ননীবালাদেবী

সফিউন্নিসা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

ননীবালাদেবীর দুঃসাহসিক কার্যকলাপ ও তাঁর অদ্ভুত জীবনকাহিনী আমি জানতে পারি শ্রদ্ধেয়া স্বাধীনতা সংগ্রামী কমলা দাসগুপ্তের কাছে। তাঁর অমূল্য আকরগ্রন্থ ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী’ লিখতে গিয়ে তিনি ননীবালাদেবীকে খুঁজে বার করেন বাগবাজারের একখানি চিলতে ঘরে। তখন তিনি ‘সাধুমা’ নামে পরিচিত। গেরুয়া পরিহিতা সন্ন্যাসিনী। জীবন থেকে কঠিন নির্মম মূল্য লাভ করে জীবনের শেষ পর্বে এসে সর্বস্ব নিবেদন করেছেন ঈশ্বরের পায়ে। কমলা দাসগুপ্তকে অনুরোধ করি ননীবালাদেবী সম্পর্কে লিখতে। আমার আবেদনে সাড়া দিয়ে তিনি দুবার– ১৯৮৮ সালের ২১ জুলাই এবং ১৯৯৭ সালের ৯ আগস্ট ননীবালাদেবী সম্পর্কে বর্তমান পত্রিকার ‘আমরা মেয়েরা’ পাতায় দুটি প্রতিবেদন লেখেন। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ননীবালাদেবীর জন্ম ১৮৮৮ সালে। অর্থাৎ জন্মশতবর্ষে তাঁর স্মৃতিচারণা করেছিলেন কমলা দাশগুপ্ত। হাওড়া জেলার বালিতে জন্ম ননীবালাদেবীর। তাঁর পিতা সূর্যকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাতা গিরিবালাদেবী। মাত্র এগারো বছর বয়সে ননীবালাদেবীর বিবাহ হয়। ষোলো বছর বয়সে বিধবা হয়ে ফিরে আসেন পিতৃগৃহে। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বাঁধে ইংরেজ ও জার্মানির মধ্যে। ইংরেজের দুর্বলতার এই সুযোগটাকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। জার্মানির কাছ থেকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ইংরেজের বিরুদ্ধে তাঁরা ভারতব্যাপী অভ্যুত্থান ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেন। ইংরেজ সরকার সেই ষড়যন্ত্রের কথা জেনে যাওয়ায় শুরু হয় বিপ্লবীদের ধরপাকড় ও তাঁদের ওপর অত্যাচার। যতীন্দ্রনাথ মুখার্জি (বাঘাযতীন) বালেশ্বরে বুড়িবালামের তীরে ইংরেজের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধে প্রাণ হারান। এই ঘটনা বিপ্লবীদের মনোবল অনেক বাড়িয়ে দেয়। এই সময় যদুগোপাল মুখার্জির নেতৃত্বে একদল দুঃসাহসী তরুণ চীন, ম্যামদেশ ও আসামের মধ্যে দিয়ে বিদেশ থেকে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র পাচার করে এনে ভারতে বিদ্রোহ সংগঠিত করার চেষ্টা শুরু করেন। ইংরেজ সরকার তাতে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ড শুরু করলো। ফাঁসি, দ্বীপান্তর, কুড়িবছর কারাদণ্ড, পুলিশি নির্যাতনে পাগল করে দেয়া– এসবই ছিল অত্যাচারের অঙ্গ। আরও ছিল। কলকাতার তৎকালীন পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্টের তদারকিতে বিপ্লবীদের দালান্দা হাউসে নিয়ে গিয়ে বীভৎস অত্যাচার করা হতো। মলদ্বারে রুল ঢোকানো, কমোড থেকে মলমূত্র এনে বিপ্লবীদের মাথায় ঢেলে দেয়া ছাড়াও বেশ কয়েকদিন বন্দিদের অনাহারে রেখে পিছনে হাতকড়া বেঁধে দাঁড় করিয়ে রেখে লাথি ও রুলের প্রহার করা হতো। এইরকম ভয়াবহ এক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে স্বাধীনতা সংগ্রামী অমরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় তাঁর পিসিমা ননীবালাদেবীকে অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত করলেন। তাঁর কাছেই অমরেন্দ্রনাথ ও তাঁর কয়েকজন সহকর্মী লুকিয়ে রইলেন এবং গোপনে বিপ্লবী কাজকর্ম চালিয়ে যেতে থাকলেন। কিন্তু পুলিশের দৃষ্টি এড়ানো গেল না শেষ পর্যন্ত। ধরা