হিংস্র রাষ্ট্র, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও অস্থির মানবতা

কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ আজ মহাসংকটে জর্জরিত। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ আজ রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিকভাবে বিপর্যস্ত। যারা দীর্ঘদিন ধরে এ দেশের শাসন ক্ষমতায় ছিলেন বা আছেন তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ক্ষেত্রে নীতিহীন আদর্শ বাস্তবায়নের ফলশ্রুতিতে আজকের এই মহাসংকট। ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতি’র নামে লুটপাটের বাজারে দেশকে পরিণত করা হয়েছে। শোষণ, বৈষম্য, অভাব-অনটন, নিপীড়ন-বঞ্চনা, রাজনৈতিক সামাজিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। মানুষের মানবিক মূল্যবোধগুলোকে ক্রমান্বয়ে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান ক্রমান্বয়ে নীচের দিকে নেমে এসেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে বেড়েছে ক্ষোভ-হতাশা অসহায়ত্ব। সৃষ্টি হচ্ছে অদৃষ্টবাদ ও রাজনীতির প্রতি চরম বিদ্বেষ। রাজনীতির ক্ষেত্রে লুটপাট, সুবিধাবাদ ও ভোগবাদের প্রভাবই প্রধান। রাষ্ট্র্রে ফ্যাসিবাদী চরিত্র দেশের মানুষকে দিশেহারা করে দিয়েছে। গণতন্ত্রহীনতার লুটপাট, ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ, বিনা বিচারে মানুষ হত্যা, বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর শাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রেখে চলেছে। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য শাসকগোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে আপস করছে এবং পৃষ্টপোষকতা দিচ্ছে। সমাজে ধর্মান্ধতার বাতাবরণ তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে কতক ঘটনায় তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। মিথ্যা প্রচার দিয়ে মানুষকে পিটিয়ে এবং পুড়িয়ে মারা হয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ লুটপাট-ধারাবাহিকভাবে চলছে। আদিবাসী-পাহাড়িদের উপরও অত্যাচার নিপীড়ন চলছে। সাম্প্রদায়িক শক্তির তাণ্ডব এদেশের মানুষ বারংবার প্রত্যক্ষ করছে। এই শক্তি যুক্তি-তর্কের কোনো তোয়াক্কাই করছে না। রাষ্ট্র মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। বরং এই ধর্মান্ধ শক্তির সাথে সুর মিলিয়ে চলছে। এদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ সাম্প্রদায়িক নয়, এটাই ছিল এই ভূখণ্ডের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। লুটেরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে এই ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে দিয়েছে। লুটেরা ধনিকগোষ্ঠী তাদের স্বার্থে সাম্প্রদায়িকতাকে ব্যবহার করেছে। দ্বি-জাতি তত্ত্বে ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী শুধু দেশভাগ করেই থেমে থাকেনি সাম্প্রদায়িকতার বীজও বুনে দিয়ে গিয়েছিল। এর বিরুদ্ধে এদেশের অসাম্প্রদায়িক বামপন্থি দেশপ্রেমিক মানুষ লড়াই-সংগ্রাম করেছিল। পাকিস্তানের ‘২৪ বছর’ ধারাবাহিকভাবে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লড়াই এবং কৃষক শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই পাশাপাশি ছিল বলেই ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে এই শক্তিকে সাময়িক সময়ের জন্য রুখে দেয়া গিয়েছিল। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই এবং শ্রেণিসংগ্রাম সমান্তরালভাবে না থাকার কারণে আজকে দেশে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শুধু এই সব ক্ষেত্রেই নয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন দুঃসহ হয়ে উঠেছে। জীবনের নিরাপত্তা নেই। নারী ধর্ষণ-নির্যাতন প্রতিনিয়ত ঘটে চলছে। বর্তমান সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় এটা ব্যাপকতা লাভ করেছে। ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিকলীগ, আজকে ‘ধর্ষক লীগে’ পরিণত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা যাদের দায়িত্ব সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দেয়া তারাই আজকে এই ধরনের ঘটনায় জড়িত হয়ে পড়েছে এবং বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। প্রচলিত আইনের দুর্বলতা এবং বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা বা বিচারহীনতার কারণেও এর তীব্রতা বেড়েছে। বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, লুটেরা ধনিকগোষ্ঠী, সামরিক-বেসামরিক আমলা এবং প্রতিবেশী দেশের উপর ভর করে ক্ষমতায় টিকে আছে। ফলশ্রুতিতে যা হবার তাই হচ্ছে। সরকার যাদের উপর নির্ভরশীল তারাই আজকে বাংলাদেশের সমাজ অর্থনীতি, রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের সংগ্রাম হলেই বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে তখন প্রায়শ বলা হয় ‘ষড়যন্ত্র চলছে’। ‘ষড়যন্ত্র’ শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা লুটপাট, অনিয়ম দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামে যারা অংশগ্রহণ করে তাদের দ্বারা সৃষ্টি হয় না। ‘ষড়যন্ত্র’ তত্ত্বটি লুটেরা ধনিক শাসকগোষ্ঠীর সৃষ্টি- এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। ‘ষড়যন্ত্রের’ রাজনীতি করে তারাই যারা জনগণের ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল নয়। তাই দেখা যায় বর্তমান সময়ে নারী ধর্ষণ-নির্যাতন, ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির তা-বে বিনা বিচারে মানুষ গুম, হত্যা, লুটপাট, দুর্নীতি, শোষণ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ইত্যাদির যারা ধারক-বাহক পৃষ্ঠপোষক তারাই ‘ষড়যন্ত্র’ করছে এটা সুস্পষ্ট এবং প্রমাণিত। এছাড়া ভূ-রাজনীতির কারণে বিদেশি ‘ষড়যন্ত্র’ তো আছেই। ভারত-বাংলাদেশ, চীন-বাংলাদেশ, ভারত-আমেরিকা সম্পর্কও আমাদের দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি সমাজকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। আমাদের সরকার এবং শাসকগোষ্ঠীও এ ‘ষড়যন্ত্রের’ ফাঁদে পা দিচ্ছে। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান হলে ভারতের ধর্মান্ধ মৌলবাদী শক্তির উত্থানও ঘটে এটাতো দিবালোকের মত স্পষ্ট। সামাজিকভাবে বলা যায় লুটেরা ধনিকগোষ্ঠীর শাসন শোষণের ফলশ্রুতিতেই আমাদের দেশে এই মহাসঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে। এই মহাসংকট থেকে উত্তরণের পথ কি? পথ আমাদের জানা আছে। সে পথেই আমাদের অগ্রসর হতে হবে। লুটেরা ধনিকগোষ্ঠী, সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে গণতন্ত্র ও শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং বর্তমান সরকারের ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই সমান্তরালভাবে চালাতে হবে। এজন্য দেশের শ্রমজীবী মেহনতি সাধারণ মানুষ, বামপন্থি, কমিউনিস্ট, দেশপ্রেমিক, প্রগতিশীল শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। সে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় জীবনের সংকট এবং শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের মুক্তির সংগ্রাম তথা মুক্ত মানবের মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে বেগবান করার মধ্য দিয়ে এই শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব। এছাড়াও আমাদের এই ঘুনে ধরা অবক্ষয়ের সমাজের কুসংস্কার, পশ্চাদপদতা, কুপমু-ুকতার বিরুদ্ধেও সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার বিষয়টিতেও জোর দিতে হবে। আদর্শের প্রতি অবিচল দৃঢ় এমন সংগঠন গড়ে তোলার ভেতর দিয়েই এই সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে। সংগঠনের শক্তি বাড়লে রাজনীতিতে শক্তি বাড়বে আর রাজনীতি নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারলে হিংস্র রাষ্ট্র ব্যবস্থা, ‘ষড়যন্ত্রের’ তত্ত্ব এবং সমাজ জীবনের যে অস্থিরতা বিরাজমান তাও দূর করা যাবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..