নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন : বর্তমান প্রেক্ষিত

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
রেখা চৌধুরী : রাজনীতি হচ্ছে এমন একটি বিষয় যেখান থেকে উৎসারিত হয় রাষ্ট্র পরিচালনার সকল রীতিনীতি ও কর্মকাণ্ড। আজকের বিশ্বে প্রতিটি রাষ্ট্রই পরিচালিত হচ্ছে নিজ নিজ রাজনীতি দ্বারা। প্রতিটি দেশের ভৌগলিক অবস্থান, আঞ্চলিক অবস্থান, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদা, ভাষা-কৃষ্টি, সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়েই আবর্তিত হয় রাজনৈতিক অবস্থান। একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, সমতাভিত্তিক মানবিক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের দৃঢ় অঙ্গিকার নিয়েই সংগঠিত হয়েছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। একটি জনকল্যাণমুখী জবাবদিহিতামূলক, নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরেই দায়বদ্ধ রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন সুস্থ রাজনীতির বিকাশ ও চর্চা অব্যাহত রাখা। প্রয়োজন নির্বাচিত কার্যকর সংসদ, সংবিধান, দায়িত্বশীল বিরোধী দল এবং নারী-পুরুষ তথা জনগণ ইত্যাদি বিষয়গুলো। এজন্যই প্রয়োজন নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। রাষ্ট্র পরিচালিত হয় রাজনীতি দ্বারা। জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। সেখানে যদি অর্ধেক জনগোষ্ঠী তথা নারীর সরব উপস্থিতি না থাকে, যথাযথ প্রতিনিধিত্ব না থাকে তৃণমূল পর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত তাহলে সেই শাসনব্যবস্থাকে আমরা পূর্ণ বা জনকল্যাণকর বলতে পারি না। কল্যাণকর জবাবদিহিতামূলক স্বচ্ছ রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়েই নারীর কার্যকর উপস্থিতি তথা ক্ষমতায়ন প্রয়োজন। কারণ ঘরে বাইরে শ্রম বাজারের সর্বত্রই নারী তার মেধা, শ্রম, সময়, চিন্তা, মননশীলতা ব্যয় করে চলেছে প্রতিনিয়ত। আমাদের দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা, চিকিৎসা, স্বাস্থ্য, ঋণ ব্যবস্থা পোশাক শিল্প ইত্যাদি ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গত কয়েক বছরে যা যা উন্নয়ন হয়েছে তাতে দেশের সর্বস্তরের নারীদের একটা অবদান রয়েছে। তারপরেও নারীর অবস্থানের খুব উন্নয়ন হয় না। নারীর এই অগ্রযাত্রা অবাধ, নিরাপদ, সুনিশ্চিত ও সুদৃঢ় করার লক্ষেই প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর পূর্ণ ক্ষমতায়ন। রাজনীতি শুধুমাত্র পুরুষের কাজ- এই ধারণা থেকে নারী-পুরুষ তথা সমাজের সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তন। শত বছর ধরে চলে আসা সমাজের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করা জন্য। এ জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা, স্বদিচ্ছা ও আন্তরিক দৃষ্টিভঙ্গি। এ লক্ষ্যেই দেশের নারী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠন ১৯৭৩ সাল থেকেই জানিয়ে আসছে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন সংরক্ষিত আসন সংখ্যা বৃদ্ধির। পরবর্তীতে সময়ের দাবিতে, সামজের উন্নয়নের লক্ষ্য, সর্বস্তরের নারীর ক্ষমতায়ন, সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য উক্ত দাবির সাথে যুক্ত হয়েছে, জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন সংখ্যা এক তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি করা হোক। এই সংরক্ষিত আসনসমূহে সরাসরি নির্বাচন চালু করা হোক এবং সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনী এলাকা সুনির্দিষ্ট করা হোক। একইসঙ্গে দাবি প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল প্রতিটি স্তরেই এক তৃতীয়াংশ নারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক এবং সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন দেয়া হোক। দেশের সকল নারী ও মানবাধিকার সংগঠন, সকলে সামাজিক সংগঠনের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ফলে নাগরিক সমাজ ও এই রাজনৈতিক দাবির প্রতি সমর্থন জানায়। ফলে উল্লিখিত ইস্যুটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক এজেন্ডায় পরিণত হয়। এবং জাতীয় পর্যায় এক ধরনের ঐক্যমতের সৃষ্টি হয়। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ১৯৯৭ এ এই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে দেশে প্রথমবারে মতো স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদের সাংরক্ষিত নারী আসনসমূহে সরাসরি নির্বাচন শুরু হয়। ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বর্তমান সরকারের প্রধান রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের ১২.