ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী বিপ্লবী পার্টি গড়ার প্রত্যয়

ডা. মনোজ দাশ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
কমিউনিস্ট পার্টিকে জনগণের আস্থাভাজন ঐক্যবদ্ধ গণভিত্তিসম্পন্ন বিপ্লবী পার্টি হিসেবে গড়ে তোলার ডাক দিয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটি। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার মাধ্যমে পার্টির শ্রেণিভিত্তিকে আরও প্রসারিত ও মজবুত করার সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করেছে কেন্দ্রীয় কমিটি। শ্রমজীবী মানুষসহ ব্যাপক জনগণের শ্রেণিগত ও অন্যান্য ন্যায্য দাবির ভিত্তিতে পরিচালিত শ্রেণিসংগ্রাম ও গণসংগ্রামের ধারায় তাদের সচেতন ও সংগঠিত করে রাজনীতি ও সমাজে বর্তমান শাসকশ্রেণির আধিপত্য খর্ব করে রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের যোগ্যতাসম্পন্ন বাম-প্রগতিশীল-গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তি সমাবেশ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা আরও জোরদার করবে পার্টি। একই সাথে শ্রেণিসংগ্রাম ও গণসংগ্রামের এই প্রক্রিয়ায় পার্টি শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের সেরা ও অগ্রণী লোকদের পার্টিতে টেনে আনবে এবং এই প্রক্রিয়ায় পার্টি শ্রমিক ও অন্যান্য মেহনতি মানুষের অগ্রবাহিনীর ভূমিকা পালন করবে ও নিজের পেছনে গোটা মেহনতি শ্রেণিকে একত্রিত করতে সক্ষম হবে। এসব কাজদক্ষতা ও দ্রুততার সাথে করার জন্য গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার মূলনীতির ভিত্তিতে পার্টি সবধরনের প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে বিরামহীন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। পার্টি সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক এবং পার্টির গোটা অভ্যন্তরীণ জীবন এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে পার্টি হয়ে ওঠে অখণ্ড ও একশিলাভূত; যাতে উদ্দীপ্ত হয় পার্টি সদস্যদের রাজনৈতিক সক্রিয়তা যা মেহনতি মানুষের অগ্রবাহিনীর কর্তব্য ও চরিত্রের সাথে তা খাপ খায়। কমিউনিস্টদের সমগ্র জীবনধারা ও ক্রিয়াকলাপ পরিচালনার অক্ষদণ্ড হল গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা। যার মধ্যে পার্টি সদস্যদের ব্যক্তিগত উদ্যোগের সাথে মেলানো হয় অধিকাংশের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা, কঠোর শৃঙ্খলা এবং উচ্চতর সংগঠনের নিকট নিম্নতর সংগঠনের অধীনতা। ‘সংগঠনের অভ্যন্তরে পার্টি যেমন গঠনতন্ত্রের নির্দিষ্টভাবে বিধি-বিধান অনুসারে গণতন্ত্রের চর্চা ও প্রয়োগ, চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং শ্রেণি ও আদর্শগত ভিত্তি অক্ষুণ্ন রেখে পার্টির অভ্যন্তরে মতবৈচিত্র্যের সুযোগ এবং পার্টির নীতি প্রণয়ন ও কার্যকলাপ পরিচালনায় পার্টি সদস্যদের ও সকল স্তরের সংগঠনের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও ভূমিকা নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হবে, ঠিক তেমনি পার্টিতে কোনও শৃঙ্খলাবিরোধী কাজ, উপদল, দলাদলির প্রবণতা প্রভৃতির বিরুদ্ধে কঠোর থাকবে।’ পার্টি এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন যে, গণতান্ত্রিক পথে ছাড়া পার্টির সাধারণ অভিপ্রায় গড়ে উঠতে পারে না। পার্টির মূল লক্ষ্য ও স্বার্থের সাথে সবাই একমত হলেও সুনির্দিষ্ট প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুরোপুরি মতৈক্য নাও হতে পারে। কিন্তু কোন প্রশ্নের আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর সমস্ত সদস্যের কাজ করতে হবে গৃহিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। পার্টি শৃঙ্খলা প্রত্যেক পার্টি সদস্যের মতপ্রকাশের অধিকারের যেমন স্বীকৃতি দেয়, তেমনি পার্টি শৃঙ্খলা প্রত্যেক সদস্যের কাছে দাবি করে ‘আলোচনার পর গৃহিত সিদ্ধান্ত প্রত্যেক সদস্যকে মেনে চলতেই হবে।’ স্তালিন ‘লেনিনবাদের ভিত্তি’ নামক রচনায় লিখেছেন-‘সমস্ত পার্টি সদস্যদের মধ্যে ইচ্ছার ঐক্য ও কার্যক্ষেত্রে ঐক্য না থাকলে পার্টিতে শৃঙ্খলার কথা ভাবা যায় না। এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে পার্টির মধ্যে বিভিন্ন মতের বিতর্কের সম্ভাবনা থাকবে না। বরং কঠোর শৃঙ্খলার জন্য পার্টিতে সমালোচনা এবং বিভিন্ন মতের মধ্যে ঘাত-প্রতিঘাতের স্থান থাকা অবশ্য প্রয়োজন। শৃঙ্খলার অর্থ মোটেই অন্ধ আনুগত্য নয়। একমাত্র সচেতন শৃঙ্খলাবোধই সত্যিকারের বিপ্লবী শৃঙ্খলার জন্ম দিতে পারে।’ আর লেনিন তাঁর ‘বামপন্থি কমিউনিজম’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন–‘এসব শৃঙ্খলা বজায় রাখা, তাকে সুদৃঢ় করা এবং তার পরীক্ষা হয় শ্রেণি সচেতনতা, বিপ্লব নিষ্ঠা, অধ্যবসায়, আত্মত্যাগ ও বীরত্বের দ্বারা...। এসব শৃঙ্খলা বজায় রাখা তাকে সুদৃঢ় করা এবং তার পরীক্ষা নির্ভর করে শ্রমজীবী জনগণের ব্যাপকতম অংশের সাথে কতটা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ পার্টি সদস্যরা রাখতে সক্ষম হন, কতটা তাদের সাথে মিশে যেতে পারেন তার ওপর।’ পার্টির মধ্যে সমালোচনা-আত্মসমালোচনার মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে যে যৌথ সিদ্ধান্ত ও জ্ঞান গড়ে ওঠে, সেই যৌথ সিদ্ধান্ত ও জ্ঞানই পার্টিতে যৌথ নেতৃত্বের ভিত্তি তৈরি করে। কমিউনিস্ট পার্টির সমস্ত ধাপে ও সব মাত্রায় যৌথ নেতৃত্ব একটা আইন। যৌথ নেতেৃত্বের নীতি পালনের অর্থ হচ্ছে, পার্টি পলিসি রচনা ও অনুসরণে পার্টি সদস্যদের অংশগ্রহণ, সমালোচনা-আত্মসমালোচনার বিকাশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরে প্রত্যেক পার্টি সদস্যের তা বাস্তবায়নের জন্য ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা ও সক্রিয়তা বৃদ্ধি। এটাই পার্টির মতাদর্শীয় ও সাংগঠনিক ঐক্য গড়ে তোলে, পার্টির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের সর্বাঙ্গীণ বিকাশ নিশ্চিত করে। এবং সেই ভিত্তিতে এটি পার্টির সক্রিয়তা এবং জনগণের সাথে সংযোগ সুদৃঢ় করার অপরিবর্তনীয় শর্ত তৈরি করে। এজন্য প্রত্যেক পার্টি সদস্যকে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে