বাংলাদেশের পাটশিল্পকে বাঁচাতে হবে

সহিদুল্লাহ চৌধুরী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
প্রেক্ষাপট গত ২৮ জুন এক ঘোষণার মধ্যদিয়ে সরকার রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকলগুলি বন্ধ ঘোষণা করেছে। ফলে স্থায়ী, বদলী ও ক্যাজুয়াল- সব মিলিয়ে প্রায় ৫১ হাজার পাটকল শ্রমিক বেকার হয়ে গেছে। করোনা মহামারীকালে যখন সামগ্রিকভাবে মানুষের জীবন-জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, চারিদিকে মানুষ চাকরি-কাজ-আয়ের উৎস হারাচ্ছে, অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে- ঠিক সেই সময়ে সরকার এ ধরণের একটি অমানবিক সিন্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছে। সরকার বলছে, এইসব শ্রমিকদের “গোল্ডেন হ্যান্ডশেক”-এর মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দিয়ে বিদায় জানানো হবে। এ জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দও করেছে। পাটকলগুলি বন্ধ করে দেবার পেছনে যুক্তি দেখানো হয়েছে, এগুলি লোকসানী প্রতিষ্ঠান। প্রতিবছর লোকসান দিয়ে চলেছে। বেসরকারি পাটকলগুলোতে যেখানে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি মাত্র ৪৭০০ টাকা সেখানে সরকারি পাটকলের শ্রমিকদের মজুরি ১৮,০০০ টাকা। লোকসানের মূল কারণ হিসেবে শ্রমিকদের উচ্চ মজুরিকে দায়ী করা হয়েছে। বলা হয়েছে, বিগত ৪৪ বছরে সরকার রাষ্ট্রায়ত্ব পাটশিল্পে ভর্তুকি দিয়েছে ১০ হাজার ৫ ’শ কোটি টাকা। সরকার রাষ্ট্রায়ত্ব ২৫টি পাটকল বন্ধ করে দিয়ে পরবর্তীতে সেগুলোকে পিপিপি’র আওতায় চালাবার প্রস্তাব রেখেছে। যদিও অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, এগুলিকে কার্যত: পানির দামে ব্যক্তি মালিকায় বিক্রি করে দেয়া হবে। কেননা অতীতে এমনটাই হয়েছে। আর বাংলাদেশে পিপিপি’র কোন উদ্যোগই কখনো খুব একটা সাফল্যের মুখ দেখেনি। এ কথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে, স্বাধীনতার পর পাটশিল্পের মাধ্যমেই “সোনালী আঁশ”-এর দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে পরিচিতি পেয়েছে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যূত্থান থেকে শুরু করে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে আমাদের পাটশিল্প শ্রমিকদের অবদান সকলেরই জানা আছে। ফলে পাটশিল্প শুধু অর্থনীতিই নয়; এটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্বের সাথে জড়িত। এরকম একটি শিল্প আমাদের চোখের সামনে নিঃশেষ হয়ে যাবে- তা হতে দেয়া যায় না। ফলে এই শিল্পকে বাঁচাতে আমাদের কিছু করণীয় আছে। প্রথমত, রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকলের বিরুদ্ধে সরকারের যেসব অভিযোগ সেগুলোকে নির্মমভাবে খণ্ডাতে হবে। কেননা, এসব অভিযোগের বেশিরভাগই ভুল তথ্য ও ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সঠিক তথ্য ও যুক্তি দিয়ে এই অভিযোগগুলোকে নাকচ করে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে সামগ্রিকভাবে পাটশিল্পকে রক্ষার জন্য একটি কার্যকর বিকল্প প্রস্তাব হাজির করতে হবে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পাট ও পাট পণ্যের চাহিদা আছে কি? এই প্রশ্নের সোজা-সাপটা উত্তর