নারী নির্যাতন এবং বাংলাদেশের আইন

আইনুন্নাহার সিদ্দিকা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
সমাজে ক্ষমতা প্রদর্শনের একটি রূপ নির্যাতন। অন্যভাবে বলতে পারি নির্যাতন সবলদের হাতিয়ার দুর্বলকে দমিয়ে রাখার জন্য। আজ আলোচনার বিষয় নারীর উপর নির্যাতন নিয়ে। যদিও কমবেশি আমাদের দেশের সাধারণ জনগণ বিভিন্নভাবে বিভিন্ন জনের দ্বারা এমনকি রাষ্ট্র দ্বারাও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। সে আলোচনা আর একদিন করা যাবে। আজ আসি মূল আলোচনায়। বাংলাদেশে নারী নির্যাতন মহামারির আকার ধারণ করেছে। এই নারী নির্যাতন শুধু শারীরিক নয় মানসিকভাবেও করা হয়। বিভিন্ন কারণে নানাভাবে নারীরা আমাদের দেশে নির্যাতিত হয়ে আসছেন। ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য, অসম্মান প্রদর্শনের জন্য, আর্থিক স্বার্থের জন্য- সর্বোপরি নারীর অগ্রসরতাকে প্রতিহত করার জন্যই মূলত নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। নারীরা যাতে এগিয়ে যেতে না পারে, সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে বা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে না পারে সেই কারণেই এই নির্যাতন। সেইসাথে আছে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা প্রদর্শনের সাধ। প্রাণীকূলের শ্রেষ্ঠ মানুষ নামের প্রাণীদের একপ্রস্থ নিচে ভাবা হচেছ নারী নামক প্রাণীটি। বিশেষ করে আমাদের বাংলাদেশে এটা অবশ্যই প্রযোজ্য। যদিও বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে নারীদের সম্পর্কে অনেক ভালো ভালো কথা বলা হয়েছে। অনেক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, মায়ের উচ্চস্থান দেওয়া হয়েছে কিন্তু সত্যি কথা বলতে আমাদের সমাজে মায়েদেরই কোনো স্থান নেই, সম্মান নেই। যেকোনো নির্যাতন অত্যাচারকে জায়েজ করা হয় নারীটার চরিত্র খারাপ বলে। নারীদের চরিত্রটাই মূল বিষয়। চরিত্র ভালো-মন্দের মাপকাঠিটাও নির্ধারণ করে দেয় সেই নির্যাতনকারীই। যে কোনো সভ্য সমাজই তার নারীকে সম্মানিত করে বড় হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে এই নারীদের মানুষ হিসেবে গণ্যই করা হয় না। নারী নির্যাতনের ভয়াবহতার কারণেই আমাদের দেশে বিভিন্ন সময়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আইন প্রণীত হয়েছে। প্রচলিত যে আইন ছিল তাতে বিশেষভাবে নারীদের ওপর নির্যাতন প্রতিরোধের মত কিছু ছিল না। এই পরিস্থিতিতে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ২০০০ সালে প্রণীত হয় ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০’। পরবর্তীতে যা ২০০৩ সালে সংশোধন করা হয়। নারী নির্যাতন শুরুই হয় পরিবার থেকে। যৌতুকের জন্য নির্যাতন, ভরণ-পোষণ না দেয়া, নারী শিশুর লেখাপড়ার সুযোগ না দেয়া ইত্যাদি নানারকম নির্যাতন পারিবারিকভাবেই করা হয়ে থাকে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালে পারিবারিক ‘সহিংসতা প্রতিরোধ আইন ২০১৩’ নামে আইন প্রণীত হয়। এ আইন শুধুমাত্র পারিবারিক নির্যাতনগুলি প্রতিরোধের নিমিত্তেই প্রণীত হয়েছে। কিন্তু আইনের দ্বারস্থ হওয়া মানেই পরিবার ভেঙে যাওয়া। যার ফলে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আইনটি সেভাবে এখনো ব্যবহৃত হয় না। আদালতসমূহে অধিক পরিমাণে মামলা দায়ের হয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায়। বিশেষ এই আইনে নির্দিষ্ট কতগুলি বিষয়ে বিচার করা হয়। যেমন– ১. দহনকারী ইত্যাদি পদার্থ দ্বারা সংঘটিত অপরাধ, যেমন এসিড নিক্ষেপ, আগুন দেয়া ইত্যাদি। এই অপরাধে সাত বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড দেয়া যায়। অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনায় শাস্তির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়। এসিড নিক্ষেপের ফলে কারো মৃত্যু হলে শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। ২. নারী