বেতিয়ারার শহীদ আমাদের অহঙ্কার

মনজুরুল আহসান খান

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
১৯৭১ এর ১১ নভেম্বর। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এক সন্ধিক্ষণে। পাকিস্তানের বর্বর সেনাবাহিনীর ব্যাপক হত্যাকাণ্ড দেশের ভেতরে সংঘর্ষ অনেকটা স্তিমিত হয়ে এসেছে। মুজিব বাহিনীও দেশের ভেতরে কোনো অপারেশন চালাতে আগ্রহী না। তারা আগাগোড়া তাজউদ্দীন সরকারের অধীনে কাজ করতে রাজি নয়। তারা মনে করত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তবে বামপন্থিরা নেতৃত্বে চলে আসবে। সেই সময় পর্যন্ত তাদের লোকবল ও অস্ত্রবল অক্ষুণ্ন রাখতে হবে যাতে বামপন্থিদেরকে নেতৃত্ব থেকে হটানো যায়। এই নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে মোশতাকপন্থিরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সাথে যোগসাজশে কনফেডারেশন গঠনের চক্রান্তের জাল বুনতে থাকে। এই সময় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার এবং ইন্দিরা গান্ধীর সরকার বামপন্থিদের ট্রেনিং এবং যুদ্ধে প্রেরণের ব্যাপারে অগ্রাধিকার দেয়। সেপ্টেম্বর নভেম্বর থেকে ন্যাপ-কমিউনিস্ট-পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা বাহিনীকে দ্রুত সামরিক প্রশিক্ষণ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। গেরিলা বাহিনীর প্রথম ব্যাচে ওসমান গনির নেতৃত্বে দুইশত জনের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এদেরকে ট্রেনিং শেষে অস্ত্রসহ দেশের ভেতরে পাঠানো হয়। তারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান নেয় এবং ধীরে ধীরে তৎপরতা শুরু করে। দ্বিতীয় ব্যাচে নেতৃত্বে ছিলাম আমি। ডিপুটি কমান্ডার ছিলেন ইয়াফেস ওসমান (বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী) শাহাদাত হোসেন ও শাহ অরম। আমরা ট্রেনিং শেষে বাইখোরা বেইস ক্যাম্পে অবস্থান নেই। অন্যরা উত্তরবঙ্গ ও চট্টগ্রামের দিকে চলে যায়। একাত্তরের ১০ নভেম্বর ইয়াফেস ওসমান ও নিজামুদ্দিন আজাদের নেতৃত্বে চল্লিশ-পঞ্চাশজনের একটি গ্রুপ আগরতলার বর্ডার চোত্তাখোলায় চলে যায়। সেখানে এগারো তারিখ প্রথম রাতেই সবাইকে ব্রিফ করা হয়। চৌধুরী হারুনর রশিদ ও নেভাল কমান্ডার আব্দুর রউফ ব্রিফিং করেন। কমান্ডার আব্দুর রউফ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি ছিলেন। এ বছর মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন। এই বাহিনীর সাথে কয়েকজন সিভিলিয়ান গাইড ছিল। তারা ঐ রাস্তা দিয়ে প্রায়ই যাতায়াত করত এবং আমাদের বাহিনীর লোকদেরকেও পারাপার করাত। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে বাহিনী যাত্রা শুরু করে। প্রথমে পাহাড় থেকে সমতল এবং ঘন গাছপালা ঘেরা পায়ে চলা পথ দিয়ে তারা এগুতে থাকে। ঘুটঘুটে অন্ধকার, চারিদিকে নিস্তব্ধতা। গেরিলা বাহিনীর নিয়ম হচ্ছে যে পথ দিয়ে চলাচল করবে বাহিনীর লোকজনই তা আগে থেকে রেকি করে নেবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা করা হয় নাই। অন্য গাইডরাই তাদেরকে রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যায়। বাংলাদেশের ঐ এলাকাটা ছিল কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রামের বেতিয়ারা গ্রাম। এই রাস্তা দিয়েই আগের দলগুলি গিয়েছে। ইয়াফেসের বাহিনী এক লাইন করে লম্বালম্বিভাবে যাচ্ছিল। সি এন্ড বি রাস্তা