ননতু: বন্ধু আমার

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

মাহমুদ সেলিম : ননতু আমার জীবনের সাথে এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে আজ মনে করাই কঠিন- ননতুর সাথে ‘প্রথম দেখা কোথায়।’ বরদোয়ালী স্কুলের প্রাথমিক ক্যাম্পে, না সরাসরি তেজপুরে। উজ্জ্বল চেহারার গান করা একটা ছেলে খুব সহজেই আমাকে আকর্ষণ করেছিল। বরদোয়ালী স্কুলের প্রাথমিক ক্যাম্পে নানা স্মৃতিময় দিনগুলির পর ট্রেনিংয়ের জন্য নির্বাচিত হই। দিনটি ছিল ২০ জুলাই ১৯৭১, আমার জন্মদিন। বরদোয়ালী স্কুল ক্যাম্প থেকে আমাদের বেশ কয়েকজনকে মিলিটারি লরিতে করে নিয়ে যাওয়া হলো অজানা একটা বাড়িতে। রাতটুকু কাটালে পরদিন ভোরে আমরা সশস্ত্র প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবো। রাতে যেখানে ছিলাম, সেখানে দেখলাম আমাদের বরদোয়ালী ক্যাম্পের একজন নেতা ইঞ্জিনিয়ার ইয়াফেস ওসমান। তিনি কীভাবে যেন জানতে পেরেছেন আমার জন্মদিনের কথা। তৎক্ষণাৎ সুকান্ত ভট্টাচার্যের ছাড়পত্র বইটি সংগ্রহ করে তাতে লিখে দিলেন - নূতন তব জনম লাগি কাতর যত প্রাণী, কারো ত্রাণ মহাপ্রাণ আনো অমৃতবাণী। তার উপর খাড়াভাবে লিখলেন ইয়াফেস ওসমান। হাতের লেখা খুব সুন্দর। বলাবাহুল্য, আমি তখনো ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীদের হাতের লেখার সাথে পরিচিত হইনি। পরদিন সকালে ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি পরিবহন বিমানে করে তেজপুর বিমান বন্দরে পৌঁছাই। সকালে নাস্তার পর ফলইন করিয়ে আমাদের ড্রেস, কম্বল, পিটঠু (হ্যাভারস্যাক) ও চেস্ট নাম্বার দেয়া হলো। কতো নাম্বার তা আজ মনে নেই। এটাও মনে নেই যে আমি আর ননতু ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’। একদিন দুপুরে খাবার পর বিশ্রামের সময়ে ননতুর বিছানার কাছে গিয়ে দেখি ননতু একটা ডায়েরি খুলে নিবিষ্ট মনে কিছু লিখছে। আর পাতার ওপরে একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি। ভারী মিষ্টি একটা অষ্টাদশীর ছবি। আমার আগমন টের পেয়ে চট করে ননতু ডায়েরিটা বন্ধ করে দিল। আমি কি আর ছাড়ি? ডায়েরিটা কেড়ে নিয়ে ছবিটা দেখেই ছাড়লাম। ধরা পড়ে ননতু সব খুলে বলল। সেই থেকেই দুজন তরুণ দুজনের কাছে মনের আগল খুলে দিলাম। সেই থেকে তুই-তুই সম্পর্ক। জন্মভূমি থেকে শত শত মাইল দূরে বিদেশ বিভূঁয়ে দুজনের নিকটতম বন্ধু হয়ে যেতে দেরি হয়নি। ননতু আমার চেয়ে বছর তিনেকের বড় ছিল। এবং অবশ্যই আমার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান এবং দায়িত্বশীল। আমি ছিলাম শৈশব থেকেই খেয়ালী, ইমোশনাল এবং বাস্তব বুদ্ধিহীন। তাই ননতু নিজে থেকেই আমাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার দায়িত্বটা নিয়ে নিয়েছিলো। আমি মেনেও নিয়েছিলাম। আমাদের দ্বিতীয় ব্যাচের প্রশিক্ষণ হয় আসামের তেজপুরে একটা ক্যাম্পে। পাশাপাশি ছয়টি বা আটটি শনের ছাউনি দেয়া ব্যারাক। সারি সারি বিছানা পাতা। তার