হলো- “আছে”, বহুল পরিমাণে আছে এবং উত্তোরোত্তর এই চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেকে মারাত্মক ভুল ধারণা নিয়ে বসে আছেন যে, বাজারে প্লাস্টিক-সিনথেটিক আসার ফলে পাটপণ্যের চাহিদা কমে গেছে। আসলে নতুন নতুন বহু ধরণের পাটপণ্যের চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। প্রথাগত পাটপণ্য যেমন বস্তা, চট, থলে, পাটের সুতা এসবের বাইরে এখন স্ট্রাবর, পেপার টিউব, জুট প্লাস্টিক সামগ্রী ইত্যাদির ব্যবহার বাড়ছে। এই তথ্য হয়তো অনেকের জানা নেই যে, বেসরকারি পাটকল করিম জুট মিল থেকে পাটের তৈরি একটি পণ্য আমেরিকায় রপ্তানি করা হয় যা দিয়ে গাড়ির ড্যাশবোর্ড ও সিট তৈরি হয়। তাছাড়া প্লেনের কার্পেট তৈরিতেও পাটের ব্যবহার হচ্ছে। পাটের শাড়ী, স্যান্ডেল, পাটের ব্যাগ, মেয়েদের হ্যান্ডব্যাগ, কার্পেট, পর্দার কাপড়, গাড়ীর সানরুফ, ব্লেজার ইত্যাদি পাট থেকে তৈরি হচ্ছে। জুট জিওটেক্স পাটের সম্ভাবনাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সচেতনতার কারণে ইউরোপসহ বহু দেশে প্লাস্টিক নিষিদ্ধ হতে যাচ্ছে। এটা পাটপণ্যের চাহিদা আরো বাড়িয়ে দেবে, সন্দেহ নেই। এছাড়া দেশের ভেতরেই পাটপণ্যের বিপুল চাহিদা রয়েছে। ২০১০ সালে প্রবর্তিত মোড়ক আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন হলে, দেশের ভেতরেই পাটপণ্যের বিপুল চাহিদা সৃষ্টি হবে। এই আইনে ধান, চাল, গম, ভূট্টা, সার, চিনিসহ ১৭টি পণ্যে বাধ্যতামূলক পাটের মোড়ক ব্যবহার কারার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ২০১৬ সালে আরো ১১টি পণ্যকে এই তালিকাভুক্ত করা হয়। এছাড়া ৯টি পণ্যে পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এরকম পরিস্থিতিতে বাড়তি কাঁচা পাটের জন্য আমাদের কৃষকদের দারস্থ হবে হতে- এটা নিশ্চিত। গত দশ বছর ধরে দেশে ৭৫ লক্ষ বেল পাট উৎপাদিত হচ্ছে। এর মধ্যে ১০-১২ লক্ষ বেল কাঁচাপাট রপ্তানি হয়। আমরা যদি চাহিদার দিকে দৃষ্টি রেখে আমাদের পাটশিল্পকে আধুনিকায়ন ঘটিয়ে উৎপাদন বাড়াতে পারি তাহলে দেশে আরো কমপক্ষে ১০ লক্ষ বেল উন্নতমানের পাট উৎপাদন করতে হবে। ফলে এ কথা বলা যায় যে, পাট পণ্যের অব্যাহত চাহিদা বাংলাদেশের কৃষি ও পাটশিল্পকে লাভজনক ও উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম। এই বিপুল সম্ভাবনাকে আমরা কীভাবে কাজে লাগাবো- সেটাই মৌলিক প্রশ্ন। পাটশিল্পে আমাদের কোনো প্রতিদ্বন্দী আছে কী? বাস্তবে পাটশিল্পে দৃশ্যতঃ আমাদের কোনো প্রতিদ্বন্দী নেই। এ প্রসঙ্গে অনেকেই ভারতের কথা বলে থাকেন। এটা নিতান্তই ভুল ধারণা। ভারতে পাটপণ্যের উৎপাদন কমে গেছে। তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যায়- ২০১১ থেকে ১৬ সাল পর্যন্ত ভারতে পাটপণ্য থেকে মোট আয় নেমে গেছে ২১.৭৯ ভাগ। অন্যদিকে বাংলাদেশে এই আয় বেড়েছে ২৫.৮২ ভাগ। এই সময়কালে বাংলাদেশি পাটপণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ২৪.২৫ ভাগ অথচ ভারতের রপ্তানি আয় কমেছে ৫৬.