ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে ক্ষমতাকাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করা আন্দোলন

রহমান মুফিজ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

গত অক্টোবর থেকে সারাদেশে গড়ে ওঠা ধর্ষণ ও বিচারহীনতাবিরোধী আন্দোলন আমাদের নতুন এক অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির সামনে দাঁড় করিয়েছে। কারণ শুরু থেকেই এ আন্দোলনের চরিত্র অন্য সাধারণ আটপৌড়ে নারী নিপীড়িনবিরোধী আন্দোলনের মতো ছিল না, এখনও নেই। গত পঞ্চাশ বছরে সম্ভবত এটাই প্রথম ধর্ষণ ও নিপীড়নবিরোধী আন্দোলন, যে আন্দোলন সরাসরি ক্ষমতাকাঠামোকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। কথা বলেছে চরম পুরুষতান্ত্রিক ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্রীয় নীতি ও আইনের বিরুদ্ধে। আন্দোলনের কর্মীরা বক্তৃতা-বিবৃতিতে ক্ষমতাসীন সরকারের বৈধতা, ফ্যাসিবাদী আচরণ, ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর সঙ্গে সহবতের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটা চরম নারীবিদ্বেষী, ধর্ষকামী মধ্যযুগীয় বর্বর সামাজিক মনস্তত্ব, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা আকাঙ্ক্ষা থেকে ক্রমাগত পেছাতে থাকা একটা আত্মঘাতি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে- অনেক হয়েছে, এবার থামো। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে আর এভাবে উলঙ্গ করে মেরো না। এই বার্তা রাষ্ট্রের কানে পৌঁছেছে। রাষ্ট্র ভীষণ আশ্চর্য হয়েছে যে, ধর্ষণ ও নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে আন্দোলনকারীরা বারবার ক্ষমতাকাঠামো, সরকার, সরকারের প্রধান ও তাঁর মন্ত্রী-সেপাইদের বিরুদ্ধে কেন স্লোগান দিচ্ছে। কেনইবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ চাইছে? আর কেনইবা সরকারের গদি নিয়ে টানাটানি করছে? নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নাারীকে বিবস্ত্র করে প্রকাশ্যে নির্যাতন, তার ভিডিও ধারণের ঘটনা প্রকাশ হবার পর এদেশের প্রতিটি মানুষ অনুভব করেছে বেগমগঞ্জের সেই ঘটনাই আজ বাংলাদেশ রাষ্ট্র, তার রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি-সভ্যতার প্রকৃষ্ট প্রতীক হয়ে ওঠে এসেছে সবার সামনে। প্রকাশ্যে উলঙ্গ করে ওই নারীর ওপর যখন বর্বরতা চালানো হচ্ছিল তখন তিনি যারপরনাই চিৎকার করতে করতে আকুতি জানাচ্ছিলেন– ‘ওরে আব্বারে, তোগো আল্লার দোহায় লাগে, আঁরে ছাড়ি দে...’