উত্তরাঞ্চলের বন্যা : দুর্ভোগ আর কতোদিন?

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মাহমুদুল গনি রিজন : প্রতিবছরের মতো এই বছরও বন্যা পরিস্থিতির মুখোমুখি দেশবাসী। এবছর স্বাভাবিক বন্যার চেয়ে বেশী বন্যা হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলে তৃতীয় দফার বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। বন্যার পানি কমার সাথে সাথে শুরু হয়েছে তীব্র ভাঙ্গন। ভাঙ্গনের ফলে এবছরেও শুধু গাইবান্ধা জেলায় বসতভিটে হারিয়েছে সাড়ে সাত হাজার পরিবার। ইতোমধ্যে বন্যা পরিস্থিতির সার্বিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও দুর্ভোগ কমেনি বানভাসি মানুষের। জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়া নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করার সাথে সাথে বাড়ছে ভাঙনের তীব্রতা। ভাঙনে নদী তীরবর্তী এলাকার বানভাসি মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে জেলার চার উপজেলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মন্দিরসহ গুরুত্বপূর্ন অনেক স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বন্যা আর ভাঙ্গনের ফলে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার পরিবার এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে। এছাড়াও বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে দেখা দিচ্ছে নানা ধরণের পানিবাহিতরোগ, বিশুদ্ধ পানি খাবারের অভাবে পেটেরপীড়াসহ বিভিন্ন ধরণের রোগবালাই দেখা দিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি এই বন্যার ভয়াবহতা সম্পর্কে পরিবেশ আন্দোলন কর্মী কৃষিবিদ সাদেকুল ইসলাম গোলাপ বলেন, নদীগুলোর ড্রেজিং না হওয়ায় বন্যাবাহিত পলি এবং নদী ভাঙ্গনজনিত মাটি জমতে জমতে নদীর তলদেশ বাঁধের বাইরের জমির চেয়ে উঁচু হয়েছে। ফলে উজান থেকে আসা স্বল্প পানির প্রবাহে নদী উপচে যাচ্ছে। তার সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় উজানে বরফ গলিত পানির প্রবাহ এবং মৌসুমি বায়ুজনিত বৃষ্টি এককার হয়ে নদীতে জলপ্রবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়াও আমাদের বন্যার আরও একটি কারণ হচ্ছে অপরিকল্পিত সড়ক, কালভার্ট নির্মাণ ও সময়মত বাঁধ সংস্কার না করা। এর ফলে বাঁধের বাইরের এলাকায় বৃষ্টিজনিত জলাবদ্ধতা হয়ে সহজে পানি নদীতে চলে যেতে পারে না। যার ফলে এবারের ২০২০ সালের বন্যা এত দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। করোনা মহামারির এই সংকট কালে জেলার বানভাসি মানুষ এখন দিশেহারা। জেলার সাঘাটা, ফুলছড়ি, সুন্দরগঞ্জ ও সদর উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ঘাঘট ও বাঙ্গালী নদীর ¯্রােতের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওযায় নদী ভাঙন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ইতোমধ্যে যমুনা নদীগর্ভে বিলিন হয়েছে জেলার সাঘাটা উপজেলার গোবিন্দপুর উচ্চ বিদ্যালয় ভবন, ফুলছড়ি উপজেলার চর কাবিলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয, ঝানঝাইড কমিউনিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পশ্চিম কালাসোনা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৪টি। অস্থায়ীভাবে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া এসব বিদ্যালয়। এছাডাও হুমকির মুখে আছে ওই উপজেলা দুটির জিগাবাডী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চৌমোহন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এদিকে গাইবান্ধা সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়নের গো-ঘাট এলাকার বন্যা নিযন্ত্রন বাঁধ সংস্কার না করায় নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ শুকনো মৌসুমে বাধঁটি সংস্কারের কোন উদ্যোগ নেয়নি গাইবান্ধা পানি উন্নযন বোর্ড । ফলে সম্প্রতি ভাঙনের কবলে পড়ে ওই এলাকার ঐতিহ্যবাহি পুরাতন দূর্গামন্দিরসহ শতাধিক বসতবাড়ি ও সংলগ্ন জমি এবং গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এছাডা স্লুইসগেট, কামারজানি ইউনিযন পরিষদ কার্যালয, উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কামারজানি বন্দর, মার্চেন্ট হাইস্কুলসহ ৫শ’ পরিবারের বসতবাড়ী ও আবাদি জমি এখন