কিংবদন্তির বিদায়...

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা ডেস্ক : যে বাম পাঁয়ের জাদুতে মোহাবিষ্ট করে রেখেছিলেন সারা দুনিয়া, সেখানে ফিদেলের ট্যাটু। ডান হাতে চে। মুখে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তোপ। যাবতীয় নিয়ম নীতি, তার কাছে সব কিছু তুচ্ছ। তিনি ফুটবলে রাজা। যার দুঃখ, হাসি, ক্ষোভ, উদ্দামতা ছুঁয়ে যেত পৃথিবীর সব প্রান্ত। ফুটবল যার কাছে ছিল সব কিছুর উপরে, অনেকের কাছে যিনি ছিলেন ফুটবলের প্রতিশব্দ। সেই দিয়াগো ম্যারাডোনা আর নেই। সমগ্র দুনিয়াকে স্তব্ধ করে দিয়ে ২৫ নভেম্বর চিরবিদায় নিলেন এ ফুটবল কিংবদন্তি। একক নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনাকে ১৯৮৬ বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন, সাদামাটা নাপোলিকে পরিণত করেছিলেন ইউরোপের অন্যতম সেরা দলে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে করা তার দ্বিতীয় গোলকে বলা হয় ইতিহাসের সেরা গোল। আর আগের গোলটি ছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধের শত্রুদের বিরুদ্ধে বার্তা। এক খেলায় তাকে রুখতে নেদারল্যান্ডসের ৫ ডিফেন্ডারের এক লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার ছবি, আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিজ্ঞাপন। ফুটবল কীর্তির বাইরেও তিনি ছিলেন বর্ণময় চরিত্রের অধিকারী। পেশাদার ফুটবলকে বিদায় জানানোর পর নানা বিতর্কের জন্ম দিয়ে প্রায় সবসময়ই ছিলেন খবরের শিরোনাম হয়ে। দেশের হয়ে চারটি বিশ্বকাপ খেলা ম্যারাডোনা জাতীয় দলের হয়ে ৯১ ম্যাচ খেলে করেছিলেন ৩৪ গোল। ৮৬’র বিশ্ব জয়ের পরের বিশ্বকাপেও দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন ম্যারাডোনা। কিন্তু শিরোপা লড়াইয়ে হেরে যায় সেই সময়ের পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে। ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র আসরেও দলের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি; কিন্তু ড্রাগ টেস্টে পজিটিভ হয়ে দুই ম্যাচ খেলেই দেশের পথ ধরতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। গ্রুপ পর্বে গ্রিসের বিপক্ষে জয়ের পর নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে জেতা ম্যাচটিই হয়ে থাকে তার ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। বুটজোড়া তুলে রেখে কোচিং ক্যারিয়ারে পা রাখেন ম্যারাডোনা। ২০১০ বিশ্বকাপে ছিলেন আর্জেন্টিনার ডাগআউটে। কোচ হিসেবে অবশ্য উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাননি তিনি। গতবছর থেকে স্বদেশের ক্লাব হিমনেশিয়ার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। গত ৩০ অক্টোবর ৬০তম জন্মদিন পালন করার তিন দিন পর শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করায় এ ফুটবল ঈশ্বরকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে পরের দিন তার অস্ত্রোপচার করানো হয়। অস্ত্রোপচার সফল হলেও হঠাৎ করে অ্যালকোহল পরিহার করায় কিছু সমস্যা দেখা দেয় তার। একারণে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল ম্যারাডোনাকে। দেশের বিশ্বকাপ জয়ে নেতৃত্ব দেওয়া ম্যারাডোনা ক্লাব ক্যারিয়ারে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সময় কাটিয়েছেন নাপোলিতে। ইতালিয়ান ক্লাবটিকে জিতিয়েছিলেন তাদের ইতিহাসের প্রথম সেরি আ শিরোপা, ১৯৮৬-৮৭ মৌসুমে। দুই মৌসুম বাদে দলটির হয়ে জিতেছিলেন