রাষ্ট্র ও পার্টি সংগঠন: নৈরাজ্যবাদ বনাম মার্কসবাদ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
ডা. মনোজ দাশ: রাশিয়ান বিপ্লবী বাকুনিন ছিলেন নৈরাজ্যবাদের জনক। ১৮৪৩ সালে প্যারিসে থাকাকালে বাকুনিনের সাথে মার্কসের আলাপ হয়। ১৮৬৪ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক গঠিত হওয়ার পর লন্ডনে আবার তাদের দেখা হয়। বাকুনিন প্রথম আন্তর্জাতিকের হয়ে কাজ করবেন বলে মার্কসকে প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু বাকুনিন কথা রাখেননি। রাষ্ট্র, পার্টি সংগঠন ও রাজনৈতিক আন্দোলন নিয়ে বাকুনিন এক নৈরাজ্যবাদী ও অবৈজ্ঞানিক ইউটোপিয় চিন্তা তৈরি করে মার্কসের সাথে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। বাকুনিনবাদের ডালপালার সাথে উত্তর আধুনিক চিন্তার কিছু ধারার ফিউশনে তৈরি হয়েছে এক নতুন ধরনের নৈরাজ্যবাদ, যা কমিউনিস্ট পার্টিগুলির মধ্যে নব্য উদারতাবাদের জন্মের পথ প্রসারিত করতে পারে। মাও সেতুং বর্ণিত উদারতাবাদের তুলনায় এই নব্য উদারতাবাদ নতুন অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে কমিউনিস্ট পার্টিগুলির ভেতর-বাইরে আরো বেশি প্রকাশ্য ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। রাষ্ট্র প্রশ্নে বাকুনিনের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে মার্কসবাদের মৌলিক পার্থক্য আছে। বাকুনিন মনে করতেন, প্রধান ক্ষতিকর যে বস্তুটি ধ্বংস করতে হবে তা পুঁজি নয়, উৎপাদনের উপায়ের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা নয়, রাষ্ট্র। তাঁর মতে, যে-কোন রাষ্ট্রই পুরোপুরি ক্ষতিকর। বিপ্লবের পরপরই রাষ্ট্র বিলুপ্ত করতে হবে। শুধু রাষ্ট্র নয়, সমাজেও কোনো কর্তৃত্ব মানতে তিনি রাজি নন। কিন্তু বিপ্লবের পর রাষ্ট্র ছাড়া, সমাজের কোনো সংগঠন ও কর্তৃত্ব ছাড়া কিভাবে বিকল্প পন্থায় সমাজ পরিচালিত হবে সে সম্পর্কে কোনো গভীর অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় তিনি দিতে পারেন নি। সমাজে শ্রেণি থাকবে, শ্রেণিদ্বন্দ্ব থাকবে; কিন্তু কর্তৃত্ব থাকবে না- এমন এক অবৈজ্ঞানিক ইউটোপিক চিন্তার দ্বারা চালিত হয়েছেন বাকুনিন। বিপ্লবের পর রাষ্ট্র নিয়ে বাকুনিনের নৈরাজ্যবাদী চিন্তার বিপরীতে মার্কস এক দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন: প্রথমত মার্কসের মতে, বিপ্লবের পর স্রেফ তৈরি রাষ্ট্রযন্ত্রকে দখল করে নিজের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তা কাজে লাগাতে পারে না শ্রমিকশ্রেণি। এজন্য বিপ্লবের পরের প্রচেষ্টা হবে আমলাতান্ত্রিক সামরিক রাষ্ট্রযন্ত্রটাকে চূর্ণ করা। দ্বিতীয়ত, প্যারি কমিউনের পরাজয়ের কারণগুলিকে বিশ্লেষণের পরিপ্রেক্ষিতে মার্কস এটাও দেখান যে, শাসক শ্রেণির পুনরুত্থানকে প্রতিহত করার প্রয়োজনে বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণিকে তার নিজস্ব রাষ্ট্র, অর্থাৎ সংখ্যালঘু শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে সংখ্যাগুরু শোষিত মানুষের বিপ্লবী প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। কমিউনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সাবেকী রাষ্ট্রযন্ত্র ভাঙ্গার অবশ্য প্রয়োজনয়ীতা প্রমাণ করার সময় মার্কস বিপ্লবের পরপরই যে-কোনও রকম রাষ্ট্র বিলোপের নৈরাজ্যবাদী চিন্তার বিরোধিতা করেছেন। তিনি লেখেন: ‘যেটা কর্তব্য, তা হল সাবেকী সরকারি ক্ষমতার নিপীড়ক অঙ্গগুলিকে পরিষ্কার কেটে বাদ দেয়া, সেই ক্ষমতারই ন্যায্য কর্তব্যগুলি সমাজের ওপর অন্যায়ভাবে আধিপত্য দখলকারী একটি কর্তৃত্বের হাত থেকে কেড়ে নেয়া এবং সমাজেরই দায়িত্বশীল সেবকদের হাতে অর্পণ করা।’ তৃতীয়ত, বিপ্লবের পর শ্রমিকশ্রেণির নিজস্ব রাষ্ট্র, যার আর এক নাম শ্রমিকশ্রেণির একনায়কত্ব, যতই অপরিহার্য হোক না কেন, মার্কস-এঙ্গেলস তাকে চিরকালের জন্য অপরিহার্যরূপে বিবেচনা করেননি। মার্কসের মতে, শ্রমিকশ্রেণির নিজস্ব রাষ্ট্রের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র থেকে অ-রাষ্ট্রে উত্তরণ ঘটে। সমাজতন্ত্র ও রাজনৈতিক সংগ্রামের সমস্ত ইতিহাস থেকে মার্কস সিদ্ধান্ত টেনেছেন যে- ‘রাষ্ট্র অবশ্যই বিলুপ্ত হবে, তার বিলোপের উত্তরণের রূপ (রাষ্ট্র থেকে অ-রাষ্ট্রে উৎক্রমণ) হবে ‘শাসক শ্রেণি রূপে সংগঠিত শ্রমিকশ্রেণি।’ সুতরাং মার্কসের দৃষ্টিতে শ্রমিকশ্রেণির একনায়কত্ব একটি দ্বান্দ্বিক ধারণা, যা প্রথমত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রটিকে ধ্বংস করে, দ্বিতীয়ত একই সঙ্গে একটি নতুন রাষ্ট্রশক্তির জন্ম দেয় ও তৃতীয়ত অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বিকাশের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অবলুপ্তির পূর্বশর্তের সৃষ্টি করে। রাষ্ট্র ও ক্ষমতার তন্ত্রজাল প্রশ্নে উত্তর আধুনিকতার সাথেও মার্কসবাদের মৌলিক পার্থক্য আছে। উত্তর আধুনিকতা রাষ্ট্রকে আড়াল করে অন্য জায়গায় ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের সন্ধান করে। উত্তর আধুনিকতার মতে, আধুনিক জগতে ক্ষমতা রাষ্ট্রের কাছে নেই। রাষ্ট্রক্ষমতা ও কর্তৃত্বের আর কোনো বিশেষ মালিক নেই; সমাজের সকলেই এই যন্ত্রের মধ্যে এক একটি অংশ। কোনো বিশেষ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা বা কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণিকে সরিয়ে দিয়ে এই রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন বা বিলুপ্তিসাধন সম্ভব নয়। তাদের মতে, ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বিরাজ করছে সর্বত্র। বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে, অর্থনৈতিক বৈষম্যে, ভাষায়, এমনকি প্রতি মানুষের মধ্যে এই ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব অব্যাহতভাবে ক্রিয়াশীল। এটি অজেয়, এর কর্তৃত্ব অনতিক্রম্য। উত্তর আধুনিকতার এই দৃষ্টিভঙ্গি মার্কসবাদের সাথে সাংঘর্ষিক। মার্কসবাদ মনে করে, ক্ষমতার প্রধান আশ্রয়স্থল রাষ্ট্র ও অর্থনীতি। মার্কসবাদ বিপ্লবের পর সমাজের অভ্যন্তরের বৈরি দ্বন্দ্ব ও কর্তৃত্বকেই শুধু নির্মূল করতে চায় না, একই সাথে অবৈরি দ্বন্দ্ব ও কর্তৃত্বের অবসান করে কর্তৃত্বহীন স্বশাসিত সর্বসাধারণের সমাজ প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। কিন্তু উত্তর আধুনিকতা রাষ্ট্র ও অর্থনীতির অন্তর্গত সামাজিক ব্যবস্থাটার কেন্দ্রে আঘাত না করে ক্ষমতাকে সমাজের ভেতরে ছড়ানো ছিটানো নানা জায়গায় খুঁজতে গিয়ে মূল ব্যবস্থাটাকে অক্ষত রাখতে চেয়েছে, যা মার্কসবাদের সাথে সরাসরি বিপরীত। সংগঠন প্রশ্নেও বাকুনিনের সাথে মার্কসবাদের কোনো মিলই নেই। সুনির্দিষ্ট নিয়ম-নীতি ও লক্ষ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত গণভিত্তিসম্পন্ন কোনো পার্টি গড়ে তোলার কোনো প্রয়োজন বাকুনিন স্বীকার করতেন না। তাঁর মতে, কয়েকজন বিপ্লবীর ছোট একটি গ্রুপ থাকাই