নারীমুক্তির পথ সমাজতন্ত্র

মনীষা চক্রবর্ত্তী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

আদিম সাম্যবাদী সমাজ পতনের পরে আরো কয়েকটি সমাজ ব্যবস্থার উত্থান ও পতন ঘটে। বর্তমানে যে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা চলছে তাও পতনের শেষ প্রান্ত সীমানায় এসে পৌঁছেছে। এখানে আমাদের আলোচ্য বিষয়- সামাজিক প্রেক্ষাপটে মানবসমাজের অধিকাংশ নারীদের অবস্থান কেমন ছিল, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তাদের মূল্যায়ন কেমন করা হয়েছিল এবং নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে কোন তন্ত্র, কোন দর্শন, কোন বাদ প্রতিবন্ধকতার কারণ হয়েছিল। একই সাথে এ-ও জানতে হবে নারী প্রগতির পথে কোন দর্শন বা মতবাদ বাস্তবমুখী। যেই সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং সার্বিক একটি সুসংহত মানবিক মূল্যবোধের মাধ্যমে নারীসমাজ সাবলীল যাপিত জীবন অব্যাহত রাখবে, আমরা ইতিহাস থেকে জেনেছি সেই সমাজব্যবস্থায় নারীই ছিল প্রধান প্রাণশক্তি। নারীর প্রেরণায়, নারীর উদ্যোগে, নারীর সিদ্ধান্তে, তারই নিয়ন্ত্রণে সমাজ নিয়ন্ত্রিত হতো, সেই মাতৃতান্ত্রিক সমাজে ছিল না কোনো হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি, সংঘাত, সংঘর্ষ, দখলদারিত্ব, বণ্টন বিভাজন, ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির প্রশ্ন। শীত-গ্রীষ্ম, ঝড়-বৃষ্টি, বর্ষা-বাদল, বন্যা সকল প্রকার প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সাথে লড়াই করে নারী-পুরুষ একই সাথে শিকারে যেত, খাদ্য সংগ্রহ করতো, সমবণ্টনের মাধ্যমে সকলে মিলে তা ভোগ করার রীতি ছিল। কালের বিবর্তনে সেখানেও উদ্ভব হল সম্পত্তির মালিকানা। শুরু হল সম্পত্তির ওপর দখলদারিত্ব, জুলুমবাজি। যা এতো যুগ পরে আজও ব্যাপকভাবে চলছে। ‘জোর যার মুল্লুক তার’ এই অমানবিক বর্বর সংস্কৃতিই প্রায় অনেকের মধ্যে প্রভাবিত হল। শুরু হল গোষ্ঠীযুদ্ধ, গোত্রযুদ্ধ- যার নাম পুরুষতন্ত্র। যেই তন্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের নারীসমাজের লড়াই আজও অব্যাহত রয়েছে। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ভাঙনের মুখে আরো একটি ভাববাদ, আধ্যাত্মবাদী শক্তির উল্লেখযোগ্য সমাবেশ ঘটে। যারা জনগণকে অদৃষ্টবাদের প্রচারে আকৃষ্ট করে মানসিকভাবে দুর্বল করে তোলে। এক দুর্বার ধর্মীয় উন্মদনার মধ্য দিয়ে নারী জাতিকে গৃহবন্দি করে রাখে। এখনো যেই কর্মকাণ্ড সমগ্র বিশ্বব্যাপী পরিব্যাপ্ত। ভূমির মালিক যাহা বলেন, ধর্মাধিপতি, পুরোহিতও তাহাই বলেন। ধনদৌলত রক্ষার্থে ধর্মও সেখানে অবস্থান করে। এই উভয়ের মিলিত শক্তির উত্থানে যেই সমাজ পরিচালিত এর নাম ‘দাস সমাজ’ বা ‘দাস প্রথা’। মাতৃতান্ত্রিক সমাজে যেই নারী আনন্দে বনহরিণীর মতো চকিত চঞ্চল পদে দাপিয়ে বেড়াতো সে এখন এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে অন্তরীণ। শুধু তার বিচরণ ক্ষেত্র রন্ধনশালা আর প্রসবঘর। ধনিক শ্রেণি আর ধার্মিকেরা ছিনিয়ে নিল সমগ্র দেশ ও জাতির নিয়ন্ত্রণভার। এখন নারীর পরিচয় হল বন্ধনকারী, সন্তান ধারণ ও পালনের এক অবলা জীবমাত্র। সমাজে এই অমানবিক দাসপ্রথা