৪৯ ভাগ। অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত থেকেও এটা প্রমাণ করা যায় যে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সামনে পাটের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। বিশ্বব্যাপী পাট ও পাটপণ্যের বিপুল চাহিদা রয়েছে এবং বাস্তবিক অর্থেই এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। আমরা অ-প্রতিদ্বন্দ্বী ! ব্যক্তিমালিকানাধীন পাটকলগুলো লাভজনক কী? এই প্রশ্নে আমাদের মধ্যে এক ধরণের বিভ্রান্তি আছে। দৃশ্যত: বেসরকারি পাটকলগুলো ভালোই মুনাফা করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- কীভাবে তারা এই মুনাফা করছে? আমরা খোঁজ-খবর নিয়ে দেখেছি, মূলত: শ্রমিককে তার ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করেই তারা লাভের মুখ দেখছে। এই বিষয়টি একেবারেই আমরা অনেকেই আমলে নেই না। কেউ কোনো কথা বলি না। যা খুবই দুঃখজনক। বেসরকারি পাটকলে ন্যূনতম মজুরি হলো ২৭০০ টাকা। ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা মিলে গড়ে একজন শ্রমিক পায় ৪৭০০ টাকা। বেসরকারি পাটকল মালিকরা শ্রমিকদের দিয়ে ১২ ঘণ্টা কাজ করায়। কারখানাগুলি আসলে শ্রমিক সংকটেও ভোগে। অনেক সময় তারা প্রয়োজন থাকলেও শ্রমিক পায় না। যেসব শ্রমিক ওখানে কাজ করে তারা ঐ কারখানার আশপাশেই বসবাস করে, কেউ কেউ পারিবারিকভাবে কৃষি কাজও করে। শুধু মাত্র পাটকলে চাকরি করে, ঐ সামান্য মজুরি দিয়ে- তাদের পেটের ভাত জোটে না। বেসরকারি পাট শিল্পের ন্যূনতম মজুরি ঠিক করা হয়েছিল ২০১৩ সালে, ২০১৮ সালে সে মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। নতুন মজুরি কাঠামো খুব দ্রুতই এসে যাবে। নতুন কাঠামোতে নিশ্চিতভাবেই মজুরির পরিমাণ বাড়বে কারণ অন্য সেক্টরগুলোতেও বেড়েছে, বিশেষ করে গার্মেন্টস্ শিল্পে। ফলে ২/১ বছরের মধ্যে বেসরকারি পাটশিল্পের শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি যদি ৯০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়- তাহলে ক’টা বেসরকারি পাটকল টিকে থাকতে পারবে- সেটা দেখার বিষয়। শ্রমিককে মারাত্মকভাবে ঠকিয়ে মালিকের মুনাফা অর্জন- এবং এটাকেই “লাভজনক কারখানা” হিসেবে দেখানোর দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের বদলাতে হবে। সরকার বেসরকারি পাটকল শ্রমিকদের মজুরির সাথে তুলনা করে রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকলগুলির লোকসান দেখানোর জন্য চাতুরির আশ্রয় নিয়েছে। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাছাড়া বর্ধিত শ্রমিক মজুরি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ফল। মজুরি বৃদ্ধির জন্য রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকলগুলির শ্রমিকরাও আন্দোলন করেছে। সেই দাবিরই প্রতিফলন ঘটেছে মজুরির বৃদ্ধির ভেতর দিয়ে। সুতরাং শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধিকে লোকসানের কারণ হিসেবে দেখানো কার্যত: রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকেই চ্যালেঞ্জ জানানোর সামিল। এটি সকলকে ভালোভাবে অনুধাবন করতে হবে। সরকারি পাটকলগুলো কেন লোকসানি প্রতিষ্ঠান হলো? সরকারের দেয়া হিসাব মোতাবেক, গত ৪৪ বছরে পাটশিল্পে লোকসানের পরিমাণ ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি বছর লোকসান হয়েছে ২৩৮.