করোনা পরিস্থিতি, স্বাস্থ্যসেবা ও জাতীয় বাজেট : বর্তমান প্রেক্ষাপট ও করণীয়

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
(ডক্টরস ফর হেল্থ এন্ড এনভায়রনমেন্ট উদ্যোগে গত ৩ জুলাই ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে পঠিত প্রবন্ধ) আজ গোটা বিশ্ববাসী কোভিড-১৯ নামক এক জটিল মহামারিতে আক্রান্ত। করোনার করাল থাবায় এখন বিশ্বব্যাপী মৃতের সংখ্যা ৫ লাখ ছাড়িয়েছে। আক্রান্ত ছাড়িয়েছে ১ কোটি। বাংলাদেশ এখন দ্রুত সংক্রমণ বৃদ্ধি হারের দশটি দেশের মধ্যে একটি, যেখানে গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে সংগৃহিত নমুনা পরীক্ষায় প্রতিদিন ২১-২৩% লোক এই ভাইরাসে আক্রান্ত বলে চিহ্নিত হচ্ছে। আমাদের দেশে করোনা রোগীর সংখ্যা ইতোমধ্যে পৌনে দুই লাখ ছড়িয়েছে, করোনার কাছে হার মেনে মৃত্যুবরণ করেছেন দুই হাজারের বেশি মানুষ, আর সুস্থ হয়েছেন প্রায় ৮৫ হাজার মানুষ। করোনা ভাইরাসে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যত রোগী শনাক্ত ও মৃত্যু হয়েছে, তার অধিকাংশ ঘটেছে গত জুন মাসে। তবে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা কম হওয়ায়, এমনকি উপসর্গযুক্ত অনেক ব্যক্তি নমুনা সংগ্রহের আওতায় না আসতে পারায় দেশে মোট রোগীর ও মৃত্যুর সংখ্যার হিসাবে গড়মিল থেকেই যাচ্ছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সরকারি প্রতিষ্ঠানে করোনা পরীক্ষার জন্য ফি নির্ধারণ করায়, দরিদ্র জনগণ টেস্ট করাতে নিরুৎসাহিত হবে, যা করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু সংখ্যা আড়াল করার একটি অপচেষ্টাও বটে। এখানে উল্লেখ্য যে, পার্শ্ববর্তী সকল দেশেই সরকারি প্রতিষ্ঠানে করোনা পরীক্ষা বিনামূল্যে করা হয়। সংক্রমণের ধারা বিবেচনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, ১ জন রোগী সনাক্ত করতে গিয়ে যদি ১০ থেকে ৩০ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয় তবে পরীক্ষা পর্যাপ্ত হয়েছে বলে ধরা যায়। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে অনেক পিছনে, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র আফগানিস্তান ছাড়া সবার নিচে। চীনের উহানে এ রোগ প্রথম সনাক্ত হয় ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরে আর আমাদের দেশে ২০২০ সালের ৮ মার্চ, সময়টা বেশ দীর্ঘ। এ সময়ে এবং পরবর্তী স্বল্প মাত্রায় সংক্রমণের সময় ধরে আমরা আপনাদের মাধ্যমে এ রোগের সম্ভাব্য ভয়াবহতা ও করণীয় সম্পর্কে সরকারের ওপর মহল, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ, এবং রোগাক্রান্তদের চিকিৎসা প্রদানকারী চিকিৎসকগণের মতে বেশি বেশি নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা, সঙ্গনিরোধ, বিচ্ছিন্নতা ও রুদ্ধাবস্থার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ করাকেই এ মহামারি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে বলে শুরু থেকেই বলা হচ্ছে। কিন্তু এ দীর্ঘ সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চিকিৎসা বিজ্ঞানের এসকল বিষয় নিয়ম অনুযায়ী সুপরিকল্পিত ও সুসমন্বিতভাবে কাজে লাগায়নি বা লাগাতে পারেনি; যেমন লাগিয়েছে আমাদেরই কাছের দেশ নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম এবং ভারতের কেরালা। রোগ প্রতিরোধের শিথিলতার কারণে সম্ভাব্য যে সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হবে তার যথাযথ চিকিৎসা দেয়া আমাদের হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা, দুর্বল ভৌত অবকাঠামো, মানসম্পন্ন যন্ত্রপাতির স্বল্পতা, দক্ষ জনবলের অপ্রতুলতা, চিকিৎসকসহ সকল স্বাস্থ্যকর্মীর স্বল্পতা ও আর্থিক সামর্থ্য দিয়ে যে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না; তা