পাচার। কোন নারীকে পাচারের উদ্দেশ্যে আনা-নেয়া বা কাছে রাখলেও এ ধারায় সে অভিযুক্ত হবে। এই ধারায় কমপক্ষে ১০ বছর কারাদণ্ড থেকে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ৩. শিশু পাচার– এই ধারাতেও মৃত্যুদণ্ড সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান হিসাবে রাখা হয়েছে। ৪. নারী ও শিশু অপহরণ– এই অপরাধের শাস্তি সর্বনিম্ন চৌদ্দ বছর কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ যাবজ্জীবনের বিধান রাখা হয়েছে। ৫. মুক্তিপণ আদায়– মুক্তিপণ আদায়ের জন্য কোন নারীকে বা শিশুকে আটক করলে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন। ৬. ধর্ষণ– আমাদের দেশে ধর্ষণ একটি মহামারির আকার ধারণ করেছে এবং অপরাধীরা এই অপরাধকে অপরাধ হিসেবেই গণ্য করে না। ধর্ষণের ফলে কারো মৃত্যু হলেই কেবল মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছিল। বর্তমানে আইন সংশোধন করে মৃত্যুদণ্ড রাখা হয়েছে। ৭. আত্মহত্যার প্ররোচণা– নারীর সম্মানহানির প্রত্যক্ষ কারণে যদি কোন নারী আত্মহত্যা করে তার সেই আত্মহত্যার প্ররোচণার দায়ে দোষী ব্যক্তির শাস্তি হবে সর্বনিম্ন পাঁচ থেকে সর্বোচ্চ দশ বছর। ৮. যৌন পীড়নের জন্য সাজা আছে সর্বনিম্ন তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ দশ বছর। ৯. যৌতুকের জন্য নির্যাতন বা যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ফলে মৃত্যু হলে সাজা হবে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা সর্বনিম্ন তিন বছরের কারাদণ্ড। মূলত: এই হলো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় অপরাধসমূহ। এই অপরাধসমূহের সংজ্ঞাও এই আইনে দেয়া আছে। প্রচলিত ফৌজদারি রাখা হয়েছে। ধর্ষণের ক্ষেত্রে বৈবাহিক ধর্ষণকে আমলে নেয়া হয়নি। শুধু নারী এবং নারী শিশুদের ক্ষেত্রেই এই আইন প্রযোজ্য। অন্য কোনো লিঙ্গের মানুষ এই আইনের সুবিধা নিতে পারবে না। তাদের যেতে হবে ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে। খুব সংক্ষিপ্তভাবে আইনগুলোর শুধুমাত্র পরিচয় দিলাম। আরো একটি আইন আছে যৌতুক নিরোধ আইন। এ আইনে সাজার পরিমাণ খুবই সামান্য। আইনগুলো বিস্তারিত বিশ্লেষণ করলে মনে হবে এদেশে নারী নির্যাতন বন্ধ হয়ে গেছে। এ দেশে নারী নির্যাতন হতেই পারে না। তারপরও আমাদের দেশে নারী নির্যাতন ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে ধর্ষণের মতো অপরাধ অহরহ ঘটেই চলেছে। অপরাধীরা ঘোষণা দিয়ে অপরাধ করছে। অপরাধের সংখ্যা নিয়ে তা উদ্যাপন করছে। বরং যে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে সে আর তার পরিবার সামাজিকভাবে হেয় হচ্ছে, অপমানিত হচ্ছে, অনেক সময় পৈত্রিক ভিটেমাটি ছেড়ে উদ্ধাস্তু হচ্ছে। এই অপরাধগুলো ঘটার ও তা বাড়ার কয়েকটি কারণ আছে। আমার দৃষ্টিতে কারণগুলো হলো– ১. সামাজিকভাবে নারীদের মর্যাদা না দেয়া। লিঙ্গ পরিচয়ে নারীর পরিচয় নির্ধারণ, নারীকে মানুষ না ভেবে শুধুমাত্র নারী নামক জীব ভাবা। একটি ধর্ষণের শিকার মেয়ে সমাজে পতিত হিসেবে বিবেচিত হয়। ২. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ বিচারহীনতা। আমাদের দেশ একটি বিচারহীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। কোনো অপরাধের বিচার হয় অপরাধীর সামাজিক পরিচয়ে অর্থাৎ সামাজিক অবস্থানের দ্বারা। যার ক্ষমতা আছে, যার প্রভাব আছে, যার ধন সম্পদ আছে তার অপরাধের কোনো বিচার হয় না। অপরাধী হিসেবে সাজা পায় যার ক্ষমতা প্রতিপত্তি নেই। প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে কি দেশের আদালতগুলি বিচার করে না? উত্তর হচ্ছে করে। ভালো বিচার করে। সেটা অপরাধীদের শ্রেণি বিবেচনায়। আমাদের দেশে একটি সংস্কৃতি চালু হয়েছে। তা হলো ভিআইপি সংস্কৃতি। বড় বড় চোর, ঘুষখোর, বাটপার চুরি করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হাতিয়ে, জনগণকে ঠকিয়ে বিশাল বিশাল বাড়ি, গাড়ি