৬৩ কোটি টাকা। রাষ্ট্রের বহু প্রতিষ্ঠান প্রতিনিয়ত লোকসান দেয়, সরকার ভর্তুকী দিয়ে সেগুলি চালিয়ে নেয়। বিমান, রেল, বিদ্যুৎসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলি প্রতিবছর যে পরিমাণ লোকসান দেয়, সে তুলনায় রাষ্ট্রায়ত্ব পাটশিল্পে লোকসানের পরিমাণ অতি নগণ্য, বলাই বাহুল্য। কিন্তু সম্ভাবনাময় পাটখাতকে আমরা লোকসানী প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকিয়ে রেখে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকী দিয়ে চালানোর পক্ষপাতি নই। কারণ এটিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা যদি ভুল নীতি, দুর্নীতি পরিহার করে, সঠিক নীতি, পদ্ধতি ও কর্মপন্থা ঠিক করতে পারি তাহলেই কেবল সেটা সম্ভব। এবং সেটা করার আগে আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি আমাদের নজর দিতে হবে। রাষ্ট্রায়ত্ব পাটশিল্পের দিকভালের দায়িত্ব বিজেএমসি’র হাতে। অভিজ্ঞতা থেকে এটাই প্রতিয়মান হয় যে, এই প্রতিষ্ঠানটি কখনোই রাষ্ট্রীয় নীতি-লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে শিল্পটিকে সাফল্যজনভাবে বিকশিত করার উদ্যোগ নেয়নি। ভুল নীতি-কর্মসূচি, একটা মাথাভারি প্রশাসন, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা- এটাই হলো বিজেএমসি’র মৌল বৈশিষ্ট্য। রাষ্ট্রায়ত্ব পাটশিল্পের সামগ্রিক সংকটের মূল উৎস এখানে। কোনো উৎপাদন প্রতিষ্ঠানে “দক্ষতা”র বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিই সব সবসময় উপেক্ষিত থেকে গেছে। ২০১১ সালে প্রকাশিত “পাট কমিশন” রিপোর্টেও এই প্রসঙ্গটি উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানে পাট শিল্পের প্রসার ঘটেছিল মূলত: রপ্তানির জন্য। দক্ষতার সংকট তখনও ছিল। কিন্তু “বোনাস ভাউচার” নামক এক পদ্ধতির কারণে অ-দক্ষতাজনিত ক্ষতি পুষিয়ে নিয়ে উৎপাদক-রপ্তানিকারকরা লাভের মুখ দেখতে পারতো। “বোনাস ভাউচার” এমন এক ব্যবস্থা ছিল, যার মাধ্যমে রপ্তানিকারকরা তাদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার একটি নির্দিষ্ট অংশ (২০-৩০%) অফিসিয়াল বিনিময় হারে ক্রয় করে আবার তা খোলা বাজারে বিক্রি করতে পারতো। বাজারে পাকিস্তানি রুপির বিপরীতে ডলারের দাম বেশি হওয়ায় (কখনো কখনো প্রিমিয়াম ১৫০%ও হতো), ডলারের এই ক্রয়-বিক্রয় থেকে প্রচুর দেশি অর্থ তাদের হাতে চলে আসতো। ফলে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশ্নটি তখনও বিবেচনায় নেয়া হয়নি। স্বাধীনতা উত্তরকালে পাটশিল্পের জাতীয়করণ এবং পরবর্তীতে বেসরকারিকরণসহ এই শিল্পকে ঘিরে নানা অনিশ্চয়তার কারণে দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়টি যথাযথভাবে সামনে আসেনি। নতুন যন্ত্রপাতি ও সেগুলি চালানোর ক্ষেত্রে শ্রমিকদের কারিগরী দক্ষতা- এটাই হলো পাটশিল্পে সামগ্রিক দক্ষতার বিষয়। মনে রাখতে হবে, আমাদের রাষ্ট্রায়ত্ব পাটখাতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি শত বছরের পুরানো। এগুলোকে কেউ কেউ বলেন- “স্কটল্যান্ড টেকনোলজি”, যার উদ্ভাবন ঘটেছিল ১৮৮২ সালে। ব্রিটিশদের হাতেই এর গোড়াপত্তন। সেই একই যন্ত্রপাতি দিয়ে কারখানা গড়ে উঠলো ভারতে। পাকিস্তান আমলেও ঐ একই টেকনোলজির ব্যবহার হতে থাকলো। স্বাধীন বাংলাদেশেও রাষ্ট্রায়ত্ব খাতে ঐ একই যন্ত্রপাতির ব্যবহার চলছে। রাষ্ট্রায়ত্ব পাটখাতে এখন যে ধরণের তাঁত আছে, সেরকম একটি