বিভিন্ন মহল থেকে বার বার বলা হয়েছিল। আমরা সকরুণ দৃষ্টিতে জীবন দিয়ে, মৃতের সংখ্যা গুণে তা এখন হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছি। এখন হাসপাতাল, বাসা সর্বত্র রোগীর আহাজারি; নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ আর নিবিড় পরিচর্যা বিছানার অভাবে লম্বা হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। ইতোমধ্যে আমরা হারিয়েছি দেশে প্রায় ৭০ জন চিকিৎসকসহ অনেক সেবিকা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা কর্মীকে, সম্মুখ যোদ্ধাদের মৃত্যুর এ হার বিশ্বের মধ্যে সর্বাধিক। হারিয়েছি দেশের অনেক বরেণ্য ব্যক্তি, পদস্থ কর্মকর্তা ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার আরও অনেককেই। আমরা সকল মৃত ব্যক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করছি। শিল্প বাঁচানোর নামে, শ্রমিকদের জীবিকার নামে কল-কারখানা বিশেষতঃ পোশাক শিল্প খোলা-বন্ধের খেলা, ঈদের সময় পরিবহন চালু করা না-করার সিদ্ধান্তহীনতা এবং দোকানপাট/শপিংমল খোলায় মানুষের অবাধ যাতায়াতের (স্বাস্থ্যবিধি না মেনে) ফলে করোনার সামাজিক সংক্রমণের ব্যাপক বিস্তার ঘটার যে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল তার বাস্তবরূপ এখন দেখতে পাচ্ছি। এ বিষয়ে সরকার গঠিত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কমিটি এবং কারিগরি পরামর্শক কমিটির সুপারিশ সঠিক ভাবে আমলে নেওয়া হয়নি, যদিও তাদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ হচ্ছে বলে প্রচারের চেষ্টা চলছে। এ মহাদুর্যোগের সময়েও সরকার ও ঊধ্র্বতন কর্তৃপক্ষের অনেকেই মূল সমস্যাসমূহ চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানের উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরিবর্তে, আমলাতান্ত্রিক খেলার মাধ্যমে সংকটের দায়ভার চিকিৎসক সমাজ ও জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে আবারও চিকিৎসক ও জনগণকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত। জাতির এই চরম সংকটকালীন সময়েও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের সুরক্ষা সামগ্রী ও থাকা-খাওয়া, চিকিৎসার যনত্রপাতি এবং দরিদ্র জনগণের রিলিফ সামগ্রী ক্রয় ও বিতরণ নিয়ে থেমে নেই দুর্নীতি, চৌর্যবৃত্তি ও মিথ্যাচার। মানহীন সুরক্ষা সামগ্রী ও সুরক্ষা সামগ্রীর স্বল্পতা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর অধিক মৃত্যু হারের অন্যতম কারণ বলে সকলেই মনে করেন, তাও আবার ক্রয় করা হয়েছে চড়া দামে। সরকারের উপর মহল থেকে প্রতিনিয়ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ এর বাণী শোনানো হলেও কার্যত তা দৃশ্যমান নয়। সম্প্রতি চীন থেকে আগত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতিতে হতাশা প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্য কর্মীদের অসাধারণ ভূমিকার প্রশংসাও করেছেন। বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতির বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আমাদের জনস্বাস্থ্যবিদ ও সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ মনে করেন, এখনো আমাদের সংক্রমণের পূর্বাভাস মেনে সঠিকভাবে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। সুতরাং বর্তমান বিরাজমান পরিস্থিতিতে রোগ নিয়ন্ত্রণে করণীয় সর্বশেষ সুযোগটিও হাতছাড়া করলে দেশবাসীকে চরম মূল্য দিতে হবে। বর্তমান বিশ্বে জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য মোটামুটি সফল বা আংশিক সফল বিভিন্ন আদলের (মডেলের) স্বাস্থ্য কাঠামো চালু আছে, কিন্তু বাংলাদেশ এর কোনটির মধ্যেই নেই, আমরা চলেছি এক জগাখিচুড়ি পদ্ধতির মধ্য দিয়ে। দেশের সমগ্র