পাটশিল্প ও চাষিকে রক্ষা করতে লড়াইয়ে নামতে হবে

আবিদ হোসেন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

বাংলাদেশের সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে মালিকানার নীতি সুনির্র্দিষ্ট করা আছে। ধারা ১৩-এ উল্লেখ আছে ‘উৎপাদনযন্ত্র, উৎপাদন ব্যবস্থা ও বণ্টন প্রণালিসমূহের মালিক বা নিয়ন্ত্রক হইবেন জনগণ এবং এই উদ্দেশ্যে মালিকানা ব্যবস্থা নিম্নরূপ হইবে : (ক) রাষ্ট্রীয় মালিকানা, অর্থাৎ অর্থনৈতিক জীবনের প্রধান প্রধান ক্ষেত্র লইয়া সুষ্ঠু ও গতিশীল রাষ্ট্রায়ত্ত সরকারি খাত সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণের পক্ষে রাষ্ট্রের মালিকানা;’ এছাড়াও জনগণের মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থার ক্ষেত্রে (ধারা-১৫) ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে উৎপাদন শক্তির সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতি সাধন’ নাগরিকদের ‘কর্মের অধিকার, অর্থাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসঙ্গত মজুরির, বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার।’ সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাট কল বন্ধ ব্যক্তিখাতে পাটশিল্পকে দিয়ে দেয়ার গণবিরোধী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের গোল্ডেন হ্যান্ডসেফের মাধ্যমে চাকুরিচ্যুত করার মধ্য দিয়ে সুস্পষ্টভাবে সংবিধান লঙ্ঘন করছে। বাংলাদেশে ১৯৫১ সালে নারায়ণগঞ্জে বাওয়া জুট মিল স্থাপনের মধ্য দিয়ে পাটশিল্পের যাত্রা শুরু। সেই বছরই ২৯৭ একর জায়গা জুড়ে ৩ হাজার ৩০০ তাঁত নিয়ে আদমজীরা এশিয়ার বৃহত্তর পাটকল স্থাপন করে। এরপর একে একে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাটকল স্থাপন করা হয়। সেইসঙ্গে কৃষকরা অধিক লাভজনক ফসল হিসেবে পাট চাষে আগ্রহী হয়। গড়ে উঠে পাট কেন্দ্রিক গঞ্জ, হাট, নদী বন্দর। স্বাধীনতার পূর্বে বাংলাদেশে পাটকলের সংখ্যা ছিল ৭৫টি। ব্যক্তিমালিকানায় পাটকলগুলো লাভ করলেও রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল ক্রমাগত লোকসান দিয়ে যাচ্ছে। বিগত ৪৪ বছরে লোকসান গুণতে হয়েছে প্রায় ১০ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। এই লোকসানের দায় সবসময় চাপিয়ে দেয়া হয় শ্রমিকের উপর। সরকারি আমলা, কর্মকর্তাদের সীমাহীন দুর্নীতি-অনিয়মের ফলে পাটশিল্প ধ্বংস প্রায়। অথচ ব্যাপক সম্ভাবনার আয়ের খাত এই পাটশিল্প। দেশের মোট সরকারি রপ্তানি আয়ের ৩-৪ ভাগ আসে পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে। উৎপাদনেও বিশ্বে দ্বিতীয়। রপ্তানিতে শীর্ষে অবস্থান করেও রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। বিশ্বব্যাংক ও সাম্রাজ্যবাদী দাতাগোষ্ঠীর পরামর্শে ১৯৮২ সালের পর বিরাষ্ট্রীয়করণ ও পাটশিল্প থেকে পুঁজি প্রত্যাহার শুরু করার মধ্য দিয়ে পাটকলগুলো বন্ধ হওয়া শুরু হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোতে কর্মচারী ও শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এদের মধ্যে স্থায়ী শ্রমিক ২০ হাজার ৬০৮ জন, অন্যরা অস্থায়ী শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ৩ হাজার ৬৩১ জন। এই বিপুল সংখ্যক জনবলকে চাকুরিচ্যুত করে মহান মুক্তিযুদ্ধের মূলচেতনাকে ভুলুণ্ঠিত করেছে সরকার। পুরনো আমলের যন্ত্রপাতির বদলে আধুনিক মেশিন স্থাপনের খরচ হতো মাত্র ১২০০ কোটি টাকা। যন্ত্রপাতি পুনঃস্থাপন করলে উৎপাদন বৃদ্ধি পেত তিনগুণ। সরকার সেই পথে না গিয়ে ব্যক্তিমাীলকানায় উৎসাহী হয়ে পাটকল বন্ধ করার অর্থ বরাদ্দ করেছে ৫০০০ কোটি টাকা। ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে নিচ্ছে ঋণখেলাপিরা। এই সময়কালে খেলাপি ঋণ মওকুফ করা হয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির নামে বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীদের দেয়া হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি। অথচ মাত্র ১২০০ কোটি টাকা খরচ করে পাটকলগুলো আধুনিক করলে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর পরিবাগুলো বেঁচে যেতো। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করার ফলে সবয়েচে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পাটচাষিরা। সারাদেশে প্রায় ৪০ লাখ পাটচাষি। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় ৪ কোটি মানুষের জীবিকা এই পাটকে কেন্দ্র করে। প্রায় সব জেলায় পাট উৎপাদন হলেও বিশেষভাবে অধিক উৎপাদন হয় ফরিদপুর, যশোর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, টাঙ্গাইল, জামালপুর জেলায়। প্রতি বছর প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার পাট বিক্রি করে কৃষকরা। পাট চাষের জমির পরিমাণ ১৪ লাখ ৭৫ হাজার একর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সালে ৬৮ লাখ বেল পাট উৎপাদন হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থ বছরে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৮২ লাখ বেল প্রায়। সরকার প্রতিবছর ক্রয় করে প্রায় ১৩ লাখ বেল। এ বছর সরকার পাট ক্রয় বাবদ কোনো অর্থ-বরাদ্দ করেনি। সরকারিভাবে কোনো পাট ক্রয় করা হবে না। এই ১৩ লাখ বেল পাট নিয়ে পাটচাষিরা কোথায় যাবে? রাষ্ট্রীয়ত্ত পাটকল বন্ধ করে বেসরকারি পাটকল মালিকদের একচেটিয়া ব্যবস্থা করার পথ সুগম করে দিয়েছে। তারা ইচ্ছে মতো দাম নির্ধারণ করবে। সরকার পাট ক্রয় করতো নির্দিষ্ট সময়কাল বেঁধে। বাকি পাট বেসরকারি পাটকল সারাবছর ধরে ক্রয় করে। ফলে কৃষক পাটের লাভজনক দাম পায় না। এমনিতেই পাটচাষে খরচ প্রতি বছর বৃদ্ধি পায়। পাট চাষে নানান সংকট মোকাবেলা করে কৃষক। পাট কাটা আঁশ ছাড়ানোর শ্রমিক পাওয়া যায় না। ফলে শ্রমিকে মজুরিও বেশি দিতে হয়। প্রতি বিঘা জমিতে বীজ, সার, ওষুধ, সেচ, কাটা, আঁশ ছাড়ানো বাবদ খরচ হয় ২০-২১ হাজার টাকা। বিঘাপ্রতি উৎপাদন হয় ৯-১০ মণ। বিক্রি করে ১৬০০-১৮০০ টাকা মণ। ৩০০০ টাকা মণ দাম হলে কৃষক কিছুটা লাভের মুখ দেখতে পায়। বেসরকারি পাটকলগুলোতে সরকারি কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় শ্রমিক মজুরি শোষণের কবলে পরে। কৃষকের কাছ থেকে কম দামে পাট ক্রয় করে। বেসরকারি খাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি। কাঁচাপাট রপ্তানি বাড়ানোর যে সুযোগ আছে, তা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিলে পাটের চাহিদা বাড়বে। কৃষকরাও কিছুটা দাম পাবে। তবে, প্রতি বছরই চাহিদা থাকা সত্ত্বেও কাঁচা পাট রপ্তানির পরিমাণ কমছে। ২০১২-১৩ অর্থ বছর পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ২০ লাখ বেল কাঁচাপাট রপ্তানি হতো। প্রতি বছর কমে ৮-৯ লাখ বেল হয়েছে। গত ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে কাঁচাপাট রপ্তানি হয়েছে ৮ লাখ বেল। দেশের মোট উৎপাদিত পাটের ৫০-৫৫ লাখ বেল ব্যবহার হয় বেসরকারি খাতের পাটকলগুলোতে। কৃষিভিত্তিক বিপুল সম্ভাবনার এ পাটখাতকে বাঁচিয়ে রাখতে, সংবিধানের মূলনীতি অনুযায়ী জনগণের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার আদায়ে সারা দেশে পাটকল শ্রমিকরা ধারাবাহিক আন্দোলন অব্যহত রেখেছে। এই আন্দোলনে পাটচাষীদেরও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে সম্পৃক্ত হওয়া জরুরি। বাংলাদেশ কৃষক সমিতি পাটকল বন্ধের প্রতিবাদে এবং পাটচাষীদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে অক্টোবর মাসব্যাপি আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এই আন্দোলন কর্মসূচিতে কৃষক সমিতি জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম কমিটিগুলোকে সক্রিয় করে আন্দোলন কর্মসূচির পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। আন্দোলনে ব্যাপক সংখ্যক কৃষককে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে উঠাণ বৈঠক, পথসভা, হাটসভা করতে হবে। লিফলেট, পোস্টার, ব্যানার ইত্যাদি প্রচারধর্মী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। গ্রামে গ্রামে আন্দোলন পরিচালনা কমিটি করে জেলা-উপজেলায় বিক্ষোভ মিছিলসহ সমাবেশ, ডেপুটেশন, ঘেরাও কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। পাট চাষ ও পাট শিল্প বাংলাদেশের ইতিহাস ঐতিহ্যের অংশ। জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম খাত। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত প্রায় ৪ কোটি মানুষের অস্তিত্বের সংগ্রামে কৃষক-শ্রমিক ও সাধারণ মানুষকে লড়াইয়ে নামতে হবে এখনি। লেখক : সহ-সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশ কৃষক সমিতি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..