পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিলে বঙ্গভবন থেকে গণভবন মানবপ্রাচীর

ঈদের পর কনভেনশন, বৃহত্তর কর্মসূচি দেয়ার ঘোষণা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা প্রতিবেদক ঃ রাষ্ট্রীয় পাটকল বন্ধের গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল, গোল্ডেন হ্যান্ডশেক এর নামে বন্ধ বা পিপিপি নয় আধুনিকায়ন করে পাটকল চালু রাখা, সরকারের দুর্নীতি, লুটপাট, ভুলনীতি পরিহার এবং লোকসানের জন্য দায়ী বিজেএমসি ও পাট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বিচার এবং পাট, পাটশিল্প ও পাটচাষীদের রক্ষার দাবিতে বাম গণতান্ত্রিক জোটের উদ্যোগে ২০ জুলাই সকাল ১১ টা থেকে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত বঙ্গভবন থেকে গণভবন পর্যন্ত মানবপ্রাচীর কর্মসূচিতে হাজারও মানুষ অংশ নিয়েছে। ঢাকায় মানবপ্রাচীরের পাশাপাশি একই দাবিতে ওইদিন সারাদেশে মানববন্ধন ও বিক্ষোভসহ নানান কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ঢাকায় গণভবন থেকে বঙ্গভবন পর্যন্ত মানব প্রাচীর কর্মসূচিতে বিভিন্ন পয়েন্টে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ জোটভুক্ত বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতা ও বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। বক্তব্যে নেতৃবৃন্দ বলেন, লোকসানের অজুহাতে ২৬টি রাষ্ট্রীয় পাটকল সরকার গত ২ জুলাই বন্ধ ঘোষণা করেছে। অথচ লোকসানের প্রকৃত কারণ কি তা চিহ্নিত করে দূর করার কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বাম নেতারা বলেন, লোকসানের জন্য শ্রমিকরা দায়ী নয়, দায়ী সরকারের

দুর্নীতি, লুটপাট ও ভুলনীতি। এর দায় শ্রমিক ও জনগণ নেবে না। নেতৃবৃন্দ বলেন, যখন সারা পৃথিবীতে পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে, যখন ইউরোপের ২৮টি দেশ কৃত্রিম তন্তু, পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে; আমেরিকায় ২০২০ সালের পর দেড় হাজার কোটি টাকার পাটের শপিং ব্যাগের চাহিদা তৈরি হবে; বিশ্বে ৫০০০ কোটি পিস শপিং বেগের চাহিদা প্রতি বছর। তখন আমাদের এখানে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। অথচ পুরো পৃথিবীর চাহিদার মাত্র ৩ থেকে ৫% বাজার ধরতে হলে আমাদের বর্তমান কারখানাগুলো দিয়েও চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে না, লাগবে আরও আরও নতুন কারখানা। এমন সময়ে পাটকল বন্ধ করা কার স্বার্থে? এ সিদ্ধান্ত গণবিরোধী ও গোটা জাতির সাথে বিশ্বাস ঘাতকতার শামিল। বাম নেতারা বলেন, পাট এবং পাটকল আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে সম্পর্কিত। ফলে পাটকল বন্ধ করা মুক্তযুদ্ধের চেতনা ও অঙ্গীকারের সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করা। আমাদের সংবিধানেও রাষ্ট্রীয় খাত প্রধান, ২য় সমবায়, ৩য় ব্যাক্তিখাত- অথচ সরকার ব্যক্তিখাত কে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে সংবিধান লংঘন করে চলেছে। ‘তাছাড়া বর্তমান সরকার সবসময় বলে তারা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবে।

বঙ্গবন্ধু তো পাটকল জাতীয়করণ করেছিল, শেখ হাসিনা বন্ধ এবং বেসরকারিকরণ করছে। তাহলে প্রশ্ন হাসিনা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন নয়, লুটেরাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে ক্ষমতায় বসেছে,’ বলেছেন তারা। নেতৃবৃন্দ বলেন, লোকসানের মূল কারণ পুরোনো যন্ত্রপাতি, অদক্ষ ও মাথাভারী প্রশাসন, মৌসুমে পাট কিনতে সময়মতো অর্থ ছাড় করা না করা, পাট পণ্যের বহুমুখীকরণ না করা এবং দুনীতি ও লুটপাট। লোকসানের কারণসমূহ দূর করে আধুনিকায়ন করলে পাটকল লাভজনক করা সম্ভব। এ প্রস্তাব আমরা দিয়েছি। সরকার ১ হাজার কোটি টাকা দিয়ে আধুনিকায়ন না করে ৫ হাজার কোটি টাকা দিয়ে গোল্ডেন হ্যান্ডশেক করে পাটকল বন্ধ করছে। নেতৃবৃন্দ বলেন, সরকার পিপিপির নামে জনগণের সম্পদ ব্যক্তি মুনাফার হাতে তুলে দিতে চাচ্ছে। আগেও পিপিপির মাধ্যমে বহু কারখানা ব্যক্তিখাতে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে ৫৬টি প্রকল্প পিপিপিতে চলছে। তার অভিজ্ঞতা কি? ওই সব প্রকল্পের অনেকগুলো বন্ধ, অনেক কারখানার মালিক চুক্তি ভঙ্গ করেছে। নেতৃবৃন্দ বলেন, সরকার এমন সময়ে পাটকল বন্ধ ঘোষণ করলো যখন পাটের সৌসুম। ইতিমধ্যে পাটকল বন্ধ ঘোষণার পরই পাটের দাম মণ প্রতি প্রায় ৪০০/ ৫০০ টাকা কমে গেছে এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের ৪০ লাখ পাট

