বন্যার্ত হাওরবাসী : অনিশ্চিত জীবন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

গাগলাজুর, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোণা। [ ছবি: মশিউর রেজা ]
অর্ণব সরকার ঃ দেশের বিভিন্ন জেলা ভয়াবহ বন্যায় ভাসছে। ভারি বৃষ্টি ও উজানের ঢলে বন্যা পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে তিনবার বন্যা হয়েছে দেশের অনেক জায়গায়, বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে। সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সিলেট এই সাত জেলার ৭ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর জলাভূমিতে ৪২৩টি হাওর নিয়ে এই হাওরাঞ্চল। ২০০৪ সালের পর এবারই এত বড় বন্যার ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে উত্তরবঙ্গ ও হাওর অঞ্চলের মানুষ। দেখা যাচ্ছে, প্রায় ১৪/১৬ বছর অন্তর অন্তর এই ধরনের ভয়াবহ বন্যা হাওরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হচ্ছে। ১৯৭৪ ও ১৯৮৮ সালেও আমাদের দেশে একই ধরনের বন্যা হয়েছিল। হাওরাঞ্চল এমনিতেই বছরের ছয় মাস বন্যার পানির নিচে ডুবে থাকে। বন্যা, আগাম বন্যায় ফসল তলিয়ে যাওয়ার ঘটনাও প্রায় বছরই হয়ে থাকে। প্রকৃতির সাথে লড়াই করেই যুগ যুগ ধরে এ হাওরাঞ্চলের মানুষ টিকে আছে। কিন্তু এবারের বন্যা হাওরবাসীকে বেশি বিপাকে ফেলেছে। হাওরে বন্যার পানি থৈ থৈ করছে। বসতঘর থেকে গোয়ালঘর সর্বত্র পানি ঢুকে পড়েছে। বন্যার মধ্যে কোথাও কোথাও ঝড়ে দোকানপাট, বাড়িঘর, গাছপালা উপড়ে পড়ছে। উপজেলার সরাসরি যান চলাচলও বন্ধ রয়েছে। বন্যার আগে থেকেই করোনা ভাইরাসের কারণে সীমিত ছিল মানুষের চলাচল, কাজকর্ম। বন্যা ও করোনা এই দুই কারণেই কাজ নেই হাওর পাড়ের দরিদ্র মানুষের। প্রতিবছর এই সময়টায় হাওরবাসী মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো। বন্যার কারণে তারা মাছ ধরতে পারছেন না। আবার যারা এই বর্ষার সময় অন্যান্য জেলায় কাজের আশায় যেত তারা বাড়ি থেকে বের হতে পারছেন না। আবার অনেক মানুষ চাকুরি হারিয়ে গ্রামে ফিরে এসেছে। ফলে গ্রামে এখন বেকার মানুষের সংখ্যা যেকোনও সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকে পানিবন্দি হয়ে না খেয়েই দিন পার করছেন। দিন এনে দিন চালানো মানুষগুলো কী কষ্টে আছে তা বলে শেষ করা যাবে না। মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে ত্রাণের আশায় বসে থাকলেও তাদের জন্য কোনো খাবারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করেনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। এমনকি ঠিকমতো তাদের কোনো খোঁজখবরও নেয়া হচ্ছে না। বন্যার্তদের মাঝে যে ত্রাণসামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। টিউবওয়েলগুলো ডুবে যাওয়ায় খাবারের পাশাপাশি পানীয় জলের সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। অনেকে বন্যার পানিই গরম করে খেতে বাধ্য হচ্ছে। হাওরের বড় কৃষকের গোলা ভরা ধান থাকে। সেখান থেকে সে সারা বছর ধান বিক্রি করে সংসারের অন্যান্য খরচাদি মেটায়। কিন্তু হাওরের ক্ষেতমজুরসহ বর্গাচাষিরা ধান কাটার মৌসুমে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে সারাবছরের খোরাকির ধান ঘরে মজুত রাখতে। বর্তমানের কর্মহীন অবস্থায় জীবন বাঁচানোর জন্য সেই খোরাকির ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। অনেকেই আবার চড়া সুদে মহাজনী ঋণ নিচ্ছে। তাই, বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অসহায় বানভাসী মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাবার পানিসহ ত্রাণসামগ্রী আশ্রয়কেন্দ্রে ও বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের চিকিৎসার নিশ্চয়তার জন্য আশ্রয়কেন্দ্রে মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করতে হবে। সকল প্রকার ঋণের কিস্তি আদায় মওকুফ করে নতুন করে হাওরের অসহায় পরিবারগুলোকে বিনাসুদে ঋণ দিতে হবে। প্রচুর গো-খাদ্য যোগান দেওয়া, থানার তদরকিতে প্রতি ইউনিয়নে টহল নৌকায় গ্রামগুলিতে খোঁজখবর নেয়া, হাওর এলাকার যেসকল পরিবারের ঘরবাড়ি নষ্ট হয়েছে, তাদের