ধর্ষণ সহিংসতার বিরুদ্ধে জেগে উঠেছে তারুণ্য

মমতা চক্রবর্তী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

ধর্ষণ-গণধর্ষণ-শিশু ধর্ষণ ও হত্যা ইদানিংকালে সকল মাত্রা ছাপিয়ে রাষ্ট্রে সরকারের উপস্থিতিকেই ব্যঙ্গ করছে প্রতিনিয়ত। এ বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসলেও বর্তমানে ক্যান্সারব্যাধির দগদগে ক্ষত রূপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে নারী জীবনে এক বিভৎসতায় দেশের সর্বত্র। দৈনিক পত্রিকা, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন লেখালেখি ও টকশোতে এ অবস্থাটিকে কখনও মহামারি, সুনামি বা ধর্ষণ-মহোৎসব বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এই উচ্চারণগুলোই পরিস্থিতির ব্যাপকতা ও পৈশাচিকতায় মাত্রা দানে যথেষ্ট। এমন কোনো দিন নেই যে দিনটিতে ২/৩টি ঘটনা নিউজ হয়ে আসছ না। প্রকাশিত ঘটনার বাইরেও এ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক ধর্ষণ ঘটনাই প্রকাশের বাইরে থেকে যাচ্ছে বা বিভিন্ন কারণে ধামাচাপা দেয়া হচ্ছে। মানুষ ভেবেছিল বিশ্বজুড়ে নতুন অদৃশ্য মহামারি করোনা হয়তো এদেশের মানুষরূপী পশুগুলোর চরিত্র বদলে দিয়ে আত্মশুদ্ধি ঘটাবে বা নতুন কোনো ভাল পরিস্থিতি বয়ে আনবে। কিন্তু বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, কয়লা ধুলেও যায় না ময়লা– এই বেলাতেও হচ্ছে তাই। করোনাকে থোরাই কেয়ার করে এই চরিত্রগুলোর পশুত্ব আরো প্রবল আকারে দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। ধর্ষণ-দুর্বৃত্তায়ন সর্বকালীন অবস্থাকে ছাড়িয়ে আরো ব্যাপকতা ও নৃসংশতা লাভ করছে। এর শেষ সীমা রেখা টানা যাচ্ছে না কোনোভাবেই। অবস্থার বিপাকে দেশের প্রতিটি পরিবার খুবই অসহায়তভাবে বিচলিত-শঙ্কিত। কারণ মাতা, ভগ্নি ও কন্যা নিয়েই তো পরিবার। বিশেষত দেশের সরকারের শাসন ব্যবস্থাই এই দায় বহন করে। আর রাষ্ট্রে অভ্যন্তরেই এই ভয়াবহ দুরবস্থার বীজ নিহিত। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামো, সরকারি ছত্রচ্ছায়ায় পেশীশক্তির উদ্ভব পালন ও দাপট, অবেধ অর্থবিত্তের যোগান, ন্যায়-নীতিহীন, মুক্ত অর্থনীতি, মূল্যবোধের অবক্ষয়, মৌলবাদী দর্শনে নারীকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে দেখার প্রকৃতি ও কার্যাবলী এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও যথাযথ সংস্কৃতি চর্চার অনুপস্থিতি মিলে উদ্ভব ঘটেছে নারী জাতির এই দুরবস্থা চিত্র। আজ নারী সমাজ প্রচণ্ড এক মহাদুর্যোগে নিষ্পতিত। গ্রাম-নগর-মহানগরের প্রতিটি স্থানে এই ধর্ষণ-গণধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ ও খুন অপ্রতিরোধ্য ও অসহনীয় গতিতে ঘটে চলেছে প্রতিকারহীনভাবে। এই অবস্থা সামাল দিতে সরকার চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে পদে পদে। কেবল আলোড়ন সৃষ্টিকারী দু’একটি ঘটনাই বিচারের পরিণতি পাচ্ছে। মাত্রাটি শতকরা ৩টি বাকি ৯৭টিরই বিচারের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এর সুযোগে দোষীরা বহাল তবিয়তে সমাজ-সংসারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই ধর্ষণ ঘটনাগুলো বিচারের আওতায় না আসার নানাবিধ কারণ রয়েছে। যেমন : এর প্রথম ধাপ সংশ্লিষ্ট থানা ও আশ্রয় কেন্দ্রগুলোর ওপর সামাজিক ও সরকারি মনিটরিং না থাকা, পুলিশ বাহিনী নারীবান্ধব নয়, প্রতিকূল পারিবারিক ও সামাজিক পরবেশ যেগুলো নারীকে আইনে সাহায্য নিতে মোটেই সহায়ক নয়, আইনের ফাঁকফোঁকর, সাক্ষ্য আইনের ত্রুটি, আলামত সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকা ও অজ্ঞতা, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা ও নানাবিধ সমস্যা নারীকে ঠেলে দিচ্ছে চরম এক ঘূর্ণাবর্তে। এত প্রতিকূলতা-দুযোর্গ-দুর্বিপাকের মধ্যেও