দ্বিতীয় সেরি আ। এখন পর্যন্ত ওই দুবারই লিগ শিরোপা জিতেছে নাপোলি। ১৯৮২ সালে বার্সেলোনার হয়ে ইউরোপীয় ফুটবলে পা রাখেন মারাদোনা। কাতালান ক্লাবটিতে দুই মৌসুম খেলে পাড়ি দিয়েছিলেন নাপোলিতে। ক্যারিয়ার জুড়ে ম্যারাডোনা গড়েছেন ইতিহাস, জন্ম দিয়েছেন নানা কীর্তি, হয়ে উঠেছেন কিংবদন্তি। জন্ম হয়েছিল আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসের এক শ্রমিকের ঘরে; সে কারণেই বোধহয় দারিদ্র্যর বিরুদ্ধে যুঝতে তার অস্ত্র হয়ে উঠেছিল ফুটবল। “বল দেখলেই আমি তার পেছনে ছুটতাম, তখন আমি হয়ে যেতাম বিশ্বের সবচেয়ে সুখী মানুষ”- বলতেন তিনি। সেজন্য তার সেই লড়াই নিয়ম-কানুন মেনে চলেনি, শঠতার আশ্রয় নিতেও কার্পণ্য দেখায়নি, শালীনতার সীমা অতিক্রম করতেও দ্বিধা করেনি। বদমেজাজী ম্যারাডোনা অন্য অনেক কৃতী ফুটবলারের মতো কারও মন রক্ষা করে চলতে পারেননি, পাত্তাই দিতেন না বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা ফিফাকেও। নিজ দেশের ফুটবল সংস্থাকে ছাড়তেন না। কোকেন নিতেন, স্বীকার করেছেন। সাংবাদিককে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছিলেন, শাস্তি মেনে নিয়েছেন, কিন্তু অনুতপ্ত হননি। ঘৃণা করতেন যুক্তরাষ্ট্রকে; বলতেনও- “যুক্তরাষ্ট্র থেকে যা কিছুই আসে, আমি তা ঘৃণা করি, সর্বশক্তি দিয়ে ঘৃণা করি। ” ২০০৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের আর্জেন্টিনা সফরের প্রতিবাদে শামিল হয়েছিলেন। সমর্থন জানিয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার বামপন্থি প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজকে। মাদকাসক্তি ছাড়াতে শরণ নিয়েছিলেন কিউবার কমিউনিস্ট বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রোর; ২০১৬ সালের ২৫ নভেম্বর মারা গিয়েছিলেন ক্যাস্ত্রো। কী কাকতাল, তার চার বছর পর একই দিনে চলে গেলেন ম্যারাডোনাও। একজন ক্যাথলিক হিসেবে গিয়েছিলেন পোপ জন পলের সঙ্গে দেখা করতে। তাকেও ছেড়ে কথা বলেননি। দরিদ্র শিশুদের জন্য পোপের উদ্বেগ দেখে বলেছিলেন, ভ্যাটিকান প্রাসাদের সোনায় মোড়ানো ছাদ বিক্রি করে দিয়ে শিশুদের জন্য ব্যয় করছেন না কেন? ম্যারাডোনার কণ্ঠে প্রায়ই উচ্চারিত হত, “আমার জীবনে আছে সাদা অথবা কালো, এর মাঝামাঝি কিছু নেই।” ২০০০ সালে ফিফা যখন শতাব্দী সেরা ?ফুটবলার নির্বাচনে ভোট আয়োজন করেছিল, তখন দেখা গেল ম্যারাডোনাই পেয়েছেন সবচেয়ে বেশি ভোট। বাধ্য হয়ে এক পুরস্কারের জায়গায় পেলে-ম্যারাডোনা দু’জনকেই পুরস্কার দিতে হয়েছিল ফিফাকে। সে-ই ম্যারাডোনা; যার ভাষায়- “আমি মারাদোনা, আমি গোল করি, আমি ভুল করি। আমি সব কিছুই নিতে পারি, আমার কাঁধ এত বড় যে যুদ্ধ করতে পারি প্রত্যেকের সঙ্গে। ” এ কারণেই সম্ভবত তার যাবতীয় ঔদ্ধত্য, তার যাবতীয় দুর্বিনীত আচরণ সবই ভক্তদের কাছে মাফ। সব মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শিশু, সবচেয়ে মানবিক মানুষ। এ কারণেই কিনা, তার মৃত্যু নাড়িয়ে দিয়েছে সমগ্র বিশ্বকে। তার মরদেহে শ্রদ্ধা জানাতে করোনাভাইরাসকে উপেক্ষা করে নেমে এসেছে হাজারো আর্জেন্টিনাবাসী। যে ফিফাকে প্রতিনিয়ত দেখাতেন বৃদ্ধাঙ্গুলি; তারাও নামিয়ে রাখছে পতাকা। যে ভ্যাটিকান তার মন পায়নি, তারাও তার জন্য প্রার্থনায় বসে গেছে। যার সঙ্গে তার ছিল শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সেই পেলেও বলছেন, “স্বর্গে নিশ্চয়ই আমরা একসঙ্গে ফুটবল খেলবো। ”

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..