মার্কিন সংসদ ভবনে তাণ্ডব ট্রাম্প সমর্থকদের

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিদেশ ডেস্ক : উন্মত্ত ট্রাম্প সমর্থকদের ভয়াবহ তাণ্ডব দেখল মার্কিন সংসদ ভবন। ৬ জানুয়ারি ওয়াশিংটনের ‘ক্যাপিটল’ ভবনে নিরাপত্তা রক্ষীদের বাধা অতিক্রম করে ঢুকে পড়ে একদল জনতা, সংখ্যায় কয়েক শত, অনেকের হাতে ছিল অস্ত্র। যাযর ট্রাম্পের সমর্থনে স্লোগান দিচ্ছিলেন। অব্যাহত ভাঙচুর এবং নৈরাজ্যের ফলে বন্ধ করে দেয়া হয় কংগ্রেসের অধিবেশন, কোনোক্রমে উদ্ধার করে সরিয়ে নেওয়া হয় সিনেটর ও কংগ্রেসের সদস্যদের। সিনেটের সভাপতির চেয়ার দখল করে, অধ্যক্ষের আসন থেকে কেউ ঘোষণা করে দিলেন: ‘ট্রাম্প নির্বাচনে জিতেছেন’। তবে দীর্ঘসময়ের এই হামলা রুখতে তেমন তৎপর হতে পারেনি নিরাপত্তা রক্ষীরাও। অবশেষে পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে তখন বাইরে থেকে পুলিশ ডেকে কাঁদানে গ্যাস, পরে গুলিও চালানো হয়। নিহত হয় চারজন। ভিডিও ফুটেজ-সহ অন্যান্য প্রমাণ থেকে স্পষ্ট এই হামলা চালিয়েছে ট্রাম্প সমর্থক অতি দক্ষিণপন্থী, নয়া ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠীগুলি বলে দাবি করেছে মার্কিন কংগ্রেস কর্তৃপক্ষ। এর আগে ১৮১২ সালে ব্রিটিশরা এই ভবন পুড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু দেশের রাষ্ট্রপতি নিজের পরাজয় ঠেকাতে উগ্রবাদী সমর্থকদের লেলিয়ে দেবেন, এমন কথা কেউ কল্পনাও করেনি। ট্রাম্পের দলেরই সিনেটর মিট রোমনি মন্তব্য করেছেন, ‘ রাষ্ট্রপতি এই অভ্যুত্থান ঘটিয়ে দিলেন’। দুনিয়ার দেশে দেশে নির্বাচিত সরকার উৎখাত করতে অভ্যুত্থান থেকে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান চালানোর ইতিহাসই মার্কিন ঐতিহ্য। এই সমস্ত আগ্রাসনের অনুমোদন, রণনীতি সবুজ সঙ্কেত পেয়েছে ক্যাপিটল ভবন থেকে। প্রয়োগ হয়েছে রাষ্ট্রপতি ভবন হোয়াইট হাউস থেকে। মার্কিন সেনেট ও কংগ্রেসের অধিবেশন কক্ষের সেই ভবনেই হল একধরনের অভ্যুত্থানই। বিদায়ী রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প পূর্বাপর জানিয়ে এসেছেন তিনি ভোটে পরাজয় মানবেন না। প্রত্যক্ষ প্ররোচনা দিয়ে তিনিই হাঙ্গামা বাঁধাতে পাঠালেন তাঁর অন্ধ সমর্থককুলের একাংশকে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী নির্বাচকমণ্ডলী বা ইলেকটোরাল কলেজকে অনুমোদন দেবার জন্য ৬ জানুয়ারিই বসেছিল সংসদের অধিবেশন। যেখানে মার্কিন সময় প্রায় ভোররাতে এসে ঘোষিত হয় জো বাইডেনই মার্কিন রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন। যে ট্রাম্প হামলাকারীদের অভিনন্দন জানিয়ে টুইট করেছিলেন, তিনি পরে বিবৃতি দিয়ে জানান, পরাজয় মানেননি কিন্তু ২০ জানুয়ারি ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেবেন। সংসদ অধিবেশনের মধ্যেই বাইডেনের জয়কে চ্যালেঞ্জ করছিলেন রিপাবলিকানরা। নির্বাচনী রায় উলটে দেবার জন্য প্রস্তাব আসছিল। এরই মধ্যে দুপুরে হোয়াইট হাউসের সামনে জড়ো হন ট্রাম্পের সমর্থকরা। তাঁদের উত্তেজিত করেন ট্রাম্প। বলেন, তিনিও তাদের সঙ্গে যাবেন সংসদ ভবনে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য নিজে যাননি, সংসদ ভবনের দিকে তাঁদের অভিযান চালানোর আহ্বান জানিয়ে এখনও মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প বলেন, ‘যদি সর্বশক্তি দিয়ে আজই না লড়েন তাহলে আপনাদের কোনও দেশ থাকবে না। দুর্বল কেউ থাকলে বেরিয়ে যান। এখন শক্তিপ্রয়োগের সময়।’ তাঁর আইনজীবী রুডি গিউলিয়ানি বলেন, ‘গায়ের জোরেই বিচার হবে’। বিস্ময়ের কথা এই যে এর পরেও সংসদ ভবনের নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশি প্রয়াস ছিল নগণ্য। সংসদ ভবনের নিরাপত্তায় থাকেন ক্যাপিটল পুলিশের ২হাজার নিরাপত্তারক্ষী। তাঁরাও সকলে ছিলেন না। দীর্ঘ সময় ধরে তাণ্ডব চললেও মার্কিন নিরাপত্তারক্ষীদের অন্য কোনও অংশকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়নি। কয়েকশত সমর্থক সংসদ ভবনের সামনে ব্যারিকেড ভেঙে ফেলেন অনায়াসেই। অল্প সংখ্যক নিরাপত্তা রক্ষীরা মৃদু বাধা দিয়েছেন মাত্র। এরপর কেউ সিঁড়ি দিয়ে, কেউ পাঁচিল টপকে, কেউ বিভিন্ন গেট দিয়ে ঢুকে পড়েন ভেতরে। অনেকের হাতেই বন্দুক, রড, লাঠি। পুলিশ পরে জানিয়েছেন, পেট্রোল বোমা, পাইপ বোমা, লাইসেন্সহীন বন্দুক উদ্ধার করা হয়েছে। ‘কোথায় ওরা?’, চিৎকার করতে থাকেন হামলাকারীরা। ‘ওরা’ মানে সেনেট, কংগ্রেসের সদস্যরা। তখন সাংসদদের কেউ লুকিয়েছেন টেবিলের তলায়, কাউকে নিরাপত্তা রক্ষীরা উদ্ধার করে বের করে নিয়ে গেছেন অন্যত্র। গ্যাস মুখোশও পরিয়ে দেওয়া হয়। ভবনের বিরাট অংশই ফাঁকা করে দেওয়া হয়। দুপুর আড়াইটেয় এক পুলিশ অফিসার অধিবেশন কক্ষে ঢুকে ঘোষণা করেন, এখান থেকে সরে যেতে হবে। সেনেট অধিবেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়। ‘ঢুকে পড়েছে’, আর্তচিৎকারের মতো শোনা যায় সেনেট কক্ষের মাইকে। ঝনঝন করে কাচ ভাঙার শব্দের মধ্যেই অধ্যক্ষ ন্যান্সি পেলোসির অফিসে ঢুকে পড়ে একদল। ভাঙচুর করা হয় অফিস। তাঁর টেবিলে উঠে নাচতে থাকে কেউ কেউ। উপ রাষ্ট্রপতি মাইক পেন্সের চেয়ারেও বসে পড়েন। নিরাপত্তা রক্ষীরা ইলেকটোরাল কলেজের গণনার বাক্স কোনোক্রমে আগলে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যায়। অন্যথায় লুট হতো সেগুলি। কেউ ছবি ছিঁড়ে ফেলে, কেউ আসবাব ভাঙতে শুরু করে। দেড় ঘণ্টা ধরে প্রথমে সংসদ ভবনের প্রাঙ্গণে, পরে ভেতরে একটানা তাণ্ডব চলতে থাকে প্রায় বিনা বাধায়। এত ভয়াবহ আক্রমণের পরেও ন্যাশনাল গার্ড আসেনি কেননা ট্রাম্প নির্দেশ দেননি। সন্ধ্যা নামার পরে ন্যাশনাল গার্ড ডাকা হয়, ওয়াশিংটনের স্থানীয় পুলিশ আসে। ওয়াশিংটনে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। পুলিশ অফিসাররা হাঙ্গামাকারীদের সরে যেতে বলে। একপ্রস্থ সংঘর্ষ হয়, পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ে হাঙ্গামাকারীদের বের করে দেবার চেষ্টা করে। তখনই কংগ্রেস অধিবেশনের কক্ষে গুলি চলেছে বলে খবর। গুলিতে এক মহিলা নিহত হয়েছেন। আরও তিনজন জখম হয়ে মারা গিয়েছেন। পুলিশের ভাষ্য, অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছেন। কিন্তু এত বড় হাঙ্গামার পরেও হামলাকারীদের বিনা বাধায় বেরোতে দেয় পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয়েছে মোট ৫২ জনকে। এক অর্থে এই হামলা পূর্বঘোষিত। ট্রাম্প ডিসেম্বরের ১৯ তারিখে নিজেই টুইট করেছিলেন, ৬ জানুয়ারি রাজধানীতে বিরাট প্রতিবাদ হবে, সেখানে আসুন, ‘বি ওয়াইল্ড’। ট্রাম্পের উগ্র সমর্থকদের মধ্যে এই দিনে ওয়াশিংটনে সমবেত হওয়ার প্রস্তুতি, কী অস্ত্র নিয়ে যাওয়া হবে, তার বার্তা বিনিময় চলেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেদিন ক্যাপিটল দখল করে নির্বাচনী ফল উলটে দেওয়া হবে বলে আহ্বান