পড়লেন তাঁরা। এর মধ্যে রামচন্দ্র মুজমদার পুলিশের হাতে হঠাৎ গ্রেপ্তার হওয়ার ফলে একটি মাউজার পিস্তল যে তিনি কোথায় রেখে গেলেন তা জানানোর সুযোগ পেলেন না। তখন বিধবা ননীবালাদেবী শাঁখা পলা সিঁদুর পরে রামচন্দ্র মজুমদারের স্ত্রী সেজে প্রেসিডেন্সি জেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করে পিস্তলের হদিশ জেনে এলেন। ১৯১৫ সালে বাঙালি সমাজে সর্বসংস্কার মুক্ত হয়ে এ কাজ করা যে কত কঠিন ছিল তা সহজেই অনুমেয়। পুলিশ অনেক পরে জানতে পারে যে ননীবালা রামচন্দ্র মজুমদারের স্ত্রী নন। ১৯১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চন্দননগরে বিপ্লবীদের আত্মগোপনের প্রয়োজনে আবার বাড়ি ভাড়া দেয়া হয়। আবার ননীবালা এলেন গৃহকর্ত্রীর বেশে। সেখানে তখন পলাতক হয়ে এসেছেন বিপ্লবী যাদুগোপাল মুখার্জি, অমর চ্যাটার্জি, অতুল ঘোষ, ভোলানাথ চ্যাটার্জি, নলিনীকান্ত কর, বিনয়ভূষণ দত্ত ও বিনয় চক্রবর্তী। এঁদের মাথার মূল্য তখন ধার্য করা হয়েছে হাজার হাজার টাকা। এঁরা ছিলেন নিশাচর। সারাদিন দরজা বন্ধ করে থাকতেন। রাত্রিতে বেরিয়ে পড়তেন। পুলিশ বার কয়েক এসেও ধরতে পারেনি তাঁদের। ননীবালার তদারকিতে যে বিপ্লবীরা বারবার তাদের বোকা বানাচ্ছেন তা বুঝতে দেরি হল না পুলিশের। তারা ননীবালার পিতাকে সিআইডি দপ্তরে নিয়ে গিয়ে নানারকম জেরা চালিয়ে যেতে থাকল। এদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেরা চলছে অন্যদিকে ননীবালাকে গ্রেপ্তারের প্রস্তুতিও শুরু করে দিল পুলিশ। ননীবালাদেবী বুঝতে পারছিলেন, এ অঞ্চলে থাকা তাঁর পক্ষে আর নিরাপদ নয়। তাঁর বাল্যবন্ধুর দাদা প্রবোধ মিত্র কার্যোপলক্ষে পেশোয়ায় যাচ্ছিলেন। সেই বাল্যবন্ধু তাঁর দাদাকে অনেক বলে কয়ে ননীবালাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে রাজি করালেন। ননীবালা পালিয়ে গেলেন। কিন্তু ষোলো সতেরো দিন পরে পুলিশ ঠিক তাঁর সন্ধান পেয়ে গেল। ননীবালা এই সময় কলেরায় আক্রান্ত হন। পুলিশ গিয়ে ওই অসুস্থ অবস্থাতেই তাঁকে গ্রেপ্তার করে। স্ট্রেচারে করে তাঁকে হাজতে নিয়ে আসে। কয়েকদিন সেখানে রাখার পর তাঁকে চালান করে কাশীর জেলে। তখন তিনি একটু সুস্থ। কাশীর জেলে আসার পরে কয়েকদিন বাদে পুলিশ তাঁকে জেল অফিসে হাজির করে। কাশীর সিআইডি ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট জিতেন ব্যানার্জি ননীবালাদেবীকে জেরা করত। ননীবালা বারবার একই কথা বলতেন– ‘আমি জানি না। কাউকে চিনিই না’। জিতেন ব্যানার্জি তাঁকে তুই সম্বোধনে অজস্র গালাগালি দিতে শুরু করত। ননীবালা নীরব। এই নীরবতাকে আর সহ্য করতে না পেরে ক্ষিপ্ত জিতেন ব্যানার্জি দু-জন জমাদারনিকে মোক্ষম শাস্তির দাওয়াই বাতলে দিল। তারা এসে ননীবালাদেবীকে টানতে টানতে নিয়ে গেল ছোট্ট একটা ঘরে। দু’জনে মিলে তাঁকে মাটিতে ফেলে পোশাক খুলে দিয়ে গোপনাঙ্গে লঙ্কাবাটা ঢেলে দিতে লাগল। তীব্র যন্ত্রণায় ননীবালা প্রাণপণ শক্তিতে তাদের লাথি মারতে লাগলেন। জমাদারনিরা ওই অবস্থায় তাঁকে ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে নিয়ে এল আবার জিতেন ব্যানার্জির কাছে। শুরু হল আবার জেরা। ননীবালার উত্তর– ‘কিচ্ছু বলব না’। – ‘আরও শাস্তি দেব’– জিতেন ব্যানার্জির হুমকি। ননীবালার সপাট জবাব– ‘যত খুশি শাস্তি দিন, কিচ্ছু বলবো না’। এবার ব্যবস্থা করা হল অন্যরকম শাস্তির। কাশীর জেলের ভেতর মাটির নীচে ছিল পানিশমেন্ট সেল। একটা মাত্র দরজা। কোনও জানালা বা