আর কত ধর্ষণ হলে জাগবে রাষ্ট্র

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
দেশে ধর্ষণ অনেক বেশি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। ধর্ষিতার কান্না পাহাড়-সমতলে সমানতালে মিলছে। আকাশ ভারী হয়ে উঠছে। মানুষ বাকরুদ্ধ। জবাব মিলছে না। নৈতিক অবক্ষয়, ক্ষমতাশালীদের পৃষ্ঠপোষকতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা এর অন্যতম কারণ। মাত্র কয়েক দিন আগে সিলেটে এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে ধর্ষণের শিকার হলেন এক গৃহবধূ। ধর্ষকেরা সবাই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী। সেই একই সময়ে খাগড়াছড়িতে দুর্বৃত্তরা এক পাহাড়ি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী তরুণীকে ধর্ষণ করে। ঢাকায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন স্বামীর জন্য রক্ত নিতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হলেন আরেক নারী। গাইবান্ধায় তরুণী ও নারায়ণগঞ্জে স্কুলছাত্রী ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। গোপালগঞ্জে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ করে ভিডিও ভাইরাল করার অভিযোগও এসেছে। এরপরই নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নারী নির্যাতনের রোমহর্ষক খবর। নোয়াখালীর নারী নির্যাতনের ঘটনায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ হয়েছে। প্রশ্ন হলো এই আওয়াজ রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্ণকুহরে পৌঁছাবে কি? নারী ও পুরুষের মধ্যকার অসমতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এখনো বিরাজমান। আরও বেশি দুঃখজনক ঘটনা হলো, বাংলাদেশে এমন অনেক সহিংসতা আছে, যা রাষ্ট্রই ঘটায় বা রাষ্ট্র কোনো ব্যবস্থা নেয় না। বাংলাদেশে ধর্ষণ কার্যত এক অপ্রতিরোধ্য অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। দেশের আনাচে-কানাচে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন বয়সী নারীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। কখনো কখনো অবিশ্বাস্য রকমের পাশবিক কায়দায় একের পর এক ঘটে চলেছে ধর্ষণ; যেন ধর্ষকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। এই মুহূর্তে সারা বাংলাদেশে ধর্ষণবিরোধী প্রতিবাদ চলছে। রাজধানীসহ দেশের অন্তত ৩৫টি জেলায় নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের প্রতিবাদ চলছে। ‘নারীর নিরাপত্তা চাই’, ‘নারীরা অনিরাপদ কেন?’, ‘আর কত নারী ধর্ষিত হলে রাষ্ট্র জাগবে?’, ‘ধর্ষকদের গ্রেপ্তার করো’- এ ধরনের নানা স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড, ব্যানার, ফেস্টুন নিয়ে শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনের রাস্তায় জড়ো হয়েছে বহু নারী-পুরুষ। তাদের সবার চোখে-মুখে জ্বলছে প্রতিবাদের অগ্নিশিখা। খোদ সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২০ সালের জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার মাত্র ৩ দশমিক ৫৬ শতাংশের ক্ষেত্রে আদালতের রায় ঘোষিত হয়েছে; আর অপরাধীদের দণ্ডাদেশ ঘোষিত হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৩৭ শতাংশ মামলায়। ধর্ষণ, নারী-শিশু নির্যাতনসহ সব ধরনের অপরাধবৃত্তি দমনের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা সরকারের একান্ত দায়িত্ব। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সরকার ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে। ধর্ষণ হলো নারী নির্যাতনের সবচেয়ে বর্বর দিক। ধর্ষণ এখন দেশজুড়ে মহামারি আকার ধারণ করেছে। নারীরা ধর্ষিত হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে। আমাদের নারীদের কোনো নিরাপত্তা নেই। বাসা থেকে বের হলে বাসায় নিরাপদে ফিরতে পারবে কি না, তা কেউ জানে না। সমাজে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি, তা ধর্ষণের ঘটনাকে উৎসাহিত করে। নোয়াখালী, সিলেটসহ দেশে অব্যাহত যে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, তা একেকটা একেকটার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে এসব হচ্ছে। অপরাধীরা মনে করে ক্ষমতাসীনদের কাছাকাছি থাকলে বা ক্ষমতাসীন হলে, এ ধরনের অপরাধ করলে কেউ কিছু করতে পারবে না। ধর্ষণের দীর্ঘমেয়াধী বিচারের প্রক্রিয়া এই অপরাধকে বাড়িয়ে দেয় আরো কয়েক গুণ। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই যদি বর্বর ধর্ষকের শাস্তি হয়, তাহলে কমবে ধর্ষণের মতো অপরাধ। নারীর প্রতি সামগ্রিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ কমবে না। নীতি-নৈতিকতা, মানবতা, বিবেক ও মনুষ্যত্ববোধ হারিয়ে মানুষ আজ বর্বর হয়ে গেছে। যারা ধর্ষণ করে তাদের মনুষ্যত্ব কোথায় থাকে? তারা কী প্রকৃত মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ? আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় মানুষ তৈরির সঠিক পথ নির্মাণ না করতে না পারলে শুধু আইন প্রয়োগ করে এই ব্যাধি থেকে সমাজকে মুক্ত করা যাবে না। বাংলাদেশে বর্তমানে অনেক আইন প্রণয়ন করলেও এর যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। তাই শুধু আইন প্রণয়ন নয়, এর যথাযথ প্রয়োগ প্রয়োজন, প্রয়োজন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। নয়তো এই সহিংসতা চলতেই থাকবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..