যেমন রোমহর্ষক তেমনই গ্লানিকর। যুদ্ধ আর ঘোরতর যুদ্ধ শেষে বিজয়ী দলের কাছে পরাজিত শক্তি দাস হিসেবে বছরের পর বছর বাঁধা পড়ে রইলো। আর নারীদের দিন কাটাতে হতো বিজয়ী শক্তির যৌনদাসী হিসেবে। দাস সমাজেও সময়ের দাবি একসময় ভেঙে পড়ে। সেখানে সৃষ্টি হয় এক কৃষিনির্ভর দাস সমাজ অপেক্ষা উন্নততর সামন্তবাদী সমাজ। এই সমাজের প্রধান রাজাধিরাজ, মন্ত্রীমণ্ডলী, প্রজাকুলসহ গঠিত হয় এক বিশাল রাজত্ব। এই রাজ্যের রাজাকে মনে করা হতো স্বয়ং স্রষ্টার প্রেরিত এক সৌভাগ্যবান প্রভু। যার অঙ্গুলি হেলনে নিয়ন্ত্রিত হতো এই বিশাল রাজ্যভূমি। এই রাজাদের মধ্যে আবার এমনও অনেকে ছিলেন যারা এক রানীতে সন্তুষ্ট নহেন। যখনই শিকারে গিয়েছেন তখনই শুধু বনহরিণীই নয় বনসুন্দরী তরুণীকেও রানী করে ঘরে তুলে এনেছেন। নারীর জীবনে শুধু সতী প্রথা নয় সতীন প্রথাও এভাবে শুরু হয়। এই রাজত্বে রাজার অধীনস্ত বহু জমিদার, তালুকদার, মহাজন, সুদখোর সভাকবি, নায়েব, রাজপুরোহিত, ভাগ্যগণনাকারী গণক মহাশয় পরিবেষ্টিত ছিল রাজদরবার। রানীরা সেখানে শুধু অন্তপুরোবাসিনী নিভৃতচারী ললনা। যদিও রাজরাজত্বের স্বর্ণযুগের সেই কথাই বলে ‘সেই রামও নেই সেই অযোদ্ধাও নেই’, এখন সব অনাচার চলছে। প্রশ্ন করি ‘কোন সে রাম, কোন সে অযোদ্ধা নগরী? যেই রাম জনক নন্দিনী সীতাকে বারবার সতীত্ব যাচাইয়ের জন্য হাজার হাজার প্রজাকুলের সামনে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করে শুধু ক্ষান্ত হননি, একি সেই রাম আর সেই রামেরই অযোধ্যা! স্বামী হয়ে অন্তঃস্বত্ত্বা সীতাকে বনবাসেও পাঠিয়েছিলেন রাম। সীতা আগুনে ভস্ম হয়নি, আবার বনের মধ্যে থেকেও সন্তান লব-কুশকে বীরপুত্র হিসেবে গড়ে তুলেছেন। এক্ষেত্রে সাম্যবাদী কবি নজরুলের সেই বিখ্যাত দুটি চরণ তুলে ধরতে চাই-“খেয়ালের বশে তাদেরে জন্মে, দিয়েছে বিলাসী পিতা, লব-কুশ বনে ত্যাজিয়াছে রাম, পালন করেছে সীতা”। এখনো সমাজে এই ধারা অব্যাহত, মহাভারতে দ্রৌপদীর কথাই যদি বলতে চাই, সেখানেও নারীর নারীত্বের প্রতি কত অবমাননাকর ঘটনা জন্ম নিয়েছে। একই সময়ে দ্রৌপদীকে পঞ্চস্বামীর ঘর করতে হয়েছে। আবার ধর্ম রাজসভায় তার বস্ত্র হরণের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটেছে। যদিও তার সম্মান রক্ষার্থে বন্ধু শ্রীকৃষ্ণ বারবারই এগিয়ে এসেছিলেন। সেই মহাভারতের একই বিষয় রাজত্ব গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য যুদ্ধংদেহী রণ দামামা বেজে উঠে। রাজা দুর্যোধনের উক্তি- “বিনাযুদ্ধে নাহি দিব সুঁচাগ্র মেদিনী”। যতযুদ্ধ, যত আস্ফালন ততই নারী জাতির ওপরে নামে চরম বিপর্যয়। ধীরে ধীরে একসময় রাজার রাজত্ব নিঃশেষিত হতে থাকে। বিলুপ্ত হয় জমিদারি প্রথা, মহাজনী প্রথা, একনায়কতন্ত্রের স্থলে গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে উঠে। সামন্ততান্ত্রিক সমাজের সেই ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক, কৃষিভিত্তিক বৈশিষ্ট্যসমূহ এতটাই দৃঢ় অবস্থানে ছিল যা সম্পূর্ণ বদল হতে আরো সময়ের প্রয়োজন। সমাজের পশ্চাৎপদতা যাদেরই বেশি ক্ষত-বিক্ষত করেছে সেই দুর্ভোগ নারী সমাজকেই পোহাতে হচ্ছে। নারীর বিবাহের পূর্বে ও পরে এমনকি স্বামীর মৃত্যুর