অস্বাভাবিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিদেশ ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে সারাবিশ্ব থেকে প্রতিক্রিয়া দেয়া হলেও চীন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়া হয়নি। দেশটির সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমলে বিরাজ করছে এক উত্তেজনাকর সম্পর্ক। একদিকে বাণিজ্যযুদ্ধ, অন্যদিকে করোনা ভাইরাসকে ‘চায়না ভাইরাস’ নামে অভিহিত করে চীনকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন ট্রাম্প। এর প্রেক্ষিতে সরকারি পর্যায়ে কোনো ভাষ্য দেয়া না হলেও সরকারি মিডিয়া গ্লোবাল টাইমস তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, চীন ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। অনেক ট্রাম্পকার্ড এরই মধ্যে অসাড় প্রমাণিত হয়েছে। ফলে চীন ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নেয়ার জন্য বাইডেন প্রশাসনের জন্য খুব কমই রিসোর্স রেখে যাচ্ছেন তিনি। খোলাখুলিভাবে বলতে গেছে, যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যকার সম্পর্ক এ যাবতকালের মধ্যে খুব বেশি অস্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছে। এই উত্তেজনা দুই দেশের প্রকৃত স্বার্থকে ভিন্নপথে নিয়ে গেছে। গত কয়েক বছরে বেইজিংকে শত্রু হিসেবে দেখে এসেছে ওয়াশিংটন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই দুটি দেশ একে অন্যের প্রতিপক্ষ নয়। ‘ড্রপ ইলিউশন্স ওভার চায়না-ইউএস রিলেশন্স, বাট ডোন্ট গিভ আপ ইফোর্ট’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে আরো বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট যে ডেমোক্রেট জো বাইডেন হচ্ছেন এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাবধারা যা-ই হোক না কেন তা উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমা মিত্ররা বাইডেনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। ট্রাম্পের চার বছর ক্ষমতার মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতির অধীনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে চীনের সঙ্গে সম্পর্কে। সব দিক দিয়ে দমনপীড়ন করা হয়েছে এবং চীনকে জব্দ করা হয়েছে। এটা ছিল তাদের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক লিগেসি। এই জিনিসটিই ট্রাম্প রেখে যাবেন। এখন প্রশ্ন হলো চীনের সঙ্গে ট্রাম্প সম্পর্ককে যে অবস্থায় রেখে যাচ্ছেন, তা কতদূর টেনে নেবেন বাইডেন? বেশিরভাগ বিশ্লেষক মনে করেন ট্রাম্প প্রশাসন উচ্চ মাত্রার সংঘাত শুরু করেছেন চীনের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্যযুদ্ধ। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার সাধারণ সম্পর্কের পরিবেশ নতুন করে স্থাপিত হয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এলিটদের চীনের বিষয়ে ভাবনা পরিবর্তন করিয়েছে। যদি বাইডেন ক্ষমতা নেন, তাহলে তিনিও চীনের ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিতে পারেন। সিনজিয়াং এবং হংকং ইস্যুসহ চীনে মানবাধিকারের ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। বাইডেন প্রশাসন থেকে এসব সম্ভবত বাদ যাবে না। এমনকি ডেমোক্রেটিক সরকার আরো দূর অগ্রসর হতে পারে। মোদ্দাকথা হলো, গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইস্যুতে চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্র তার চাপ শিথিল করবে বলে মনে হয় না। সম্পাদকীয়তে আরো বলা হয়, এ বছরের শুরু থেকে চীনের ওপর অনেকবারই ইচ্ছাকৃতভাবে চাপ বাড়িয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। তারা তাদের নির্বাচনী প্রচারণার কৌশল হিসেবে চীনের বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগের নীতিকে ব্যবহার করেছে। তারা মনে করেছিল, চীনা ইস্যুতে যত কঠোর হবে এবং করোনা ভাইরাস মহামারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে ঢাকতে তারা চীনের ওপর যত দোষ চাপাবে, ততই তারা ভোটে