সময়ের কথা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আহমদ সিরাজ : করোনা বাংলাদেশে উদয়ের পর থেকে যাতায়াতের স্বাভাবিকতা অনেকখানি নষ্ট হয়ে গেলে, অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ আর স্বাভাবিক থাকেনি। যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে উঠে মোবাইল ফোন। কিন্তু এ সময়ে নানাজনের সঙ্গে আলাপ যোগাযোগ মোবাইল ফোনে হয়ে উঠলেও কী এক অস্পষ্ট কারণে যেন সাহিত্যিক আকমল হোসেন নিপু ভাইয়ের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলা হয়ে উঠেনি বা তিনিও কথা বলেননি। অনেকটা হৃদয়ের সহোদরের মতো আমাদের অবস্থান তৈরি হয়ে আছে- করোনাকালীন সময়ে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তাতে আমাদের এ ক’মাস কথা না বলাতে এক ধরনের অভিমান যুক্ত হয়ে গিয়েছিল কি না তা স্পষ্ট হয়নি। কেউ কথা না বলাতে যেন কার অপেক্ষায় কে থেকেছে, এভাবে সময় অতিবাহিত হতে থাকে। মাঝে মাঝে এমন অদ্ভূত সময় পার হতে হয়। এর মধ্যে হঠাৎ গত ৪ জুলাই ২০২০ বিকেল ৬.১৫টায় নিপু ভাইয়ের ফোন আসে। দীর্ঘদিন পর ফোনে আমাদের কথাগুলো কোন পারস্পরিক অভিযোগের ছিল না। স্বাভাবিক উচ্চারণে দীর্ঘ সময় পার ধরে আমাদের নিজেদের অবস্থান জানাতে গিয়ে অনেক কথা হয়ে গেল। এভাবে ৩২ মিনিটের মতো আলাপে আমাদের কথায় উঠে আসে করোনা পরিস্থিতিতে আমাদের বর্তমান ও অনাগত ভবিষ্যত জীবন। নিপু ভাইয়ের কথায়- করোনার সর্বগ্রাসিতায় বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও জীবিকা যে পরিস্থিতিতে পড়েছে, তাতে মানুষ মানুষের জন্য মানবিকতার যে উদ্যোগ সর্বত্র পরিলক্ষিত হয়ে উঠতে দেখা গেছে তা করোনা পরিস্থিতিতে দেখা যায় নি। নিপু ভাইয়ের কথার মধ্যে দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথাও ছিল, আমরা অনেক খারাপ অবস্থার মধ্যে চলে গেছি। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এমন নাজুক পরিস্থিতিতে যারা সর্দি-কাশি হলে সিঙ্গাপুর, হংকং চলে যেতেন, তারা কিন্তু এ যাত্রায় দৌড়াতে পারেননি কিংবা যারা বেগম পাড়া, আরাম পাড়া তৈরি করে রেখেছেন, তাতেও দৌড়াতে পারেন নি এবং তাতে যে এই শ্রেণির ব্যক্তিদের মানবিকতা উতরে উঠেছে স্বদেশের মানুষের জন্য তার কোনও আলামত খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই মহাদুঃসময়ে মানবিকতার জমিনে খরা, কোনও চাষাবাদ হয়নি বলে মনে হয়েছে। মানুষের জন্য একটা আতংকের বিষয় আমাদের কথায় উঠে এসেছিল, ঐ শ্রেণির বিত্তবানরা চাইলে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্গতি ঘোচাতে দেশের আনাচে কানাচে সহযোগিতার হাত পৌঁছে দিতে পারতেন, আর তাতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতি অনেকখানি পূরণ হয়ে যেত। বরং তাদের নির্লিপ্ত অবস্থান প্রকট থেকেছে। এই অর্থে করোনা পরিস্থিতিতে করোনা দুর্যোগে মানুষের বোধদয় তেমন ঘটছে বলে মনে হয় না। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে উপরে ও তলে একটা আস্থাহীনতা, বিশ্বাসহীনতার রাজত্বই যেন তৈরি হয়েছে। এই সময়ে দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীন দম্ভোক্তি বিস্ময়বিমূঢ় করেছে। তখন আমাদের মনে হয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলেও এই মহলের লুটেরা মনোবৃত্তি কমবে না, তাদের আগ্রাসী তৎপরতা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। করোনার কারণে দুনিয়াব্যাপী এই সত্যের উৎসারণ ঘটেছে। পরিবেশ জীবনের জন্য অপরিহার্য, কিন্তু এই উপলব্দি হয়েছে বলে মনে হয় না। একটু সুযোগ হয়ে উঠলে আগের মতোই পাহাড়টিলা বনভূমি উজাড় বা সাবাড় করতে দ্বিধা থাকবে না। তাই আমাদের বুঝে নিতে হচ্ছে করোনা গেলেও আমাদের দূর্দশা হয়তো যাবে না। প্রতিনিয়ত করোনায় আক্রান্ত, মৃত্যু ও হতাশায় সমস্ত পৃথিবী একটা অচল অবস্থার মধ্যে, তবুও আমরা আমাদের কৃতিত্ব ও কর্তৃত্বের জায়গায় কেউ হাত দিচ্ছে কি না, প্রশ্ন তুলছে কি না, তাতে আমরা যতটুকু মনোযোগী থাকছি, স্বদেশ স্বজাতির জন্য ততখানি মনোযোগী হচ্ছি কী- এই প্রশ্নও তোলা যাবে না। সর্বত্রই যেন কৃতিত্ব ও কর্তৃত্ব তাড়া করে যাচ্ছে। তেমনি ভীতি ভাবনা যখন আমাদের আলোড়িত করছে তখন করোনা পরিস্থিতি মানুষজনের কর্মহীনতার বিশালতায় ‘শ্রমমানুষ’অনেকখানি দিশেহারা। বাসাবাড়িতে তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশে মোবাইল আসক্তিতে বাঁধা পড়ে আছে। তারা মোবাইলে ডুবে আছে। টিপটিপ মোবাইলে দিন রাত তারা যন্ত্রমানব হয়ে উঠছে। এর মধ্যে সময়ের অনাসৃষ্টি সাধিত হচ্ছে কি না- যার হাত থেকে নিস্তার নেই। মোবাইলে নিয়মিত এমন পরিস্থিতিতে তারাই মোবাইলের দাসত্বে আছে এমন শংকা আশংকা থেকে মুক্ত থাকা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি জটিল ও উদ্বেগজনক পর্যায়ে বলা চলে। মোবাইলের অদ্ভুত ব্যবহারে আমাদের বড় একটা অংশ মহামারির মতো কিনা গুরুতর জিজ্ঞাসা। আমাদের ফোনালাপে এই বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়ে উঠে আসে, করোনা পরিস্থিতিতে এর মাত্রাও কম নয়। আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক সময়গুলো মোবাইলের কোষে কোষে এমনভাবে জায়গা করে নিচ্ছে কাছে থেকে পুত্র কন্যাকে ডাক ছাড়লেও সহজে শুনতে পায় না, কিংবা এসব ডাকাডাকির জন্য বিরক্তির কারণ হয়ে উঠে, অথবা কখনও ক্ষেপে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। ভাইরাসের মতো মোবাইল দুর্যোগ কি পরিস্থিতি তৈরী করেছে, তা তলিয়ে দেখা হচ্ছে না। সমাজবিজ্ঞানী, মনস্তত্ত্ববিদদের জন্য এটি ভাবনারও কোন শুভ বার্তা নয়। বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতিতে এটি একটি বাড়তি ঝামেলার মতো বড় বিপদ হতে পারে। সকল স্তরে মোবাইল ব্যবহারের ভেতর দিয়ে একটি বড় অংশের বিশেষত তরুণদের এই আসক্তিতে আক্রান্তের ঝুঁকি বাড়ছে। আমাদের এতসব কথায় জড়িয়ে আলাপন নানা মাত্রা পেয়েছিল। দৃশ্যত যে বিষয়গুলো এতদিন আমাদের চোখে পড়েনি, অনেকটা বিভোর হয়ে ঘোরেই যখন তখন করোনা পরিস্থিতি মূল হিসাবে ধরে আমাদের দুর্বলতাগুলো উম্মোচিত করে দিয়েছে। আমাদের বড়াই করা মানবিকতার জমিনে যেমন, তেমনি কৃতিত্বের জমিনেও এরকম কথামালার ভেতর দিয়ে আমাদের আলাপ শেষ হয়ে যায়। লেখক: সদস্য, সিপিবি, মৌলভীবাজার জেলা কমিটি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..