আর ব্যাংক ব্যালেন্সের মালিক হচ্ছে তারা। সেই টাকা দিয়ে তারা মসজিদ, মাদ্রাসা স্কুল করছে। সেই টাকা দিয়ে তারা রাজনৈতিক দল কিনে নিচ্ছে। আর তারপরই ভিআইপি তকমা লাগিয়ে নিচ্ছে। এখন সেই ভিআইপিরা নিজেদের দেশের রাজা ভাবছেন। এ দেশ তাদের কেনা, দেশের জনগণ তাদের কেনা গোলাম। তাই এ দেশের জনগণের সাথে যা ইচ্ছে তাই তারা করতে পারে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ আমাদের দেশ একটি বিচারহীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে আমরা একটি ধর্ষণ ঘটনার কথা বলতে পারি। ধর্ষণ অপরাধটি একটি বিশেষ আইনের আওতায় বিচার করা হয়। আইনটি ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’। এখন এই ঘটনার পর মামলা করার জন্য প্রথমে যেতে হবে থানায়। থানায় গিয়ে অভিযোগ করার পর নির্যাতিতার ডাক্তারি পরীক্ষা হবে। পুলিশ তদন্ত করে চার্জশিট দেবে। আদালত মামলাটি বিচারের জন্য নিয়ে সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে। মামলার সাক্ষী, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (ডাক্তারি সনদপত্র) দেখে বিচারক রায় দেবে। খুব সোজা। না, সোজা নয়। মামলা করতে গেলে পুলিশ আগে দেখবে অপরাধী কে? অপরাধী যদি ক্ষমতাসীন দলের হয় বা প্রভাবশালী কেউ হয় বা তথাকথিত ভিআইপি কেউ হয় তখন মামলা নিতে গড়িমসি করবে। ফলে ডাক্তারি পরীক্ষা দেরি হবে। অথবা হবে না। স্বাভাবিকভাবে মামলা হলো, তারপর অভিযুক্ত পক্ষ প্রথমেই সেই নির্যাতিতাকে প্রমাণ করার চেষ্টা করবে যে সে চরিত্রহীন। তারপর হুমকি ধামকি। তারপর এলাকা ছাড়া। তারপর সাক্ষীদের কেনাবেচা। কিনতে না পারলে হুমকি। তারপর সাক্ষীর অভাবে বেকসুর খালাস। যদিও নারী নির্যাতন দমন আইনে বিচার প্রক্রিয়া শেষ করার নির্দিষ্ট সময় বেধে দেয়া আছে তারপরও এ মামলা শেষ হতে সময় লাগে বছরের পর বছর। কারণ আইনের ফাঁক। তদন্ত ঠিক সময় সম্পন্ন না করতে পারলে যথাযথ কারণ দেখিয়ে তদন্তের সময় বাড়ানো যায়। যথাযথ কারণের তো কোনো অভাব নেই। তারপর সাক্ষীরা সময়মত হাজির হয় না। সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে সাক্ষ্য দেয়া থেকে বিরত করলে সময়তো পার হবেই। তারপর ভিআইপি মামলার তাড়া। সর্বোপরি বিচারক সংকট। আমাদের এক বিচারককেই একই দিনে বিভিন্ন ধরনের মামলা পরিচালনা করতে হয়। ফলে মামলা জটের কারণেও বিশেষ মামলাগুলো বিচার করতে দেরি হয়। এভাবেই একটি ধর্ষণ মামলার বিচার হতে দীর্ঘ সময় পার হয়ে যায়। ধর্ষণ মামলায় অপরাধীর প্রথম হাতিয়ার নারীকে চরিত্রহীন বানানো। চরিত্রের একক কি? কে করবে এর পরিমাপ? আর চরিত্রহীন হলেই কি অধিকার জন্মায় নারীটিকে অপমান করার? তাকে ধর্ষণ করার? আরো একটি বিশেষ কারণ দেখায় অভিযুক্তরা তা হলো নারীর পোশাক। আমি প্রথমেই বলেছি বিভিন্ন ধর্মে নারীদের বিভিন্নভাবে মহিমান্বিত করার চেষ্টা হয়েছে। আমাদের দেশ ধার্মিকদের দেশ। মসজিদ মন্দিরের অভাব নেই। হিন্দু মুসলমান যে যার ধর্ম রক্ষায় খড়গহস্ত। শুধু এক জায়গায় এরা অভিন্ন তা হলো নারীর প্রশ্নে। নারী নির্যাতনে তাদের ধর্ম লাগে না। নারীর অসম্মানে ধর্মের কোনো প্রভাব খাটে না। নারী নির্যাতন বন্ধে শুধু আইন করলেই হবে না, প্রয়োজন আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ। দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির মাধ্যমে দোষী ব্যক্তির সাজা নিশ্চিত করার মাধ্যমে নারী নির্যাতন কমানো সম্ভব। সেইসাথে রাষ্ট্রীয়ভাবে নারীকে তার মানবিক মর্যাদা, অধিকার প্রদানের মাধ্যমে সমাজে নারীর অবস্থান পুরুষের সমান করার মাধ্যমেই নারী নির্যাতন প্রতিরোধ করা সম্ভব। সমাজ নারীকে নারী হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে যতদিন না দেখবে ততদিন নারীর মুক্তি নেই। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা হলেই সম্ভব নারীমুক্তি, সম্ভব নারী নির্যাতন বন্ধ করা।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..