মতাদর্শিক ও বাস্তব জীবনের সংগ্রামের মধ্যদিয়ে কমিউনিস্ট যৌথবাদী নৈতিকতা অর্জন করতে হয়। এবং দৃষ্টান্ত স্থাপন ও অব্যাহত প্রচেষ্টার মাধ্যমে কমিউনিস্ট যৌথবাদী প্রচেষ্টার দিকে মানুষকে টেনে আনতে হয়। আমাদের সঠিক রণনীতি-রণকৌশল আছে। কিন্তু সঠিক লাইন থাকলেই সাফল্য আপনা-আপনি এসে ধরা দেয় না। প্রথমত সাফল্য নির্ভর করে আন্তরিকভাবে রণনীতি-রণকৌশলকে লক্ষ্য অভিমুখীভাবে সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ ও প্রয়োগের ক্ষমতার ওপরে। দ্বিতীয়ত যারা পার্টি লাইন কার্যকর করবে সে সব কর্মী বাছাই করার ওপর, তাদের যথাযথভাবে শিক্ষিত করে তোলার ওপর। বাছাইকৃত পার্টি ক্যাডারদের লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থেকে পার্টির লাইনকে সৃষ্টিশীলভাবে জনগণের মধ্যে নিয়ে যেতে হয়। নিজে শৃঙ্খলা মানতে হয়, একই সাথে শ্রেণিশত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামে এবং কমিউনিস্ট ধারা হতে পার্টির সবধরনের বিচ্যুতির বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম পরিচালনায় সক্ষম হয়ে উঠতে হয়। সক্রিয়-পরিশ্রমী-নিঃস্বার্থ হয়ে ওঠার পাশাপাশি স্বাধীনভাবে কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। পার্টিকে ক্যাডার বাছাই ও তাদের গড়ে তুলে, তাদের মাধ্যমে ধারাবাহিক বিপ্লবী কর্মকাণ্ড তথা বাস্তব জীবনের আন্দোলন সংগ্রাম ও বৈচিত্র্যময় কাজকর্ম পরিচালনার মধ্যদিয়ে গণভিত্তি সম্পন্ন বিপ্লবী পার্টি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা জোরদার করবে। ‘জনসমুদ্রে আমরা বারি বিন্দুর মত। জনগণকে আমরা তখনই পরিচালনা করতে পারি যখন তাদের প্রাথমিক সচেতনতার সাথে সংগতিপূর্ণরূপে কথায়-লেখায়-আচরণে-সংগ্রামে আমাদের অভিব্যক্তি প্রকাশ পায়।’ জনগণের উপলব্ধির সাথে সংগতিপূর্ণ অভিব্যক্তিই তাদের সাথে পার্টির সম্পর্ক স্থাপনের মৌলিক সূত্র। পার্টির জমায়েত বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে জনগণের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপনের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করার ওপর পার্টি গুরুত্ব আরোপ করেছে। শুধুমাত্র নিরলস ধারাবাহিক কাজের মাধ্যমেই জনগণের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব। জনগণের সাথে থাকলেই হবে না জণগণের সামনে থাকতে হবে। জনগণের কাছ থেকে শিখতে হবে এবং জনগণকে শিক্ষিত করতে হবে। মেহনতি জনগণের সাথে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনের জন্য পার্টিকে সবধরনের সংগ্রামে পারদর্শি হতে হবে। জমায়েত বাড়াবার বিষয়গত প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য জেলা-উপজেলা পযায়ে সঠিক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে। নেতৃত্বের বিষয়ীগত গুণাবলি বিষয়গত প্রয়োজনের সাথে সংগতিপূর্ণ হতে হবে। এই নেতৃত্ব নির্বাচন লেনিনীয় পার্টিতে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। লেনিন নেতৃত্ব নির্বাচনের সময় উচ্চ মার্কসবাদী মতাদর্শগত অবস্থান, কমিউনিস্ট নৈতিক মানদণ্ড, পার্টির