যথেষ্ট। এই ছোট একটি গ্রুপই বিভিন্ন জায়গার বিপ্লবী আন্দোলনের সমন্বয় সাধন করবে। আর উত্তর আধুনিকতা সামগ্রিকভাবে বিচার না করে চিন্তার বৈচিত্র্য-গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার নামে, কর্তৃত্বের অভিযোগে গণতান্ত্রিক-কেন্দ্রিকতা-শৃঙ্খলা-সমালোচনা আত্মসমালোচনা ও যৌথ চিন্তা নির্মাণের ভিত্তিতে পরিচালিত কমিউনিস্ট পার্টির গোটা ধারণাটিকেই নাকোচ করে দেয়। উত্তর আধুনিকতার বক্তব্য হচ্ছে-সাংগঠনিক কাঠামোকে ঘিরে থাকে একাধিক পক্ষ। যার মধ্যে একটা হলো কর্তৃত্বকারী, অন্যটি প্রতিপক্ষ। কর্তৃত্বকারী পক্ষ তাদের মতো করে সংগঠনকে গড়তে চায়। আর কর্তৃত্বকারী অংশের প্রতিপক্ষরা বিরোধিতার মাধ্যমে সর্বনিয়ন্ত্রক সাংগঠনিক কাঠামো থেকে সংগঠনকে রক্ষা করে। এখানে বিরোধিতা করার অর্থ সমালোচনা-আত্মসমালোচনা নয়। এই বিরোধিতা আসলে গণতান্ত্রিক-কেন্দ্রিকতাকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে সংগঠনের মধ্যে এক ধরনের স্বেচ্ছাচারের জন্ম দেয়া। আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য যে সাংগঠনিক শৃঙ্খলার দরকার হয় উত্তর আধুনিকতা সেদিকে গুরুত্ব দিতে রাজি নয়। এভাবে উত্তর আধুনিকতা সংগঠনের মধ্যে নৈরাজ্যকে উসকে দেয়। বাকুনিনবাদের ডালপালার সাথে উত্তর আধুনিক চিন্তার কিছু ধারার ফিউশনে তৈরি নব্য উদারতাবাদ একটু ভিন্নভাবে সংগঠনের মধ্যে নৈরাজ্যবাদের প্রসার ঘটায়। এই নব্য উদারতাবাদ অতি গণতন্ত্র চায়, কিন্তু কেন্দ্রিকতাকে মানতে গড়িমসি করে। নিজের স্বার্থের বিপক্ষে গেলে সাংগঠনিক নিয়ম-নীতি-শৃঙ্খলাকে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলে। অন্যের সমালোচনা করে, সমালোচনাকে সংগঠনের বাইরে নিয়ে আসে। কিন্তু আত্মসমালোচনা করে না। নব্য উদারতাবাদ চিন্তার বৈচিত্রের নামে যৌথ চিন্তায় বিশ্বাস করে না। ভিন্নমত প্রকাশের কোনো নিয়মতান্ত্রিক কাঠামো তারা মানতে রাজি নয়। সীমাহীন অধিকার ও স্বাধীনতা চায়। অধিকার ও স্বাধীনতার সাথে দায়িত্ব ও কর্তব্যের দ্বান্দ্বিক ঐক্য তারা বোঝে না। ব্যক্তির অহং তাদের কাছে বড় কথা। কমিউনিস্ট নৈতিকতা তাদের কাছে এক অলীক কল্পনা। সংগঠন প্রশ্নে নৈরাজ্যবাদের সাথে বিপ্লবী পার্টির সুস্পষ্ট পার্থক্য আছে। প্যারি কমিউনের পতনের পর ১৮৭২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম আন্তর্জাতিকের হেগ কংগ্রেস বাকুনিনপন্থিদের বিরোধিতা সত্ত্বেও বিজয় সূচক সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শর্তরূপে রাজনৈতিক সংগ্রামের অবশ্য প্রয়োজনীয়তা এবং লৌহদৃঢ় শৃঙ্খলার প্রলেতারীয় পার্টি গঠনের শুধু স্বীকৃতিই প্রদান করে না, এটা হয়ে দাঁড়ায় আন্তর্জাতিক-এর সকল সদস্যের জন্য পালনীয় সাংগঠনিক নিয়ম। কংগ্রেস সংগঠন বিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য বাকুনিনকে বহিষ্কার করে। মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন কমিউনিস্ট পার্টিকে দেখেছেন শ্রমিকশ্রেণি ও অন্যান্য শ্রমজীবী জনগণের অগ্রবাহিনী, সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের জন্য সংগ্রামের সবচেয়ে সংগঠিত-সচেতন-অগ্রসর-সুশৃঙ্খল ও দৃঢ়চিত্ত বিপ্লবী রাজনৈতিক দল হিসেবে। গণতান্ত্রিক-কেন্দ্রিকতার নীতিই হল কমিউনিস্ট পার্টির আসল প্রাণসত্তা। মতাদর্শগত ঐক্য, ইচ্ছার ঐক্য ও কাজের ঐক্যের সাংগঠনিক শৃঙ্খলার দ্বারা পার্টি একসূত্রে গ্রথিত। পার্টির আভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সমালোচনা