‘ধর্মীয় অবমাননা’, জুয়েল হত্যাকাণ্ড এবং রাজনীতিতে বিমানবিকীকরণ

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

গত বেশ কয়েক বছর ধরে বিশেষ করে ফেসবুকের জনপ্রিয়তা বা ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে বিশ্বের অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও একটা বিশেষ প্রবণতা খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আর তা হলো কোনো ধর্ম পরিচয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কোনো ফেসবুক ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পুরো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে উস্কানি দিয়ে সহিংসতা উস্কে দেয়া। ২০১২ সালের রামুর ঘটনা থেকে শুরু করে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার নাসিরনগর, ভোলা বা সাম্প্রতিক সময়ের ফেসবুকের স্ট্যাটাসকে ঘিরে কুমিল্লার মুরাদনগরেও একই ধরনের সহিংতার বিস্তার দেখা গেলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক স্ট্যাটাস ঘিরে ‘ধর্মীয় অবমাননা” এর অভিযোগ এনে কোনো সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে সহিংসতার এই প্রবণতার বিপরীতে আরেকটি নতুন ঘটনাও দেখা গেলো গত ২৯ অক্টোবর লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলায়। উপজেলার সীমান্তবর্তী বুড়িমারী ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় জামে কোরআন শরীফ অবমাননার অভিযোগে আবু ইউনুস মো. শহিদুন্নবী জুয়েলকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করে মুসল্লিরা। পিটিয়ে আহত করা হয় সুলতান মো. রুবাইয়াত সুমন নামের আরেকজনকে। এ ঘটনায় অনেক অমিল থাকলেও দুটি বিষয়ে মিল যেমন- ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এবং সেটাকে ঘিরে সহিংসতা এবং শেষ পর্যন্ত পুড়িয়ে হত্যা। ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে গণপিটুনিতেও আমরা গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ড দেখেছি। তবে ছেলেধরা সন্দেহে কাউকে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলাকে মোটা দাগে আইনশৃংখলা বাহিনী বা সামগ্রিক শাসন ব্যবস্থার ওপর আস্থার অভাবকে দায়ী করলেও সামাজিক গণমাধ্যমে বা অন্য কোনোভাবে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে জনপরিসরে সহিংসতাকে উস্কে দিয়ে কাউকে হত্যা করাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? এই ধরনের সহিংসতার পেছনে অনেক সময় অনেক রাজনৈতিক দুরভিসন্ধিকে দায়ী করা হলেও একটা বিষয়ে দ্বিমত থাকে না যে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনতে পারলে, মানুষের মনোজগতকে ধর্মীয় সহিংসতায় দিকে ঠেলে দেয়াটা সহজ হয়। কেননা ধর্ম নিয়ে সাধারণত মানুষের অনুভূতি একেবারেই বিশ্বাস নিভর এবং তা পার্থিব কোনো যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। সেজন্যই কারো বিরুদ্ধে- সে হোক সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের কেউ অথবা সংখ্যালঘু - ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনতে পারলে সহিংসতা উৎপাদন খুব সহজ হয়ে যায়। ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলনকে ঘিরে বিশেষ করে আমার দেশ পত্রিকাসহ আরো কিছু সমচিন্তাধর্মী পত্রিকা সমাজ পর্যায়ে যে ‘আস্তিক বনাম নাস্তিক’ মেরুকরণ করেছিলো তা একের পর এক ব্লগার হত্যাকেই উৎসাহিত করেছিলো। আর তার সাথে সরকার বা রাষ্ট্রপক্ষ থেকেও এসব হত্যাকাণ্ডের যারা শিকার হলো তাদের বিরুদ্ধেই “ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ির অভিযোগকে মোটা দাগে সামনে আনলো। তারা জোর কণ্ঠে এগুলোর নিন্দা তো করলোই না, সাহস নিয়ে জনপরিসরে এই দাবিটাও করলোনা যে, এ ধরনের হত্যাকাণ্ড কোনো ধর্মকেই গৌরবান্বিত করে না বা সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিকে এভাবে হত্যা সকল