তাতঁ দিনে ১৬ ঘণ্টা চালাতে ৫ জন শ্রমিক দরকার হয়। বছরে ৩০০ দিন ৫ জন শ্রমিক যদি এই তাঁতটি চালায় তাহলে উৎপাদন হবে সর্বসাকুল্যে ১৬ টন। যদিও বাস্তবে এর চেয়েও কম পাওয়া যাচ্ছে এখন। ফলে পাটের দাম ও শ্রমের মজুরির হিসাব ও উৎপাদিত পণ্যের দাম বিবেচনায় নিলে লোকসান হওয়া ছাড়া কোনো পথ নেই। এটাই ঘটছে এখন। ফলে এই টেকনোলজি দিয়ে কোনভাবেই আর পাটশিল্পকে লাভজনক করার সুযোগ নেই। তাছাড়া নতুন প্রযুক্তির তাঁত স্থাপন না করে পুরাতন তাঁতের সংস্কারের (বিএমআর) জন্য টাকা ব্যয় করলে সেটা অর্থের আরেক অপচয় ছাড়া আর কিছু হবে না। সুতরাং রাষ্ট্রায়ত্ব পাটখাতটি কেন আজ লোকসানী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে- সেটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধি না করে, উৎপাদন না বাড়িয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানই টিকে থাকতে পারে না, লাভজনক হওয়াতো আরো দূরের কথা। দুর্ভাগ্যজনক হলো, এরকম একটি অদক্ষ প্রতিষ্ঠানের ওপরই বছরের পর বছর ভর করে টিকে থাকে একটা আমলাতন্ত্র, যার বেতন-ভাতা টেনে চলেছে এই শিল্প। সরকার এখন অভিযোগের তীর ছুড়ছে শুধু শ্রমিকদের মজুরির দিকে- কিন্তু আসল সংকটের দিকে তার নজর নেই। সরকারি পাটকলগুলো কীভাবে লাভজনক হতে পারে? রাষ্ট্রায়ত্ব পাট শিল্পকে কীভাবে লাভজনক করা যাবে তার ইঙ্গিতটা ওপরের অধ্যায়েই দেয়া হয়েছে। মোদ্দাকথা হলো পুরানো যন্ত্রপাতি ছুড়ে ফেলে নতুন যন্ত্রপাতি বসাতে হবে। নতুন যন্ত্রের প্রয়োজনে শ্রমিকদের কারিগরী দক্ষতা বাড়াতে হবে। বর্তমানে বিজেএমসি পরিচালিত ২২টি কারখানায় হেসিয়ান, সেকিং এবং সিবিসি- এই তিন ধরণের মোট ১০ হাজার ৮৩৫টি তাঁত রয়েছে। আধুনিক স্বয়ংক্রিয় তাঁতের তুলনায় এগুলির উৎপাদন ক্ষমতা অত্যন্ত কম এবং পুরাতন হয়ে যাবার কারণে উৎপাদন ক্ষমতা আরো কমে গেছে। হেসিয়ান তাঁতের পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতা ১৬ টন, সেকিং তাঁতের ৩৯ টন এবং সিবিসি তাঁতের ১৮ টন। অথচ চায়নিজ Tungda TD 788 Model Ges Victor 1101 Jute Rapier Loom স্বয়ংক্রিয় তাঁত ব্যবহার করলে বছরে ৩৬ টন উৎপাদন করা সম্ভব। আর বুদ্ধিমত্তার সাথে সরবরাহ চুক্তি করতে পারলে তাঁত সরবরাহকারী কোম্পানিগুলিই শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে পারে। পাটের সরবরাহ ও পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারলে স্বাভাবিকভাবেই পাটশিল্প নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে। আমাদের হিসাব মতে, নতুন টেকনোলজি ব্যবহারের ফলে গড় উৎপাদন ৬০ ভাগ বেড়ে যাবে। উৎপাদিত পণ্যের বিক্রয়মূল্য শুধু হেসিয়ান তাঁত থেকেই আসবে ১৩০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া সেকিং ও সিবিসি থেকে আসবে আরো প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। ফলে বিজেএমসি তখন আত্মনির্ভরশীল একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। কোনো ধরণের সরকারের আনুকূল্য ছাড়াই সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক নিয়মে পরিচালিত হবে। যন্ত্রপাতির আধুনিকীকরণ শুধু রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকলগুলির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়। বেসরকারি