টিকা পাওয়া নিয়ে ‘ধোঁয়াশা’

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক : ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের (এসআইআই) কাছ থেকে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন বা টিকা সময়মতো পাওয়া নিয়ে দেশে হঠাৎ ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত ওই টিকা তৈরি করছে এসআইআই। প্রতিষ্ঠানটির কর্তাব্যক্তিদের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ দেখা দিয়েছে জনমনে। প্রশ্ন উঠছে চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে। সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হলেও সন্দেহ দূর হচ্ছে না। ‘কোভিশিল্ড’ টিকা কেনার জন্য গত ১৩ ডিসেম্বর সেরাম ইনস্টিটিউট ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের সঙ্গে চুক্তি করে সরকার। চুক্তি অনুযায়ী, জানুয়ারির শেষ বা আগামী মাসের শুরু থেকে পরবর্তী ছয় মাসে ৫০ লাখ করে মোট ৩ কোটি টিকা পাওয়ার কথা বাংলাদেশের। এজন্য অগ্রিম হিসেবে ৬০০ কোটি টাকা সেরাম ইনস্টিটিউটের অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়ার কথাও জানিয়েছে সরকার কিন্তু গত সপ্তাহে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট উৎপাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনা ভ্যাকসিন রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ভারত সরকার। এর ফলে দরিদ্র দেশগুলোর ভ্যাকসিন পেতে আরো কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানায়। ইনস্টিটিউটের সিইও আদর পুনাওয়ালাকে উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, কয়েক মাসের জন্য ভ্যাকসিন রপ্তানির অনুমতি দেবে না ভারত। ভারতীয়রা যাতে যথাযথভাবে ভ্যাকসিন পায়, সেজন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে পরে সেরাম ইনস্টিটিউটের জনসংযোগ কর্মকর্তা মায়াঙ্ক সেন দিল্লিতে বলেছেন, টিকা রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞার যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা পুরোপুরি সঠিক নয়। কারণ তাদের টিকা রপ্তানির ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে কোম্পানিটি এখন অন্য দেশে টিকা রপ্তানির অনুমতি পাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে, যা পেতে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। রপ্তানি শুরু করার আগেই তারা ভারত সরকারকে ১০ কোটি টিকা দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। কিন্তু এ মুহূর্তে তারা রপ্তানি করতে পারবে না, যেহেতু তাদের রপ্তানির অনুমতি নেই। ভারত সরকারের সঙ্গে এখনো টিকার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি সেরাম ইনস্টিটিউটের। শিগগিরই এই চুক্তি হবে বলে প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিকারকর্মী ডা. লেলিন চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, ‘অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার প্রযুক্তি নিয়ে সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া যে কোভিশিল্ড টিকা উৎপাদন করছে, তা স্বল্পমূল্যে বাজারজাত করতে অর্থায়ন করেছে দ্য বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন এবং আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিন জোট গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমোনাইজেশন (গ্যাভি)। এর শর্তানুযায়ী এই টিকার শতকরা ৫০ ভাগ ভারত এবং বাকি ৫০ ভাগ অন্য দেশকে দিতে হবে। সেই হিসেবে আমরা ওই টিকা পাব, তা আশা করা যায়। আবার এসআইআইয়ের সঙ্গে বেক্সিমকো ও বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের মধ্যে হওয়া ত্রিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ীও আমরা কোভিশিল্ড পাব। তবে কথা হচ্ছে, এই পাওয়ার সময় আগের চেয়ে একটু প্রলম্বিত হতে পারে।’ বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘টিকা পাওয়া নিয়ে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে কি চুক্তি হয়েছে, আমরা তা জানি না। তবে সংবাদমাধ্যম বলছে, টিকা পাবে না। তবে তা সাময়িক সময়ের জন্য। তাই আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। যেহেতু আমরা অন্য কোথাও টিকা পাব না, তাই এর বাইরে করারও কিছু নেই। সেক্ষেত্রে আমাদের উচিত হবে, টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে আরো তৎপর করা।’ রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেনও বলেছেন, ‘জাতিসংঘ এ পর্যন্ত একটি মাত্র টিকার অনুমোদন দিয়েছে। এর একটি স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র সিরাম ইনস্টিটিউটের টিকার অনুমোদন দিলে তবেই তা রপ্তানি করতে পারবে। যেহেতু টিকাটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় উৎপাদিত, তাই এটা অন্য দেশে দিতেই হবে। এজন্য উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই, আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।’ ভাইরোলজিস্ট ডা. মুশতাক বলেন, ‘শুধু ভারতের টিকা নয়, এরই মধ্যে চীন ও রাশিয়া উৎপাদিত টিকা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষে অনুমোদনের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় (ডব্লিউএইচও) জমা দিয়েছে। নতুন বছরের ছুটি শেষে আগামীকাল (আজ) ডব্লিউএইচওর প্রথম মিটিং বসতে যাচ্ছে। সেখানে অনুমোদন পেলে তবেই ভারত টিকা সরবরাহ করতে পারবে।’ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘শুরু থেকেই সরকার যে চুক্তি বলে আমরা অগ্রাধিকার পাব বলে আশ্বস্ত করেছে, আমার মনে হয়, ভারত তা মেনটেন করবে, করা উচিত। ভারত তা অগ্রাহ্য করলে সেটা হবে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের শিষ্টাচারবহির্ভূত। বাংলাদেশের মানুষ তা গ্রহণ করবে না।’ হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী আরো বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের জন্মের সময় থেকে ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক। এ নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আবেগ আছে। আমার মনে হয় না, তারা এই আবেগে আঘাত করবে। তাহলে দুই দেশের বন্ধুত্বের যে কথা বলা হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। মনে হয় না, তারা সেই ঝুঁকি নেবে।’ চিকিৎসক নেতা ডা. রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, ‘টিকা উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে প্রথমে অন্য কোথাও টিকা দেওয়া কঠিন। তাই টিকার ক্ষেত্রে নিজেদের অগ্রাধিকার দিয়ে ভারত যে অন্যায় করেছে, তা মনে করছি না। টিকা পাওয়া যাবে চুক্তি ও সম্পর্ক অনুযায়ী। তাই এখনই হতাশ হওয়ার কিছু নেই। এমনিতেই সব প্রক্রিয়া শেষে টিকা পেতে আমাদের সময় লাইবেই।’ তিনি বলেন, ‘যাদের প্রচুর টাকা আছে, তারা এরই মধ্যে টিকা দেওয়া শুরু করেছে। যেমন এ অঞ্চলের মধ্যে ইসরায়েল, সিঙ্গাপুর দিতে পেরেছে। আমাদের যেহেতু সেই সুযোগ নেই, তাই অপেক্ষা করতে হচ্ছে আপাত।’ এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আরো বলেন, ‘সৌভাগ্য যে, দেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত ও মৃত্যুর হার কম। ইউরোপীয় দেশের মতো নয়, সেটাই বড় রক্ষা। আমরা যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি, তাহলে এ থেকে রক্ষা পেতে পারি।’ সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তাও টিকা পাওয়া নিয়ে ‘সমস্যা হবে না’ বলে আশ্বাস দিয়েছেন। চুক্তি অনুযায়ী, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস বাংলাদেশে সেরাম ইনস্টিটিউট উৎপাদিত ভ্যাকসিনের ‘এক্সক্লুসিভ ডিস্ট্রিবিউটর’। প্রতিষ্ঠানটির চিফ অপারেটিং অফিসার রাব্বুর রেজা একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘টিকা পাওয়া নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা নেই। আমাদের সঙ্গে তাদের (এসআইআই) নিয়মিত যোগাযোগ আছে। আজও বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে। তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছে। আমরা নিশ্চিত, আমাদের সঙ্গে যেভাবে চুক্তি হয়েছে, সে অনুযায়ী সেসময়েই আমরা ভারত থেকে টিকা পাব।’ চুক্তির শর্ত তুলে রাব্বুর রেজা বলেন, ‘সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে আমাদের চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশে অনুমোদন পাওয়ার পর এক মাসের মধ্যে আমরা প্রথম লটের টিকা পাব।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন গতকাল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ভারত থেকে যথাসময়ে টিকা পাবে বাংলাদেশ, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বিষয়টি বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছে। সেরাম ইনস্টিটিউট টিকা রপ্তানি করতে পারবে না এমন খবর প্রচারিত হওয়ার পর বাংলাদেশে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় সকাল থেকেই দুদেশের মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ শুরু হয়।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..