জনগণের ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা’ প্রদানের জন্য প্রয়োজন জনস্বাস্থ্য ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে মূলভিত্তি ধরে নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার সঠিক বাস্তবায়ন। সে লক্ষ্যে ভৌত ও কারিগরি অবকাঠামো তৈরি, দক্ষ জনবল সৃষ্টি, এবং পাশাপাশি প্রয়োজন সুপরিকল্পিত, সুসমন্বিত ও দুর্নীতিমুক্ত দক্ষ ব্যবস্থাপনা, গবেষণা এবং পর্যাপ্ত রাষ্ট্রীয় অর্থ বরাদ্দ। কিন্তু সরকার ধনীক শ্রেণি ও উচ্চ মধ্যবিত্তের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে গিয়ে মেডিকেল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে মুক্তবাজার অর্থনীতির ঢালাও প্রয়োগের মাধ্যমে এখানেও অবাধ বাণিজ্য উন্মুক্ত করেছে। ফলে স্বাস্থ্যসেবা কার্যত পরিণত হয়েছে পণ্যে। দ্রুত গতিতে বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্ব ও নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির পাশাপাশি বৃদ্ধি পাচ্ছে জনগণের চিকিৎসা ব্যয়। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১২ সালে চিকিৎসার জন্য ব্যক্তির পকেট থেকে খরচ হতো ৬৪ শতাংশ আর সরকার ও দাতা সংস্থা মিলে খরচ করেছে বাকী ৩৬ শতাংশ; এ ক্ষেত্রে সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ২০৩২ সালের মধ্যে বিপরীত চিত্রে নিয়ে আসার। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ২০১৯ সালে এসে স্বাস্থ্যের ব্যয় মিটাতে ব্যক্তির পকেট থেকে খরচ দাঁড়িয়েছে ৭২ শতাংশ; ফলে চিকিৎসার খরচ মিটাতেই প্রতি বছর বাংলাদেশের ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। করোনা মহামারির কারণে আগামী বছর এর সাথে আরও প্রায় ২ (দুই) কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে বলে অনেক অর্থনীতিবিদই মনে করেন। আমরা সকলেই জানি, স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য রোগ চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধই উত্তম উপায়। এই প্রতিরোধ ব্যবস্থা কার্যকর রাখতে হবে তৃণমূল গ্রাম থেকে নগর স্বাস্থ্যসেবা পর্যন্ত, এর প্রতিটি স্তরে। এজন্য প্রয়োজন চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থাপনায় জনগণের অংশগ্রহণ এবং জনগণের প্রতিনিধিত্ব, দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ ও জনবান্ধব স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। প্রয়োজন জনগণের নিকট সহজলভ্য ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রদান উপযোগী ভৌত ও কারিগরি অবকাঠামো, পর্যাপ্ত সংখ্যক দক্ষ ও সংবেদনশীল জনবল, ন্যায্যমূল্যে মানসম্মত ওষুধ সরবরাহ এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান। জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের লক্ষ্যে আমরা দীর্ঘদিন ধরে এসকল বিষয়ে সরকার তথা নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসলেও সরকার কার্যত কর্ণপাত করেনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে মোটামুটি মানসম্পন্ন চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে হলে প্রতি ১০, ০০০ (দশ হাজার) মানুষের জন্য চিকিৎসক, সেবিকা ও ধাত্রী মিলে থাকতে হবে কমপক্ষে ২৩ জন (উন্নত বিশ্বের উন্নত মানের সেবার জন্য কম পক্ষে ৪৪ জন); কিন্তু আমাদের আছে ৮.৩ জন। অথচ আমাদের পাশের দেশগুলোর মধ্যে ভারতে ২৮.৫ জন, নেপালে ৩৩.৫ জন, শ্রীলংকায় ৩৬.৮ জন, মালদ্বীপে ১১৮ জন, ভুটানে ১৯.৩ জন, থাইল্যান্ডে ২৮ জন, আর দক্ষিণ কোরিয়ায় আছে ৮১.৪ জন। অপর দিকে ১ (এক) জন চিকিৎসকের সাথে থাকতে হবে ৩ (তিন) জন সেবিকা ও ৫ (পাঁচ) জন অন্যান্য চিকিৎসা সেবা কর্মী; কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে ১ (এক) জন চিকিৎসকের বিপরীতে আছে ০.