‘মাস্ক খুলবার পর কেউ কাউকে চিনতে পারবে কি তখন?’

কফিল আহমেদ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
এক. খেয়াল করে শোনো সাইরেন বাজতে থাকলে ভোরের পাখিরা সব চুপ হয়ে যায় তখন। মাইক ডাকলেও। মন খারাপ হলেও তুমি আর অ্যাম্বুলেন্স ডেকো না মন খারাপ হলেও এভাবে তুমি পাহাড়ে যেও না মন তাতে করে আকাশটা ভয়ে মরে যেতে পারে আরো যদি যাও তবে সূর্য উঠার সাথে মেলতে শেখো পা আরো চুপচুপ করে হাঁটতে শেখো মানুষ ঝরনাধারার সাথে বইতে শেখো ডাকতে শেখো কোনো ভোরের বন-পাখিসম কিংবা দৌড়তে শেখো সন্ধ্যার যাত্রীর সাথে কাজ করতে শেখো ঢেউ তোলে চাকা ঘুরাতে বা কারখানা চালাতে হলে যাতে আর মাটি না কাঁপে! প্রার্থনা করো পাঠ করো যাতে আকাশ আর বিষ কয়লা না হয়! তিন. মধু কালিজিরা যে খেতে বলছো ওসব তো আর মানুষের বুকে জন্মায় না, এক কৌটার দাম কতো দিতে হবে তা ভেবেছো কি কবিরাজ! রোজ রোজ গরম পানি যে খেতে বলছো চুলা জ্বালাবার বিল কতো আসে সে খোঁজ রাখো কি পরামর্শক! চল্লিশ টাকার আদার দাম দিয়েছি আমি তিনশ টাকা কেজি এই মড়কের হাটে! আর দারুচিনি, সে তো আর কবিতার দ্বীপ থেকে আসবে না, জাহাজ আসবে না সেই দেশ আজ অমানিশা আর নিমপাতা তুলসীপাতার কথা যে বলছো সে গাছ তো জন্মাতে দিলে না এ দেশের উঠানে বনে সারা দেশ জুড়ে বিষবৃক্ষ ছড়িয়ে দিয়েছে ওরা যে রাষ্ট্রীয়ভাবে সেসব বলতে চাইলেই বলবে- অনুমতি নাই, সমাবেশ নিষেধ! অষুধ লিখবার আগে তাই একবার ভেবে নিয়ো কোটি কোটি চোখমুখ কই পাবে কবিতার এই ‘ডাইলভাত’! গদ্য-১ এখানে টিউবওয়েলকে কল বলে ডাকে সবাই। কদিন থেকেই আশপাশ থেকে একটা কথা শুনছি খুব। শুনছি কলে পানি নাই! মিঠাপানির ভূমিতে পানি নাই। রসের মাটির অঞ্চলে পানির স্তর দিন দিন নিচে নেমে গেছে। মাটির তন্তুকণা, অসীম পাতাল ভিতরে ভিতরে সেও শুকিয়ে যাচ্ছে যে! একেতো খালবিল দিন দিন নাই হয়ে গেছে। তারওপর সেচের মেশিন। আর পানিশোষক বিষবৃক্ষের হিড়িক চারদিকে। আর ওয়েদারটা এমন যে এই চৈতমাসেও দিনে গরম আর রাতে শীত লাগে বেদম। শুনেছি মরুভূমি অঞ্চলে এমন হয়। শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে মানুষের। কাশতে কাশতে সকালে রান্না চড়ায় মেয়েরা, বাচ্চারা খেলা করে। কদিন থেকে একমুঠ পাতার জন্য নিমগাছ খুঁজছিলাম। পাড়ায় একটা যাও পেয়েছি, তা এই মাটির নিমগাছ বলে মনে হয়নি আমার। এ অঞ্চলের নিমের পাতার রঙ ঢং আজো চোখে লেগে আছে যে আমার! কিন্তু তা মিললো না যে! পুঁজিবাদকে গাল দিতে ইচ্ছা হলো না আজ আমার। কারণ শুধু পুঁজিপাটা নয়, মানুষের অন্তর্দেশ একটা ব্যাপার বটে! এইটা না থাকলে নিমের জমিনে যমের আগমন স্বল্পেতেই ঘটতে পারে যে! তবে পুঁজিতন্ত্র একটা ব্যাপার। এই যেমন টাকা করোনাভাইরাস ছড়ায়। কিন্তু সবাই সেটা পকেটে নিয়ে ঘুরছি যে। চাইলেও পকেটের জীবানুটাকে পুড়িয়ে ফেলা যাচ্ছে না যে! গতকালও আলুবেগুনের দোকানিকে বকলাম। মুখের থুথু লাগিয়ে টাকা গুনছিলো সে। আঙুলে একেকটা এক’শ টাকা পঞ্চাশ টাকার নোট আসে, আর প্রতিবারই আঙুলে থুথু লাগায় সে! ওদিকে কানে কথা ভেসে আসছিলো মানুষের। কে যেনো বলতেছিলো ‘মনে মানলেও পেডে মানে না যে, বাইর না অইয়া কি করতাম!’ তাকাতেই শুনতে পেলাম ওরা কয়েকজন বলাবলি করছিলো—- সামনে থুথু ফেলাতে কাকে যেনো পুলিশ তা চাটতে বলতেছিলো কাল! দুই. মৃত্যুর পর মাস্ক খুলে ফেলতে বলছিলো ওরা আর কারাগারে এতো ভীড় যে ঘুমাতে যাবার আগেও ওখানে মাস্ক পরে ঘুমাতে বলছিলো ওরা আর স্বাস্থ্যবিধি মেনে সৎকার করা হবে জেনে তখন নিজেকে দেখিয়ে সবাই বলাবলি করছিলো দেখো আমিই সেই শেষতম মরা যার কোনো স্বাস্থ্যবিধি মানার দরকার নাই। চার. মাস্ক খুলবার পর তখন চিনতে পারবে কি তুমি আমারে আর! সবকিছু বদলে গেছে বদলে যাচ্ছে শুনছি কিন্তু বদলায়নি চোখের নিশানা তোমার বদলায়নি ক্ষমতার নামে যতো দখলদারি তোমার মানুষ টাকা গুনছে রাষ্ট্রগুলা অস্ত্র গুনছে মহড়ার পর মহড়া চলছে সাগরে প্রান্তরে যেকোনো খোলা জায়গা দেখলে সেখানেই ধুমধাম প্রাণঘাতী মহড়া যে সাজাও! যেকোনো খোলা চোখ মুখ দেখলেই সেখানেই আলোর কারাগার রচনা করতে যে চাও! কোলের বাচ্চারা বড় হচ্ছে সব কিন্তু বড় হয়নি যে কোলের চিত্রাবলী মানবিক হয়নি যে কোলের মানচিত্রাবলী তোমার! কোল আরো ভয়ার্ত সংকীর্ণ আর আগ্রাসী হচ্ছে যে তোমার! মাস্ক পরবার আগেই কি তুমি চিনতে আমায়? মায়েরা কি করবে বাচ্চারা কি করবে তখন আর জন্মের আগেই মৃত্যুর খবর রটে যায় যদি কবিতা বা প্রার্থনায় মৃত্যুর আগেই স্বর্গত হবার নারকীয় ডামাডোল নামে যদি প্রেমে কিংবা প্রত্যাখ্যানে যদি সবখানে! মায়েরা কি করবে! বাচ্চারা কি করবে তখন আর! পৃথিবীতে থাকতে চায় না কেউ আজ পৃথিবীতে থাকতে চায় না পণ্ডিতের দুরুদুরু মন বিজ্ঞানীর বিজ্ঞাপন তাও দুনিয়া শুদ্ধু খেয়েদেয়ে সব ছারখার করে অন্য গ্রহে হানা দিতে চায় যদি নানান রাষ্ট্রীয় মিশন পৃথিবীতে থাকতে চায় না অথচ পৃথিবীর সবকিছু গিলে খেতে চায় যদি মন মাস্ক খুলবার পর কেউ কাউকে চিনতে পারবে কি তখন? বলো মাস্ক পরবার আগে কখনো কেউ কাউকে চিনতে কি তখন! গদ্য-২ কিন্ত নিরাপত্তা একটা বিদঘুটে, বড় জটিলতর শব্দ আজো এই পৃথিবীতে। নিরাপত্তার নামে পৃথিবীতে কতো আইন আর ক্ষেপণাস্ত্র প্রাচীর গড়ে তুললো যে সভ্যতা নামের এই ব্যর্থতা! পাড়াগলির বিদ্যালয় থেকে, সেসবের বাজার সমিতি থেকে শুরু করে জাতিসংঘ পর্যন্ত সবখানে কতো যে পরিষদ যে গড়ে উঠলো এই নিরাপত্তার নামে! কতো আইন কানুন কতো স্কোয়াড আর কতো কতো ক্ষেপণাস্ত্রই না সাজানো হলো পৃথিবীর জলে স্থলে আসমানে এই নিরাপত্তার নামেই। কিন্তু কোথাও কোনো উপায় হলো কি তাতে! নিরাপত্তা ব্যাপারটা যেনো আজো জ্যান্ত কবর এক! নিরাপত্তার কথা এলে আরব্য যুগের সেই জ্যান্ত কবর দেয়ার কথাটাই মনে আসে বারবার! নিরাপত্তার অভাবের কথাটা বলেই, নিরাপত্তা দেবার কথাটা বলেই কতো রাষ্ট্র আর এসবের রাষ্ট্রসভা হলো যে পৃথিবীতে! নিরাপত্তা হচ্ছে সেই বেষ্টনীর নাম, যার মাঝে পড়ে তুমি নিজের মতো করে ভাল থাকতে বা বাঁচতে পারবে কি এই পৃথিবীতে বলো আর? যতোদিন