আর কত...

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
সুমাইয়া সেতু : আদিবাসী তরুণীটি তার বাবা-মায়ের কাঁধে ভর করে ফিরছে, রক্তাক্ত তার জামা। এই ছবিটি একটি ট্রমার মধ্যে নিয়ে যাবে যে কোনো বিবেকবান মানুষকে। ঠিক সেই রেশ কাটতে না কাটতেই শোনা যায় স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনা। তার পরে সেই ভিডিও চিত্র, যা দেখে ওঠে দাঁড়ানোর সাহস আমার সত্যিই হয়নি। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নারীকে বিবস্ত্র করে শ্লীলতাহানির ঘটনা ও সেই ঘটনার ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে, এ রকম হাজারো ঘটনা আমাদের সমাজে প্রতিদিন ঘটছে। ঘটনার বর্ণনাগুলো ৭১ এর শোনা কাহিনীকেও হার মানায়। যেই প্রতিবাদগুলো উঠে আসে তা মোট ঘটে যাওয়া ঘটনার তুলনায় অতি নগন্য। প্রতিবছর ক্রমাগত হারে ধর্ষণের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আইন ও শালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুসারে ২০১৮-২০১৯ এ ধর্ষণ বেড়েছে দ্বিগুণ, আর ২০২০ এ এই সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে কয়েকগুণ। বেগমগঞ্জের ঘটনার পর স্বতঃফূর্তভাবে বাম প্রগতিশীল সংগঠন ও সাধারণ ছাত্ররা নেমে আসে রাস্তায়, স্লোগানে স্লোগানে আবারো মুখরিত হয় শাহবাগ, শুধু শাহবাগ নয় সারাদেশেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়কালে একটা প্রশ্ন খুব বেশি উঠতে দেখা যায়, প্রশ্নটা মূলত ক্ষমতাসীন দলের লোকদের থেকেই উঠে আসে। তারা জানতে চায়, আমরা কেন যেকোনো আন্দোলনে শেখ হাসিনাকে টেনে নিয়ে আসি। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, এই রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ বলে সরকারি সত্তার বাইরে আদৌ কি কোনো সত্তা বিদ্যমান? যেখানে প্রতিটা বিচারের জন্য মাননীয়ার আদেশের অপেক্ষায় থাকে বিচার বিভাগ, সেখানে এই বিচারহীনতার দায় কার? আমরা বলতে চাই, এই দায় শেখ হাসিনা ও তার বাহিনীর। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি, প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনায় ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ জড়িত, এখানে বুঝতে হবে ক্ষমতা ও তার প্রয়োগ। ক্ষমতার দম্ভে এই মানুষগুলো কোনো অন্যায় কাজেই আর ভয় পাই না, তারা ভয় পায় না প্রশাসনকেও। কারণ এই দেশে ক্যান্টনমেন্টের মতো জায়গায় তনু ধর্ষিত হয়, ধর্ষিত হয় আদিবাসী নারী এই জলপাই পোশাকের বাহিনী দ্বারা। ধর্ষণবিরোধী চলমান আন্দোলনের মাঝেই আমরা জানতে পারি কক্সবাজারের টেকনাফের একটি চেক পোষ্টে এনজিও কর্মী ধর্ষিত হয়- তাহলে বুঝতে হবে রক্ষকেরাই আজ ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। যদি ধর্ষণের সামাজিক কারণগুলোর দিকে তাকাই দেখবো এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী সর্বত্র পণ্য। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বড় বড় বিলবোর্ডে নারীকে প্রদর্শন করা হয় পণ্যের মোড়োকে। অপরদিকে পর্ণোগ্রাফি ও মাদক সমাজে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। আইন থাকলেও নেই তার প্রয়োগ এবং সর্বক্ষেত্রে নারীর চরিত্রের দিকেই তোলা হয় আঙুল। আমরা যখন আন্দোলনে নামি লক্ষ করবেন সেখানেও আন্দোলনকারী নারী কর্মীদের চরিত্র নিয়ে নানান কাহিনি রচনা করা হয়, এবারের আন্দোলনেও আমরা তাই দেখতে পেলাম। আরেকটি বিষয় ও বর্তমানে লক্ষ্য করা যায় যে আন্দোলন দানা বাঁধতে যেমন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভূমিকা রাখে তেমনি বিভিন্ন পোস্টার, ছবি, ভিডিও এডিটিংয়ের মাধ্যমে আন্দোলন নষ্ট করার বা বিভ্রান্তি ছড়ানোকে প্রধান অস্ত্র সেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেই বেছে নেই ক্ষমতাসীন দলের লোকজন। চলমান ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে আমরা এ সকল বিষয় লক্ষ করেছি। একটা দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় বসে থেকে এই মহাজোট সরকার একধরনের ভয়ের রাজনীতি কায়েম করেছে, এখানে মানুষ কথা বললে, কবি কবিতা লিখলে, শিল্পী ছবি আকলেও আইসিটি আইনে তাকে জেলে পুরে রাখা হয়। অপরদিকে ধর্ষক’রা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেরায়। ন্যায়সঙ্গত প্রতিটি আন্দোলনে একদিকে হামলা করে পুলিশ বাহিনী অন্যদিকে হামলা করে ছাত্রলীগের গুন্ডাবাহিনী এটা স্পষ্টতই বোঝা যায় এই সমাজ থেকে ধর্ষণ মুছে দিলে ক্ষতিটা আসলে কাদের। চলমান ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে ৯টি দাবি উঠে এসেছে, এর মধ্যে কয়েকটি দাবি সকল মহলের কাছে প্রশংসিত এবং বলা যায় সকলের দাবি, আমাদের সমাজ বাস্তবতায় ধর্ষিতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় যেতে ভয় পাই কারণ সে জানে বিচারিক প্রক্রিয়ায় আরো কয়েক দফায় তাকে মানুষিক ধর্ষণের শিকার হতে হবে। বিচারকার্য সহজ করতে ১৮৭২-১৫৫(৪) ধারাকে বিলোপ করে ডিএনএ আইনকে সাক্ষ্য প্রমাণে কার্যকর করতে হবে। ধর্ষকের শাস্তি কাগজে কলমে লিখে দিয়ে এই অপরাধ দমন সম্ভব নয়, আমরা বলতে চাই পাঠ্যপুস্তকে নারীর প্রতি অবমাননাকর লেখা রাখা যাবে না। ওয়াজ-মাহফিল, সাহিত্য, নাটক, সিনেমা বা বিজ্ঞাপনে নারীকে পণ্য হিসাবে উপস্থাপন বন্ধ করতে হবে। পর্ণোগ্রাফি ও মাদক বন্ধ না হলে ধর্ষণ নির্মূল সম্ভব না। সমাজে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনায় অল্প টাকা বা সামান্য শাস্তির মাধ্যমে মীমাংসা করে দেয়া সালিশি প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে, সর্বোপরি ভিকটিমকে সকল ধরনের নিপীড়নের হাত থেকে রক্ষা করতে না পারলে ধর্ষণের ঘটনা উঠে আসবে না। আর বিগত সময়ে এ সকল বিষয়গুলো দায়িত্বশীলতার সাথে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় ছাত্রসমাজ এই ‘ব্যর্থ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর’ পদত্যাগের দাবি জানিয়েছে। আমরা জানি, একদিকে যাদের নিরাপত্তা দেয়ার কথা তারাই ধর্ষক আর অপরদিকে এই সরকার নিজের গদি টিকিয়ে রাখতে সন্ত্রাসী লালন-পালন-পোষণ করছে, আর এক শ্রেনীর মানুষ ধর্ষণে নারীর পোশাকের দোষ খুঁজে বেরাচ্ছে। তাই এই লড়াইটা অনেক কঠিন। আমাদেরকে লড়ে যেতে হবে প্রাণপণে। পরিশেষে এটাই বলা যায়, রক্তাক্ত ধর্ষিতার রক্তের শপথে, আমরা জনগণের শক্তি নিয়ে, ন্যায্যতার শক্তি নিয়ে রাজপথে ছিলাম, আছি, থাকবো। ইতিহাস এই সাক্ষ্য দেয়- রাজপথই মুক্তি আনে। লেখক: সহ-সাধারণ সম্পাদক, ছাত্র ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..