বিচারহীনতার সংস্কৃতি

শরিফ উল আনোয়ার সজ্জন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন থেকেই বিচ্ছিন্নভাবে ধর্ষণ ও নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। সর্বশেষ ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী দ্বারা সিলেটের এমসি কলেজ হোস্টেলে ধর্ষণ এবং নোয়াখালীর এখলাসপুরে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নিপীড়নের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলে আসার পর সারাদেশ বিক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে। ৫ অক্টোবর ‘ধর্ষণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’ ব্যানারে ছাত্র ইউনিয়নসহ দেশের প্রগতিশীল ছাত্র-যুব-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো শাহবাগে গণ অবস্থানের ডাক দেয়। একই সাথে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ শুরু হয়। ৬ অক্টোবর ধর্ষণ-নিপীড়নের বিচার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে কালো পতাকা মিছিলে পুলিশের লাঠিচার্জে আন্দোলনকারীরা আহত হলে আন্দোলন তীব্রতর হয়ে হঠে। প্রগতিশীল ছাত্র-যুব-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো একত্রিত হয়ে ‘ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’ ব্যানারে আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে থাকে। পূর্বের ধর্ষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে যে আন্দোলনগুলো হয়েছিল তার প্রায় সবগুলোই ছিল নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার বিচারের দাবিতে। এবারের আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার বিচারের চাইতে সামগ্রিক বিচারহীনতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার সংশোধনের দাবি। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন কাঠামো কোনভাবেই ধর্ষণ-নিপীড়নের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত চার বছরে দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণ-সংক্রান্ত ১৭ হাজার ২৮৯টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ভিকটিমের সংখ্যা ১৭ হাজার ৩৮৯ জন। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৮৬১ জন নারী ও ৩ হাজার ৫২৮ জন শিশু। এসময়ে ৩ হাজার ৪৩০ টি ধর্ষণ মামলার বিচার শেষ হয়েছে। নিষ্পত্তি হওয়া মামলায় ১৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ৮০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ৫৭৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজাসহ ৬৭৩ জনকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। ধর্ষণের শিকার মেয়েদের সারাদেশে ৮টি ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের মাধ্যমে কাউন্সিলিং, পুলিশি ও আইনি সহায্য দেয়া হয়। ২০০১ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠিত এসব কেন্দ্র থেকে ৪ হাজার ৩৪১টি যৌন নির্যাতনের মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ৫৭৮টি বিচার হয়েছে এবং সাজা হয়েছে মাত্র ৬৪টি ঘটনার। মোট মামলার মাত্র ২-৩ শতাংশ মামলার বিচারে শাস্তি হয়েছে। সারাদেশে যে পরিমাণ নারী ধর্ষণ ও নিপীড়নের শিকার হয়, সামাজিক ও প্রশাসনিক হেনেস্তার ভয়ে অধিকাংশ নারী বিচারিক প্রক্রিয়ার যেতে চায় না। ঔপনিবেশিক আমলের আইন কাঠামো এক্ষেত্রে সবচাইতে বড় অন্তরায়। আন্দোলনকারীরা যে ৯ দফা দাবি উত্থাপন করেছে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দাবি ‘ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য আইন ১৮৭২-১৫৫ (৪) ধারা বিলোপ করতে হবে এবং মামলার ডিএনএ আইনকে সাক্ষ্য-প্রমাণের ক্ষেত্রে কার্যকর করতে হবে’। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর অধীনে ‘নারী একটি বিশেষ যৌনক্রিয়ায় একটি বিশেষ পুরুষের সাথে যৌনতায় সম্মত ছিলেন, কি ছিলেন না’ ধর্ষণের এই সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞায়ন থাকা সত্ত্বেও ভিকটিমকে সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ (৪) ধারার কারণেই ধর্ষণ মামলা দায়ের করতে গেলে ‘নৈতিক চরিত্রের’ পরীক্ষা দিতে হয়। নৈতিক চরিত্রের পরীক্ষা শেষে নারীটি আদৌ মামলা করার জন্য উপযুক্ত কি না, এই বোঝাপড়া বিচারালয়ে প্রমাণিত হয়। আইনিভাবে ধর্ষণ কী, সেটি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও ধর্ষণ মামলায় যখন ভিকটিমের অতীত ‘চরিত্র’, আগেকার যৌন সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়, তখন এটি নারীবিদ্বেষী, সর্বোপরি সংবিধানবিরোধী একটি দ্বৈত আইনব্যবস্থা কায়েম করে। ধর্ষণ যতটা না নারীর প্রতি সহিংসতা, যতটা না নারীর শরীরের প্রতি সহিংসতা, যতটা না নারীর প্রতি কৃত অপরাধ, তার চেয়েও বেশি ধর্ষণকে নৈতিকতা, পবিত্রতা, সম্মান, সম্ভ্রম, সতীত্বের কাঠামোর মধ্যে দেখা হয়। এই বাস্তবতায় ধর্ষণ মামলাগুলো প্রায়ই ভিকটিমের ‘চরিত্রহরণের’ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। গুরুত্বপূর্ণ হলো, অপরাপর আর কোনো মামলার ধরনেই সাক্ষ্য এত জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে না, যতটা একজন সাক্ষী সাক্ষ্য আইনের মারফত ধর্ষণ মামলার ভিকটিমের চরিত্র-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রভাব ফেলতে পারে। ভিকটিমের বিগত যৌন ইতিহাস নিয়ে কথোপকথন ও জিজ্ঞাসাবাদের সংস্কৃতি চালু থাকার দরুণ শতকরা ৯০ ভাগ মেয়ে শিশু ও নারী ধর্ষণ মামলার অভিযোগ আনতে ভয় পান। কেউ কেউ মামলা মাঝপথে বন্ধ করে দেন। অনেক সময় আসামিপক্ষের উকিলের জেরায় ভিকটিম নারী মানসিক, সামাজিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন, এমনকি আত্মহননের পথ বেছে নেন। ফলে ধর্ষণের অভিযোগ বিচারের বাইরে রয়ে যায়। এদেশে নারী ধর্ষণ-নিপীড়নের ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এবং সামাজিক মূল্যবোধের সংকটও অনেকটা দায়ী। আন্দোলনের ৯ দফা দাবিতে বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে নীচের তিনটি দাবি পূরণ হওয়া বেশ গুরুত্বপূর্ণ * ধর্মীয়সহ সব ধরনের সভা-সমাবেশে নারীবিরোধী বক্তব্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে। সাহিত্য, নাটক, সিনেমা, বিজ্ঞাপনে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন বন্ধ করতে হবে। পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণে বিটিআরসির কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক চর্চায় সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। * পাঠ্যপুস্তকে নারীর প্রতি অবমাননা ও বৈষম্যমূলক যে কোনো প্রবন্ধ, নিবন্ধ, পরিচ্ছেদ, ছবি, নির্দেশনা ও শব্দ চয়ন পরিহার করতে হবে। * গ্রামীণ সালিশের মাধ্যমে ধর্ষণের অভিযোগ ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে। ধর্ষণ ও নারী নিপীড়ন বন্ধ করার জন্য যেমন আইন সংশোধন করে তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে তেমনি সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করতে হবে। ধর্ষণের বিরুদ্ধে সচেতনতা, প্রতিবাদ, আওয়াজ তাই জোরেশোরেই হোক। রাষ্ট্র ধর্ষণ রোধে করণীয় স্থির করুক, সক্রিয় হোক। অপরাধীদের বিচার হোক, বিচারের মধ্য দিয়ে দৃষ্টান্তমূলক সাজা হোক। লেখক: সহ-সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..