দেশে প্রতিবাদী তারণ্যের একটি আলোর বেনুর সুর বেজে উঠেছে। যে সুর নারীকে এই বিপদে শক্তি সাহস ভরসার আশা জাগানিয়া স্থানে নিয়ে যাওয়ার সুচনা ধ্বনির ঘোষণা দিচ্ছে। এই আলো ছড়ানিয়াদের আন্দোলন-সংগ্রামের পথ বেয়ে আসবে গণচেতনা-জাগরণ ও একাত্মতার দ্যুতিময় একটি অবস্থা। সমস্ত দৈন্যতা ও পুরুষতন্ত্রের ঊর্ধ্বে উঠে জেন্ডার বৈষম্য ভুলে গিয়ে মানবতার জয়গানে মুখরিত যে শক্তিটি অর্থাৎ দেশের প্রগতিশীল বাম ঘরানার সকল শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতি জগতের কল্যাণকামী শক্তির মেল বন্ধনের একটি উদ্বোধন সূচিত হয়েছে ৫ই অক্টোবর। প্রথমে ছাত্র ইউনিয়ন ধর্ষণবিরোধী প্রাফিতি আঁকতে গেলে পুলিশি বাঁধা আসে এবং নেতাদের গ্রেফতার করে নির্যাতন চালায়। এর বিরুদ্ধে সহকর্মী ছাত্ররা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও আন্দোলন শুরু করলে সেখানেও পুলিশি নির্যাতন নেমে আসে। তারা থেমে না গিয়ে অবস্থান সমাবেশ করে প্রতিবাদ জানায় এর পরবর্তী কর্মসূচি লাঠি মিছিল ও অবস্থান। এরপর কালো পতাকা মিছিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দিকে অগ্রসর হতে গেলে সেখানে চরম পুলিশি আক্রমণে ছাত্রী নেতারা পর্যন্ত আহত হয়। কিন্তু এই আপসহীন চরিত্রতো ভয়ে পিছিয়ে যাওয়া শেখেনি। ইতোমধ্যে সিলেটের এমসি কলেজে সরকারি ছাত্র সংগঠনের নারী ধর্ষণ ঘটনাও নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক জঘন্যতম নারী নিগ্রহের ঘটনা ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আরো বেগবান ও সংগঠিত রূপ ধারণ করে সর্ব বাম ছাত্র ঐক্য মোর্চা আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী যুক্ত হয়ে ৯ অক্টোবর মহাসমাবেশ করে “ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ” ব্যানারে ৯ দফা কর্মসূচির ঘোষণা করে। এবং ১৬ অক্টোবর শাহবাগ থেকে নোয়াখালী পর্যন্ত এক শান্তিপূর্ণ লংমার্চ কর্মসূচি আন্দালনের ডাক দেয়। ৯ দফা কর্মসূচিগুলো হলো– স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সকল সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নারী নির্যাতনবিরোধী সেল কার্যকর করা, সিডো সনদে স্বাক্ষর ও পূর্ণ বাস্তবায়ন নারীর প্রতি সব বৈষম্যমূলক আইন ও প্রথা বিলোপ, ধর্মীয় সব সমাবেশে নারীর বিরোধী বক্তব্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য, সমস্ত বিজ্ঞাপনে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন বন্ধ করা, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণে বিটিসিএলের কার্যকর ভূমিকা নেয়া ইত্যাদি। আন্দোলনের একটি পর্যায়ে সরকার তড়িঘড়ি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন-২০০০ এর ৯(১) ধারাটি সংশোধন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পরিবর্তে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি ‘মৃত্যুদণ্ডের’ ঘোষণা দেয়। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা মনে করে আনুসঙ্গিক কতগুলো বিষয় ফয়সালা না করে সরকার ঘোষিত মৃত্যুদণ্ড আইন নারী ধর্ষণ নির্যাতন কমানোর জন্য যথেষ্ট নয় তাই তারা বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক উপরোল্লিখিত ৯ দফা পেশ করে। তারণ্যের অনুসন্ধানী ও দূরদর্শী দফাগুলোর বাস্তব প্রতিফলন ঘটতে শুরু করল মৃত্যুদণ্ড আইন ঘোষণার দিন থেকেই প্রতিদিন নারী ধর্ষণ ঘটনা একের পর এক ঘটা শুরু হয়ে গেল অদ্যাবধি। এত ছাত্রদের দেয়া দফাগুলির যৌক্তিকতা যথার্থ বলেই মানুষ মনে করছে। ঘোষণা অনুযায়ী বিগত ১৬ অক্টোবর বাম ছাত্র মোর্চা এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনে সম্মিলিতভাবে সমাবেশ শেষে নোয়াখালী গামী শান্তিপূর্ণ লং মার্চ কর্মসূচিটি শুরু করে। প্রথমে নারায়ণগঞ্জ অবস্থান ও