জনগণের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এক হোন

ডক্টরস প্ল্যাটফরম ফর পিপলস হেলথ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আমরা জানি, চিকিৎসকরা মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়োজিত। তাঁরা রোগীর চিকিৎসা করেন পেশাগত ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে। প্রগতিশীল চিকিৎসক নেতৃবৃন্দ মানুষের রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সহকর্মী চিকিৎসকদের গণমানুষের স্বার্থে কাজ করার জন্য অনুপ্রাণিত ও সংগঠিত করে থাকেন। আমাদের দেশে ৮০' দশক পর্যন্ত চিকিৎসক সমাজের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন (বিএমএ) এর নেতৃত্বে ছিলেন বাম-গণতান্ত্রিক চিকিৎসক নেতৃবৃন্দ। তৎকালীন প্রকৃচির আন্দোলনে ও স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতনের গণঅভ্যুত্থানে বিএমএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিএমএ সে সময় সরকারের নিকট আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন, চিকিৎসকদের চাকরির নীতিমালা সংস্কার ও কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে এবং জনমুখী স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নে দাবি উত্থাপনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। ৯০' দশকে ড্যাব ও স্বাচিপ গঠনের ফলে বিএমএ হিমাগারে চলে যায় এবং নেতৃবৃন্দ সরকারি দলের সাথে একাকার হয়ে যান। বাম-প্রগতিশীল চিকিৎসক নেতৃবৃন্দের অনেকেই ড্যাব-স্বাচিপ এর সাথে ঐক্যবদ্ধ নির্বাচন করে বিএমএ এর নেতৃত্বে আসেন। কিন্তু জনমুখী স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নে ও চিকিৎসক সমাজের দাবি আদায়ের আন্দোলনে বিএমএ কে ধরে রাখতে ব্যর্থ হন। সরকার দলীয় চিকিৎসক নেতৃবৃন্দ বিএমএ-কে সরকারের লেজুড়ে পরিণত করেন এবং এদের অনেকে বিভিন্ন দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। কোভিড-১৯ সংক্রমণ মোকাবিলার চিত্রের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে চিকিৎসা এবং সার্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সরকারের নীতি ও পরিকল্পনায় জনস্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করা, অব্যবস্থাপনা, অবহেলা, দুর্বৃত্তায়ন ও ঢালাও বেসরকারীকরণজনীত দীর্ঘদিনের বিরাজমান সংকট নগ্নভাবে ফুটে উঠেছে। সাধারণ জনগণ তাদের ন্যূনতম চিকিৎসার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুবরণ করেছে। অন্যদিকে সরকার নিজ দায়িত্ব আড়াল করে চিকিৎসক ও জনগণকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার অপচেষ্টায় লিপ্ত থেকেছে। অথচ বিএমএ এবং অন্যান্য চিকিৎসক সংগঠনগুলি এর জোরালো প্রতিবাদ না করে নিরব থেকেছে বললে অত্যুক্তি হবে না। এতাবস্থায় বাম-গণতান্ত্রিক চিকিৎসক নেতৃবৃন্দ স্বাচিপ-ড্যাব এবং অন্যান্য সকল প্রগতিবিরোধী সংগঠনের বিকল্প এমন একটি চিকিৎসক মঞ্চ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা প্রবলভাবে অনুভব করেন যা চিকিৎসকদের নেতৃত্বে নার্স-টেকনোলজিষ্ট-স্বাস্থ্যকর্মীসহ জনগণকে সাথে নিয়ে সার্বিক স্বাস্থ্য আন্দোলন গড়ে তুলবে এবং জনমুখী স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নে সরকারকে বাধ্য করতে পারবে। এই প্রেক্ষাপটে জনগণের স্বাস্থ্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন বাম-গণতান্ত্রিক চিকিৎসক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ গত ২১ মে ২০২০ এক ভিডিও কনফারেন্সের মধ্য দিয়ে চিকিৎসকদের সম্মিলিত মঞ্চ ‘ডক্টরস প্ল্যাটফরম ফর পিপলস হেলথ’ গঠন করেন।   ডক্টরস প্ল্যাটফরম ফর পিপলস হেলথ এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ১) স্বাস্থ্যকে জনগণের মৌলিক অধিকার হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান, এবং আইন ও বিধি দ্বারা তা নিশ্চিত করার জন্য সংগ্রাম গড়ে তোলা। ২) সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্যে বিভিন্ন শ্রেনী-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে চিকিৎসকদের নেতৃত্বে সার্বিক স্বাস্থ্য আন্দোলন গড়ে তোলা। ৩) জনস্বাস্থ্য ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে মূল ভিত্তি ধরে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সংগ্রামকে সুদৃঢ় করা। ৪) স্বাস্থ্যখাতে