। যেন ওই নারী নয়, এভাবেই চিৎকার করছে আজকের বাংলাদেশ। যেন দেশটাকেই ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছে একদল লুটেরা, অসভ্য বর্বর রাজনৈতিক গোষ্ঠী। ফলে এ ঘটনার পর কোনো সংবেদনশীল মানুষই ঘরে বসে থাকতে পারেননি। স্ব স্ব জায়গা থেকে এর প্রতিবাদে স্বোচ্চার হয়েছেন। এর প্রতিবাদ যখন রাজপথে তার নিজস্ব স্বতঃস্ফূর্ত ভাষা নিয়ে হাজির হয়েছে তখন রাষ্ট্র এবং সরকারে চরম আস্থাশীল গোষ্ঠীটি; যারা প্রায়শ আমাদের প্রগতিশীল নানা আন্দোলনে সক্রিয় থাকেন তারা বেশ গোস্সা হয়েছেন। তারা প্রকাশ্যেই এই আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বলার চেষ্টা করেছেন, ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে সরকারের বিরুদ্ধে কেন কথা বলা হবে? তাদের বাক্যবাণ নিবদ্ধিত হয়েছে আন্দোলনে সক্রিয় বামপন্থি কর্মীদের প্রতি। বলেছেন- বামপন্থিরা আন্দোলনকে ভিন্নখাতে নিয়ে যাচ্ছেন। তারা ধর্ষণ ও বিচারহীনতার প্রতিবাদের নামে সরকার পতনের আন্দোলনে নেমেছেন। আন্দোলনের আকস্মিক বিস্তৃতি ও জনমনের তীব্র অসন্তোষ বুঝতে পেরে প্রধানমন্ত্রী তড়িঘড়ি করে আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি ‘মৃত্যুদণ্ড’ করার ঘোষণা দেন। এতে সরকারপন্থি এক্টিভিস্টরা দারুণ প্রসন্ন হলেন। বললেন–সরকার তো দাবি মেনে নিয়েছে, এরপরও কেন আন্দোলন? এমনকি আমাদের নারীবাদী এক্টিভিস্টদেরও অনেকে একই বক্তব্য দিয়েছেন। সরকারের এমন লোকভোলানো চাতুর্যপূর্ণ অবস্থানকে তারা ন্যায্য বলে মনে করছেন। ধর্ষকের শাস্তি ‘মৃত্যুদ-’ ঘোষণার মধ্যেই ধর্ষণ ও যৌনপ্রতিহিংসা প্রবণতার লাগাম টানা যাবে বলে বিশ্বাস করছেন। সমাজ ও তার ক্ষমতার পুরুষতান্ত্রিক কেন্দ্রীভূতিকে দুবর্ত্তায়িত রাষ্ট্রকাঠামোর উপজাত অনুসঙ্গ হিসেবে দেখতে পারছেন না। তারা একে মামুলি সামাজিক বিশৃংখলা বা সাধারণ পুরুষতান্ত্রিক যৌন বিকার বলেই ক্ষান্ত দিচ্ছেন। এটা এক ধরনের সচেতন রাজনৈতিক শঠতা। এর মধ্য দিয়ে তারা প্রকারান্তরে নারীর মুক্তির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। নারীর মুক্তি ও মর্যাদাই যে প্রকৃত মানবমুক্তি, এ চিরায়ত সত্যকে নানা বাকচাতুর্য দিয়ে অবলীলায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন এ ‘সুশীল শ্রেণি’। যদি কোনো ভৌগলিক সভ্যতার উৎকর্ষতা সম্পর্কে ধারণা নিতে চাই তবে আমাদের তাকাতে হবে সে ভুগোলের নদী ও নারীর দিকে। নদী এখানে প্রকৃতি আর নারী রাজনীতির প্রতীক হয়ে আসে। নদীর অবাধ ও সুস্থ প্রবহমানতার মধ্যে প্রকৃতির নিয়ম ও সচলতাকে ইঙ্গিত করে। আর নারীর স্বাধীনতা, অধিকার ও মর্যাদা সুরক্ষার ভেতরে নিহিত আছে মানুষের মর্যাদা। কারণ সভ্যতার আদি থেকে নারীই প্রকৃতপক্ষে মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেছে, পুরুষ নয়। যদিও পুরুষতন্ত্র তার সমস্ত পরিভাষায় ‘পুং’ লিঙ্গের আধিপত্যকেই ‘মানুষ’ বলে সজ্ঞায়িত করছে। পুং লিঙ্গের সমার্থক শব্দ হিসেবে ‘নর’ ‘পুরুষ’, ‘পুরুষোত্তম’, ‘মনুষ্য’, ‘আত্মা’, ‘পরমাত্মা’, ‘ইশ্বর’, ‘পরমেশ্বর’ ‘পরমব্রহ্ম’ ইত্যাদি শব্দবন্ধ দিয়ে বোঝাতে চেয়েছে পুরুষেরাই মানুষ। তারাই সৃষ্টিকুলে শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। তাদের আধিপত্যই ন্যায্য। পক্ষান্তরে নারীকে বলছে ‘স্ত্রী লোক’, ‘রমণী’ ‘মহিলা’। নারীর বৈশিষ্ট্য হিসাবে অভিধানে তারা লিখে রেখেছে- ‘সতীত্ব’, ‘মমত্ব’, ‘বাৎসল্য’সহ প্রভৃতি নারীসুলভ গুণ। এসব গুণ দিয়ে নারী ‘বিশ্বমোহিনী’র ভূমিকা নেবে। পুরুষের আজ্ঞাবহ হবে, পুরুষকে পরিতৃপ্ত করবে। কারণ পুরুষের বিপরীতার্থক শব্দ হিসেবে নারী মানুষ নয়। তার ‘আত্মা’ বলতে কিছু নাই (আত্মা শব্দটি এখানে স্বতন্ত্র মর্যাদাপূর্ণ অস্তিত্ব অর্থে ব্যবহৃত)। সে কেবলই মোহ। জীবসত্ত্বা হিসেবে সে মনুষ্য সমাজে নীচ ও করুণার পাত্র। ফলে পুরুষের আশ্রিত হয়ে বাঁচতে হবে তাকে। এই মনস্তত্ব যে সমাজ, সভ্যতা বা রাষ্ট্র বহন করে চলে, সভ্যতার ঐতিহাসিক দায়িত্ব হিসেবে এ বর্বর ধারণাকে ভেঙে নতুন মানবিক ধারণা গড়ে তোলার কোনো উদ্যোগ নেয় না যে সভ্যতা, তাকে কোনোভাবেই মনুষ্যসভ্যতা বলা যায় না। সচেতন যুথবদ্ধ প্রয়াসের ভেতর দিয়ে সামাজিক প্রগতির যে ধারা মানুষ তৈরি করেছে আমরা তার উত্তারিধকার বহনে অক্ষমতার পরিচয় দিয়ে চলেছি বারবার। বুর্জোয়া বা পুঁজিতান্ত্রিক সমাজ নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলে যে লোকভোলানো বুজরুকি আমাদের সামনে উপস্থাপন করে তাতে হয়তো রাষ্ট্র বা সরকারের ক্ষমতাবলয়ে কিছু নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ে, কিন্তু শেষ বিচারে এসব প্রতিনিধি পুরুষতন্ত্রেরই প্রতিভূ বৈ আর কিছু হয়ে দাঁড়ায় না। পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে না এসব নখদন্তহীন ‘বিশ্বমোহিনী’রা। কারণ প্রচলিত পুরুষাভিধান এদেরকে মানুষ হিসেবেই যেখানে গণ্য করে না, এবং তা তারা মেনেও নেয় সেখানে নারীমুক্তি বন্দি হয়ে পড়ে লোক দেখানো ‘নারীর ক্ষমতায়নের’ বৃত্তে। এর ফলে একজন নারী হয়েও দেশের প্রধানমন্ত্রীকে দেখা যায় ধর্মান্ধ চরম নারীবিদ্বেষী গোষ্ঠীর সঙ্গে আঁতাত করে রাষ্ট্রীয় নীতি সংস্কারে মনোযোগী হতে। এটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বেঈমানির সামিল। যারা প্রশ্ন তুলেছেন, ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে আন্দোলনকারীরা ক্ষমতাকাঠামোকে কেন বারবার আঘাত করছে, তাদের জেনে রাখা উচিৎ ‘ধর্ষকামী মনস্তত্ব’ হাওয়া দিয়ে আসে না। একটা দুর্বৃত্তায়িত রাষ্ট্রব্যবস্থা, যার পরিচালনায় রয়েছে