পরে বৈধব্য জীবনে পোশাক-পরিচ্ছেদ, খাদ্য-সামগ্রী সব ধর্মীয় অনুশাসনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, বিবাহের সাথে সাথেই নারীর শাঁখা, সিঁদুর, নাকফুল, লালশাড়ি যেমন বাধ্যতামূলক পরিধেয় বস্ত্র- তেমনিভাবেই স্বামীর মৃত্যুর পর মুহূর্তেই শাঁখা ভাঙা আর সিঁদুর মোছাও অবশ্য পালনীয়। খুলে ফেলে নাকফুলও। লালশাড়ি আর নয় সাদা থান, এমনকি মাথা ন্যাড়া করে দেয়া হতো। সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগে যেই সহমরণ প্রথা আইনত নিষিদ্ধ হল তখন হতেই নারীর বৈধব্য জীবন আরো দিনের পর দিন অন্তর্জ্বালায় দগ্ধ হতে থাকলো। সহমরণের আগুনের মধ্যে যে নারী ছুটাছুটি করতে থাকে সেখানে চিতায় ধূপ, ধূনা, ছিটিয়ে ধোঁয়াশায় সেই করুণ দৃশ্যকে আড়াল করে থাকে। জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ নারীর আর্তনাদকে ঢেকে দেয়ার জন্য খোল করতাল দিয়ে হরিসংকীর্তনের বাজনায় সকলকে জানিয়ে দেয়া হতো প্রতিব্রতা সতীদাহ হচ্ছে। সহমরণে যে নারী অল্প সময়ে দগ্ধ হতো সেই প্রচলন বন্ধ হবার পর নারীর জীবনে আরো দীর্ঘতরভাবে দগ্ধ হতে শুরু করলো। এই হল মাতৃপূজারী সনাতন হিন্দু সমাজের নারীর স্বাধীনতা। তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের সমাজ সংস্কারক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যিনি তাঁর নিজের পুত্রের জন্যে এক বিধবা তরুণীকে পুত্রবধূ হিসেবে ঘরে তুলেছেন। এরপর থেকে হিন্দু সমাজে বিধবা বিবাহ প্রথা প্রচলিত হয়। এখানে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার সেই পঙতি দুটি-‘আমারে রেখ না বাক্যহীনা, মম হৃদয়ে বাজে রুদ্রবীণা’। গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার দিকে যদি আমরা ফিরে তাকাই যেখানে ভোটাধিকারের মতো একটি সমঅধিকারের আশা জাগে সেখানেও কি নারীর ভোটাধিকার নারীর নির্বাচনের প্রার্থিতা পদ আন্দোলন ব্যতিরেকে স্বীকৃতি পেয়েছিল? বর্তমানেও সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বে নারীকে পণ্য হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। সমস্ত কিছুর পরেও আমরা দেখেছি, যেই সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ায় নারীর সম্মানজনক অবস্থান, সেখানে নারীকে মানুষ হিসেবে মর্যাদার আসনে রাখা হয়েছে। বর্তমানে এখনো কিউবার নারীসমাজ সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার ফল ভোগ করছেন। নারীর স্বাধীনতার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতা নেই। কিউবার সামাজিক, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারী-পুুরুষ সমান অবস্থানে থেকে সমাজকে উন্নততর পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সমাজে পুরুষের মতোই নারীরও অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার মত মৌলিক বিষয়ের নিশ্চয়তা আছে। তাহলে এতবড় সত্যকে সামনে রেখেও আমরা কেন নারীমুক্তির পথ খুঁজতে দিশেহারা? সমাজতান্ত্রিক বিশ্বই দিবে নারীমুক্তির নিশ্চয়তা। নারীমুক্তির মাঝেই নিহিত রয়েছে সমাজের মুক্তি, মেহনতি মানুষের মুক্তি, সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..