“অকালে ঝরে পড়া রক্ত পলাশ”

মহসীন রেজা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত। দেশের মানুষ যখন করোনা মহামারির নিয়ে শঙ্কিত, আতঙ্কিত, দিশেহারা; মহামারির সংকট উত্তরণের জন্য যখন যে যার মত প্রস্তুতি শুরু করেছে, ঠিক তখনই ভূমিকম্পের মতো নওগাঁ শহরে খবর এলো- আমাদের পলাশ আর নেই। তার এই অকাল মৃত্যুতে নওগাঁ শহরের প্রগতিশীল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। পলাশের অকাল মৃত্যুর খবর পেয়েও নওগাঁর মানুষ সহজে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সবাই বারংবার খবরটা ঢাকার বিভিন্ন সূত্র থেকে নিশ্চিত হতে চেষ্টা করছিল। খবর পাওয়া মাত্র তার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক কর্মকাণ্ডের সহকর্মীবৃন্দরা তার উকিল পাড়াস্থ বাড়িতে সমবেত হয়। সকলেই নিশ্চিত হয় ২০ মার্চ ২০২০ রাত অনুমান ৮.৩০ মিনিট ঢাকার রাজপতে আকস্মাৎ মৃত্যুবরণ করেছেন। আমার সকলের প্রিয় আসাদুজ্জামান পলাশ। আসাদুজ্জামান পলাশের এই অকাল মৃত্যু আমাদের নওগাঁবাসীকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। শোকাহত করে ফেলে। পরদিন সকালে আমাদের পলাশ নওগাঁ ফেরে লাশ হয়ে। সঙ্গে থাকেন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বন্ধু জাহাঙ্গীর আলম নান্নু, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মানবেন্দ্র দেব’সহ প্রমুখ। আশির দশকের শেষ দিকে যখন স্বৈরাচার এরশাদ সরকারবিরোধী আন্দোলন তুমুল বেগে এগিয়ে চলছে রাস্তা প্রায় প্রতিদিন নানা রকম মিছিলে মিছিলে মুখরিত হত, তখন ছাত্রদের মিছিলে একটি নতুন মুখ নিয়মিত আসতে থাকলো। হালকা পাতলা ছিপছিপে গড়নের সেই কিশোর দ্বীপ্ত কণ্ঠে নানা রকম স্লোগান স্লোগানে নওগাঁ শহরের রাজপথে প্রকাম্পিত করছে। শুধু যে নিজে নয় তার সহপাঠিদেরও এরশাদ বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সেই মিছিলে নিয়ে আসছে। এরপর সেই সদ্য কিশোর উত্তীর্ণ সেই ছাত্র বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলেও নিয়মিত হতে থাকলো। মিছিলের বাহিরেও ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন রাজনৈতিক সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়তে থাকলো। স্বাভাবিক ভাবেই সকলের চোখে পড়লো এই কিশোর। জানা গেলে কিশোরটিই হচ্ছে আমাদের আসাদুজ্জামান পলাশ। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ছাত্র আন্দোনে এক নতুন গতিবেগ বা জোয়ার আসে। নওগাঁ শহরে দলে দলে ছাত্র/ছাত্রী ছাত্র ইউনিয়নের পতাকা তলে সমবেত হতে থাকে। নওগাঁ শহরের উকিলপাড়া এলাকায় তৎকালীন ছাত্র নেতা শফিকুল ইসলাম, জাহিদুল ইসলাম বাবু, শহিদুল ইসলাম রিপন, আব্দুল্লা আল মামুনের নেতৃত্বে ঘরে ঘরে ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য হতে থাকে। ছাত্র ইউনিয়নের নেতা বর্তমান আমেরিকা প্রবাসী জাহিদুল ইসলাম বাবু ও জাফিউল ইসলাম পাপ্পুর ভ্রাতৃদ্বয় ছাত্র আন্দোলনের নিবেদিত প্রাণ। তাদের চাচাতো ভাই আসাদুজ্জামান পলাশ। তাদের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে কিশোর পলাশ ছাত্র আন্দোলন, ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় ভূমিকা রাখতে শুরু করে। শুধু পলাশ একাই নয় নওগাঁ জেলা স্কুলের তার সহপাঠি বন্ধুদেরও ছাত্র ইউনিয়নের যুক্ত করে। এবং জেলা স্কুলের প্রচুর ছাত্র ছাত্র ইউনিয়নের নীল পাতাকা তলে সমবেত হয়। পলাশের নেতৃত্বে