ধর্মেই নিন্দাযোগ্য! অথচ ক্ষমতাসীনদের সমর্থক বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের একটা বড় অংশ পোশাক বা দাঁড়ি-টুপির ভিত্তিতে ‘রাজাকার বনাম দেশপ্রেমিক’ পরিচয়ে সমাজ পর্যায়ে মেরুকরণ করেছেন, যা ৯/১১ পরবর্তী সময়ে বিশ্ব পর্যায়ের মেরুকরণের সাথে মিলে যায়। আসলে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে সহিংসতা বা হত্যাকাণ্ড, সেটা অভিজিৎ, জুলহাস বা দীপন বা সর্বশেষ নিয়মিত নামাজ পড়া জুয়েল হোক, ধর্ম পরিচয় বা সংখ্যাগরিষ্ঠতাভিত্তিক রাজনীতির চর্চা বা জনপ্রিয়তা যত বাড়বে, সমাজে মেরুকরণ যত বাড়বে - তা পোশাকের বা দাঁড়ি-টুপির কারণেই বা ধর্ম বিশ্বাসের কারণেই হোক - পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা আরো শক্তিশালী হবে, যা শেষ পর্যন্ত বিমানবিকীকরণের পথকেই আরো সহজ করে দেয়। আর কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্য কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিমানবিকীকরণে সফল হতে পারলে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অতীতে পারস্পরিকভাবে যতই কাছের হোক না কেন, একে অপরের বিরুদ্ধে সহিংসতায় লিপ্ত হতে এক সেকেন্ড সময় নেয় না। কেননা মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, বিমানবিকীকরণ এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে যে কোনো ব্যক্তি বা তার মানবিক পরিচয়টাকে আড়াল করে দেয়া যায়। এমন একটা পরিচয় সামনে আনা হয় যা সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে সহিংসতাকে জায়েজ করে দেয় এবং নিষ্ঠুরতা নিশ্চিত করা যায় সহজেই। অন্য কথায়, সরকারের কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ দাঁড়ালে তাকে ‘রাজাকার’ তকমা দিতে পারলে তার বিরুদ্ধে সহিংসতা বা বলপ্রয়োগ সমস্যাহীন হয়ে পড়ে বা গ্রহণযোগ্যতা পায়। যেমন: ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় টুটসীদের বিরুদ্ধে গণহত্যা শুরুর আগে সংখ্যাগরিষ্ঠ হুটুরা তাদেরকে “ক্ষতিকর তেলাপোকা’ হিসেবে চিহ্নিত করে তুলেছিলো! হিটলার এবং নাৎসি কর্মীরা ইহুদি সম্প্রদায়কে গণহত্যার আগে ইঁদুর বলে অভিহিত করে আসছিলো। ১৯৭১ সালে বা তার আগে থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী আমাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন কিছু ছিলো না। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ‘ভারতের মদদপুষ্ট ইসলামবিরোধী ষড়যন্ত্র’ হিসেবে প্রচার করছিলো, আর মুসলমান বাঙালিকে ‘ভেজাল মুসলমান’ এবং বাঙালি সংস্কৃতিকে ‘হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি’ বলে আখ্যায়িত করে আসছিলো। ২০১৮ সালে ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেনকে (এনআরসি) যৌক্তিক দাবি করতে গিয়ে বিজেপি নেতা অমিত শাহ বাংলাদেশি অভিবাসীদের ‘উইপোকা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলো। তাই সবকিছু মিলিয়ে “ধর্ম অবমাননা”র অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সমাজ বা রাষ্ট্র যদি সহিংসতা সুরক্ষা দিতে না পারে এবং তার বাঁচার অধিকারকে নিশ্চিত করতে না পারে “সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি” হিসেবে, সেক্ষেত্রে আমাদের দেশের রাজনীতিতে বিমানবিকীকরণের চর্চা আরো শক্তিশালী হবে বলে আশংকা করা যায়। সমাজ বা রাষ্ট্র পর্যায়ে পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা আরো বাড়বে এবং সহিংসতা আরো বিপদজনক হয়ে উঠবে সামনে! এতে ধর্ম পরিচয়ে বা অন্য পরিচয়ে সংখ্যালঘুদের ঝুঁকি যেমন আরো বাড়বে, সংখ্যাগরিষ্ঠদের মাঝে যারা ভিন্ন মত বা ভিন্ন চিন্তার আছেন তাদের জন্যও তেমনই নিরাপত্তাহীনতা মোটেই কমবে না। জুয়েলের মতো করে পুড়িয়ে মেরে ফেলার মতো ঘটনা বন্ধ করাও হয়তোবা খুব সহজ হবে না ভবিষ্যতে। লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..