অনলাইন ক্লাস ও ছাত্রদের ৭ দফা : বৈষম্য বনাম বাস্তবতা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
কাজী রাকিব হোসাইন : ১. শ্রেণিবৈষম্য কী? পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন ক্লাসে গেলে কী হবে? পরিষ্কার দুটি শ্রেণির পার্থক্য বোঝা যাবে। একটা শ্রেণি পয়সাওয়ালা, বাস করে নগরে। তাদের দামি ডিভাইস আছে, ডেটা কেনার টাকা আছে, বাসায় ভালো নেটওয়ার্ক আছে। আরেকটা শ্রেণি নিম্নবিত্ত, টাকাপয়সা নেই, দামি ডিভাইস কেনার সামর্থ্য নেই, টানা লকডাউনে ঘরে হয়তো ঠিকঠাক খাবারও নেই। এরা বেশিরভাগ এখন আছে গ্রামে, এলাকায় নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। কেউ কেউ হয়তো পেটের দায়ে ছোটখাটো নানা কাজও করছে। এখন যখন বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন ক্লাসে যাবে, প্রথম শ্রেণির তাতে বিশেষ অসুবিধা নেই। দ্বিতীয় শ্রেণিতে যারা আছে, তারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও ক্লাস করা থেকে বঞ্চিত হবে। এমনিতেই তারা নানাবিধ চাপে আছে, চাপ আরো বাড়বে। পাবলিক ভার্সিটির শিক্ষা আর সার্বজনীন অধিকার থাকবে না, পয়সাওয়ালা শ্রেণির বাপের সম্পত্তিতে পরিণত হবে। এটা শ্রেণিবৈষম্য। আমাদের সংগ্রামটা এই শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে। ২. একটা পরিবারের কোনো সদস্য করোনায় আক্রান্ত/সদ্য রিকভার করেছেন/সাসপেক্ট। সেই বাসার বয়সী ছেলে/মেয়েটা অনলাইনে ক্লাস করতে বসছে। তার মানসিক অবস্থাটা কল্পনা করুন। এমনটাই ঘটতে চলেছে আমাদের অন্তত দেড় শতাংশ সহপাঠীর সঙ্গে। অনলাইন ক্লাস নিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি জানতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলএলবি (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষের আমরা কয়েকজন (রেজওয়ান খাইর ফাহিম, আনিকা তাবাসসুম, হোসাইন আরমান, সাইকি রহমান নিয়ন, ফাতেমা দোলন, আরিব হাসান, কাজী রাকিব) একটা জরিপ চালিয়েছিলাম। ফলাফল? অংশগ্রহণকারী ১৪১ জনের মধ্যে আমাদের ৩৮ জন সহপাঠী জানিয়েছেন অনলাইনে ক্লাস হলে তারা সেটা করতে পারবেন না। ১৪১ জনের মধ্যে ৩৮ জন। একটা ব্যাচেরই ২৮% শিক্ষার্থীকে ক্লাস করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছেন আমাদের শিক্ষকরা! সংখ্যাটা আঁতকে ওঠার মতো। আরেকটু আঁতকে ওঠার মতো খবর, ২০ জন সহপাঠী জানিয়েছেন ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে হলে তাদের আর্থিক সহযোগিতা দরকার, তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা ক্লাসের খরচ বহন করার মতো নয়। ১৪.২%। কতো খরচ হয় অনলাইন ক্লাসে? প্রতি ঘণ্টা ক্লাসে খরচ হবে গড়ে এক জিবি ইন্টারনেট। দুই ঘণ্টায় দুই জিবি। গ্রামীণফোনে দুই জিবি ইন্টারনেটের সবচেয়ে সস্তা প্যাকটা ৫৭ টাকা। আইন বিভাগ সপ্তাহে ছয়টা করে দুই ঘণ্টার অনলাইন ক্লাস নেয়ার রুটিন দিয়েছে। সপ্তাহে ছয়টা দুই ঘণ্টার ক্লাসে সাপ্তাহিক ডেটা খরচ ৩৪২ টাকা। মাসে কতো হয় তাহলে? এখানে উল্লেখ্য, করোনাকালে এই ১৪.