করোনা, জীবন ও প্রকৃতি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
লেলিন চৌধুরী : এক. রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর, /লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তুর/ হে নব সভ্যতা! হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী, /দাও হে তপোবন পুণ্যচ্ছায়া রাশি/গ্লানিহীন দিনগুলি, সেই সন্ধ্যাস্নান, / সেই গোচারণ, সেই শান্ত সামগান/নীবারধান্যের মুষ্টি, বল্কলবসন, /মগ্ন হয়ে আত্মমাঝে নিত্য আলোচন/মহাতত্ত্বগুলি।............/ চাই স্বাধীনতা, চাই পক্ষের বিস্তার, /বক্ষে ফিরে পেতে চাই শক্তি আপনার, /পরানে স্পর্শিতে চাই ছিঁড়িয়া বন্ধন/অনন্ত এ জগতের হৃৎস্পন্দন।’ (সভ্যতার প্রতি)। অরণ্য জীবন ধ্বংস করে সেখানে ‘পাষাণপিঞ্জর’ গড়ে ‘রাজভোগ’ গ্রহণের দ্বারা মানুষের জীবন কল্যাণে স্থিত হবে না। তাই সভ্যতার বুলডোজারের আঘাতে বনভূমি উজাড় হতে থাকলো। অরণ্যজীবনের সাথে মানবজীবনের ভারসাম্য ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত হলো। ফলে অরণ্যবাসী সকল প্রাণ মানুষের ওপর চড়াও হতে শুরু করে। তাতে আরো অনেক কিছুর সাথে মানুষের রোগশোক বাড়তে থাকলো। এরকম একটি রোগ হলো করোনা বা কোভিড-১৯ দ্বারা সংঘটিত মহামারি। চলমান করোনা মহামারির সাথে পরিবেশ বিপর্যয়ের আন্তঃসম্পর্ক অনুধাবন ও উদ্ঘাটনের জন্য জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (United Nations Environment Program (UNEP)) একদল বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞকে দায়িত্ব প্রদান করে। তারা কোভিড-১৯ সংক্রমণের ছয়টি কারণ নির্ণয় করেছে। সেগুলো হলো- ১. মানুষ ও গৃহপালিত প্রাণী এখন অরণ্যজীবন ও বাস্তুতন্ত্রে অতি নিকটবর্তী হয়ে পড়েছে। গৃহপালিত পশুপাখি এখন বনের রোগকে মানুষের মধ্যে ছড়ানোর মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। ২. মানুষের কার্যকলাপের জন্য বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তিত হচ্ছে। এরফলে অরণ্যবাসী রোগজীবাণুর জন্য নতুন আবাস প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। ৩. কৃষির ব্যাপক সম্প্রসারণের কারণে বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে। ৪. মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য যে ধরনের বাস্তুতন্ত্র (ecosystem) দরকার মানুষের কার্যকলাপে সেটি বিনষ্ট হয়েছে। ৫. সকল প্রাণের আবাসের জন্য প্রয়োজন একটি সুসমন্বিত বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem Integrity)। এখানে মানুষ ক্রমাগত হস্তক্ষেপ করছে। ৬. যদি সবকিছু এভাবে চলতে থাকে তাহলে ঘন ঘন মহামারি দেখা দেয়ার আশংকা রয়েছে। দুই. বিশ্বের অন্যসব দেশের মতো বাংলাদেশও