পুরানো সংখ্যা থেকে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

সংবিধানকে পূর্ণ গণতান্ত্রিক কর (সাপ্তাহিক একতার ১৯৭২ সালের ২০ অক্টোবর সংখ্যায় প্রকাশিত) একতা রিপোর্টার “যে সংবিধানের বিল গণপরিষদে উত্থাপন করা হইয়াছে উহাকে আমরা একটি সমাজতান্ত্রিক সংবিধান বলিয়া মনে করি না।” উহাকে “সাধারণভাবে আমরা একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান বলিয়া মনে করি। কিন্তু সংবিধান বিলে কতকগুলো ধারা-উপধারা আছে যেগুলো অগণতান্ত্রিক...।” দেশের খসড়া সংবিধান সম্পর্কে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর গত ১৮ অক্টোবর পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে উপরোক্ত অভিমত প্রকাশ করেন। (....) সংবিধান বিল সম্পর্কে পার্টির অভিমতের পূর্ণ বিবরণ: (....) সংবিধানকে একটা প্রকৃত গণতান্ত্রিক জনকল্যাণকর সংবিধানে পরিণত করিবার জন্য, সংবিধান বিলটি সংশোধন করিবার জন্য আমরা একেবারে নিম্নতম কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপন করিতেছি। আমাদের প্রস্তাব উত্থাপন করিতেছি। আমাদের প্রস্তাবগুলি নিম্নরূপ : রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বিষয়ক ১। সংবিধান বিলের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনায় মূলনীতিগুলির মধ্যে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আমাদের দেশ হইতে সকল প্রকার সাম্রাজ্যবাদী, সামন্তবাদী ও আধা সামন্ততান্ত্রিক এবং অবাধ ধনতান্ত্রিক শোষণ উচ্ছেদ করা হইবে। (....) (....) ৩। দ্বিতীয় ভাগে মূল নীতির মধ্যে এমন একটি ধারা থাকা দরকার যাহাতে সমাজ হইতে দুর্নীতি দমনকে রাষ্ট্র একটা মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করে। সামাজিক দুর্নীতি যে আমাদের দেশে জনজীবনের একটা প্রধান সমস্যা সে কথা উল্লেখ না করিলেও চলে। তাই মূল নীতির মধ্যে এই ধরনের একটি ধারা যোগ করা দরকার। (....) মৌলিক অধিকার বিষয়ক ৫। সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকারের মধ্যে জনজীবনের নিম্নতম অধিকারগুলিরও কোন উল্লেখ নাই। একথা সত্য যে, সকলের জন্য উপযুক্ত কাজের অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান কিছুটা সময় সাপেক্ষ, কিন্তু খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতিকেও যদি মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করা না হয় তাহা হইলে গণতন্ত্র শুধু মৌখিক গণতন্ত্রই থাকিয়া যাইবে। তাই সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকারসমূহের মধ্যে প্রথমেই নিম্নোক্ত ধারাটি সন্নিবেশ করা একান্ত প্রয়োজন : “প্রত্যেক নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, নিঃখরচায় ৭ বছর হইতে শুরু করিয়া ১৪ বছর পর্যন্ত শিক্ষালাভ, নিঃখরচায় চিকিৎসা লাভ, কাজের জন্য যুক্তিসংগত মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং যুক্তিসংগত বিশ্রাম ও অবকাশের অধিকার থাকিবে।” (....) প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা বিষয়ক ৮। সংবিধান বিলের চতুর্থ ভাগে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক আইন সভা ভাঙিয়া দিবার যে বিধান রহিয়াছে সেইগুলি গণতন্ত্রবিরোধী বিধান। (....) (....) সুতরাং ৫৬ ধারার (৩) উপধারা এবং ৫৭ ধারার (২) উপধারা নিম্নোক্ত সংশোধিত আকারে লিপিবদ্ধ করা উচিত : (ক) ৫৬(৩)–“নির্বাচনে যে রাজনৈতিক দল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করিবে সেই রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্যরা যাঁহাকে সংসদীয় নেতা