ছিদ্রও ছিল না। ঘুটঘুট্টি আলোবাতাসহীন ওই ঘরে তিনদিন রোজ আধঘণ্টা করে ননীবালাকে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে রাখা হল। তৃতীয় দিনে পৌনে একঘণ্টা প্রায় রেখে দেয়। সেদিন যখন তাঁকে বের করা হয় তখন তিনি অক্সিজেনের অভাবে অজ্ঞান হয়ে গেছেন। এত শাস্তি দিয়েও ননীবালার কাছ থেকে পুলিশ কোনও তথ্যই আদায় করতে পারেনি। শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে প্রশাসন তাঁকে পাঠিয়ে দিল প্রেসিডেন্সি জেলে। প্রেসিডেন্সি জেলে আসার পর ননীবালাদেবী খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেন। জেল সুপার, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এসে বারবার অনুরোধ করেও তাঁকে এককণা খাবারও খাওয়াতে পারেনি। খাওয়ার কথা বললেই ননীবালা বলতেন, ‘বাইরে গিয়ে খাবো’। প্রতিদিন তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সকাল নয়টায় গোয়েন্দা পুলিশরা এসে নিয়ে যেত। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত চলত একটানা জেরা। পুলিশ কর্তা গোণ্ডি সাহেব নিজে জেরা করত। একদিন সে বলল, দেখুন, আপনাকে তো এখানেই থাকতে হবে। কী করলে আপনি খাবেন?’ ননীবালা বললেন, যা চাইব, তাই করবেন? গোণ্ডি বলল, ঠিক আছে। তিনি তখন বললেন, আমাকে বাগবাজারে রামকৃষ্ণদেবের স্ত্রী সারদাদেবীর কাছে রেখে দিন। গোণ্ডি তাঁকে এই মর্মে দরখাস্ত দিতে বললো। ননীবালা তখনই তাঁকে দরখাস্ত লিখে দিলেন। গোণ্ডি দরখাস্তখানা হাতে নিয়ে দলা পাকিয়ে বাতিল কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দিল। এই অপমানে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ননীবালা সজোরে একটি চড় কষিয়ে দিলেন গোণ্ডির মুখে। দ্বিতীয় চড়টি মারার আগেই তাঁর হাত ধরে ফেলে অন্য এক অফিসার। ননীবালা তখন প্রচণ্ড ক্রোধে ফুঁসছেন। তাঁর একটাই প্রশ্ন, ছিঁড়ে ফেলবে তো লিখতে বলল কেন? আমাদের মানসম্মান থাকতে নেই? প্রেসিডেন্সি জেলে স্টেট প্রিজনার হিসেবে ননীবালাদেবীকে রাখা হল। ওই জেলে তখন সিউড়ির রাজনৈতিক বন্দি দুকড়িবালাদেবীকে মাউজার পিস্তল রাখার অপরাধে সশ্রম দিন টাকাতে হচ্ছে। প্রতিদিন তাঁকে আধমন ডাল ভাঙতে হত। এদিকে ননীবালাদেবীর উপবাস চলছে। জেলার এসে তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, কী করলে খাবেন? ননীবালা জানতে চাইলেন, জেলে কোনও ব্রাহ্মণকন্যা আছে কিনা। সে বলল, আছে, দুকড়িবালা। ননীবালা চাইছিলেন ওই ডালভাঙার পরিশ্রম থেকে দুকড়িবালাদেবীকে মুক্তি দিতে। প্রায় আঠারো/উনিশ দিন বাদে কুকড়িবালাদেবীর রান্না করা ভাত খেলেন ননীবালাদেবী। দু-বছর জেল খাটার পর ১৯১৯ সালে ননীবালা মুক্তি পান। কিন্তু জেলের বাইরে তাঁর জন্য অপেক্ষা করেছিল আর এক বিস্ময়। তাঁকে আশ্রয় দেবার কেউ ছিল না। ইংরেজের ভয়ে তখন সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তাঁর দিক থেকে। বহু কষ্টে একা একা জীবন কেটেছে তাঁর। আত্মীয়স্বজন কেউই তাঁকে গ্রহণ করেনি। সবার উপেক্ষা আর অবহেলা সহ্য করে তিনি নিজের চেষ্টায় অনেক কষ্টে বাগবাজার অঞ্চলে একচিলতে ছোট্ট ঘর জোগাড় করতে পেরেছিলেন। বাকি জীবনটা তিনি সম্পূর্ণ একাকী ওই ঘরে কাটান। শূন্যতায় ভরা ছিল জীবন তাঁর। কিন্তু কাউকে তিনি কোনও অভিযোগ জানাননি। কারও প্রতি ক্ষোভ ছিল না তাঁর। তথ্যসূত্র : শত নারী বিপ্লবী, সম্পাদনা : শেখ রফিক, বিপ্লবী কথা প্রকাশনা

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..