ভাঙনের আশংঙ্খায় রয়েছে। এছাড়াও সদর উপজেলার মোল্লারচর ইউনিযনে গত দু’সপ্তাহে বাজে চিথুলিয়া ও চিথুলিয়া গ্রাম দুটির ৩১৮টি পরিবার নদী ভাঙনে গৃহহারা হয়েছে। অপরদিকে সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের দীঘলকান্দি, গোবিন্দপুর, পাতিলাবাড়ি, নলছিযা, কালুরপাড়া ও বেড়া গ্রামের দু’শতাধিক ঘরবাড়ী নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সাঘাটা ইউনিয়নের দক্ষিণ সাতালিযা, উত্তর সাথালিযার ফ্লাড সেন্টার, গোবিন্দী, হাটবাড়ী, বাঁশহাটা, হাসিলকান্দি মৌজার প্রায় ২শ’ পরিবারের ঘরবাডী নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙ্গনের শিকার এসব পরিবার অন্যত্র গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। ওই উপজেলায় ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে আশেপাশের দু’শতাধিক বসতবাডী। ফলে ভাঙন কবলিত মানুষ দ্রুত তাদের বাড়ীঘর সরিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। একই উপজেলার কচুয়া ইউনিয়নে বাঙ্গালী নদীর ভাঙনে রামনগর গ্রামের বসতবাড়ী ও প্রচুর আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ১৫টি পরিবার মারাত্মকভাবে ভাঙন কবলিত হয়েছে। ভাঙ্গন অব্যাহত আছে ওই উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের প্রায় ১০টি গ্রাম। এছাডা ফুলছড়ি উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে ব্যাপক নদী ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ভাঙনে চরম হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে এরেন্ডাবাডী ইউনিযন পরিষদ ভবন, পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র, ওই ইউনিয়নের জিগাবাডী উচ্চ বিদ্যালয, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি বাজার, নুরানী হাফিজিয়া মাদ্রাসা, ঈদগা মাঠ, একটি বিএস কোয়াটার, দুটি জামে মসজিদ, ৩টি মোবাইল টাওয়ার। ভাঙ্গন অব্যাহত আছে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর, হরিপুর ও কাপাসিয়ার পোড়ার চর এলাকা। জেলা প্রশাসন জানিযেেছ, জেলার সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা, সাদুল্লাপুর, গোবিন্দগঞ্জ ও সদর উপজেলাসহ ৬টি উপজেলার ৪৪টি ইউনিযন বন্যা কবলিত হয়েছে। বন্যার কারণে ৩৫ হাজার ৫৫১টি পরিবারের ২ লাখ ৫০ হাজার ৭৮৬ জন মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। জেলা ত্রাণ দপ্তর জানিয়েছে, এ পর্যন্ত বন্যার্তদের মধ্যে ৫১০ মে টন চাল, ৩০ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও ৫ হাজার ৬৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কে সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য মিহির ঘোষ বলেন, করোনা মহামারির এসময় অসহায় বানভাসি মানুষগুলো এমনিতেই দিশেহারা অবস্থার মধ্যে ছিল। তার উপর দীর্ঘমেয়াদি এবারের বন্যা তাদের জন্য ‘মরার উপর খরার ঘা’। বানভাসি মানুষের পাশে দাড়াতে সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বন্যা মোকাবেলায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কোন পরিকল্পনা নেই। বন্যাকালীন সময়ে জনপ্রতি ত্রানের যে বরাদ্দ, তা রীতিমত ভানভাসি মানুষদের সাথে উপহাস করা ছাড়া আর কিছুই নয়। বন্যা মোকাবেলায় সরকারের কোন সমন্বয় নেই। দুর্নীতিতে নিমজ্জিত সরকারের সকল প্রতিষ্ঠান। বার বার বন্যা আসে বন্যা যায়। বন্যার কবলে পড়ে নিঃশ্ব হয় হাজার হাজার মানুষ। বাপদাদার পৈত্রিক ভিটেমাটি চোখের সামনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ভাঙ্গন কবলিত এসব মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বংশ পরম্পরায় সমাজবদ্ধ পরিবার থেকে। ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে নদীতীবর্তী এসব অসহায় মানুষ স্তানান্তরিত হয়ে বসতভিটে পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। এ চিত্র অহরহ এখন নদীতীরবর্তী মানুষগুলোর। অসহায় মানুষগুলো রাষ্ট্রের কাছে প্রার্থণা জানায়, প্রতিকারের। কিন্তু প্রতিকার পায় না। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় এই যুদ্ধ কতদিন চলবে কেউ তা বলতে পারে না। অথচ বৈশ্বিক এই সমস্যা নিরসনে কতই না আয়োজন চলছে বিশ্বব্যাপী?

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..