একটা সরকার, তার গৃহীত নীতির বাইরে কোথাও কোনো বিচ্ছিন্নভাবে ক্ষমতা চর্চার সুযোগ নেই। সমাজতাত্ত্বিকরা বহু আগেই এই মতে স্থির হয়েছেন, চলমান ধর্ষণকাণ্ডগুলোকে এখন আর কেবলই জৈবিক বিকার বলে চালিয়ে দেয়া যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে ক্ষমতার বিকার। ব্যক্তি, গোষ্ঠী, গোত্র, জাতি, ধর্ম রাজনীতির একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রদর্শনের বিকার হিসেবেই দেখতে হবে যে কোনো ‘জোর প্রয়োগের’ মনস্তত্বকে। যখন জনগণের প্রতি রাষ্ট্র বা সরকারের জবাবদিহিতার বালাই থাকে না, জোর করে, ভয়ের সংস্কৃতি জারি রেখে, ফ্যাসিবাদী কায়দায় ক্ষমতায় আসীন থাকা যায়, ক্ষমতার জোর খাটিয়ে প্রভাবিত করা যায় বিচার বিভাগকেও তখন ক্ষমতার আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে থাকা শ্রেণির মধ্যে এ বিশ্বাস সংক্রমিত হয়– যে কোনো অন্যায় করেই পার পাওয়া যাবে। এমন কি ক্ষমতার প্রশ্রয়ে না থাকা শ্রেণির মধ্যেও এ বিশ্বাস বদ্ধমূল হয় যে, জোর প্রয়োগ একটি বৈধ উপায়। এবং এ উপায় বারবার তারা প্রয়োগ করছে নারীর ওপর, শিশুর ওপর। কারণ নারী ও শিশুই সমাজে সবথেকে দুর্বল। তার ওপর যদি সেই নারী ও শিশু সবথেকে নিষ্পেষিত শ্রেণির হয়ে থাকে তাহলে যেন নিপীড়িত হবার ‘নিয়তি’ সে জন্ম থেকেই লাভ করেছে। ফলে স্কুলে, কলেজে, মাদ্রাসায়, রাস্তায়, চাকুরিস্থলে, নিজ বাড়িতে, বন্ধুর আড্ডায় কোথাও নারী ও শিশু নিরাপদ নয়। সর্বত্র নারীকে ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখার কৌশলই প্রয়োগ করছে এ সমাজ। নারীকে দমিয়ে রাখার মধ্য দিয়ে প্রগতির অগ্রযাত্রাকে দমিয়ে রাখছে। প্রখ্যাত নারীবাদী তাত্ত্বিক সিমোন দ্যা বোভোয়ার আরো স্পষ্টভাষায় বলেছেন, নারীর যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে পুরুষতন্ত্র সমাজে তার আধিপত্য টিকিয়ে রাখে। এ পুরুষতন্ত্র নারীর যৌনতার ওপর নারীর কোনো অধিকার স্বীকার করে না। তার অধিকার হরণের মধ্য দিয়েই পুরুষ তার ‘বেটাগিরি’ ফলাতে চায় সর্বত্র। ফলে এই যে বেটাগিরির মনস্তত্ব, এটা এখন কেবল নারী-পুরুষে সীমাবদ্ধ নেই। এটা এখন জাতিদ্বন্দ্বে, ধর্মদ্বন্দ্বে, শ্রেণিদ্বন্দ্বে প্রবিষ্ট হয়ে গেছে। বেটাগিরি’র এ দৃষ্টিভঙ্গি ভাঙার লড়াই কখনোই পরিণত হবে না যতদিন না এই দৃষ্টিভঙ্গির লালনকারী রাষ্ট্রকে আমরা চ্যালেঞ্জ করতে না পারি। এই চ্যালেঞ্জ এই মুহূর্তে বামপন্থি আন্দোলনের কর্মীরাই ছুঁড়ে দিয়েছে রাষ্ট্রকে। এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে কাণ্ডারির ভূমিকা নিতে হবে বামপন্থি কর্মীদেরই। লেখক : কবি, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..