তালিকা করে সাহায্যের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যদিকে গোলায় ও গুদামে থাকা প্রায় দেড় কোটি টন ধানের বড় অংশ হচ্ছে ভেজা, যার এক কোটি টন আছে দেশের হাওর ও উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে। এসব জেলায় ধান শুকানোর পর্যাপ্ত রোদ না পাওয়ায় ধানের মান দিন দিন খারাপ হচ্ছে। অন্যান্য এলাকায় বন্যায় আমন বীজতলা ছাড়াও বিভিন্ন সবজির ক্ষেত বন্যায় ধ্বংস হয়ে গেছে। শ্রমের দ্বারা লালিত কৃষকের স্বপ্ন বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। পুকুর ডুবে মাছ ভেসে গেছে। এতে এসকল কৃষক ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বসতঘর থেকে গোয়ালঘর সর্বত্র পানি ঢুকে পড়েছে। বাড়ির আঙিনায় ৫-৬ ফুট পানি। আবার হাওরের উত্তাল ঢেউয়ে কোনো কোনো বাড়ির উঁচু ভিটেমাটি ভেঙে যাচ্ছে। বসতভিটে রক্ষায় বাঁশের খুঁটি পুঁতে দিচ্ছেন বাড়ির চারপাশে। ঘরের ভেতরে চৌকিতে কোনোরকমে দিনাতিপাত করছেন অনেকে। অনেকেই আবার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন। এক একটি রুমে ভিন্ন পরিবারের লোকজন থাকায় করোনা নিয়েও চিন্তিত বন্যার্ত মানুষজন। দেখা গেছে, দুর্গম হাওর এলাকায় এখনো পৌঁছায়নি পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হাওর এলাকার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোয় দেখা দিয়েছে শুকনো খাবারের সংকট। আয়-রোজগার বন্ধ থাকায় খেটে খাওয়া মানুষেরা চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছেন। ত্রাণই একমাত্র ভরসা তাদের। হাওরাঞ্চলের যুবকদের কর্মসংস্থানের কোন ব্যবস্থা নেই। সেখানে সরকারি উদ্যোগে ট্রেনিং সেন্টার ও শিল্প এলাকা গড়ে তোলা জরুরি। নদী ড্রেজিং করে সেই মাটি সরকারি খাসজমি ভরাট করে প্রত্যেক ইউনিয়নে যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির নির্দিষ্ট এলাকা গড়ে তোলা যায়। সেখানে গরুর খামার, হাঁস-মুরগির খামার, মাছের পোনা উৎপাদনের খামার, হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। ইজারা প্রথা বাতিল করে হাওরে যাতে অবাধে সকলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ ও নিজেরা খেতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। দেখা যায়, ইজারাদাররা ১০-১২ বছরের জন্য হাওরের জলাশয়ের নির্দিষ্ট জায়গা ইজারা নিলেও তারা পুরো হাওরজুড়েই রাজত্ব গড়ে তোলে। বর্ষাকালেও নিজের বাড়ির সামনেও কাউকে মাছ ধরতে দেয় না। ইজারা নেওয়ার প্রথম তিন বছর মাছ ধরার নিয়ম না থাকলেও দেখা যায় প্রতিবছরই তারা মাছ ধরে। প্রথমে জাল নিয়ে এবং শেষ পর্যন্ত বিষ প্রয়োগে মা মাছ, পোনা সব ধরে নিয়ে যায়। ফলে এসব লোভী ইজারাদারদের কারণে হাওরে আজ মাছ অনেক কমে গেছে। হাওরের গ্রামগুলি পানির উপর ভাসমান দ্বীপের মতো দুঃস্বপ্নপুরিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এককালে হাওরের গ্রামগুলি জন্মলগ্ন হওয়ার আগেই বাড়ির পাশে বাঁশের খুঁটির প্যাচে চাইল্যাবন দিয়ে চেলাতুলে ও গ্রামের চতুর্দিকে থাকা হিজল গাছের বন ভরাবর্ষার ঢেউয়ের কড়াল থাবা বা আফাল থেকে রক্ষা করতো। গত ২০ বছরে অনেক বন উজার হয়ে গেছে। বাঁশ এখনও কিছু কিছু পাওয়া গেলেও হাওরগুলি বনশুন্য হয়ে যাওয়ায় বাড়ি বাঁধার বিকল্প আর কিছুই নাই। হাওরের গ্রামগুলো রক্ষায় হিজল-করচ গাছের বন প্রাকৃতিক বাঁধ হিসেবে ভূমিকা রাখতো, তেমনি দুপুর বেলা এই গাছের নীচে ধান কেটে ক্লান্ত মজুররা বিশ্রাম নিত। সেই গাছগুলো ইজারাদাররা কেটে শীতকালে মাছ ধরার জন্য কাটাল হিসেবে জলাশয়ে ব্যবহার করে। এই কারণে বর্তমানে হিজল গাছ নেই বললেই চলে। খাসজমি, গ্রামের চতুর্দিকে হিজল গাছ লাগাতে হবে। ইজারাদাররা যেন এই গাছ না কাটতে পারে তাও নিশ্চিত করতে হবে। হাওরবাসীকে বন্যা থেকে রক্ষায় ও কর্মসংস্থান তৈরি করে বেকারত্ব থেকে মুক্তি দিতে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সঠিকভাবে নদী, জলাশয় ও খালগুলো খনন ও বড় বড় ঢেউ থেকে (আফাল) রক্ষায় সরকারি উদ্যোগে টেকসই গ্রাম রক্ষা বাঁধ নির্মাণের বিকল্প নেই। লেখক: সহ-সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..