ও আত্মসমালোচনা। পার্টি নেতৃত্বের যৌথতাই সংগঠনের সফল ক্রিয়াকলাপের আবশ্যিক পূর্বশর্ত। নিজস্ব মতামত যাই হোক না কেন, সকল পার্টি সদস্যকেই পার্টির গৃহীত সিদ্ধান্ত ও মত অনুসারে কাজ করতে হবে, অনুমতি ছাড়া পার্টির মৌলিক নীতি-আদর্শ-লক্ষ্য ও গৃহীত সিদ্ধান্তের পরিপন্থি কোনও মত কোনভাবেই প্রচার করা যাবে না; এটাই লেনিনীয় কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ নিয়ম। রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রশ্নে বাকুনিন, উত্তর আধুনিকতা ও নব্য উদারতাবাদের সাথে রয়েছে মার্কসবাদের বিরাট পার্থক্য। রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতি বাকুনিনের মনোভাব ছিল নেতিবাচক। প্রুধোঁর নৈরাজ্যবাদ ছিল সংস্কারধর্মী। আর বাকুনিনের নৈরাজ্যবাদের চরিত্র ইউটোপিয়, কিন্তু বিদ্রোহধর্মী। এজন্য তা তরুণদের জন্য মোহের ফাঁদ তৈরি করে। বাকুনিন স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থানের মধ্যে, বিদ্রোহের মধ্যে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় দেখতে পেয়ে তিনি জনগণকে অবিলম্বে অবিরাম ধ্বংসের জন্য আহ্বান জানান। বাকুনিনের প্রধান আশাভরসা ছিল শ্রেণিচ্যুত ব্যক্তি-উপাদান, লুম্পেন প্রলেতারিয়েতের ওপর। শ্রমিকশ্রেণির সংগঠিত লক্ষ্য অভিমুখি দীর্ঘ সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা তিনি স্বীকার করতেন না। উত্তর আধুনিকতাও সংগঠিত রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। তাদের মতে, রাজনীতির কোনো সামগ্রিক, সুদূরপ্রসারী ও সর্বজনীন লক্ষ্য নেই। রাজনীতি হলো স্থানিক ও খণ্ডিত। সংগ্রামের ধরনও তাই হতে হবে স্থানিক ও অনুসংগ্রাম পর্যায়ে। ধরা যাক মানব মুক্তির কথা। উত্তর আধুনিকতার মতে, যদি মানব মুক্তির প্রশ্নকে সমাজের অন্যান্য বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত করে মানব মুক্তির জন্য সামগ্রিক তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করে বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রস্তুতি নেয়া হয় তবে সেটা হবে ভুল পদক্ষেপ। তারা কোন সুশৃঙ্খল সচেতন আন্দোলন গড়তে চায় না। আন্দোলনকে স্বতঃস্ফূর্ততার হাতে সমর্পণ করতে চায় তারা। একদিকে আন্দোলনকে স্থানিক ও অনুসংগ্রামে বেঁধে রাখা, বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনকে অস্বীকার করা; অন্যদিকে আন্দোলনকে স্বতঃস্ফূর্ততার হাতে ছেড়ে দিয়ে সংগঠন করার দায় বহন না করা; এই হচ্ছে উত্তর আধুনিকতার আন্দোলন। আর উত্তর আধুনিকতার রাজনীতির ধারায় সিক্ত নব্য উদারতাবাদ লালন করে সংস্কারধর্মী এক সংশোধনবাদী রাজনীতি। মার্কসবাদ সংগ্রামের বিভিন্ন রূপকে দ্বান্দ্বিকভাবে সম্পর্কিত করে। শ্রেণিসংগ্রামকে সমাজের চালিকা শক্তি রূপে গণ্য করে। মার্কসবাদের কাছে সংগ্রামের বিভিন্ন রূপ (অর্থনৈতিক, স্থানিক বা/ও অনুমাত্রিক এবং পূর্ণমাত্রিক) শুধু পরস্পর সম্পর্কিতই নয়, শেষ বিচারে প্রত্যেকটা শ্রেণিসংগ্রামই হলো রাজনৈতিক সংগ্রাম। বাকুনিনবাদ, উত্তর আধুনিকতা ও নব্য উদারতাবাদসহ সব ধরনের নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে আদর্শিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মার্কসবাদ সচেতন-সংগঠিতভাবে মেহনতিদের শ্রেণিসংগ্রামের সর্বপ্রধান এবং নিষ্পত্তিমূলক রূপ রাজনৈতিক সংগ্রামের মাধ্যমে মেহনতিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..