পাটকলগুলোকেও এই ধারা চালু করতে হবে। সেক্ষেত্রে তাদেরকে কী ধরণের নীতি ও আর্থিক সহায়তা দেয়া দরকার- সরকারকে তা ভেবে দেখতে হবে। সবশেষ কথা আমরা বাংলাদেশে পাটশিল্পের একটা নব-জীবন চাই। এই নতুন জীবন গড়ার ভিত্তি হলো- জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পাটপণ্যের যে বর্ধিত চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে সেটাকে কাজে লাগানো ও নতুন যন্ত্রপাতি দিয়ে কারখানাগুলিকে নতুন করে সাজিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করা। বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে প্রাকৃতিক তন্তু পাটের তৈরি পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। পাটপণ্যের বহুমুখিকরণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে এই সুযোগকে আমরা ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারি। পাট এখনো আমাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত। কিন্তু মোট রপ্তানিতে এর হিস্যা অতি নগণ্য। পাটশিল্পের আধুনিকীকরণের মধ্য দিয়ে আমরা এটাকে বৃদ্ধি করতে পারি। সে ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর ৮০% নির্ভরতা কমিয়ে এনে একটি শক্তিশালী রপ্তানি ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব। এটা দেশীয় অর্থনীতির ভিত্তিকে আরো মজবুত করবে। পাট চাষ ও পাট শিল্প বাংলাদেশের ঐতিহ্য। পাট দেশের প্রধান অর্থকারী ফসল। আঁশ জাতীয় কৃষি ফসলের মধ্যে বিশ্বে তুলার পরই পাটের স্থান। দেশের প্রায় ৫০ লাখ কৃষক পাট চাষের সাথে যুক্ত। পাট চাষ, প্রক্রিয়াকরণ, পাট ও পাট জাতীয় বিভিন্ন উপকরণ তৈরি ও বাণিজ্যের সাথে প্রায় ৪ কোটি মানুষের জীবন জীবিকা জড়িত। বাংলাদেশের অর্থকরী ফসলের মধ্যে একমাত্র পাট খাতই শতভাগ মূল্য সংযোজনকারী। পশ্চাৎ ও সম্মুখ সংযোগ শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ঐতিহাসিকভাবে পাটের অর্থনীতি আমাদের গোটা অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সর্বোপরী আমাদের মনে রাখতে হবে ’৬৯-এর গণঅভ্যূত্থানসহ বাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের আন্দোলনের দাবির সাথে পাটশিল্প অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের অভ্যূদয় এবং ‘৭২’র এর সংবিধানে পাট, পাটশিল্পকে জাতীয় সম্পদ, জাতীয় ঐতিহ্য ও গৌরবের ধারক হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। সেকারণে এটা শুধু সম্পদই নয়; বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতির অংশ। পাট এবং পাটশিল্প ধ্বংস হওয়ার অর্থ বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অন্যতম উপাদানকে ধ্বংস করে দেয়া। আমরা কোনোভাবেই এটা হতে দিতে পারি না। তাই, অবিলম্বে রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিল করে, পাটকল চালু ,আধুনিকায়ন এবং উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি। একই সাথে এই দাবিতে সচেতন মানুষকে এগিয়ে এসে ,পাট ও পাটশিল্প বাঁচানোর সংগ্রাম জোরদার করার আহ্বান জানাচ্ছি । লেখক: আহ্বায়ক, পাট-সুতা ও বস্ত্রকল শ্রমিক-কর্মচারি সংগ্রাম পরিষদ

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..