৩ জন সেবিকা আর ০.৬ জন অন্যান্য চিকিৎসা সেবা কর্মী। আবার এই সীমিত জনবলের মধ্যে ২০১৯ সালে ২৭.২৭% পদই শূন্য ছিল (সূত্র: এইচ আর এইচ ডাটা শীট - ২০১৯, এইচআরএম ইউনিট, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়)। অপরদিকে স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রীয় অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের চিত্র বরাবরই করুণ। একেতো স্বল্প বরাদ্দ, যা বিশ্বে তো বটেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও সর্বনিম্ন; তার উপর রয়েছে লাগামহীন দুর্নীতি, অর্থব্যয়ে অব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ব্যয়ের সীমাবদ্ধতা। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী আমাদের স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ কমপক্ষে জাতীয় বাজেটের ১৫% এবং জিডিপির ৫% হওয়া উচিত। ২০১২ সালে প্রণীত ‘স্বাস্থ্যসেবা অর্থায়ন কৌশল পত্রে’ ২০২৫ সাল নাগাদ জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫% এবং ২০৩২ সালের মধ্যে মোট বাজেটের ১৫% অর্থ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছিল (সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ০৬.০৬.২০২০)। কিন্তু পরবর্তীতে কোনও অর্থ বছরের বাজেটেই তার বিন্দুমাত্র প্রতিফলন নেই, বরং তা আনুপাতিক হারে আরও কমেছে। একযুগ আগেও যেখানে বরাদ্দ ছিলো জাতীয় বাজেটের ৬ (ছয়) শতাংশ, অবহেলার শিকার হতে হতে তা ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরের নেমে এসেছে ৪.৯২ শতাংশে এবং জিডিপির মাত্র ০.৮৯ শতাংশে। ইতোমধ্যে ২০২০-২০২১ অর্থ বছরের বাজেট জতীয় সংসদে পাস হয়েছে। এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২৯, ২৪৬ হাজার কোটি টাকা (গত বছর এর পরিমাণ ছিল ২৫, ৭৩২ কোটি টাকা)। তবে বিশ্ব ব্যাংক ও এডিবির প্রদেয় উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ বাদ দিলে দেখা যাবে গত বারের তুলনায় প্রকৃত বরাদ্দ মাত্র ১, ০২২ কোটি টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে (গত বছরের তুলনায় মাত্র ১৪% বেশি)। অবশ্য করোনাকালীন ও করোনা উত্তর স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় আরও ১০, ০০০ (দশ হাজার) কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যদিও এ ক্ষেত্রে আরও বরাদ্দের প্রয়োজন। জনগণের প্রত্যাশা ছিল করোনায় উন্মোচিত স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা কাটাতে, মেডিকেল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার আমূল সংস্কারের জন্য এ খাতে জনবল বৃদ্ধি, ভৌত ও কারিগরি অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং গবেষণার জন্য অনুন্নয়নশীল খাতের বরাদ্দ কমিয়ে স্বাস্থ্য খাতে আরও বরাদ্দ দেয়া হবে; কিন্তু সে প্রত্যাশা মোটেই পূরণ না করে গতানুগতিক বরাদ্দই দেয়া হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ডক্টরস ফর হেল্থ এন্ড এনভায়রনমেন্ট করোনা পরিস্থিতিতে আমাদের কয়েকটি দাবি পুনর্ব্যক্ত এবং স্বাস্থ্য খাতে বাজেট সম্পর্কে আমাদের প্রস্তাব ও দাবি আপনাদের মাধ্যমে জাতির সামনে তুলে ধরছি। কোভিড-১৯ সম্পর্কিত দাবিসমূহ : ১। কোভিড-১৯ কে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণা করতে হবে। ২। বিনামূল্যে কোভিড-১৯ এর নমুনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার সকল দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। অবিলম্বে নমুনা পরীক্ষা ফি সংক্রান্ত পরিপত্র বাতিল করতে হবে। সকল সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালসমূহকে রিকুইজিশন করে কোভিড ও নন-কোভিড চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। ৩। জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে পর্যাপ্ত সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগ সম্পন্ন করতে হবে। ৪। প্রত্যেক জেলায় ICU এবং নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ সুবিধাসহ পর্যাপ্ত সংখ্যক শয্যার করোনা ইউনিট চালু করতে হবে। এলাকাভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলিকে সমন্বিত করে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকৃত রোগীদের আইসোলেশন ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। ৫। একযোগে সারা দেশব্যাপী কোভিড-১৯ রোগের লক্ষণযুক্ত রোগী খুঁজে পরীক্ষার জন্য অবিলম্বে মানসম্মত র্যা পিড টেস্ট কিট বিনামূল্যে আপামর জনগণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। ৬। একযোগে সারা দেশব্যাপী কোভিড-১৯ অত্যাধিক আক্রান্ত এলাকাসমূহে (রেড জোন) লকডাউন দৃঢ়ভাবে চালু রেখে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও চিকিৎসা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ৭। করোনা রোগীর চিকিৎসায় নিয়োজিত সকল সরকারি চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও নিরাপত্তাকর্মীসহ অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণকর্মীদের জন্য নির্ধারিত কর্মক্ষেত্রে কোয়ারেন্টাইনে থাকা, খাবার ও যাতায়াতের ব্যবস্থা এবং চিকিৎসাকেন্দ্রে মানসম্পন্ন ব্যক্তিগত নিরাপত্তা আবরণী (পিপিই) সরকারি-বেসরকারি সকল স্তরের চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্টদের জন্যও নিশ্চিত করতে হবে। ৮। সরকারি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য সরকার ঘোষিত ঝুঁকি বীমা ও ভাতার ক্ষেত্রে বেসরকারি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কেউ অসুস্থ হলে তার চিকিৎসার সমস্ত দায়ভার রাষ্ট্র বহন করবে ও এই দুর্যোগ মোকাবিলা করতে গিয়ে স্বাস্থ্যখাতের কারো মৃত্যু হলে যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ৯। ইজারাদারদের পকেট ভারি করার কোরবানির হাট বসানোর সরকারি সিদ্ধান্ত যা করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুহার বৃদ্ধি করতে পারে- তা প্রত্যাহার করতে হবে। ১০। টঙ্গী, গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জসহ সকল শিল্পাঞ্চলে অবিলম্বে কোভিড ফিল্ড হাসপাতাল নির্মাণ করতে হবে, যা পরবর্তীতে শিল্পশ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। কর্মক্ষেত্রে শিল্পশ্রমিকদের শারীরিক দূরত্বসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্য সেবা ও বাজেট সম্পর্কিত দাবি ও প্রস্তাব: ১। স্বাস্থ্যকে জনগণের “মৌলিক অধিকার” হিসাবে সাংবিধানিক আইনি সুরক্ষা দিতে হবে। ২। স্বাস্থ্যখাতে জাতীয় বাজেটের কমপক্ষে ১৫% এবং জিডিপির ৫% বরাদ্দ দিতে হবে এবং যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ৩। অনুৎপাদনশীল খাতসমূহে বাজেট বরাদ্দ হ্রাস করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সমাজকল্যাণ খাতে বাজেটের এক তৃতীয়াংশ বরাদ্দ করতে হবে। ৪। সরকারি হাসপাতালে প্রাথমিক থেকে বিশেষায়িত পর্যন্ত সকল চিকিৎসা বিনামূল্যে প্রদান করতে হবে। ৫। সরকারি হাসপাতালে ইউজার ফি বাতিল করতে হবে। এ পর্যন্ত আদায়কৃত ইউজার ফি’র স্বচ্ছ হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশ এবং তা হাসপাতাল উন্নয়নে ব্যবহার করতে হবে। ৬। উপজেলা পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালসমূহ ১০০ শয্যা ও জেলা পর্যায়ে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করতে হবে। প্রতি ১০ হাজার জনগণের জন্য স্বাস্থ্যকর্মী (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রস্তাব অনুযায়ী) আনুপাতিক হারে কমপক্ষে ২৩ জনে উন্নীত করার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিতে হবে। ৭। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকে মানসম্পন্ন চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক, নার্স ও ধাত্রী নিয়োগ করতে হবে ও পর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী সংস্থান করতে হবে। ৮। দারিদ্র্যসীমার নীচে অবস্থানরত জনগোষ্ঠীর জন্য সুপেয় পানি, মানসম্মত পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থাসহ স্বাস্থ্যকর আবাসন নিশ্চিত করতে হবে। ৯। স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যাকে প্রাধান্য দিয়ে গণমুখী স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। ১০। শিল্পায়ন, নগরায়ণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহনের নামে বন উজার, নদী ভরাটসহ পরিবেশ বিধ্বংসী সকল কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। ১১। দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ সংরক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণের স্বাস্থ্য সুনিশ্চিত করতে হবে। ১২। মেডিকেল ছাত্র এবং নবীন চিকিৎসকদের সামাজিক সংযোগ ও দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিক্ষা কারিকুলামে দেশের জন্য উপযোগী পরিবর্তন আনতে হবে। ১৩। মেডিকেল শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করতে হবে। মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদান নিশ্চিত করতে মানহীন মেডিকেল কলেজ বন্ধ করতে হবে। ১৪। চিকিৎসক, বিশেষত মেডিক্যাল কলেজ শিক্ষকদের গবেষোণায় উদ্বুদ্ধ করতে সহায়ক চাকুরী কাঠামো চালু করতে হবে এবং এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ ও জনবল নিয়োগ দিতে হবে। ১৫। চিকিৎসা ব্যবস্থায় দেশের জন্য উপযোগী রেফারাল পদ্ধতি চালু করতে হবে। ১৬। মেডিকেল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সকল ক্ষেত্রে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। সেবা প্রদানকারী, নিয়ন্ত্রণকারী এবং পরিকল্পনা ও ব্যবস্থ্যাপনার সাথে জড়িত সকলকেই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। আমরা চিকিৎসক সংগঠন ডক্টরস ফর হেল্থ এন্ড এনভায়রনমেন্ট’র পক্ষ থেকে এ সকল বিষয়ে দীর্ঘদিন লিখে এবং বলে আসছি কিন্তু কাজ হয়নি, হচ্ছেও না। আমরা মনে করি স্বাস্থ্যের সংগ্রাম চিকিৎসকদের একার বিষয় নয়, শুধু চিকিৎসকদের পক্ষে তা অগ্রসর করা সম্ভবও নয়। মেডিকেল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার আমূল সংস্কারের লক্ষ্যে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বিত ‘সার্বিক স্বাস্থ্য আন্দোলন’ গড়ে তোলা ছাড়া সামনে কোনো বিকল্প নেই। বিষয়টি আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বিধায় এর সমাধান বহুলাংশে নির্ভর করে রাষ্ট্র ব্যবস্থার ওপর বা রাষ্ট্র পরিচালনায় অধিষ্ঠিতদের শ্রেণি চরিত্রের ওপর, এ কথা ভুলে গেলে চলবে না। তাই বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা বহাল রেখে এর সামগ্রিক সমাধান সম্ভবও নয়। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, করোনার বৈশ্বিক মহামারি শুধু পুঁজিবাদের আত্মঘাতী প্রবণতাই উন্মোচিত করে নি; তার গণস্বাস্থ্য বিরোধী, অমানবিক ও আগ্রাসী চরিত্রেরও উন্মোচন ঘটিয়েছে। আমরা চিকিৎসক সমাজ ও স্বাস্থ্যসেবার সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মীবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বাস্থ্য খাতে এই নৈরাজ্যের অবসান চাই। আসুন আমরা সবাই মিলে সুস্থ সমাজ নির্মাণের লক্ষ্যে “সবার জন্য স্বাস্থ্য” ও শিক্ষার আন্দোলন গড়ে তুলি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..