শ্রেণিভিত্তিকে রক্ষায় সামর্থতা, সুনির্দিষ্ট কাজ গঠনমূলক-শৃঙ্খলা ও ক্ষিপ্রতার সাথে করার সামর্থ, সূচনাকারীর ভূমিকা রাখার মানসিকতা এবং লক্ষ্য অভিমুখীনতাসহ নেতৃত্বের আরও কয়েকটি বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। কিন্তু মতাদর্শগত কাজ ও সংগ্রাম ছাড়া কোনোকিছুই অর্জন করা সম্ভব নয়। এজন্য কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় পার্টির মতাদর্শগত কাজ ও সংগ্রামের ওপর আরো গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। প্রথমত পার্টির মধ্যে মতাদর্শগত কাজ ও সংগ্রাম থাকা দরকার। অব্যাহত মতাদর্শগত কাজ ছাড়া পার্টির মধ্যে যে বুর্জোয়া চিন্তা-চেতনা থাকে তাকে মার্কসবাদী চিন্তা চেতনা দিয়ে নাকচ করে জীবনের সব ক্ষেত্রে সর্বহারা শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করা সম্ভব নয়। পার্টির বিপ্লবী ঐক্যগড়ে তোলার জন্য এবং বিপ্লবী প্রক্রিয়াকে নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা গড়ে তোলার জন্যও ধারাবাহিকভাবে তত্ত্বগত শিক্ষার কাজ পরিচালনা করা দরকার। শুধুমাত্র রাজনীতি-অর্থনীতি সম্পর্কে ধারণাটা মার্কসবাদী মতাদর্শের সাথে সংগতিপূর্ণ হলেই চলে না। একই সাথে সংস্কৃতিগত দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণের ক্ষেত্রে পার্টি নেতা ও কর্মীদের বুর্জোয়া সংস্কৃতিকে প্রত্যাখ্যান করে উন্নততর সর্বহারার সংস্কৃতি ও নৈতিক মান অর্জন করা দরকার। দ্বিতীয়ত পার্টির মধ্যে মতাদর্শগত কাজ পরিচালনা করাই যথেষ্ট নয়। মার্কসীয় মতাদর্শকে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে প্রসারিত করতে না পারলে তাদের বিপ্লবী সংগ্রামের মধ্যে টেনে আনা যায় না। তৃতীয়ত শুধুমাত্র পার্টি ও জনগণের মধ্যে মতাদর্শগত শিক্ষার কাজ পরিচালনা করলেই হবে না। মতাদর্শগত কাজকে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য সব ধরণের মার্কসবাদবিরোধী মতাদর্শের বিরুদ্ধে বিরামহীন সংগ্রাম পরিচালনা করা দরকার। কিন্তু মার্কসবাদবিরোধী অবৈজ্ঞানিক আদর্শের বিরুদ্ধে বৌদ্ধিক সংগ্রাম পরিচালনা করাই মতাদর্শিক সংগ্রামের একমাত্র লক্ষ্য নয়। পার্টির ঐতিহাসিক লক্ষ্যকে আরও স্পষ্ট ও শক্তিশালী করা এবং দেশ ও বিশ্বঘটনাবলি থেকে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জ ও মতাদর্শগত সমস্যাগুলি মোকাবিলা করার জন্য মার্কসের দ্বান্দ্বিকতার ওপর দাঁড়িয়ে জীবন ও জগত সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ হাজির করাও মতাদর্শিক কাজ ও সংগ্রামের লক্ষ্য। এভাবে মার্কসীয় মতাদর্শগত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে, শ্রেণিসংগ্রাম ও গণসংগ্রামের ধারায় পার্টির শ্রেণিভিত্তিকে প্রসারিত করে এবং গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার মূলনীতির ভিত্তিতে বিপ্লবী ধারার ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলেই পার্টি তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে সক্ষম হয়ে উঠবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..