পাশেই প্রায় তেপান্তরের মাঠের সমান একটা মাঠ। একবার দৌড়ে ঘুরে আসতে জান বেরিয়ে যাওয়ার দশা হতো। মাঠের পাশেই ব্যারাকগুলোর সামনের দিক লাগোয়া পাটক্ষেত। তার পাড়েই আমাদের প্রাতঃকৃত্য সম্পাদনের ব্যবস্থা। প্রথমদিন সকালে ঘুম ভেঙ্গে দেখি পাশের বিছানায় ইঞ্চি তিনেক লম্বা একটা চীনে জোঁক। রক্ত খেয়ে ঢোল। নড়তে পারছে না। কোনওমতে মাথা উঁচু করে যেন বলছে- ‘আমাকে একটু কষ্ট করে পাটক্ষেতে ছেড়ে এসো তো।’ জোঁককে আবার আমি খুব সমীহ করি। সাবধান হয়ে গেলাম। বুট আর প্যান্ট ছাড়া চলা প্রায় বন্ধ করেই দিলাম। স্নানের সময়ে ননতু ডাক দিল। বলল- চল, সামনের বিলে নাকি স্নানের জায়গা। গিয়ে দেখি বিলভর্তি ‘দাম’ জাতীয় ভাসমান ঘাস। ডাঁটি লাল রঙের, পাতা সবুজ। তার মাঝে ৩০ ফুট বাই ২৫ ফুট একটা জায়গা দামমুক্ত করা হয়েছে। টলটলে পরিষ্কার পানি। তার নীচে সাদা বালু ঝকঝক করছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখি সাদা বালুর ওপর কালো কালো শত শত জোঁক যেন ওঁত পেতে অপেক্ষা করছে আমাদের জলে নামবার। ওরে বাবা!! ননতু বলল, ‘কিচ্ছু হবে না। তুই ঝুপ করে ডুব দিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে আয়।’ তাই করলাম। দেখলাম ওরা ধরতে পারেনি। সাবান মেখে দ্বিতীয়বার নামতে গেলাম। গিয়ে দেখি জোঁকগুলো যেন আরও কাছে চলে এসেছে। যেন বলছে- ‘আগেরবার মিস করেছি, এবার আর মিস করবোনা।’ ননতু বলল- ‘আরে নাম তো। ওরা বুঝে উঠার আগেই তুই উঠে আসতে পারবি।’ এই যে পদে পদে সাহস দেয়া এবং গাইড করা- এটা শুধু আমাকে নয়, ননতু এই ব্যাপারে আরও অনেককেই ঋণী করে রেখেছে। বিকেলে খেলার মাঠে দেখি আরেক ননতু। ফুটবল খেলা। একপক্ষে গেরিলারা, মানে আমরা। অন্যপক্ষে ওস্তাদরা। ননতুকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারছে না। দূরন্ত স্ট্রাইকার ননতুর গোলেই সম্ভবত আমরা সেদিন জিতেছিলাম। পরে শুনেছিলাম, মনজুর আলী ননতু ছিল রংপুর জেলা স্কুলের চ্যাম্পিয়ন অ্যাথলেট। ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, বাস্কেটবল সব দলেরই ক্যাপ্টেন। সুন্দর গান করত, নাটকও করত। আরও শুনেছিলাম, মাত্র ১৬ বছর বয়সে ইস্ট পাকিস্তান রেফারীজ ক্যাম্পে যোগ দিয়ে তৎকালীন সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম স্থান অধিকার করেছিল। ঢাকা ওয়ান্ডারার্স-এ ও প্রথম বিভাগে ফুটবল খেলত ননতু। ক্যাম্পে সন্ধ্যার আগে আগে বসতো গানের আসর। ক্যাম্প কমান্ডার ছিলেন মনজুরুল আহসান খান, মনজু ভাই। আমরা বলতাম কমরেড সিনিয়র লেফটেন্যান্ট বা সংক্ষেপে ‘সিনিয়র’। সিনিয়র বলিষ্ঠ কণ্ঠে গাইতেন ‘ধিতাং ধিতাং বোলে’ বা ‘ভেদি অনশন- মৃত্যু তুষার তুফান’। ইয়াফেস ভাই গাইতেন- ‘উঠলোরে ঝড় দিন বদলের পালা এলো’ বা ‘ঝঞ্ঝা ঝড় মৃত্যু দুর্বিপাক’। আজাদ ভাই (বেতিয়ারা যুদ্ধে শহীদ নিজামুদ্দিন আজাদ) গাইতেন- ‘এইতো বেশ এই নদীর তীরে বসে গান শোনা’ বা ‘এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে’। আওলাদ (বেতিয়ারা যুদ্ধে শহীদ) গাইতো- ‘জানি একদিন আমার জীবনী লেখা হবে’। বগুড়ার ফটুভাই গাইতেন- ‘আমি চেয়েছি তোমায়, সে কি মোর অপরাধ’। রায়পুরার কুদ্দুস ভাই গাইতেন- ‘ভাটি গাঙ্গের ভাইটাল সুরে’, ননতু আর আমি গাইতাম নজরুল, মান্না দে, মানবেন্দ্র, শ্যামল, হেমন্ত, সতীনাথ। নজরুল একাডেমীতে গান শিখতো ননতু শবনম মুশতারী আর রেবেকা সুলতানাদের সাথে। গলাটা ছিল সতীনাথ-এর মতো। সঙ্গীত শিল্পী হলে ননতু খুব নাম করতে পারতো। কিন্তু নিজে গাওয়ার চেয়ে আমাকে দিয়ে গাওয়ানোটাই ওর বেশি পছন্দ ছিলো। কোনো সমস্যার সমাধানে ননতুর জুড়ি ছিল না। তেজপুরের পর আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো সুবনসিড়ি উপত্যকায় স্পেশাল লিডারশিপ ট্রেনিং এ। আমার গ্রুপের ডেপুটি কমান্ডার মাহফুজ ভাই এর সাথে আমার ঝগড়া হলো। (মাহফুজ ভাই আর নেই। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা)। আমার মন খারাপ। খুব খেপে আছি। ক্যাম্পের পাশে কুলুকুলু বয়ে যাওয়া টলটলে পানির ঝর্ণার মাঝখানে বড় পাথরের উপর বসে আছি। আমাকে ঘণ্টাখানেক লেকচার দিয়ে ঠাণ্ডা করে ফেলল ননতু। এমনি ছোট ছোট অজস্র ঘটনা বলা যাবে, যাতে বোঝা যাবে, ননতু কতো ঠাণ্ডা মাথার মানুষ ছিল। তার পরিবারের জন্যও সে ছিল সমস্যা-সমাধানকারী। ট্রেনিং-এর পর আমরা চলে আসি বাইখোরা বেস ক্যাম্পে। এখানেও ননতুর কর্মীসত্ত্বা সচল। সব কাজে মনেপ্রাণে অংশগ্রহণ। নিয়মিত ডায়েরি লিখতো ননতু। বেতিয়ারা যুদ্ধে ওর সেই মূল্যবান ডায়েরিটা হারিয়ে যায়। বেতিয়ারা যুদ্ধে আমরা হারাই নয়জন বীর সহযোদ্ধাকে। তারপর বজরা গ্রাম ঘেরাও করে ৬৫ জন রাজাকারকে গ্রেফতার করি। আমরা একসাথেই চাঁদপুর হয়ে নবাবগঞ্জ, তারপর ১৭ ডিসেম্বর সকালে ঢাকায় শহীদ মিনারে উপস্থিত হই। স্বাধীনতার পর ননতু চলে গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদে আর আমি নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজে। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক, সভাপতি মন্টু ঘোষ। ১৯৭৩ সালে সোনালী ব্যাংকে যোগ দিয়ে আমি ঢাকায় চলে আসি এবং থাকি ১০ নং পুরানা পল্টন, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। ছাত্র ইউনিয়ন পাঠাগারের দায়িত্ব পালন করতাম আর আবু কায়েস মাহমুদ নূর হোসেনের সাথে জয়ধ্বনি কার্যালয়ে ঘুমাতাম। এই ছাত্র ইউনিয়ন অফিসেই আবার ননতুর সাথে দেখা। ১৯৭৪ এ আমি চলে আসি উদীচীতে। ননতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদে। এ বছরেই আমি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ লাভ করি। সম্ভবতঃ ননতুও একই সময়ে। বহু প্রতীক্ষিত লাল কার্ড। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর দুই তরুণের যাত্রা হলো শুরু। আজ এ পর্যন্তই থাক। আমার বন্ধু ননতুকে নিয়ে কথা একবারে শেষ করা কঠিন। ভবিষ্যতে হয়তো কখনো ননতুর ‘বাংলাদেশ পর্বের’ আলোচনা করা যাবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..