কমরেড আব্দুল হাদীর রাজনীতির জানা-অজানা কথা

আবুল কালাম আজাদ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

কমরেড আব্দুল হাদী (হাদী ভাই) নোয়াখালীতে প্রকাশ্যে ‘ন্যাপ’ নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু মূলত তিনি ছিলেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে (ঘঅচ) একজন আত্মগোপনকারী নিবেদিত, ত্যাগী কমিউনিস্ট নেতা। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯২৪ সালে অবিভক্ত ভারতবর্ষে কমরেড আব্দুল হাদী জন্মগ্রহণ করেন এবং ০২ জানুয়ারি ২০০৩ স্বাধীন বাংলাদেশে বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানাধীন ঘাটলা ইউনিয়নের ঘাটলা গ্রামটি ছিল জনাব আব্দুল হাদীর জন্মস্থান। পরবর্তীতে বর্তমান সোনাইমুড়ী থানার সোনাপুর ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে, সোনাপুর বাজারের সন্নিকটে তিনি স্থায়ীভাবে আবাসস্থল গড়ে তোলেন। সোনাপুর গ্রামটি ছিল প্রগতিশীল রাজনীতির একটি শক্তিশালী ঘাঁটি। হাদী ভাইয়ের পিতা ছিলেন অবিভক্ত ভারতবর্ষের কংগ্রেস নেতা। পারিবারিক রাজনৈতিক আবহে তাঁর মধ্যে মানবপ্রেম-দেশপ্রেম জাগ্রত হয়। বলতে গেলে উত্তরাধিকার সূত্রে জনাব আব্দুল হাদী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ১৯৪৫ সালে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর নেতৃত্বে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। পরবর্তীতে ১৯৪৬ ব্রিটিশ শাসনামলে কমিউনিস্ট আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদকে তিনি মনে-প্রাণে ঘৃণা করতেন। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক মানব দরদি কমিউনিস্ট কর্মী। বিশ্বব্যাপী সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত করাই ছিল তাঁর মূলমন্ত্র। জাতিবেদ, বর্ণবৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা, মানুষে মানুষে ভেদাভেদে তিনি বিশ্বাস করতেন না। তিনি পৃথিবীব্যাপী মানুষের শোষণমুক্তির স্বপ্ন দেখতেন। ১৯৪৬-এ ভারতবর্ষে সংগঠিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবিরোধী কাজে তিনি প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি বজায় রাখতে নোয়াখালীতে দাঙ্গা নামক বর্বরতা দমনে সাহসী ভূমিকা পালন করেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে জেল-জুলুম, পাশবিক অত্যাচার, নির্যাতন, ভয়, ভীতি উপেক্ষা করে দেশে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সর্বাত্মক কাজ করার ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে কোনো দিন আড়াল করেননি। তাঁকে কোনো দিন সুবিধাবাদী চরিত্র স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি ছিলেন আমৃত্যু আদর্শের প্রতি অবিচল ও নিষ্ঠাবান, ত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আমাদের অনেকের কাছেই ছিলেন তিনি আদর্শের প্রতীক ও পথপ্রদর্শক। আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে তিনি বহুবার জেলে অন্তরীণ হয়েছেন। রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন সময়ে তাঁর পরিবার অপরিসীম ভোগান্তিতে পড়েছেন। শোষণমুক্তির আন্দোলন করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে তিনি পাকিস্তানী স্বৈরশাসকের অত্যাচার ও হামলার শিকার হন। তিনি ১৯৫০ থেকে ১৯৫৪ পর্যন্ত কারাভোগ করেন এবং নির্যাতনের শিকার হন। কারাভোগের পর তিনি মুক্তি পান। ঐ সময় শাসকশ্রেফণ পূর্ব বাংলার যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেয়ে দিয়ে প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার, জুলুম-নির্যাতন শুরু করে। ফলে জনাব আব্দুল হাদীকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৯৫৬ পর্যন্ত কারাগারে বন্দি রাখা হয়। পাক শাসনামলে কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ থাকায় কমরেড আব্দুল হাদী ১৯৫৭ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে (ন্যাপ) যোগ দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশনা মতো কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে থাকেন। পরবর্তীতে ন্যাপ (ঘঅচ) বিভক্ত হলে তিনি ন্যাপ (মুঃ) অংশে কাজ করতে থাকেন। কমিউনিস্ট পার্টি ছিল পাকিস্তানি শাসনামলে শাসকদের আতঙ্ক। তৎকালীন সময়ে শাসকশ্রেণি যাকেই কমিউনিস্ট মনে করতো তাঁর ওপর নেমে আসতো হয়রানি, জেল-জুলুম, পাশবিক অত্যাচার, নির্যাতন - যার কোনো সীমা পরিসীমা ছিল না। যে কারণে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা তাদের পরিচয় গোপন রেখে প্রকাশ্যে ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতা, কর্মী, সমর্থক হয়ে কাজ করতেন। ৭০-এ আমাদের দেশে সংগঠিত দুনিয়া কাঁপানো প্রলয়ংকরী জলোচ্ছ্বাসের আঘাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। ঐ ভয়াবহ দুর্যোগ শেষে নোয়াখালীর উপকূলীয় এলাকায় রিলিফ ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। কমরেড আবদুল হাদী আত্মমানবতার