জিতবে। এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের চীনা নীতিতে বুদবুদ দেখা দিয়েছে, যেখানে এই দুটি দেশের মধ্যকার সম্পর্কে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছেন ট্রাম্প প্রশাসন। সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, আমরা বিশ্বাস করি, ওইসব বুদবুদকে উড়িয়ে দেয়া যেতে পারে। যতটা সম্ভব বাইডেন টিমের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা উচিত বেইজিংয়ের। এর মধ্য দিয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে পুনরুদ্ধার করে যৌথভাবে একটি উচ্চতর কাঙ্খিত স্থানে নিয়ে যাওয়া উচিত। প্রথমত, করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে মেরামত করার প্রচুর সুযোগ রয়েছে। জো বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবেন করোনা ভাইরাস মহামারির বিরুদ্ধে। তিনি আগেই বলেছেন, এই করোনাভাইরাস মহামারিকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে লড়াই করার কোনো বিকল্প নেই। এদিক থেকে ‘চায়নাকে দায়ী’ করা এবং ‘চীনকে জবাবদিহিতায়’ অব্যাহত রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হবে। যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের জন্য তাদের তীব্র সংঘাতময় অবস্থান থেকে সরে এসে প্রত্যাশিত সহযোগিতায় যাওয়া সম্ভব হতে পারে, যখন তারা করোনাভাইরাস মোকাবিলা করবে। এদিক থেকে একে অন্যের সহযোগিতা করার মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কে যে সমস্যা বিরাজ করছে তা নতুন করে মূল্যায়নের পথ সৃষ্টি হবে। দ্বিতীয়ত, প্যারিস জলবায়ুু চুক্তিতে নতুন করে যোগ দেয়ার ইচ্ছা নিশ্চিত করেছেন বাইডেন। জাতিসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ-কে অনুমোদন দিতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সহযোগিতা অপরিহার্য। এটা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সম্পর্ককে বাড়িয়ে তুলবে। তৃতীয়ত, অর্থনীতি ও বাণিজ্যের দিক দিয়ে বাইডেন সম্ভবত ট্রাম্পের সর্বোচ্চ চাপে রাখার নীতি অব্যাহত রাখতে পারেন। গত কয়েক বছরে এমন বেশ জটিল কিছু পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছে, যা তাদের নিজেদের এবং অন্যদেরও ক্ষতি করেছে। বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাতটি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে ব্যর্থ হয়েছে ওয়াশিংটন। পক্ষান্তরে এতে অনেক মার্কিন কোম্পানি প্রকাশ্যে তাদের অসন্তোষের কথা বলেছে। বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে কিছু ব্যবহারিক প্রশাসনিক পরিবর্তন হয়তো কিছু সামঞ্জস্য আনতে পারে। চতুর্থত, ট্রাম্প প্রশাসন এতটাই দূরে গিয়েছে যে, এতে চীনের আস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কোভিড-১৯ মহামারি দেখা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। এ জন্য সেখানে বাচ্চাদের পড়তে পাঠানোর পরিকল্পনা বাদ দিয়েছে অনেক চীনা পরিবার। এর ফলে শিক্ষা ক্ষেত্রে সাপ্লাই ডিমান্ড রিলেশনশিপ ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। তাই চীনা শিক্ষার্থী এবং শিক্ষাবিদদের দমিয়ে রাখা অব্যাহত রাখার জন্য বাইডেনের হাতে খুব বেশি সুযোগ নেই। অবশ্যই মর্যাদার প্রশ্নে অনেক বেশি একগুঁয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টি। কিন্তু দুটি বড় শক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন মূল্যবোধের কারণে কৌশলগত সংঘাত থেকে কমই সরে যাবে। পক্ষান্তরে ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের দিকে আরো বেশি মনোযোগ দেবেন বাইডেন। চীনকে মোকাবিলা করতে যদি এই জোট ব্যবস্থাকে ব্যবহার করতে চায় ওয়াশিংটন, তাহলে তাতে জোটের সঙ্গে তাদের সম্পর্কে উত্তেজনা দেখা দিতে পারে। কারণ, চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্রের অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোটকে শক্তিশালী করার জন্য চীনের সঙ্গে সংঘাতময় অবস্থা তৈরি করতে চায় না।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..