২% শতাংশের অনেকেই তাদের পরিবারের বেঁচে থাকার জন্য ডিপার্টমেন্ট থেকে আর্থিক সহযোগিতা নিয়েছেন। তাদের যা দেয়া হয়েছিলো, পরিমাণটা ২০০০ এর বেশি নয়। একজন শিক্ষার্থীকে পুরো পরিবার নিয়ে বাঁচার জন্য ২০০০ টাকা দিচ্ছেন, সেই একই শিক্ষার্থীর ওপর অনলাইন ক্লাসের নামে মাসে ১৪০০ টাকার অতিরিক্ত খরচের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছেন! ৩০ জন (২১%) সহপাঠী জানিয়েছেন এলাকায় ক্লাস করার মতো পর্যাপ্ত নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। ০৩ জনের ডিভাইসই নেই ক্লাস করার মতো। অথচ ক্লাস ডাউনলোডের ব্যাপারে শিক্ষকদের আপত্তি। ডাউনলোড করে রাখা গেলে স্লো নেটওয়ার্ক হলেও ডাউনলোড করে পরে দেখা যেতো। জানা গেছে, সে সুযোগ রাখতে চান না শিক্ষকরা। ৩. লকডাউনের শুরুতে যখন প্রথম অনলাইন ক্লাসের প্রস্তাব এসেছিলো, ঢাবি উপাচার্য একবাক্যে ‘না’ বলে দিয়েছিলেন। বরিশালের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা উপাচার্যের ব্যাকগ্রাউন্ড হয়তো এই উপলব্ধি তৈরি করেছিলো, গ্রামগঞ্জের শিক্ষার্থীদের পক্ষে সম্ভব না অনলাইনে ক্লাস করা। অথচ তার দুইমাস পার হতে না হতেই দৃশ্যপট বদলে গেলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষে পদার্পণ উদযাপনের নামে জোরেশোরে বিশ্ববিদ্যালয়কে অনলাইন ক্লাসের দিকে নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেলো। শিক্ষার্থীদের সুবিধা-অসুবিধার কোনো তোয়াক্কাই আর থাকলো না। কেন এই আকস্মিক তোড়জোড়? কোন ‘উপরের’ নির্দেশে নিরুপায় আমাদের শিক্ষকরা? কারণটা অনুমেয়। এর পেছনেও আছে আন্তর্জাতিক পুঁজির ভয়ংকর প্রতিযোগিতা। লক্ষ্য করলে দেখবেন, বিশ্বব্যাপী লকডাউনের কারণে সব ধরনের ব্যবসায়ই মন্দা চলছে। কিন্তু উল্টো পথে হাঁটছে আইটি জায়ান্টদের ব্যবসা। ই-কমার্সের ব্যবহার বেড়েছে। অনলাইন ক্লাসের ক্ষেত্রে মূলত ব্যবহার হচ্ছে গুগল, অ্যামাজন, ইত্যাদি দানবীয় পুঁজিপতি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন প্লাটফর্ম। ক্লাসের পরিমাণ বাড়লে, গণশিক্ষা অনলাইনে চলে গেলে এদের ব্যবসা বাড়বে। ধারণা করা কঠিন নয়, এই ব্যবসা বাড়ানোর জন্য দেশে দেশে ইতোমধ্যে লবিস্ট নিয়োগ করা হয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতায়, জনবিচ্ছিন্ন হয়ে টিকে থাকার জন্য তাদের পুঁজির তোষণ করতে হয়। সরকারের এই পুঁজিতোষণ নীতিরই ফলাফল যথাযথ প্রস্তুতি সম্পন্ন না করে দ্রুত অনলাইন ক্লাসে যাওয়ার জন্য এই “উপরের চাপ”। বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিপতিরা খুশি, সঙ্গে “ডিজিটাল বাংলাদেশ”এর একটুখানি শো-অফ। পলিসি হিসেবে মন্দ নয় ফ্যাসিস্টের জন্য। কিন্তু মন্দ আমাদের জন্য। নিম্নবিত্ত শিক্ষার্থীদের জন্য। প্রথমেই যেমনটা দেখানো হলো, পরিপূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়া অনলাইন মাধ্যমে ক্লাস এই শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিষ্কার শ্রেণিবৈষম্যমূলক আচরণ। ৪. শিক্ষার্থীরা শ্রেণিবৈষম্যের শিকার হলে, প্রতিবাদে এগিয়ে আসার প্রথম দায় ক্রিয়াশীল প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনসমূহের। সে দায় মেটাতেই, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ বিগত ১৩ জুন প্রথমবার দেয়া তাৎক্ষণিক বক্তব্যে এই বিষয়টিকে শ্রেণিবৈষম্য হিসেবে চিহ্নিত করে ক্লাস শুরুর আগে ছাত্রদের সমস্যা সমাধানের ও পূর্ণ প্রস্তুতি নেয়ার দাবি জানায়। এই দাবির তোয়াক্কা না করে যখন ঢাবি প্রশাসন বিনা প্রস্তুতিতেই জোরপূর্বক ছাত্রদের ওপর অনলাইন ক্লাস চাপিয়ে দেয়ার দিকে যাচ্ছে, তখন ২৭ জুন একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়কে ৭ দফা শর্ত বেঁধে দেয়া হয়। শর্ত ৭টি হচ্ছে- ১. প্রত্যেক শিক্ষার্থীর অনলাইন ক্লাস করার যাবতীয় ডেটা খরচ বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রদান করতে