সমাবেশ শেষ করে বড় ধরনের অংশগ্রহণে তারা কুমিল্লা অভিমুখে রওনা হয়ে সেখানে পুনঃসমাবেশ শেষে ফেনীর উদ্দেশ্যে রওনা হয় এবং সেখানে সমাবেশ শেষ করে নেয়াখালীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করে সেখানে সমাবেশ সমাপ্ত হওয়ার কথা থাকলেও লং মার্চের সমাবেশ তারা শেষ করতে পারেনি। ফেনী থেকেই তাদের উপর ৪ দফা আক্রমণ আসে নোয়াখালী পর্যন্ত। সরকারের পুলিশ বাহিনীর সহায়তায় সরকার দলীয় ছাত্র ও যুব লীগের মাস্তান বাহিনী দ্বারা। লংমার্চকারীদের গাড়ি ভাঙচুরসহ ২৫/৩০ জন আহত হয়। এদের মধ্যে মেয়ে শিক্ষার্থীও ছিল ৫/৬ জন। এই অতঙ্কিত অনাকাক্সিক্ষত আক্রমণে লংমার্চের কর্মীরা বিস্মিত ছিল ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন ও সংগঠিত করে একটি সুন্দর-অর্থবহ-কার্যকরী আন্দোলন গড়ে তুলতে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিয়ে এই ন্যাক্কারজনক ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে জনতাকে সংগঠিত করে এর থেকে দেশের বিপন্ন নারী সমাজকে রক্ষা করা। সরকার যদি নারী সহিংসতা ও ধর্র্ষণ বন্ধে আন্তরিক হতো তবে তারা এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদী আক্রমণ না চালিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে তাদের নারী যুব ও ছাত্রদের সাথে একাত্ম করে আন্দোলনকে উৎসাহিত ও বেগবান করতে সাহায্য করত। এই আন্দোলনটি সরকারবিরোধী বা সরকার পতনের ছিল না। এটি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে বিপদমুক্ত করার একটি সুস্থ শান্তিপূর্ণ সামাজিক আন্দোলন। বাকি রইল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি। এটাও অত্যন্ত যৌক্তিক পরিস্থিতির উদ্বিগ্নতায়, নারী সমাজের নিরাপত্তাহীনতায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও মন্ত্রণালয় সম্পূর্ণ ব্যর্থ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও নারীকে নিরাপদে রাখতে। তাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিজ উদ্যোগেই পদত্যাগ করা উচিত ছিল। উচিতের সংস্কৃতির দেশ এটি নয়। এখানে যে যত ব্যর্থ ও দুর্বৃত্তায়নে জড়িত সে ত্তিরস্বারের পরিবর্তে পুরস্কৃত হয়। প্রয়োজনে দপ্তরবিহীন মন্ত্রণালয় বানানো হয় এদের পুরস্কার দানে। এতে প্রমাণিত হলো– এই সরকার জনস্বাথের নয়, ধর্ষক পক্ষের সরকার। তাই এরা জনগণের ন্যায়ের আন্দোলনকে ভয় পায়। আর ভয় দেখিয়ে সব অন্যায়কে জায়েজ করে ক্ষমাহীন অন্যায়ের অতল গহ্বওে দিন দিন তলিয়ে যাচ্ছে। তাই এদের গদি রক্ষার হাতিয়ার ও পাহাড়াদার রাষ্ট্রের পুলিশ আর ক্যাডার বাহিনী হলো শক্তির রক্ষাকবচ। এদিয়ে শেষ রক্ষা হবে না। ইটালির মুসোলিনী ও জার্মানির হিটলার, পাকিস্তানের আইয়ুব, ইয়াহিয়া, বাংলাদেশের এরশাদ স্বৈরাচার জনরোষে শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের আঁস্তাকুড়েই নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। দর্শনের কথা হলো- “ইতিহাস থেকে কেউ কোনো শিক্ষা নেয় না, এটাই ইতিহাসের আর একটি শিক্ষা”। তবে যত প্রতিকূলতাই আসুক না কেন, বন্ধনহীন অপ্রতিরোধ্য দুরন্ত তারুণ্যের এই আন্দোলন থেকে যাবে আগামীতে। লংমার্চে আক্রমণের সাথে সাথে সারা দেশে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে। তারুণ্যের আলোর যাত্রা সামনে এগিয়ে যাবেই সব অত্যাচার ডিঙিয়ে। এ আলোর বেনুর সুর বন্ধ না হয়ে সপ্তমে উঠে আন্দোলন-সংগ্রামকে নতুন মাত্রায় নিয়ে এর তীব্রতা আরো বাড়িয়ে দেবে এদেশের নির্যাতিত-নিষ্পেষিত নারী জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ করতে। জয় হোক প্রতিবাদী তারুণ্যের। একটি নিরাপদ সংসার-সমাজ-রাষ্ট্রব্যবস্থা ফিরে আসুক বিপন্ন নারী সমাজের জন্য।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..