এক ঝাঁক কিশোর ছাত্র ইউনিয়নের কর্মকর্তাকে নতুন গতি এনে দিলো। ১৯৮৯ সালে ছাত্র ইউনিয়নের সাথে পলাশ যুক্ত হওয়া তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের ইতিহাস এক উল্লেখ্যযোগ্য ঘটনা। পলাশের মাধ্যমেই নওগাঁ শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে ছাত্রদের মধ্যে ছাত্র ইউনিয়নের আদর্শ ছড়িয়ে পড়তে থাকলো। বিশেষ করে পলাশের নওগাঁ শহরের কেন্দ্রস্থলে বাসা হওয়ায় পুরো শহরের ওপর, ছাত্রদের ওপর, সংগঠনের প্রভাব ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে দ্রুত ছাত্রদের একত্রিত করা, তাৎক্ষণিক ছাত্রদের স্কুল থেকে বের করে রাজপথে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী মিছিলে সামিল করা জন্য নওগাঁ জেলা স্কুলে পলাশের কোনো বিকল্প ছিল না। ছাত্র ইউনিয়ন ছাড়াও তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও পরবর্তীতে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতৃত্বও নওগাঁ জেলা স্কুলের ছাত্রদের সংগঠিত করবার বিষয়ে পলাশের ওপর আস্থা ও নির্ভর করতেন। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই পলাশ নিজ সাংগঠনিক, রাজনৈতিক গুণাবলি দিয়ে নওগাঁ ছাত্র ইউনিয়নের অপরিহার্য ব্যক্তিতে পরিণত হন। জনপ্রিয় ছাত্র নেতাতে পরিণত হন। ১৯৯০ সালে ঢাকাতে ছাত্র নেতা জহাদ হত্যার মধ্যে দিয়ে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গঠিত হলে দেশব্যাপী এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নতুন গতি আসে। নওগাঁতে তুমুল ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠে। এরশাদের পুলিশ নানা রকম দমন পীড়ন শুরু করে। এক পর্যায়ে ছাত্র ইউনিয়নের জেলা সভাপতি মহসীন রেজা সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ও রাশেদ জাহাঙ্গীর শুভ্রকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে কারাগারে আবদ্ধ করলে ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বের ঘাটতি অনেকটা পলাশ অপরাপর ছাত্র নেতাদের সাথে নিয়ে পূরণ করতে এগিয়ে আসে এবং সফল হন। আসাদুজ্জামান পলাশ ১৯৯২ সালে এস.এস.সি পাস করে নওগাঁ সরকারি কলেজে ভর্তি হয়। পলাশ নওগাঁ সরকারি কলেজের পাশাপাশি নওগাঁ সরদ উপজেলা কমিটির বিভিন্ন পদে থেকে দায়িত্ব পালন করতে থাকে। এই সময় পলাশ আরোও বৃহত্তর রাজনৈতিক চিন্তা থেকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সাথে যুক্ত হয়। আসাদুজ্জামান পলাশ, রাসেল কবির, শংকর সাহা প্রমুখকে নিয়ে গঠিত একটি পার্টি গ্রুপে সংগঠিত হয়ে ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি কমিউনিস্ট পার্টির কাজের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতনের পর নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সারা দেশের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে। নওগাঁ সরকারি কলেজে ১৯৯২ সালের ১০ ডিসেম্বর নওগাঁ সরকারি কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে “গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্য” (ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র মৈত্রী, ছাত্রলীগ, জাসদ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট) মনোনীত “রাসেল সমু” পরিষদে সহ-পত্রিকা সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। আসাদুজ্জামান পলাশ ১৯৯২ সালে নওগাঁ সরকারি কলেজের সাধারণ সম্পাদক ১৯৯৪ সালে ছাত্র ইউনিয়নের নওগাঁ জেলা শাখার সহ-সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৯৭ সালে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন। পরবর্তীতে নওগাঁ জেলা শাখার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যও নির্বাচিত হন। আসাদুজ্জামান পলাশ নওগাঁ শহরের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শহরে বড় হলেও পলাশের গ্রামের বাড়ি শহরেরই পাশের শৈলগাছী ইউনিয়নের গুমারদহ গ্রামের সহিত সম্পর্ক ছিল নিবিড়। পলাশের বাবা সালামতুল্লাহ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। পলাশের মা মাজেদা খাতুন পুরোই একজন গৃহিণী। পলাশরা তিন ভাই চার বোন। পলাশের পরিবার রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী চিন্তা লালন করে। কিন্তু আসাদুজ্জামান পলাশ ছাত্র ইউনিয়ন, কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত হয়ে প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ মুক্তমনা মানুষে পরিণত হয়। যা তাকে নানা রকম সামাজিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যুক্ত হতে সহায়তা করেছে। আসাদুজ্জামান পলাশ শুধুমাত্র রাজনৈতিক আন্দোলনে নিজেকে আবদ্ধ করেন নাই। আশির দশকে গড়ে উঠা নওগাঁ আবৃত্তি পরিষদ সক্রিয় হওয়া কিংবা ভাষা আন্দোলনের চেতনায় নওগাঁ ভিত্তিক একুশে উদযাপন পরিষদের সামনের সারির সদস্য হিসেবে ভূমিকা রাখেন। ছাত্র আন্দোলন থেকে অবসর নিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিতে সক্রিয় হন। নওগাঁ পার্টির শহর কমিটি সদর উপজেলা কমিটির দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০১২ সালে নওগাঁ জেলা সম্মেলন জেলা কমিটির সংগঠক হিসেবে নির্বাচিত হন। আসাদুজ্জামান পলাশ যুব আন্দোলনে যুক্ত হয়ে যুব ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাচিত হন। কর্মজীবনে প্রবেশ করে এবং কম্পিউটার ও কম্পিউটারের যন্ত্রাংশের ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু ব্যবসায় অনভিজ্ঞতার কারণে নানাভাবে প্রভাবিত হন এবং ঋনগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ফলে ব্যবসার পাঠ চুকিয়ে দিতে হয় তাকে। নতুন করে কিছু করার মানসে ঢাকা গনম করে পলাশ। নানা জায়গায় চাকুরী করে আবার নওগাঁতে ফেরার জন্য প্রস্তুতি শুরু করেন। ঢাকাতে বিভিন্ন সাংগঠনিক রাজনৈতিক কাজে যুক্ত থাকেন। কিন্তু আসাদুজ্জামান পলাশ জীবন সংগ্রাম করতে গিয়ে শরীরে নানা রকম রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। ২০ মার্চ ২০২০ রাত আনুমানিক ৮.৩০ মিনিটে পলাশ চা পানের জন্য চায়ের দোকানের দিকে যাবার পথে সম্ভবত: ডায়েবেটিকসের মাত্রা বেড়ে যওয়ায় অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় পড়ে যান। এবং সেখানেই অকালে মৃত্যুবরণ করেন। যে পলাশ ১৯৭৬ সালের ১২ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেই পলাশ অকালেই ঝরে গেল। খুবই দুঃখজনক যে পলাশের পাশাপাশি তার সবচেয় বড় বোন এবং সবচেয়ে ছোট বোন এই বৎসরই মৃত্যুবরণ করেছেন। আসাদুজ্জামান পলাশের মৃত্যু তার পরিবারের জন্য যেমন ক্ষতির তার চেয়েও বড় ক্ষতির নওগাঁ পার্টি ও নওগাঁর আপামর মানুষের জন্য। যা পূরণ হবার নয়। লাল সালাম, কমরেড আসাদুজ্জামান পলাশ। লেখক : সভাপতি, নওগাঁ জেলা, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..