কবির পরিচয়নামা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
এই যে করোনাকাল, এই মহামারিকাল কতটা কঠিন হয়ে এল? কতটা ঘুম ভাঙাল? মানুষের ঘুম ভাঙতে তো উপলক্ষ লাগে, একটা লাল মোরগের ডাকাডাকি লাগে, লাগে নারকেল পাতার ফাঁক গলে ঢুকে পড়া রোদের গান, জঙ্গলের, মাটির, ঘাসের আর হাওয়ার ঐকতান লাগে। কতটা ঘুম ভাঙল মানুষের? সে প্রশ্নের আগেই অবশ্য আছে আরও আরও বোঝাপড়ার ভার। সে বোঝাপড়া কি হলো কিছু? এই করোনাকাল, এই বন্দী দশা, এই হা-হুতাশের কাল, কলে কলে লে-অফের এই কাল বলে দিচ্ছে রোদের গান স্তব্ধ করে, জঙ্গল, মাটি, ঘাস আর হাওয়ার ঐকতান ভেঙে দিয়ে, চিরে ফেলে লাল মোরগের গলা সে আদতে কোথাও যেতে পারেনি। যাওয়া যায় না। একা একা কে যাবে কোথায়? পিঁপড়াদের সারি তো পায়ে পায়েই চলে, মানুষ তো হাঁটে চিলের ছায়ার নিচেই। এই পিঁপড়াকে পিষে দিয়ে, সেই চিলের আকাশ ঢেকে দিলে কমজোরি মানুষ তো হবেই হাওয়ায় উধাও। এই কথাটা জঙ্গলে ঢুকে পড়া, নদী গিলে পেট ফোলানো মানুষ একটু হলেও কি বুঝেছে? অনেকে তো বলছে এখানে-ওখানে এমন বহু কথা, কিন্তু বোধে নিতে পারছে কি? অথচ এটাই বোধে নেওয়া জরুরি, যার কথা একজন কফিল আহমেদ বলছেন বহুদিন ধরে, নানা আঙ্গিকে, নানা ভাবে। কফিল আহমেদ কে? একজন কবি? একজন শিল্পী? একজন অ্যাকটিভিস্ট? কফিল আহমেদ এই সবই। আবার এই সব অভিধাকেই খুব অনুচ্চারে অস্বীকার করা একজন। সবকিছু ছাপিয়ে কফিল আহমেদ একজন মানুষ, এই মাটির সন্তান। মানুষ মানে তো প্রাণ এক। কফিল আহমেদ সেই প্রাণের প্রতিনিধি। প্রাণ মানে তো জন্ম বিস্তার ও লয়ের এক চক্র। কফিল আহমেদও এর বাইরে নন। তারও জন্ম হয়; সে জন্ম ১৯৬২ সালের ১ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের এক প্রগতিশীল কৃষিপ্রাণ পরিবারে। প্রাণের প্রকোষ্ঠে থাকে যে স্থানের ইতিহাস, যার আলো-জল-হাওয়ায় গড়ে ওঠে, বেড়ে ওঠে সে; কফিল আহমেদের ক্ষেত্রে তা নিঃসন্দেহে করিমগঞ্জ। প্রথা মেনে পরিচয় দিতে গেলে বলতে হয়, কফিল আহমেদের জন্ম এক কৃষি প্রাণ পরিবারে, যার বাবা আবদুর রহমান মরু সরকার ছিলেন বিশিষ্ট সমাজকর্মী এবং প্রগতিশীল কৃষক আন্দোলনের একজন সক্রিয় সংগঠক-ব্যক্তিত্ব। স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা করেছেন যথাক্রমে যশোর ও কিশোরগঞ্জে। এরপর অনার্স করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই প্রকাশিত হয় তার প্রথম যৌথ কাব্যগ্রন্থ ‘জংশন’, যার অন্য কবি ছিলেন রিফাত চৌধুরী। গত শতকের আশির দশকের লিটল ম্যাগ আন্দোলনের একজন সক্রিয় লেখক তিনি। এর মধ্যে সাহিত্যকাগজ পূর্ণদৈর্ঘ্য, নদী, দামোদর, ফৃ, মান্দারের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্যোগ্য। ২০০১ সালে প্রকাশিত হয় তার গানের সংকলন ‘পাখির ডানায় দারুণ শক্তি গরুর চোখে মায়া’। ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয় কবিতাগদ্যকথা, ‘রোজ তাই কথা বলে আমার কবি’। কিন্তু এই প্রথা মানা পরিচয়, একজন কফিল আহমেদের জন্য যথেষ্ট নয়। এটা কোনো বইয়ের পরিচিতি অংশের জন্য মানানসই ও দস্তুর। কিন্তু যেহেতু ‘কোনো কিছুর জন্মের শুরুটা কোথায় কেউ তা দেখে না।’ এই অদেখা শুরুর ভাষ্যকে বুকে পুষেই কফিল আহমেদ একে একে বলে যান সব প্রাণের কথা। কতটা? কফিল বলেন, ‘হে পতঙ্গ পাখি লতাগুল্মঝোঁপ, দেখো- আমার দুই চোখ আটকে যাচ্ছে কীটনাশকের দুঃসহ নীলে।’ কফিল আহমেদ-এর সেই প্রাণ যে আকুল হয় একই সঙ্গে সেই গৃহিণী ও তার হারিয়ে যাওয়া পাতিহাঁসটির জন্য, যার কবিতা-গানে ভাষা পায় একই সঙ্গে রাখাল ও গরুর হাহাকার ধ্বনি। এ প্রাণ সর্বপ্রাণের কথা বলে, সর্ব সত্তার কথা বলে। জীব ও জড়-ধূলা ও ঢেউ এখানে একাকার। এই প্রাণের সঙ্গে অনায়াসে কথা চলে অন্য প্রাণের, অন্য গানের। প্রকৃতির খাঁজে খাঁজে জমে থাকা সুর ও সঙ্গম, উদ্ভাস ও বিলোপ, চিৎকার ও হাহাকার ধ্বনির সম্মিলন ঘটিয়ে এই প্রাণ অনায়াসে ‘পুরোটা সপ্তক একবারে বাজানোর’ ঘোষণা দিতে পারে। কফিল আহমেদ ‘পাখ ভাঙা পাখিটার’ মতো ‘ঘাড় ভাঙা ঘোড়াটার’ মতো করেই অনায়াস উপলব্ধিতে পৌঁছান যে, প্রাণের কোনো রাষ্ট্র থাকতে নেই; তার আছে দেশ। ফলে বানিয়ে তোলা রাষ্ট্র, চাপিয়ে দেওয়া রাষ্ট্র ও এর যাবতীয় খেল ও ভেলকির বিপরীতে কফিলের দাঁড়িয়ে যাওয়াটা অবধারিত। তিনি তাই দাঁড়ান; লড়াইয়ের ময়দানে থাকেন হাজির। নিজের কবি, শিল্পী বা অ্যাকটিভিস্ট পরিচয়ে নয়, এক প্রাণ ও সক্রিয় সত্তা হিসেবেই তিনি রাষ্ট্র ও এর আর আর কাঠামোর আরোপের বিপরীতে ঋজুভাবে দাঁড়িয়ে যান। আহ্বান জানান, ‘বুক টান, বুক টান টান করে দাঁড়ানো’র। আহ্বান করেন জেগে উঠতে নতুন এক জাগরণের মধ্যে, ঠিক যেমনটি জেগেছিলাম মাতৃজঠরের অন্ধকারের মধ্যে, যে জাগরণ থেকে ‘ভুয়া জাগরণের’ তল্পিবাহী এক রাষ্ট্র-প্রকল্পিত শিখিয়ে তোলা, গজিয়ে তোলা, আরোপের শিক্ষায়তনগুলো আমাদের দূরে নিয়ে গেছে। কফিল আহমেদের গানগুলো, কবিতাগুলো, কথাগুলো তাই কোনোভাবেই তার নিজ প্রাণ ও সত্তার বিস্তার থেকে আলাদা নয়। কবিতা বা গানে তিনি যে কবির কথা বলেন, যে কবিকে কখনো কখনো কাঠগড়ায় দাঁড় করান, যার দিকে ছুঁড়ে দেন অস্বস্তিকর সব প্রশ্ন, তা