নির্বাচন করিবেন, রাষ্ট্রপতি তাঁহাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করিবেন।” (....) সংবিধান গণতান্ত্রিক ও জনকল্যাণমুখী করার দাবিতে সভা বিক্ষোভ গণপরিষদ অভিযান (সাপ্তাহিক একতার ১৯৭২ সালের ২৭ অক্টোবর সংখ্যায় প্রকাশিত) নিজস্ব রিপোর্টার দেশের সংবিধানে খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, চাকুরির মৌলিক অধিকার প্রদান, অর্থনীতির ক্ষেত্রে সরকারি মালিকানাকে প্রধান খাত বলে স্বীকার করা, শ্রমিকদের ধর্শঘটের অধিকার প্রদান, মহিলা আসনে প্রত্যক্ষ নির্বাচন এবং উপজাতীয় জনগণের উন্নয়নের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের দাবিতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি গতকাল ২৫ অক্টোবর সকাল ১১টায় আনোয়ারা উদ্যানে (ফার্মগেট) এক গণজমায়েত ও সমাবেশ শেসে গণপরিষদ অভিযানের আয়োজন করেছিল। এ সকল দাবিতে সারাদেশে কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঢাকার আনোয়ারা উদ্যানে রায়পুরা, নারায়ণগঞ্জ, গোদনাইল এবং ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে কমিউনিস্ট পার্টির হাজার হাজার সভ্য, কর্মী, ও সমর্থকগণ জমায়েত হন। রায়পুরার কর্মীগণ লালটুপি পরে লাঠিহাতে মিছিল করে ঢাকা জেলা কমিউনিস্ট পার্টির ব্যানার বহন করে কমিউনিস্ট পার্টির দাবির সমর্থনে শ্লোগান দিয়ে সমাবেশে যোগদান করেন। অফিস-কারখানা খোলা থাকা সত্ত্বেও ঢাকা শহর এবং বিভিন্ন শিল্প এলাকা থেকে বহুসংখ্যক শ্রমিক-কর্মচারী সমাবেশে যোগদান করেন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা কমরেড মণি সিংহ। বক্তৃতা করেন কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড আব্দুস সালাম এবং কেন্দ্রীয় সম্পাদক-লীর সদস্য কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ। গণজমায়েত গৃহীত এক প্রস্তাবে কমিউনিস্ট পার্টি দেশপ্রেমিক দল ও বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক আনীত সংশোধনীগুলোকে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের গণপরিষদকে মেনে নিয়ে সংবিধানকে পূর্ণ গণতান্ত্রিকীকরণ ও জনকল্যাণকরণের দাবি জানান হয়। সভাপতির ভাষণে কমরেড মণি সিংহ বলেন যে, গণপরিষদ যে সংবিধান প্রস্তুত করছে তা, হবে দেশের শ্রমিক-কৃষক জনগণের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের দলিল। তাই এই সংবিধানে জনগণের অধিকার স্বীকৃত হতে হবে। তিনি বলেন যে, এদেশের ৫ কোটি ক্ষেতমজুর এবং গরিব কৃষককে মাত্র ৮০ হাজার বিত্তবান জোতদার শোষণ করছে। দেশে আধা সমাজবাদী ব্যবস্থা বর্তমান। খসড়া শাসনতন্ত্রে জমি দখল করার কথা থাকলেও আমূল ভূমি সংস্কার করে সমাজতন্ত্রের কোনো ধারা নেই। ভূমি সংস্কার ছাড়া খাদ্য ঘাটতি পূরণ এবং শিল্পোন্নয়ন সম্ভব নয়। দেশের জনগণের বৃহতত্র স্বার্থেই আমূল ভূমি সংস্কার চাই। শাসনতন্ত্রকে প্রকৃত গণতান্ত্রিক এবং জনকল্যাণমুখী করার জন্য তিনি কৃষক-শ্রমিক জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করার আহ্বান জানান। (....) মার্কিনী অনুপ্রবেশ বাড়ার আশঙ্কা (সাপ্তাহিক একতার ১৯৭২ সালের ১ ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত) রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক গত ২৮ নভেম্বরের দৈনিক বাংরার এক খবরে প্রকাশ, ঢাকায় রেশনের দোকানে চালের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। (....) (....) দৈনিক বাংলার এই খভর নিশ্চয়ই উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের রাজধানী কোদ ঢাকা শহরে রেশনের দোকানে এবং সরকারি গুদামে চালের