পর্যাপ্ত বীজ আলু, ভেজালমুক্ত সার বিতরণের দাবিতে ‘কৃষকবন্ধন’

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

সরকারি মূল্যে পর্যাপ্ত বীজ আলু ও সার বিতরণের দাবিতে কৃষক সমিতির ‘কৃষকবন্ধন’
একতা প্রতিবেদক : চলতি বছর আলু চাষের মৌসুমে কৃষকরা জমি তৈরি করলেও বীজআলুর সংকটে আলু চাষে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সিন্ডিকেটের কারসাজিতে আলুর দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কোল্ড স্টোরেজে বীজ আলু বেশি দামে আগেই বিক্রি করার ফলে চাষের জন্য বীজ আলুর সংকট দেখা দিয়েছে। বিএডিসি’র আলুর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম পরিমাণ বীজ আলু মজুদ রাখা হয়েছে। বীজ আলুর অভাবে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এই সুযোগে অসৎ ডিলার ও বীজ আলু বিক্রেতারা সরকারের বেঁধে দেওয়া জাত ভেদে ২৭ টাকা থেকে ২৯ টাকা কেজির বীজ আলু ৫০ টাকায় বিক্রি করছে। কৃষকরা আলু চাষে নিরুৎসাহিত হওয়ায় আগামীতে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা আলুর দাম বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। গত ২৬ নভেম্বর বাংলাদেশ কৃষক সমিতির উদ্যোগে সরকারি মূল্যে কৃষকদের পর্যাপ্ত বীজ আলু ও ভেজালমুক্ত সার বিতরণের দাবিতে অনুষ্ঠিত ‘কৃষকবন্ধনে’ বক্তারা এসব বলেন। কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি নিমাই গাঙ্গুলীর সভাপতিত্বে কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ জহির চন্দন, সহ-সাধারণ সম্পাদক আবিদ হোসেন, সহ-সাধারণ সম্পাদক সুকান্ত শফি চৌধুরী, নির্বাহী কমিটির সদস্য রোমান হায়দায়, লাকি আক্তার, মানবেন্দ্র দেব, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শরিফুজ্জামান শরিফ, মোবারক হোসেন ঝন্টু, মানিকগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক মো. সেতোয়ার হোসেন, গাজীপুরের কৃষকনেতা জাহাঙ্গীর হোসেন, ঢাকা জেলার কৃষকনেতা জামাল হোসেন । নেতৃবৃন্দ বলেন, আল ছাড়াও ধান, সবজি চাষে কৃষককে প্রচুর সার কিনতে হয়। সারের পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও ডিলাররা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে কৃষক পর্যায়ে বেশি দামে সার বিক্রি করছে। সরকার নির্ধারিত দামের বেশি দামে সার বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সংশ্লিষ্ট বিভাগের নজরদারি না থাকায় এবং স্থানীয় প্রশাসনের যোগসাজশে ডিলাররা বেশি দামে সার বেচছে। এ কারণে কৃষকের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরপর ফসল বিক্রি করতে গিয়ে দাম না পেয়ে প্রতি বছর লোকসান গুণতে হয়। বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ কৃষক সমিতি অবিলম্বে সরকারি দামে কৃষক পর্যায়ে পর্যাপ্ত বীজ আলু ও ভেজালমুক্ত সার বিতরণের ব্যবস্থা না করলে গ্রাম পর্যায়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলবে। নেতৃবৃন্দ পরে বিএডিসি’কে সক্রিয় ও সক্ষম করে গড়ে তুলে কৃষকদের সার-বীজ কীটনাশকসহ যাবতীয় কৃষি উপকরণ সরবরাহের দাবিতে কৃষিমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি পেশ করেন। স্মারকলিপিতে বলা হয়, প্রাণঘাতী করোনার ভয়াল থাবায় গোটা দেশ আজ বিপর্যস্ত। প্রতিদিন মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি মারাত্মক সংকটগ্রস্ত। দেশের অর্থনীতির সকল খাতে ধ্বস নামলেও, একমাত্র কৃষিই অর্থনীতিকে সচল রেখে জনগণের প্রয়োজন মেটাচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে মেহনতি কৃষক ও ক্ষেতমজুরদের ত্যাগ ও ঝুঁকি নিয়ে কৃষিতে অক্লান্ত শ্রম। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। আবারও করোনার প্রকটে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিতে ভয়াবহ মন্দায় রপ্তানি ও প্রবাসীদের রেমিট্যান্স খাতে ধস নেমে আসবে। ফলে কৃষিই আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে। বৈশ্বিক মহামারি করোনার এই দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে সারা বিশ্বের সাথে বাংলাদেশ ও এদেশের কৃষকেরাও বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি। খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিতকরণে বিভিন্ন কৃষি উপকরণ তথা মানসম্মত রাসায়নিক সার সংগ্রহ ও বিতরণ, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, উন্নত মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন ও বিপণন, কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ইত্যাদি কৃষকের মাঝে অবাধ সরবরাহ থাকা বাঞ্ছনীয়। ফসল উৎপাদনে বীজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। অন্যান্য কৃষি উপকরণের কার্যকারিতা গুণগত মানসম্পন্ন বীজের ওপর নির্ভরশীল। তাছাড়া কোন ফসলের সম্ভাব্য ফলন বীজের মানের সাথে সরাসরি জড়িত। সরকারি কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশ আলু হেক্টরপ্রতি গড় ফলন মাত্র ১১ টন। আলুর উৎপাদন ২০ টন পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। তাছাড়া কৃষকেরা যদি আলুর উচ্চফলন পেতে চান তাহলে সুষম সারের বিকল্প নেই। প্রতি বছর দেশের মোট উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আলুর আবাদ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায়। মৌসুমের শুরু থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা জুড়ে আলু আবাদে ব্যস্ত সময় পার করেন চাষিরা। কিন্তু চলতি মৌসুমে আলু চাষের অন্যতম উপাদান বীজ ও টিএসপি সারের সংকটে ফেলেছে দেশের চাষীদের। চাহিদামতো বীজ ও সার না পাওয়ায় চাষীরা বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছে। এরকম অবস্থায় দ্রুত বীজ আলু ও সারের জোগান নিশ্চিত না করা গেলে অনেক চাষিই আলু আবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। বর্তমানে বাজারে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে আলু তাই যেসব চাষি গত বছর আলুর আবাদ করেননি তারাও এবার আবাদ করছেন। এ কারণে জেলায় বীজ আলু ও টিএসপি সারের সংকট দেখা দিয়েছে। আর এ সুযোগে ব্যবসায়ীরাও বীজ ও সারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। বাজারে, ‘এ’ গ্রেড আলু বীজ প্রতি বস্তা (৪০ কেজি) ১ হাজার ৮৮০ থেকে ১ হাজার ৯২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ‘বি’ গ্রেড আলু বীজ ১ হাজার ৮৪০ ও অন্যান্য জাতের আলু বীজ ১ হাজার ৮০০ টাকা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা বীজ সংকটের অজুহাত দেখিয়ে ৪০ কেজির প্রতি বস্তা অ্যাস্টেরিক, ক্যারেজ ও ডায়মন্ড জাতের আলু বীজ ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি করছেন। একই অভিযোগ টিএসপি সার কিনতে আসা কৃষকদের। প্রতি বস্তা সারের দাম ১ হাজার ১০০ টাকা নির্ধারণ করা থাকলেও সার সংকট দেখিয়ে কিছু কিছু ব্যবসায়ী নানা কৌশলে কৃষকদের কাছ থেকে ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করছেন। এ পর্যায়ে কৃষক সমিতির দাবি হচ্ছে- সরকারি মূল্যে পর্যাপ্ত বীজ আলু বিতরণ ও সরবরাহ ঠিক রাখা; সরকারি মূল্যে পর্যাপ্ত সারের সরবরাহ নিশ্চিত করা; যেসকল অসাধু ব্যবসায়ী নানা কৌশলে কৃষকদের কাছ থেকে অধিক অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন তাদের শাস্তি দেওয়া; জেলায় জেলায় সরকারিভারে হিমাগার নির্মাণ করা; বিএডিসি-কে সাবলম্বী ও সচল করা।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..