করোনাক্রান্ত। কোভিড-১৯-র তাণ্ডবে জনজীবনের তাল ও ছন্দ কেটে গিয়েছে। একদিকে অসংখ্য মানুষের অসুস্থতা ও ভোগান্তি, বিপুল সংখ্যক মৃত্যু এবং ঘরবন্দি জীবনের অবসন্নতা অন্যদিকে কর্মহীনতা, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং সর্বোপরি ক্ষুধা – এ দুইয়ের যৌথ আঘাতে মানুষ ও মানবিকতা ঘোর দুর্যোগে নিপতিত। বাংলাদেশে করোনাকালের দৈর্ঘ্য সাড়ে তিনমাসের কাছাকাছি। এই সময়কালে নানা উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য, উপাত্ত ও পর্যবেক্ষণ থেকে করোনাক্রান্ত জনগোষ্ঠীর কতোগুলো বৈশিষ্ট্য আমাদের নজরে এসেছে। সেগুলো হচ্ছে - ক. যারা খালি গায়ে, খালি পায়ে খোলা মাঠে হালচাষ করে তাদের করোনাক্রান্ত হওয়া বিরল। গার্হস্থ্যকর্ম ও গার্হস্থ্যকৃষিতে নিয়োজিতদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রযোজ্য। খ. শহরে রিকশাচালক, ঠেলাচালক এবং যেসব শ্রমজীবী রোদে-বাতাসে কাজ করে তাদের মধ্যেও করোনার প্রাদুর্ভাব দূর্লভ। গ. ঢাকা, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য বড় শহরের বস্তিবাসীদের মধ্যে করোনা সংক্রমণের সংখ্যা খুব কম। ঘ. বিত্তবানদের মধ্যে করোনার সংক্রমণ বেশি। শিক্ষিত চাকরিজীবী, মধ্যবিত্ত, ব্যবসায়ী ও আয়েশী জীবনে অভ্যস্তরা করোনার প্রধান শিকার হচ্ছে। এছাড়াও যারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্থানে দীর্ঘসময় কাজ করে এবং কর্মকালে কৃত্রিম আলোর নীচে অবস্থান করে তাদের মধ্যেও আক্রান্ত বেশি। তিন. পর্যবেক্ষণকে কাঠামোবদ্ধ করার প্রয়াসে আমরা কতোগুলো নির্ণায়ক স্থির করি। অতঃপর সেই নির্ণায়কগুলোর আলোকে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণকারী মানুষের তথ্যাদি যাচাই করি। ঢাকা মহানগর, ঢাকার রিকশাচালক, ঠেলাগাড়ি চালক, কুলিমজুর, ফুটপাতের ভাসমান দোকানদার, কড়াইল বস্তি, কল্যাণপুরের পোড়াবস্তি, মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ বস্তি, চট্টগ্রাম শহরাঞ্চলের বস্তি, মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলা, টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলা, কুষ্টিয়ার দর্শনা ও তৎসংলগ্ন সীমান্ত এলাকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। করোনা সংক্রমিত ব্যক্তির পেশা ও কাজের ধরণ, দীর্ঘদিন বাসস্থান, অসংক্রামক রোগের উপস্থিতি, এসি ও ফ্রিজ ব্যবহার -- মূলতঃ এই তথ্যগুলো সংগ্রহ করা হয়। অসংক্রামক ব্যাধি, শারীরিক শ্রম, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ, কৃত্রিমভাবে সংরক্ষিত খাদ্য, কৃত্রিম আলো, সূর্যালোক, খোলা বাতাস, রাসায়নিক বিষমুক্ত খাদ্য, মাটির সংস্পর্শ--এই নির্ণায়কগুলো দ্বারা বাংলাদেশের করোনাক্রান্তদের প্রাথমিক বিশ্লেষণ তৈরি