হবে। আর্থিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। ২. যে সকল শিক্ষার্থীদের ডিভাইস নেই, তাদের চিহ্নিত করে ডিভাইস কেনার জন্য অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। ৩. রাষ্ট্র ও টেলিকম অপারেটরদের সহযোগিতা নিয়ে সব শিক্ষার্থীর জন্য উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। ৪. প্রত্যেক শিক্ষার্থীর সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে একটি পূর্ণাঙ্গ জরিপ পরিচালনার মাধ্যমে ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে। ৫. প্রত্যেকটি ক্লাস যেকোনো সময় যেন যেকোনো শিক্ষার্থী ডাউনলোড করতে পারে তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট সহ, ডিপার্টমেন্টের ফেসবুক গ্রুপ, ইউটিউব ও গুগল ড্রাইভে আপলোড করে মুক্ত অবস্থায় রাখতে হবে। শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ৬. ক্লাসে উপস্থিতির ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যবাধকতা বা মার্কস রাখা যাবে না। এ সকল ক্লাসকে অফিসিয়াল ক্লাস হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। ৭. শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাউন্সিলিং কার্যক্রমের পরিধি বৃদ্ধি করতে হবে। ৫. প্রস্তুতি ও সব ছাত্রের অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা ছাড়া অনলাইন ক্লাস বৈষম্যমূলক। এই বৈষম্য নিরসনের উপায় খুঁজতে হবে আমাদের। প্রথমত, অতিরিক্ত খরচের কোনো বোঝা পরিবারগুলোর ওপর চাপিয়ে না দেয়া। এর সমাধান সমস্ত ডেটা খরচটুকু বিশ্ববিদ্যালয়ের বহন করা। বা যদি সম্ভব হয়, টেলিকম অপারটেরদের সহযোগিতা নিয়ে ছাত্রদের জন্য ফ্রি মোবাইল ডেটা এক্সেসের ব্যবস্থা করা। যাদের ক্লাস করার উপযুক্ত ডিভাইস নেই, তাদের ডিভাইস সরবরাহ করার আগে অনলাইন ক্লাস ফলপ্রসূ হবে না। তাদের ডিভাইস দেয়া, বা ডিভাইস কেনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জামানতে ন্যূনতম অর্থ বন্দোবস্ত করে দেয়া। যাদের নেটওয়ার্ক নেই রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা নিয়ে নেটওয়ার্কের ব্যবস্থা করা। ক্লাস ডাউনলোডেবল রাখা, যাতে স্লো নেটওয়ার্কেও ডাউনলোড করে দেখা যায়। ডাউনলোড করে দেখা অংশের যেহেতু সরাসরি ক্লাসে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই, এই সমস্ত ক্লাসকে অফিশিয়াল ক্লাস হিসেবে বিবেচনা না করা, এটেন্ডেন্সের ফাঁস না লাগানো। এই প্রত্যেকটা কাজের জন্য চাই তথ্য। সব ছাত্রের থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করে পূর্ণাঙ্গ জরিপ করে তবেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। মানসিক চাপ কমাতে সেবা দেয়া। সংক্ষেপে এই পয়েন্টগুলোর উপরেই দাঁড়িয়ে আছে ছাত্র ইউনিয়নের ৭ দফা। ছাত্রদের এই দাবি ঢাবি প্রশাসনকে ইতোমধ্যে স্মারকলিপির মাধ্যমে জানানো হয়েছে। তারা এগুলো বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন। প্রশাসনের সঙ্গে আমাদের পূর্বের অভিজ্ঞতা খারাপ হলেও তাদের এই আশ্বাস কতটা ফলে সেটা দেখার অপেক্ষায় আমরা আছি। এই ৭টি দাবি সবাইকে নিয়ে ক্লাসে যাওয়ার দাবি। বৈষম্যমুক্ত শিক্ষাঙ্গনের জন্য অনলাইন ক্লাসের আগে এই কাজগুলো করা প্রয়োজনীয়। ছাত্রস্বার্থে এই দাবিগুলো মেনে নেয়া দরকারি। আর মানা না হলে তা শিক্ষার্থীদের ক্ষুব্ধ করে তুলবে। ছাত্রদের ক্ষোভ আবার হাঁটবে, অনলাইন থেকে রাজপথে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..