জানিয়ে ‘বর্বরতার পথেই’ সভ্যতা বাঁচানের আওয়াজ তুলেছিলেন ট্রাম্প সমর্থকদের এই অংশ। দেখা গেছে, এই হামলায় জড়িতরা প্রায় সকলেই শ্বেতাঙ্গ। ‘প্রাউড বয়েজ’-এর মতো শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীরা ছিল। ছিল অভিবাসী-বিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠী, সোস্যাল মিডিয়ায় তথাকথিত চক্রান্তের কাহিনি ছড়ানো ‘কিউ-অ্যানন’ সমর্থকরা। প্রশ্ন উঠেছে, যদি কৃষ্ণাঙ্গরা থাকত, তাহলে পুলিশ কি এইরকমই নির্জীব আচরণ করত? অনেক রাতে সেনেট ও প্রতিনিধিসভার যৌথ অধিবেশন ফের শুরু হয়। ততক্ষণে পরিবেশেরও গুরুতর পরিবর্তন ঘটে গেছে। প্রত্যেক ইলেকটোরাল কলেজ ভোট গণনা হয়, বৈধতার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর মধ্যেই আরিজোনা ও পেনসিলভেনিয়ার ভোটের স্বীকৃতির বিরুদ্ধে প্রস্তাব আসে। সেনেটে ৯৩-৬ ভোটে সেই প্রস্তাব পরাজিত হয়। প্রতিনিধিসভায় ৩০৩-১২১ ভোটে সেই প্রস্তাব পরাস্ত হয়। পেনসিলভেনিয়ার ক্ষেত্রে সেনেটে ৯২-৭ ভোটে প্রস্তাব পরাস্ত হয়, প্রতিনিধিসভায় ২৮২-১৩৮ ভোটে। প্রায় ভোররাতে ভাবী রাষ্ট্রপতি হিসাবে মার্কিন কংগ্রেসের স্বীকৃতি পেয়েছেন জো বাইডেন এবং উপ রাষ্ট্রপতি হিসাবে কমলা হ্যারিস। ২০ জানুয়ারি তাঁরা শপথ নেবেন। হামলা চলাকালীন ভাবী রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন টেলিভিশনে বলেন, আমেরিকা এক অন্ধকার সময়ের সামনে। নজিরবিহীন আক্রমণ চলছে। ট্রাম্পের উচিত টেলিভিশনে এসে এই জনতাকে সংযত হতে বলা। ট্রাম্প অবশ্য তা করেননি। ট্রাম্প এত প্ররোচনা ছড়াচ্ছিলেন যে নজিরবিহীনভাবে মার্কিন রাষ্ট্রপতির টুইটার অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। হাঙ্গামার শেষ পর্বে এসে ট্রাম্প বিবৃতি দিয়েছিলেন, এই প্রতিবাদ বিশেষ ধরনের। হাঙ্গামাকারীদের সেলাম ঠুকেছিলেন। বলেছিলেন এবার বাড়ি যান। অধিবেশন শেষে তিনি বিবৃতি দেন। সেখানে তিনি বলেন, আমি এই নির্বাচনের ফলাফল একেবারেই মানি না। কিন্তু ক্ষমতা হস্থান্তর সুশৃঙ্খলভাবেই হবে। তবে আমাদের লড়াই সবে শুরু হলো। এই হামলার পরে মার্কিন রাষ্ট্রপতির অফিসের একাধিক শীর্ষ অফিসার ইস্তফা দিয়েছেন। সহকারী নিরাপত্তা অফিসার, মেলানিয়া ট্রাম্পের পরামর্শদাতারাও এঁদের মধ্যে রয়েছেন। বিশ্বজুড়ে ধিক্কৃত হয়েছেন ট্রাম্প। মার্কিন ক্যাপিটলে ট্রাম্প পন্থিদের হামলার ঘটনার পরেই জো বাইডেনকেই আমেরিকার পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে সার্টিফিকেট দিল মার্কিন কংগ্রেস। স্বাভাবিক ভাবেই কংগ্রেসের এই সিদ্ধান্তে খুশি ডেমোক্র্যাটরা। নভেম্বরে ৩০৬ আসনে জিতে আসার পর থেকেই রিপাবলিকানরা বাইডেন-হ্যারিসের জয়ী হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। তারপরেই নির্বাচনের ফলকে চ্যালেঞ্জ জানায় ট্রাম্প পন্থীরা। যদিও কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই এদিন ক্যাপিটলে ঢুকে তাণ্ডব চালায় ট্রাম্প অনুগামীরা। এই ঘটনার পরে পরেই আবার নিজের হার স্বীকার করে নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা জানিয়ে দেন তিনি। পরে তা নিয়ে একটি টুইটও করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সক্রিয় রাজনীতি থেকে তিনি কখনোই সরে যাবেন না বলেও জানান ২০২৪-এ ফের নির্বাচনে লড়াই করার ইঙ্গিতও দেন এদিন নিজের টুইটে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..