এই জীবনবোধেরই গহীনের এক চরিত্র, যার সঙ্গে আলাপে আলাপে মুক্ত হতে থাকে সত্য। ২০০১ সালে প্রকাশিত গানের সংকলন ‘পাখির ডানায় দারুণ শক্তি গরুর চোখে মায়া’ দিয়ে কফিল আহমেদ যে অস্বস্তির জন্ম দেন, যে উদ্ভাসের জন্ম দেন, তা বাংলা গানে অভিনব। গান নিয়ে কফিল আহমেদের ভাষ্য, ‘এইমাত্র ফুটেছে! এইমাত্র যে ফুটেছে-তাকে কী করে একটু পরের দৃষ্টি দিয়ে দেখা যাবে! জন্মের পর শিশুরা প্রথম শুনেছে মায়ের গান। সেই প্রথম শোনা সুর। খুব স্পষ্ট কারোরই মনে থাকে না। কিন্তু সমস্তটা, জীবনব্যাপী সবখানেই তা মিশে আছে। যা মনে নাই-কিন্তু প্রাণে মিশে আছে।’ (সুরের জন্মমৃত্যু) কফিল আহমেদ এই ভূমিলগ্ন গানের সুর, কথা, চিন্তাচিত্র কোথায় পেলেন? কে চিনিয়ে দিল তাঁকে এই দারুণ মোকাম? কফিল আহমেদ বলছেন, ‘আমার নানি মেহেরুন্নেসা ছিল সুরগল্পের এক জীবন্ত প্রবাহ যেন! আমরা ভাইবোনেরা বড় হয়েছি নানির সুরগল্পের কোলে। আমাদেরকে কোলেকাঁখে রেখেই সুর আর কথার চলনে কাজ করতেন আমাদের নানী। বাংলা গানের এক জীবন্ত সুরধারার সাথে আমার নিবিড় সম্পর্কটা বোধ করি ওখানেই। আর আয়োজন করে আমার গানের জীবনের শুরুটা আমাদের করিমগঞ্জের গানের বন্ধুদের সাথে। ওখানকার প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক পরিসরের সান্নিধ্য আমাকে গান নিয়ে, সুর নিয়ে জীবন কাটাতে প্রস্তুত করেছে। আশির দশকের শেষ, আর নব্বই দশকের শুরুর কাল সেইটা। বলা যায় অল্প সময়ে সুরের এক বিস্তৃত পৃথিবীতে বাস করেছি তখন ওখানে আমি। ওখানেই চর্যাপদ, বিদ্যাপতি, চন্দ্রাবতী, উদ্ধব দাসসহ মধ্যযুগের প্রিয় গীতিকবিতা নিয়ে প্রিয় কাজগুলো করেছি, সেসবেও কিছু সুর সাজিয়েছি। সাথে আমার নিজের একান্ত গান তো আছেই।’ কী গান, কী কবিতা, কী চিত্রভাষায়, কী জীবনাচারে কফিল আহমেদ এই জগৎকে তার প্রতিটি সত্তাকে দেখতে চান, দেখেন অখণ্ডভাবে। সংগীত তার কাছে সমগীত। শব্দের একত্রীকরণের পাণ্ডিত্যের ছলে তিনি সমগ্রকে হারাতে অনিচ্ছুক। ফলে করোনাকালের এই লকডাউন দশা দৃষ্টিগ্রাহ্য হওয়ারও বহু আগে থেকেই তিনি সবাইকে সবগুলো সত্তাকে ডাকতে পারেন– ‘বন্ধু জাগো’ বলে। ব্যক্তিবাদিতার মহাফেজখানায় বসে অনায়াসে বলতে পারেন– ‘সোনার রাজার মতোই কুৎসিত সব প্রকরণ কুৎসিত।’ আর এ কারণেই সব প্রাণের মিথজীবিতার অন্বয়কে অস্বীকার করা বুদ্ধিজীবিতার ঘাড়ে কফিল আহমেদ এক বিরাট অস্বস্তির নামও। *পরিচয় পর্বে ব্যবহৃত সব উদ্ধৃতি কফিল আহমেদের গান-কবিতা-কথা থেকে নেওয়া। লিখেছেন-নেলসন

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..