স্থানীয় সংস্থা প্রসঙ্গ- ১

স্বশাসিত স্থানীয় সংস্থা : চাই ক্ষমতায়ন ও সুষ্ঠু নির্বাচন

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
কিছুদিনের মধ্যেই দেশের কয়েক হাজার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন শুরু হয়ে যাবে বলে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করে রেখেছে। ইতোমধ্যে দেশের বেশ কয়েকটি পৌরসভার নির্বাচন হয়ে গেছে। পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলো হলো তৃণমূলে সবচেয়ে বিস্তৃতভাবে পরিব্যাপ্ত ‘স্থানীয় স্বশাসিত সরকার-সংস্থা’। ২/৩ মাসের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের বৃহত্তম অংশের ‘ভোটারদের অংশগ্রহণে (!)’ সেসব সংস্থার নির্বাচন। অথচ, এই নির্বাচন যতোটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা তা সে পাচ্ছে না। এর পেছনে প্রথম কারণটি হলো, দেশের সংবিধান অনুসারে এসব ‘স্থানীয় স্বশাসিত সরকার-সংস্থার’ যে ভূমিকা, কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা থাকার কথা, তা থেকে এগুলো বঞ্চিত। ব্রিটিশ আমলে ইউনিয়ন বোর্ড ও পৌরসভাগুলো ছিল নিতান্তই ‘জনসেবার সংস্থা’। এগুলোকে কোনোভাবেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের সংস্থা হিসেবে গণ্য করা হতো না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে রচিত এদেশের সংবিধানে এগুলোকে ‘জনসেবার সংস্থার’ সাথে সাথে ‘রাষ্ট্র ক্ষমতার সংস্থা’ রূপে মর্যাদা দেয়া হয়েছে। ‘ক্ষমতার’ কাঠামোগত ক্ষেত্রে এই রূপান্তর ছিল অতীব তাৎপর্যপূর্ণ। রাষ্ট্রক্ষমতার গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের নীতির আলোকে এই ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিধান গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু ৫০ বছরেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। রাষ্ট্রক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ তো দূরের কথা, উল্টা তার কেন্দ্রীভবন অব্যাহত থেকেছে। তা এখন আওয়ামী (এবং বিএনপির শাসনামলে বিএনপির) দলীয় কর্তৃত্ববাদ, গণতন্ত্রহীনতা ও ফ্যাসিস্ট দুঃশাসনের উদ্ভব ঘটিয়েছে। স্বাধীনতার ৫০ বছর সময়কাল অতিক্রান্ত হলেও এখনো পর্যন্ত নির্বাচিত স্বশাসিত সরকার সংস্থারগুলোকে ‘ক্ষমতার সংস্থা’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। ব্রিটিশ আমলের মতো এখনো এগুলোকে মূলত ‘জনসেবার সংস্থা’ হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছে। আরও যা করা হচ্ছে তা হলো, এগুলোকে ‘রাষ্ট্রের’ নয়, ‘ক্ষমতাসীন সরকারের’ শক্তির সম্প্রসারিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলোকে স্বশাসিত ক্ষমতা প্রয়োগকারী স্বাধীন সংস্থায় পরিণত করার বদলে কেন্দ্রীয় সরকার ও মন্ত্রণালয়ের আজ্ঞাবহ ‘জ্বি হুজুর সংস্থা’ হয়ে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে স্থানীয় সংস্থা সম্পর্কে সংবিধানের মূলনীতির মৌলিক বরখেলাপ। আর, ‘জনসেবার’ সংস্থা হওয়ার বদলে এগুলো বহুলাংশে পরিণত হয়েছে ‘জনগণের সম্পদ’ আত্মসাৎ করার প্রতিষ্ঠানে। বিশ্বের প্রায় সব দেশের সংবিধানেই ‘স্থানীয় শাসন’ বিষয়টি ‘প্রশাসন’ শিরোনামের পরিচ্ছেদে অন্তর্ভুক্ত থাকে। কিন্তু আমাদের দেশের সংবিধানে এই বিষয়টিকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া ও তার বিশেষ গুরুত্ব চিহ্নিত করার জন্য ‘স্থানীয় শাসন’ শিরোনামের একটি পৃথক পরিচ্ছেদ হিসেবে তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সংবিধানের চতুর্থভাগে ‘রাষ্ট্রপতি’, ‘প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভা’ শিরোনামের প্রথম দু’টি পরিচ্ছেদের পরেই এই তৃতীয় পরিচ্ছেদের ৫৯(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক এককাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।” এ থেকে এ কথা বেশ স্পষ্ট যে, স্থানীয় সরকারের কাজকর্মের বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা আইন সভার হাতে ন্যস্ত থাকলেও, তাদের স্ব স্ব “প্রশাসনিক এককাংশের স্থানীয় শাসনের” ক্ষেত্রে এসব স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থার কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশ। এই মূল নির্দেশনা অগ্রাহ্য করে আইন সভাও কোনো আইন প্রণয়নের ক্ষমতা রাখে না। স্থানীয় সংস্থার কাজে মন্ত্রীদের তো নয়ই, এমনকি এমপিদেরও নাক গলানোর কোনো অধিকার থাকতে পারে না। এমনটি করলে সেটি হবে একটি অসাংবিধানিক এবং অবৈধ কাজ। অন্যদিকে, আমলাতন্ত্রকে স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থার ওপর খবরদারী করতে দেয়াটাও হবে অন্যায় ও সংবিধান লঙ্ঘনের ঘটনা। বরঞ্চ, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তা কর্মচারীদেরকে স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থার কর্তৃত্বের অধীনে কার্যনির্বাহ করাই হবে সঠিক ও বিধিসম্মত। স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থাগুলোর স্বাধীন কর্তৃত্ব কার্যকর করতে হলে সবচেয়ে আগে যে কাজটি করতে হবে তা হলো, এসব সংস্থাকে আর্থিক বিষয়ে স্বাধীন হতে দেয়া। সেজন্য তাদের আর্থিক এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে তাদের স্বক্ষমতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য্য। সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী ক্ষমতার গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের জন্য এটি একটি অপরিহার্য শর্ত। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা পরিষদ ইত্যাদি সংস্থাগুলোকে আর্থিকভাবে ক্ষমতাসম্পন্ন করার দুটো উপায় আছে। এক হলো, করারোপের ক্ষেত্রে এসব সংস্থার ক্ষমতা বিপুলভাবে প্রসারিত করা। অর্থাৎ, যেসব ক্ষেত্রে তারা কর-শুল্ক আদায় করতে পারবে তার তালিকা অনেক পরিমাণে বাড়িয়ে দেয়া। নানা জটিলতার কারণে এই পথ ধরে খুব বেশি দূর আগানো হয়তো সম্ভব হবে না। সে ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পথটি হলো, কেন্দ্রীয়ভাবে যে কর-শুল্ক ইত্যাদি আদায় হয়ে জাতীয় বাজেটে অন্তর্ভূক্ত হয়, তার একটি নির্দিষ্ট অংশ (৫০ শতাংশ বা ৩৩ শতাংশ- আলোচনা করে যা চূড়ান্ত করা যাবে) স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থাগুলোকে প্রদানের জন্য বিধিবদ্ধভাবে (ংঃধঃঁঃড়ৎু) বরাদ্দ রাখার ব্যবস্থা করা। সেই মোট বরাদ্দের কতো পরিমাণ অর্থ সুনির্দিষ্টভাবে কোন সংস্থার কাছে যাবে তা নির্ধারণ করে দেয়ার জন্য একটি ‘স্বাধীন জাতীয় কমিশনকে’ দায়িত্ব দেয়া হবে। প্রয়োজন ও গুরুত্ব বিবেচনা করে তারা বাজেটের সেই বিধিবদ্ধ অর্থ বিভিন্ন স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থার মাঝে বিতরণ করবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের জন্য স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থার প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিতকল্পে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করাটা হলো একটি আবশ্যিক শর্ত। পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিজে থেকে যতোটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা তা তার না পাওয়ার দ্বিতীয় কারণটি হলো প্রকৃত অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিশ্চয়তার অভাব। সংবিধানে শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ‘বিকেন্দ্রীকরণের’ নির্দেশনাই দেয়া হয়নি, সেখানে ‘গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের’ কথাও বলা হয়েছে। সংবিধানে “নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের” মাধ্যমে স্থানীয় শাসনকাজ পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। এটিকে অর্থপূর্ণ করতে হলে নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হওয়াটা হলো অত্যাবশ্যক প্রাথমিক শর্ত। কিন্তু বর্তমানে দেশের গোটা নির্বাচন ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে এক ধরনের প্রহসনে পরিণত হয়েছে। জিয়া, এরশাদের সময় নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা হয়েছিল। সেই অবস্থা থেকে উত্তরণের অঙ্গীকার ছিল সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী গণঅভ্যূত্থানের একটি প্রধান প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা হয়নি। অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ ধরে দেশ এগুতে পারেনি। অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনুপস্থিতি, দলীয় প্রতীক নিয়ে স্থানীয় সংস্থার নির্বাচন করার সুযোগ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। কিন্তু এখন তার চেয়ে বড় ইস্যু ও প্রতিবন্ধকতা হলো নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অর্থশক্তি, পেশিশক্তি, প্রশাসনিক কারসাজি, সাম্প্রদায়িক প্রচারণা ইত্যাদির সর্বগ্রাসী অশুভ প্রভাব। লোকে বলে, এখনকার নির্বাচন হলো ‘হোন্ডা-গুণ্ডার’ দাপটের প্রতিযোগিতার খেলা। প্রথমেই ‘টাকার খেলা’ শুরু হয়ে যায় প্রাক-নির্বাচনী প্রচারণা দিয়ে। পোস্টার-ব্যানার-হোডিং, দান-খয়রাত ইত্যাদির মাধ্যমে ‘দোয়া চাইতেই’ খরচ হয়ে যায় লাখ-লাখ টাকা। তার পরে আসে নমিনেশন পাওয়ার জন্য ‘খরচপাতি’। নমিনেশন বাণিজ্য এখন এক বিশাল ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। তারপর শুরু হয় প্রচারণা দিয়ে ‘তাক লাগিয়ে দেয়ার’ খরচ, নির্বাচনী কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রশাসনকে ‘হাত করার’ খরচ, স্থানীয় মাতব্বরদের ‘কিনে নেয়ার’ খরচ, ভোটারদের মধ্যে টাকা ছড়িয়ে ‘ভোট কেনার’ খরচ ইত্যাদি আরো কতো কী! সব মিলিয়ে খরচ দাঁড়ায় গিয়ে কোটি টাকার হিসেবে। এ নিয়ে অবশ্য এক শ্রেণির প্রার্থীদের কোনো পরোয়া নেই। এ তো হলো নির্বাচনী ব্যবসা! ব্যবসায় যে টাকা বিনিয়োগ হবে, তার দশগুণ উঠিয়ে নেয়া যাবে। দেশে এখন সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা নাকি মেম্বার, কমিশনার, চেয়ারম্যান, মেয়র, এমপি-গিরির ব্যবসা! এই ‘টাকার খেলার’ কম্পিটিশনে আমার-আপনার-সাধারণ মানুষের কোনো জায়গা করে নেয়ার সুযোগ আছে কি? টাকা ঢাললেই হোন্ডা-গুণ্ডা দিয়ে দাপট দেখানো যায়। সেই দাপটের সামনে প্রতিপক্ষকে কাবু করা যায়। অধিকন্তু, ‘উপরের নির্দেশে’ কাজ করে সরকারের ‘গুড বুকে’ থাকা বা হাতে হাতে ‘টু-পাইস’ প্রাপ্তির প্রলোভন দ্বারা প্রশাসনের একাংশকে হাত করতে পারলে আর কী চাই! বিনা ভোটারেই বাক্সভর্তি করে ফেলা, ছাপ্পা ভোট, এমনকি আগের রাতে ব্যালট দিয়ে বাক্স ভরে রাখা, ভোট গণনায় কারচুপি – টাকার জোরে আজকাল কোনো কিছুই অসাধ্য নয়। আজকাল চতুর্দিকে এসবই তো ঘটছে। আর পাবলিক! সাম্প্রদায়িক অনুভূতিকে অপব্যবহার করে জনগণের প্রকৃত স্বার্থের বিষয়গুলো তাদের দৃষ্টি থেকে সরিয়ে রাখতে পারলে প্রকৃত জনসেবক, সৎ, দক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীদের দূরে ঠেলে দেয়াটা একেবারেই সহজ হয়ে যায়। তাছাড়া চা-পান-সিগারেটের নগদ প্রাপ্তি দিয়ে তাদেরকে মোহিত রাখাটাও কঠিন কোনো কাজ নয়। এভাবে জনগণের সুবিবেচনা প্রসূত মতামতের প্রতিফলনের বদলে নির্বাচন এখন পরিণত হয়েছে অর্থ-শক্তি, পেশি শক্তি, প্রশাসনিক আনুকূল্য ইত্যাদির ওপর কার দখল বেশি তা প্রদর্শনের কুৎসিত প্রতিযোগিতায়। তাই, সংবিধানে রাষ্ট্রক্ষমতার গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের যে ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে তা কার্যকর করার জন্য একদিকে স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থার ক্ষমতায়ন যেমন অপরিহার্য, তেমনই অপরিহার্য হলো অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিতকল্পে নির্বাচন ব্যবস্থাকে তার বর্তমান প্রহসনমূলক অবস্থা থেকে আমূল ঢেলে সাজানো। টাকার খেলার নির্বাচনে ‘বিনিয়োগ’ করা অর্থ উঠিয়ে আনাসহ তা আরো কয়েক গুণ বাড়ানোর জন্য নির্বাচিত চেয়ারম্যান, মেম্বার, কমিশনাররা জনসেবা ও উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ টাকায় ভাগ বসাতে দ্বিধা করে না। শুরু হয়ে যায় দুর্নীতির জমজমাট কারবার। তাছাড়াও স্থানীয়ভাবে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে চলে থাকে বেআইনী লুটপাটের নানা বেপরোয়া কর্মকাণ্ড। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে জনসেবায় মনযোগ না দিয়ে তাদের চোখ নিবদ্ধ থাকে টাকা বানানোর সুযোগের প্রতি। এসব অনাচার ও রুগ্নতার মাঝেও, দুর্নীতি ও লুটপাট থেকে মুক্ত প্রকৃত জনদরদী ব্যক্তিরা কোনোভাবে নির্বাচিত হতে পারলে, বর্তমান ব্যবস্থার মধ্যেও, সাধারণ মানুষ আরো কিছুটা সেবা ও সুবিধা পেতে পারবে। সে ধরনের সৎ, জনদরদী ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তি নির্বাচিত হলে স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও নানা সৃজনশীল উদ্যোগ পরিচালনা সম্ভব হবে। জনসেবায় ব্রতী, সৎ, নিষ্ঠাবান, দক্ষ ও জনস্বার্থে সংগ্রাম পরিচালনার ক্ষেত্রে পরীক্ষিত প্রার্থীদের নির্বাচিত হতে পারাটাও যেসব কারণে স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থার সংবিধান নির্দেশিত পথে কাজ করতে পারার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তৃণমূলের নির্বাচিত স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থাগুলোর কাজকর্মের সাথে দেশবাসীর রাজনৈতিক-আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গী ও চেতনার মানের বিষয়টি নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারা, চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি তথা ‘জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার’ নীতি-আদর্শ, অসাম্প্রদায়িকতা, বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চা ইত্যাদি বিষয়গুলো সমাজে কতোটা প্রসারিত হবে ও গভীরতা পাবে ইত্যাদি ক্ষেত্রে স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা সম্ভব। দেশে বর্তমানে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী জঙ্গিবাদের যে বিপদ বিরাজ করছে, মুষ্ঠিমেয় লুটপাটকারীর লুণ্ঠন, জুলুম-অত্যাচার-নির্যাতন ইত্যদির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামে এসব সংস্থাগুলোর ভূমিকা খুবই কার্যকর হতে পারে। আসন্ন পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এটিও একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থার নির্বাচনের প্রধান এজেন্ডা হওয়া উচিৎ চারটি বিষয়। (এক) স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থার প্রকৃত ক্ষমতায়ন। (দুই) নির্বাচনকে অবাধ-নিরপেক্ষ করার জন্য অর্থশক্তি, পেশিশক্তি ইত্যাদি থেকে তাকে মুক্ত করে নির্বাচন ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার সাধন। (তিন) দুর্নীতিমুক্ত, সৎ, জনদরদী, দক্ষ ব্যক্তিদের নির্বাচিত করা। এবং (চার) সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদ, লুটপাটতন্ত্র, কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিস্ট শাসন, সাম্রাজ্যবাদী শোষণ ইত্যাদি প্রতিরোধের শক্তিকে তৃণমূলে প্রসারিত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারা সমুন্নত রাখা। স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থার নির্বাচন নিছক ‘উৎসবের’ মতো একটি হৈ-চৈ মার্কা ব্যাপার নয়। সেটি তার চেয়ে ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ক্ষমতায়ন, সুষ্ঠু নির্বাচন ইত্যাদি ইস্যুগুলো এর সাথে সম্পৃক্ত। বস্তুতঃ এগুলোই হলো সবচেয়ে গুরুত্ববাহী ইস্যু ও প্রধানতম নির্বাচনী এজেন্ডা। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এসব ‘আসল এজেন্ডাগুলো’ আজ অনেকটাই আড়াল করে রাখা হয়েছে। ‘বড় দল’ বলে দাবিদার বুর্জোয়া দলগুলো এসব এজেন্ডাকে সামনে আনার বদলে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে নিছক নেত্রীদ্বয়ের ‘নিজের লোকের’ সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতার পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। উল্লিখিত এজেন্ডাগুলোকে সামনে আনার জন্য বামপন্থিরা চেষ্টা করছে। কিন্তু তারা বিভক্ত হয়ে আছে এবং তাদের শক্তি এখনও সীমিত। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব করে তুলতে হলে স্থানীয়ভাবে সংগ্রাম-আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি স্থানীয় সংস্থার নির্বাচন-কাজকর্মের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বামপন্থিদেরকে তাদের মনযোগ কেন্দ্রীভূত করতে হবে তৃণমূলে। ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে সেই তৃণমূলে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..