চাষী। ‘এমনিতেই আমাদের কাঁচা পাট ভারতে পাচার হয়, রাষ্ট্রীয় পাটকল বন্ধ হওয়ায় কাঁচাপাট পাচার আরও বাড়বে। সরকারের পাটকল বন্ধের এই সিদ্ধান্ত ভারতকেই লাভবান করবে,’ বলেছেন তারা। নেতৃবৃন্দ বলেন, ২০১৮ সালে জাতীয় পাট দিবসে শেখ হাসিনা বলেছিলেন পাট আমাদের সোনালি আঁশ, জাতীয় সম্পদ, পাটকল কোনোমতেই বন্ধ হবে না। ‘ওই দিন তিনি পাটের শাড়ি, পাটের জুতা, পাটের ভ্যানিটি ব্যাগ ব্যবহার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন আদমজী বন্ধ করেছে বিএনপি, খালেদা জিয়া তো পিয়ারে পাকিস্তান। আজ শেখ হাসিনা যে ২৫টি পাটকল বন্ধ করলেন, তাাতে ভারত লাভবান হবে। তাহলে জনগণ যদি প্রশ্ন করে শেখ হাসিনা কি তাহলে পিয়ারে হিন্দুস্থান? এর জবাব কি দেবেন?,’ প্রশ্ন বাম জোটের। নেতৃবৃন্দ বলেন, ৪৮ বছরে ব্যাংক ডাকাত, ঋণ খেলাপিদের ৪৫ হাজার কোটি টাকা সরকার মাফ করে দিয়েছে। রেন্টাল, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গত ১০ বছরে উৎপাদন না করেও বসিয়ে রেখে তাদের ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ভর্তুকি দিয়েছে ৬২ হাজার কোটি টাকা। অথচ ৪৮ বছরে ১০ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা পাটকলে লোকসান দিতে হয়েছে বলে চারিদিকে শোরগোল তোলা হচ্ছে। নেতৃবৃন্দ বলেন, সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার অজুহাত হিসেবে

লোকসানকে বড় করে দেখায়। কিন্তু এর সাথে যুক্ত শ্রমিক পরিবারের জীবিকা, সরকারকে গত ৪৮ বছরে এই কারখানাগুলো কত টাকা বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির বিল ও ট্যাক্স হিসাবে দিয়েছে? পাটচাষী, পাটকল শ্রমিক, কারখানার সাথে যুক্ত পরিবার, দোকানদার, ঝাড়–দারসহ তাদের মত কত মানুষের জীবিকা এবং কত হাজার হাজার শিশু-কিশোরের লেখাপড়া চলে এই পাটকলের উপর সেটা কখনো কি ভেবে দেখেছে সরকার? মানবপ্রাচীর চলাকালে বিভিন্ন পয়েন্টে হওয়া সমাবেশে সিপিবিসহ জোটভুক্ত দলের নেতারা বলেন, বাস্তবে শোষক লুটেরাদের দৃষ্টি পড়েছে জমিসহ পাটকলের ২৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ দখলে নেয়ার। সরকার ওই লুটেরাদের পক্ষে কাজ করছে। কিন্তু দেশের জনগণ তা হতে দিবে না। নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে রাষ্ট্রীয় পাটকল বন্ধের গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল, পাটকল আধুনিকায়ন করে রাষ্ট্রীয় পরিচালনায় চালু রাখার দাবি জানান। ‘এরপরও যদি সরকার তার গণবিরোধী সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে না আসে তাহলে ঈদের পর পাটচাষী, পাটকল শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতিবিদ, ছাত্র, সংস্কৃতিকর্ম, নারীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের কনভেনশন করে বৃহত্তর আন্দোলন এর মাধ্যমে সরকারকে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারে বাধ্য করা হবে,’ বলেন তারা।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..