তুমি দরোজা খুলে একা একা ঘুমাতে না পারবে, যতদিন তুমি ঘরে বাইরে নিজের মতো করে বাঁচতে না পারবে—- ততদিন কন্যাশিশু দিবসের মতো সান্তনা পুরস্কারের মতো কিছু আল্লাদের গন্ডীতে আটখানা-বন্দী করে রাখবে নিজেকে তুমি বড়জোর! যেনো তুমি রুগ্ন, চির পংগু কোনো! বাঁচার জন্য নিরাপত্তা নামক শাসনকামীতার কিছু লাইফ সাপোর্ট দরকার আজ তোমার! জন্মমাত্রই এই পৃথিবীতে যেনো তুমি করুণ অপরাধী যেনো আজো! আর এই ব্যর্থ, অন্যায়ের কাছে মাথা নত, এই ‘আমরা’ কেবল ‘শাস্তি চাই বিচার চাই’ বলে বলে বড়জোর নিরাপত্তার কথাটাই সামনে আনছি বারবার। কিন্তু জানো তো, এই ‘শাস্তি চাই বিচার চাই নিরাপত্তা চাই—-’ জাতীয় আহ্বান আর্তি সবসময়ই ছিলো এই পৃথিবীতে। কিন্তু বন্দীত্ব আরো ভয়াবহ, নিপীড়ন আরো বিভৎস হচ্ছে যে সবখানে দিন দিন! নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা কথাটা একটা অশ্লীল কারাগার যেনো, সব বন্ধ এক জ্যান্ত কবর যেনোবা কোনো। যা কেবল স্বর্ণখচিত ‘বন্দিনী’ কিংবা কোনো পচাগলা মৃতদেরই সাজে! ভিতরে ক্ষত রেখে বাইরে থেকে সিলি করা হয় সবখানে আজো। কথাটা সব সময়েই বলি, আজো বললাম নিরাপত্তা নামক কারাগারের জ্যান্ত কবরে-খোপে যেনো আর কোনোদিন আটকা না থাকো তুমি! মানুষকে মানুষ হয়ে উঠবার ক্ষেত্রগুলি গুম করে করে, মানবিক হয়ে উঠবার সম্ভাবনাগুলি শূন্য লোপাট গায়েব করে করে, কেবল কিছু আইন কানুন বিধানের কথা বলে বলে পৃথিবীকে বড়জোর আরো আঁটসাঁট কারাগারে পরিণত করা যায় কেবল। কিন্তু প্রয়োজন প্রত্যেকের নিজের মতো করে বাঁচা। বড় প্রয়োজন পরিষ্কার বোঝাপড়া। প্রয়োজন মানুষে মানুষে নিঃশর্ত অকপট সহমর্মিতা ভালবাসার। প্রয়োজন সেই দিন আনা যেখানে মানুষ মানুষকে খুন ধর্ষণ বন্দী বা বঞ্চিত করবে দূর কথা, যেখানে কেউ কারো কোনো প্রকার বিরক্তি বা যন্ত্রণার কারণ হয়ে উঠবে না কোনোদিন আর! পেটে ক্ষুধা নিয়ে আজো মাইল মাইল হাটতে থাকা মানুষের প্রাণটুকুতে সম্ভাবনার সেই শক্তিটুকু আছে নিশ্চয়। একমুহূর্ত ভালবাসার জন্য, এক তিলেক সত্যের জন্য, সুন্দরের জন্য যুগযুগ অপেক্ষারত মানুষের প্রাণে সেই প্রাণটুকু আছে নিশ্চয়। এই ভয়াল মহামহড়কের মাঝেও নানারূপ বাধা আর প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে রাস্তায় নামতে পারা এদেশের মানুষের প্রাণটুকুতে জীবনের জন্য জীবনের সেই মুক্তিপাগল ডাকটুকু আছে নিশ্চয়। বিচারের কথা আসে। বিচার বলতে কেবল কিছু আইন কানুন আর এসবের শাস্তিবিধানকে বুঝায় না নিশ্চয়। বিচারবোধ বলতে বৈষম্য নিপীড়ন বঞ্চণামুক্ত জীবনবোধকেই বুঝায়! আর মনে রেখো, নির্যাতন নিপীড়ন জর্জর ভয়াবহ এই পৃথিবীতে নিজেকে মুক্ত করবার সাথে সাথে আরো অনেককে, সবাইকে, গোটা চরাচরকেই যে মুক্ত করবে তুমি! ব্যাপারটা কঠিনতর হলেও জীবনের কাছে জীবনের চাওয়া এইটাই। “মন লুকিয়েছি, মন লুকিয়েছো, মন, দেহটা লুকাবো কই? তুমি লুকাইও না, লুকাইওনা রূপ পুরোটা প্রকাশ হও!”

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..