সেবায় সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধেও ছিল তাঁর অনন্য ভূমিকা। পাক হানাদার বাহিনীর বর্বর আক্রমণের পর পরই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য তিনি ভারতের আগরতলায় “ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন” এর প্রতিষ্ঠিত ক্যাম্প, ক্রাফট ইন্সস্টিটিউটে চলে যান। ঐ সময়ে তিনি ক্রাফট ইন্সস্টিটিউটে অবস্থানকারী নোয়াখালী কমিউনিস্ট পার্টির চালিকা শক্তি কমরেড শেখ মোহাম্মদ আবদুল হাই সাহেবের সাথে যুক্ত হয়ে ক্রাফট ইন্সস্টিটিউটের ক্যাম্প ও বড়দুয়ালিয়া হাইস্কুলে স্থাপিত ক্যাম্পের সমন্বয়কারী ও ক্যাম্প পরিচালনার কাজে সম্পৃক্ত হন এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। হাদী ভাইয়ের বাড়িটি ছিল নোয়াখালীর প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শের পতাকাবাহীদের অন্যতম গোপন আশ্রয়স্থল ও বৈঠকস্থল। পাকিস্তান আমলে যতগুলো গোপন বৈঠকে অংশগ্রহণ করেছিলাম - ঐ বাড়িটি ছিল অধিকাংশ গোপন বৈঠকের নির্ধারিত স্থান। রাজনৈতিক সকল কাজে কমরেড আব্দুল হাদীর সহধর্মিণী ছিলেন তাঁর অকৃত্রিম সহযোগী ও সাহায্যকারী। চৌমুহনী রেলওয়ে স্টেশনে কমরেড আব্দুল হাদীর ‘বুকস্টল’ - নামের একটি দোকান ছিলো। দোকানটিতে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্র, সাপ্তাহিক পত্রিকা, ম্যাগাজিন, সাহিত্য সাময়িকী, রাজনীতির নানা ধরনের পুস্তক পাওয়া যেতো- এজন্য তাঁর ঐ দোকানটি রাজনৈতিক কর্মীদের মিলনকেন্দ্র ছিলো। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশ শাসন অবসানের জন্য এবং ইংরেজদের কবল থেকে মুক্তির জন্য ‘ব্রিটিশ হটাও’ আন্দোলনে তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন। ইংরেজ শাসন অবসান হলেও শোষণ বঞ্চনার অবসানের মাত্রা কমেনি। ফলে, হিন্দু-মুসলিম ‘দ্বি-জাতি’ তত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তানী শাসক দলের বিরুদ্ধে আবারো ‘লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়, ইয়ে আজাদী জুটা হ্যায়’- আওয়াজের সাথে একাত্ম হয়ে পুনরায় তিনি শোষণ মুক্তির আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিন্তু শোষণ-বঞ্চনা তীব্র থেকে তীব্রতর ধারণ করায় অবশেষে বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন আরম্ভ হয়। এতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর পাশবিক ও নারকীয় হত্যাযজ্ঞ শুরু হলে এ দেশের মুক্তিকামী জনতা প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নেয় এবং তাদের সাহায্য সহযোগিতায় বাংলাদেশের আপামর জনতা স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীর মানচিত্রে ‘বাংলাদেশ’ নামের একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের অভ্যুদয় ঘটায় - ‘জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গনতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র’- এ চার মূলনীতির ভিত্তিতে দেশটির সংবিধান রচিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কমরেড আব্দুল হাদী ভারতে অবস্থান করে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেন। এ দেশে সমাজতন্ত্র কায়েমের লক্ষ্যে শ্রদ্ধেয় আব্দুল হাদী আমরণ কাজ করেছেন। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক চর্চায়, তিনি তাঁর এলাকায় এক সমৃদ্ধ বলয় গড়ে তুলেছিলেন। বিজ্ঞানমনস্ক, প্রগতিশীল ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী অসাম্প্রদায়িক মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত ছিলো তাঁর সারাটি জীবন। তিনি বিশ্বাস করতেন ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। ব্রিটিশ আমল থেকে শোষণ, লুণ্ঠন, প্রতিক্রিয়াশীলতা, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, বিভিন্ন সময় তিনি দৃঢ়তার সাথে রুখে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর শূন্যতা এই অবক্ষয়ের যুগে পূরণ হবার নয়। ব্যক্তিজীবনে হাদী ভাই ছিলেন ছয় সন্তানের জনক?। তাঁরা হলেন-কানন আরা (কানন), কুসুম, শাহেদ আলী (শাহেদ), বকুল, পারুল ও মালতি। তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তান ‘কানন আরা’ বাম রাজনীতির সুপরিচিত একটি নাম। কমরেড আব্দুল হাদী, ব্রিটিশ-পাকিস্তান-বাংলাদেশ, এ তিনটি শাসন আমল প্রত্যক্ষ করেছেন। উক্ত তিন শাসনামলেই সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, অবিচল আস্থা নিয়ে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত মিছিল, সমাবেশ, আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি সারাজীবন শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অবতীর্ণ ছিলেন। দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগে পরিপূর্ণ ছিল কমরেড আব্দুল হাদীর সমগ্র জীবন। তাঁর প্রয়াণ দিবসে হাদী ভাইয়ের পরিবারের প্রতি জানাই গভীর ভালোবাসা, সমবেদনা ও তাঁর প্রতি জানাই অনন্ত শ্রদ্ধা। লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..