করা হয়। নির্ণয়াকগুলোকে দু’ভাগে বিভক্ত করা হয়। প্রথম পাঁচটির সাথে করোনা সংক্রমণের সরাসরি যোগসূত্র পাওয়া যায়। জীবনযাপনে এই পাঁচটি নির্ণয়াকের প্রভাব যাদের যতো বেশি তাদের মধ্যে করোনা সংক্রমণ ও করোনায় মৃত্যুহার ততো বেশি। যাদের জীবনযাপনে শেষ চারটি নির্ণায়ক মূল ভূমিকা পালন করে তাদের মধ্যে করোনার প্রকোপ অতিসামান্য। প্রতিদিনের জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে মানুষের রোগ প্রতিরোধ তৈরি হয়। একটি পরিবেশ থেকে অন্য পরিবেশে গিয়ে বসবাস শুরু করলে মানুষ নতুন পরিবেশে অভ্যস্ত হতে থাকে। তখন নতুন পরিবেশের নির্ণায়ক দ্বারা তার দেহ ও মনের সামগ্রিকতা প্রস্তুত হয়। এটি অতিদ্রুত বা কয়েকদিনে হয় না। ধীরে ধীরে এই প্রক্রিয়া বহমান থাকে। এজন্য দেখা যায় গ্রামের একটি কৃষক পরিবারের এক ভাই মাঠের জমিতে চাষাবাদ করে, তার করোনা হচ্ছে না। কিন্তু তারই অন্য ভাইটি মধ্যপ্রাচ্যে অথবা নিউইয়র্কে অভিবাসী জীবনযাপন করছে। তার কিন্তু করোনা সংক্রমণ দ্রুত হচ্ছে। গ্রামবাসী ভাই এবং অভিবাসী ভাই দুজনেই বংশগতভাবে একই ধরনের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। কিন্তু জীবনযাপনের পরিবেশের কারণে তাদের নির্ণায়কগুলো পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে। তাই জীবনযাপনের প্রতিবেশ ও পরিবেশ করোনা সংক্রমণের সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। পুরো বিষয়টি একটি পর্যবেক্ষণলব্ধ সরল সিদ্ধান্ত। এটি মোটেই রিসার্চ মেথডোলজি অনুযায়ী সম্পন্ন করা কোনও বৈজ্ঞানিক গবেষণা নয়। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে এই সিদ্ধান্তগুলোর পুনঃপরীক্ষণ হওয়া বাঞ্ছনীয়। চার. পশু ও সমগ্র প্রাণীকুল থেকে মানুষের ভিন্নতা সূচিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মস্তিষ্কের কারণে। মহাজাগতিক ও জাগতিক অগণন অচিন্তনীয় ঘটনাপঞ্জীর একটি হলো মানবমস্তিষ্কের ক্রমোন্নতি। এই উন্নত মস্তিষ্কের কারণে মানুষ অর্জন করেছে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা। মানুষের স্বপ্ন দেখা ও কল্পনা করার অপরিমেয় ক্ষমতার ভিত্তিও হলো মস্তিষ্ক। এই চারের সমন্বয়ে মানুষ সভ্যতা নির্মাণে প্রয়াসী হয়। মেধাচালিত শ্রম দ্বারা এই প্রয়াস বাস্তবায়নের পথ-মানচিত্র খুঁজে নেয়। মানুষ তার নির্মিত সভ্যতাকে নির্মমভাবে ‘অতি মানবকেন্দ্রিক’ করে গড়ে তোলে। অতি মানবকেন্দ্রিকতা এতো বীভৎস রূপ নেয় যে নিজের জ্ঞাত মানবগোষ্ঠীর বাইরের মানুষকেও মানবেতর ভেবে তাদেরও নির্বিচারে নির্মূল করেছে। আমেরিকার মূলবাসী লাল ভারতীয়, আদি অষ্ট্রেলীয়, কালো আফ্রিকাবাসী এখনো দগদগে ক্ষতের মতো আমাদের অশ্রু ঝরায়।