অভাব নিঃসন্দেহ এটা প্রমাণ করছে যে দেশে কাদ্যের একটা সংকটজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এই সঙ্গে চাল নিয়ে জাহাজ এসে চট্টগ্রামে ভিড়েছে বলে যে আশ্বাস দেয়া হয়েছে, তাতে এটা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, আমাদের অবস্থা হলো যে, আমরা দিন আনি দিন খাই। (....) (....) খাদ্য পরিস্থিতির এই শোচনীয় অবস্থার জন্য দায়ী হলেন সরকার। আমাদের সাপ্তাহিকে আগে একাধিক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে যে, বিভিন্ন জেলার বহু অঞ্চল বিশেষত যেসব অঞ্চল মুক্তি সংগ্রামের সময় পাক বাহিনী কর্তৃক বিশেষভাবে বিধ্বস্ত হয়েছিল সেই সব অঞ্চলে হাল, গরু প্রভৃতির অভাবে কৃষি উৎপাদনে সংকট দেখা দিয়েছে। এই সমস্যার সমাধানের জন্য সরকার কোন সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। তাই সেসব জমিতে এবার ফসল হয়নি। মুক্তি সংগ্রামের সময় যেসব কৃষক ঘরবাড়ি ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল স্বাধীনতার পর তারা ফিরে এসেও তাদের পুনর্বাসনের জন্য যথাযোগ্য ব্যবস্থা সরকার পক্ষ থেকে নেয়া হয়নি। ফলে ঐরূপ বহু কৃষক তাদের জমি চাষ করতে পারেনি। এভাবেও বিভিন্ন জেলার বহু জমি পতিত রয়ে গেছে। তাছাড়া এবার আমন ফসলের সময় প্রচণ্ড খরা পড়লেও সরকার টিউবওয়েল, পাম্প প্রভৃতি বসিয়ে ক্ষেতে পানি সরবরাহের যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। প্রকৃতপক্ষে আমন ফসলের ফলন যাতে ভাল হয় সে জন্যে সরকারের কোন পরিকল্পনা এমন কি সামান্য চিন্তা ছিল বলেও মনে হয় না। (....) (....) এই পরিস্থিতিতে খাদ্যের জন্যে আবার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীর কাছে সরকারের পক্ষ থেকে হাত পাতার কতকগুলো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। দৈনিক বাংলার খবরেই প্রকাশ বাংলাদেশে সফররত বিশ্ব ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট মি. পিটার কারগিল গত ২৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে খাদ্য ও অন্যান্য মানবিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন। খবরে আরও প্রকাশ, আনরডের একজন বড়কর্তা স্যার রবার্ট জ্যাকসন গত ২৬ নভেম্বর খাদ্যমন্ত্রীর সাথে দেখা করে বাংলাদেশের খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং সর্বপ্রকার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। (....) (....) কিন্তু বিশ্বব্যাংক ও আনরড এই দুটি সংস্কার মৌলিক চরিত্র মার্কিনদের দ্বারা নিয়ান্ত্রিত। তাই সরকার ঐ দুইটি সংস্থার মাধ্যমে যে খাদ্য সাহায্য আনছেন তা আসলে হবে মার্কিন খাদ্য সাহায্য। সরকার কি শর্তে খাদ্য সাহায্য নিচ্ছেন তা আমরা জানি না বটে; কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি যে, খাদ্য সাহায্য হল একটা অন্যতম প্রধান সূত্র-যার মাধ্যমে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা বিভিন্ন নয়া স্বাধীন দেশে জনুপ্রবেশ করে এবং সেখানে তাদের নয়া ঔপনিবেশিক শোষণের জাল বিস্তার করে। (....) (....) এই আশঙ্কা প্রতিরোধ করার একমাত্র পথ হলো আগামী বোরো ও ইরি ফসলের ভালো উৎপাদন সুনিশ্চিত করা এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা। (....) (....) সরকার যাতে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সঠিক ব্যবস্থা অবলম্বন করে সে উদ্দেশ্যে প্রবল গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এই গণআন্দোলন গড়ার জন্য কমিউনিস্টদের এগিয়ে যেতে হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..