বাজেটের নূন্যতম ১৫% ও জিডিপির ৫% বরাদ্দের দাবীতে এবং বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আন্দোলন গড়ে তোলা। ৫) বর্তমান কোভিড এবং এই রকম অতিমারি স্বাস্থ্য দুর্যোগ মোকাবিলায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জনস্বাস্থ্য আন্দোলন গড়ে তোলা। জাতীয় পর্যায়ে মহামারির চিকিৎসা সম্পূর্ণ ভাবে সরকা্রের দায়িত্ব নেয়ার লক্ষ্যে সংগ্রাম গড়ে তোলা। ৬) সরকারী স্বাস্থ্যসেবা এবং শিল্পাঞ্চলে জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থার অবকাঠামো উন্নয়ন সহ প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী জনসংখ্যা অনুপাতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও স্বাস্থ্যকর্মীর নিয়োগের দাবীতে আন্দোলন গড়ে তোলা। ৭) মেডিকেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, হাসপাতালে ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। চিকিৎসাসেবা প্রদানের সময় স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর হামলা সহ কোন অনাকাংখিত ঘটনা ঘটলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের সুরক্ষিত রাখতে আন্দোলন গড়ে তোলা ও আইনী সহায়তা প্রদান করা। ৮) চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাসহ গণমুখী পেশাজীবি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কর্মসূচী গ্রহণ করা। ৯) চিকিৎসা বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা খাতে পৃথক ও পর্যাপ্ত বরাদ্দের দাবীতে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া এবং চিকিৎসকদের গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করা। ১০) সাম্রাজ্যবাদী প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সরকার কর্তৃক চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বাণিজ্যিকীকরণের উদ্যোগ প্রতিরোধ করা। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসায় অতি মুনাফার বিরুদ্ধে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করা। ১১) ইউজার ফি বাতিল করে সকল সরকারী হাসপাতালে বিনামূল্যে জনগণের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া। এ সকল চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে সরবরাহকৃত ঔষধের প্রকরণ (item) ও পরিমাণ এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম বৃদ্ধি নিশ্চিত করার আন্দোলন জোরদার করা। ১২) ঔষধের মূল্যবৃদ্ধি রোধে এবং অত্যাবশ্যকীয় ঔষধ সহজলভ্য করার লক্ষ্যে ১৯৮৩ সালে ঘোষিত ঔষধনীতির মূল কাঠামো ও লক্ষ্য ঠিক রেখে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য সংগ্রাম করা। ১৩) জনগণকে স্বাস্থ্য সচেতনতায় উদ্বুদ্ধকরণে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা। নিরাপদ পানি এবং ভেজাল ও দূষণমুক্ত খাদ্য আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করা। ১৪) প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ বিধ্বংসী পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা। ১৫) ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে জনগণের কাছে জবাবদিহীমূলক গণতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাঠামো ও স্বায়ত্বশাসিত স্থানীয় সরকার গড়ে তোলার সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া। সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য বিভাগের প্রশাসনিক পদে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কিংবা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ স্বাস্থ্য ক্যাডারের চিকিৎসক নিয়োগ নিশ্চিতকরণে সচেষ্ট থাকা। ১৬) শ্রেনীবিভক্ত ও বৈষম্যপূর্ণ বাংলাদেশে স্বাস্থ্যকে জনগণের মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামের সাথে স্বাস্থ্য আন্দোলনের সম্পর্ক স্থাপন করা। ১৭) জনগণের সভা-সমাবেশ ও সংগঠন করার গণতান্ত্রিক অধিকার সহ অবাধ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম অব্যাহত রাখা। ১৮) জনগণের গণতান্ত্রিক সরকার ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশ নেয়া। (ডক্টরস প্ল্যাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ-এর আহবায়ক কমিটির ১৮/০৮/২০২০ তারিখের সভায় অনুমোদিত)

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..