যুদ্ধ, ধর্ম, রাষ্ট্র, সীমান্ত, আইন ইত্যাদি নানা নামে এখনো ধ্বংস ও হত্যাযজ্ঞ চলমান। অগ্রসরমান সভ্যতার রথের চাকাতলে পিষ্ট হতে থাকে প্রকৃতির সাজানো বহুবৈচিত্র্যময় জীবন ও জড়ের সমাহার। প্রকৃতির বিন্যাসকে বিপর্যস্ত করে, প্রকৃতির অগণন সদস্যকে বিলুপ্ত করে সভ্যতার অট্টালিকা নির্মিত বিনির্মিত হয়েছে। অহংকারের দুঃসহ তাণ্ডবে সকল প্রাণ এবং জড়কে ক্রমাগত আঘাত ও ধ্বংস করে যাচ্ছে মানুষ। পাহাড় পর্বত, বনভূমি, সমুদ্র ও সমুদ্রতল, বায়ু এমনকি মহাশূন্য পর্যন্ত মানুষের আগ্রাসন থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। প্রকৃতির বিন্যাসকে পদদলিত করে, বদলে দিয়ে মানুষ নিজের স্বকপোলকল্পিত আয়েশের প্রাসাদ গড়ে তুলেছে। ক্ষুব্ধ প্রকৃতি রোষানলে জ্বলে উঠেছে। সাইক্লোন, টর্নেডো, জলোচ্ছ্বাস, বজ্রপাত, ভূমিকম্প, মহামারি রূপে প্রকৃতি বারবার আঘাত করেছে। দুর্যোগ কেটে যাওয়ার পর মানুষ আবার সর্বনাশের আয়োজনে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছে। এ যেন দীপশিখা সম্মোহিত পতঙ্গের উড়ালযাত্রা, আত্মহননের বিরতিহীন প্রয়াস। এবারের কোভিড১৯-র মহামারিটি ভিন্ন ধরনের। এটি আঘাত করেছে একেবারে ভিন্ন জায়গায়। সুরক্ষিত দূর্গে বসবাস করছে এমন ভাবনায় যারা বুঁদ হয়েছিলো এবার তারাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কৃত্রিম আলোর নিচে বসবাসরত ভোগী বিত্তবান অমরত্বের ভাবনাবিলাসে মত্ত ছিলো। মাঠেঘাটে হালচাষ করা নগ্নপদ নগ্নগাত্র মানুষগুলোর দিকে তাকাতো নিদারুণ অবজ্ঞায়। সহসা করোনা বাতাস বয়ে গেল তাদের বুকের উপর দিয়ে। সভ্যতার ইতিহাসে ‘সুখভোগী’ মানুষেরা চাষাভুষাদের মাটিগন্ধী জীবনকে অন্তত একবারের জন্য হলেও ঈর্ষা করতে বাধ্য হলো। পাঁচ. মানুষের কার্যফলে প্রকৃতি এখন অসুস্থ। প্রকৃতির অসুখ করলে মানুষেরা ভালো থাকে না। সভ্যতার গতিপথে পরিবর্তনের চূড়ান্ত সময় সমাগত। আমাদের ঠিক করতে হবে- কোন পথে যাবো? একটি পথ হলো প্রকৃতির বিন্যাসের সাথে সাযুজ্য রেখে পরিবেশের সন্তান হিসেবে জীবন ও সভ্যতাকে অগ্রসর করে নেয়া। অন্যটি হলো- অহংকারের উন্মত্ত তাণ্ডবে পরিবেশ প্রকৃতিকে পদদলিত করে যে-ভাবে মানুষ চলছে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। ‘--ওরে তুই ওঠ আজি!/আগুন লেগেছে কোথা? কার শঙ্খ উঠিয়াছে বাজি/ জাগাতে জগত-জনে? কোথা হতে ধ্বনিছে ক্রন্দনে/শূন্যতল? কোন অন্ধকার মাঝে জর্জর বন্ধনে/অনাথিনী মাগিছে সহায়?............/অন্ন চাই, প্রাণ চাই, চাই মুক্ত বায়ু, /চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, চাই আনন্দ-উজ্জ্বল পরমায়ু, / সাহসবিস্তৃত বক্ষপট!’ (এবার ফিরাও মোরে/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। আমরা কি ফিরবো? ফিরতে পারবো?

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..