অর্থাৎ ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের কাছাকাছি পৌঁছার পর হঠাৎ জিপের শব্দ এবং অবাঙালি কণ্ঠস্বরে ‘হল্ট’। আজাদ গ্রুপ কমান্ডার হওয়া সত্ত্বেও সামনের স্কাউটরা অপরিচিত স্থানে কিছুটা নার্ভাস মনে হওয়ায় নিয়ম ভঙ্গ করে সামনে চলে আসে। সে সঙ্গে সঙ্গে তার স্টেনগান থেকে ব্রাশ ফায়ার করতে থাকে। কিন্তু এক পর্যায়ে তার স্টেন রুক আউট বা জাম হয়ে যায়। পাকিস্তানি সেনাদের পাল্টাগুলিতে আজাদ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। দখলদার বাহিনীর ট্রেসার বুলেট সমস্ত এলাকা আলোকিত করে ফেলে। সেই আলোতে দেখে পাকিস্তানিরা নিশানা করে গুলি চালাতে থাকে। ঘটনাস্থলেই নয় জন শহীদ হয়। আমাদের বাহিনীর বেশিরভাগ সদস্যের অস্ত্র ছিল প্যাক করা। যাদের অস্ত্র খোলা ছিল তারা গুলি চালাতে থাকে। ইয়াফেস বুদ্ধি করে কলামের দুই পাশে দুটি ফায়ার গ্রুপকে পজিশন নিতে বলে। ফায়ার গ্রুপের হালকা মেশিন গানের গুলিতে পাক বাহনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই সুযোগে গেরিলা দল পাহাড় অর্থাৎ ভৈরব টিলার দিকে পিছু হটতে থাকে। পরের দিন দুপুর নাগাদ সবাই যেখান থেকে যাত্রা করেছিল সেখানে এসে পৌঁছে। শুধু একজন মকবুল তিনদিন পরে উলঙ্গ অবস্থায় ফিরে আসে। কিন্তু তার হাতের রাইফেল সে হাতছাড়া করে নাই। আমি বাইখোড়া বেইস ক্যাম্প থেকে খবর পাওয়ার পর পরই সামরিক জিপে ছুটে যাই ফিল্ড হাসপাতালে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আমাকে খবর দেয়া হয়েছিল যে আহতরা আমাকে দেখতে চাচ্ছে। আমি ওখানে গেলে নার্স ডাক্তার সবাই ছুটে আসে আমাকে দেখতে। ওরা বলছিল প্রত্যেকেই জ্ঞান ফেরার পর তোমাকে দেখতে চেয়েছিল। ওখানে আমাকে এক ব্রিগেডিয়ার ডেকে নিয়ে বললেন তোমাদের বাহিনী সত্যি খুব বাহাদুর বটে। এভাবে এম্বুস হলে কম করে হলেও নব্বই পার্সেন্ট ক্যাজুয়ালটি হয়। সেই তুলনায় তোমাদের কিছুই না। এরপর আমি চোত্তাখোলায় যে ক্যাম্পে আমাদের বাহিনীর অন্যরা ছিল তাদের কাছে গেলাম। আমরা ওখানে দাঁড়িয়ে সামরিক কায়দায় শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করলাম। গেরিলাদের মনোবল বাড়াতে আমি ওখানে কয়েকদিনের জন্য থেকে গেলাম। মাঝে মাঝে ওখানে কামানের গোলা এসে পড়ছে। অন্যরা সবাই বিভিন্ন ট্রেঞ্চে। কমান্ডাররা সুরক্ষিত বাঙ্কারে। আমি ঝুঁকি নিয়েই ক্রল করে প্রতিটি বাঙ্কারে গিয়ে সবার সাথে গল্প হাসি ঠাট্টা করলাম। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে উঠল। ওরা ফিরে এলো বাইখোরার বেইস ক্যাম্পে। এরপর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কৌশলের কিছু পরিবর্তন করলাম। একই সাথে গেরিলা ও ফ্রন্টাল যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করলাম। কয়েকদিনের মধ্যেই আবার সবাই মিলে যুদ্ধ যাত্রা। এবার ফেনী, চৌদ্দগ্রামের পতনের সময় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলাম, তারপর চন্দিপুর হয়ে রায়পুরায়। রেডিওতে পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর শুনে উল্লাসে ফেটে পড়ে দেশ। আমি রাতে ছিলাম রায়পুরার কৃষক শহীদ দুদু মিয়ার বাসায়। দুদু মিয়ার দুই ভাইয়ের হাত ধরে শপথ নিলাম শহীদদের স্বপ্ন স্বার্থক করতে জীবন বিসর্জন করতে দ্বিধা করব না। লাখো শহীদের প্রতি লাল সালাম। লেখক : উপদেষ্টা, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..