২ অনুচ্ছেদে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংখ্যা ৩৩ শতাংশে উন্নীত করা হবে এবং সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি ছিল। পরবর্তীকালে ২০০৯ সালের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন যে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ণ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার অবদান নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন- সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংখ্যা ৪৫-১০০/৩ উন্নীত করা হবে এবং তারা সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন। দেশের নারীসমাজ-নারী আন্দোলনের জন্য অত্যন্ত আশাবাদী। পরবর্তী জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১-তেও ৩২.৭ অনুচ্ছেদে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একই ঘোষণা দেয়া হয়। এমতাবস্থায় দেশের জনগণ, নারী সমাজ-নারী আন্দোলনের সকল পর্যায়ের সংগঠক-কর্মী যখন অপেক্ষা করছিল যে, দশম জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হবার সাথে সাথেই চলমান নারী আসনের বিধানটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে তার আগেই নারী আন্দোলনের, নারী সমাজের দীর্ধ দিনের দাবি ও প্রত্যাশা পূরণের একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। এমতাবস্থায় বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত ২৯ জানুয়ারি ২০১৮ সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সভায় জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন ব্যবস্থা আরও ২৫ বছর বহাল থাকবে এই মর্মে সংবিধান (সপ্তদশ সংশোধন) আইন ২০১৮-এর খসড়া অনুমোদন দেয়া হয়, যা এদেশের নারী সমাজের জন্য অত্যন্ত অসম্মানজনক। শুধু তাই নয়, এটা এযাবতকালে সরকারে গৃহীত জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিসহ গৃহীত সব নীতিসমূহ, ঘোষণা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গৃহীত সকল কর্মসূচি, জাতিসংঘ ঘোষিত সিডো সনদ, ও এস.ডি.জি’র সাথেও সাংঘর্ষিক। এমতাবস্থায় আমরা চাই নারীর অগ্রযাত্রা অবাধ-নিরাপদ-সুনিশ্চিত ও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর পূর্ণ ক্ষমতায়ন। কারণ রাজনৈতিক দলের নীতিগত, কাঠামোগত ও আইনগত পরিবর্তনের অঙ্গিকার ছাড়া নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন তথা সার্বিক ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়। রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ তথা নারীর সার্বিক ক্ষমতায়নের জন্য প্রয়োজন ইতিবাচক ভূমিকা ও আন্তরিক সদিচ্ছা। দেশের নারী আন্দোলন সংগঠন, সামাজিক সংগঠনগুলো এ বিষয়ে রাজনৈতিক দল ও নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাংসদ, শিক্ষক/শিক্ষার্থীসহ সকল জনগনকে সাথে নিয়ে যার যার মত দেশব্যাপী আলোচনা সভা, মতবিনিময় সভা, স্মারকলিপি পেশ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। যাতে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথ বাধামুক্ত-প্রশস্ত হয়। বর্তমানে গোটা বিশ্ব জুড়ে এক অদৃশ্য ঘাতক করোনার ভাইরাসের বিধ্বংসী ছোবলে গোটা মানব জাতি আজ দিশেহারা। উলোট-পালোট হয়ে গেছে মানুষের চলমান জীবন-জীবিকার পথ। সর্বত্র আতঙ্ক বিরাজমান। বাংলাদেশ এর বাইরে নয়। ইতোমধ্যে এই ভাইরাসের অভিঘাতে আমাদের দেশেও প্রতিদিনই প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে। চাকুরিচ্যুত হয়েছে কর্মহীন হয়ে পড়েছে শ্রমজীবী, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্তসহ সকল পর্যায়ের নারী ও পুরুষ। ঘরবন্দি মানুষের জীবন। এর ফলশ্রুতিতে বেড়ে গেছে নারীর প্রতি সব রকমের সহিংসতা, নির্যাতন, নিপীড়নের মাত্রা। কন্যা শিশু, তরুণী এক কথায় নারীর জীবন আজ চরমভাবে নিরাপত্তাহীন। এমনই এক অস্থির সময়ে আমরা সংবাদমাধ্যমে (৩ জুন ২০২০, প্রথম আলো) জানতে পারলাম যে, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের মাঝে অন্যতম পদক্ষেপ- “২০২০ সালের মধ্যে সকল রাজনৈতিক দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিটি কমিটিতে ৩৩% নারী থাকতে হবে” বিধান রেখে ২০০৯ সালে নির্বাচন কমিশন যে জনপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল তা আজ ২০২০ সালে এসে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে তার পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। নির্বাচনের কমিশনের এহেন চিন্তা-ভাবনা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটি পশ্চাৎমুখী পদক্ষেপ। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ণ তরান্বিত করার লক্ষ্যেই প্রতিটি দলের ২০২০ সালের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ প্রতিনিধিত্ব বাধ্যতামূলক করার বিধান রেখে ২০০৯ সালে সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব ৯০ (খ) দ্বারা আদেশ করা হয়। যাতে রাজনীতিতে নারীর দৃশ্যমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়। এবং এই অধ্যাদেশের ফলে তৃণমূলের নারীদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছিল, যা এদেশের নারী আন্দোলনের দীর্ঘ দাবি ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে কোনোরূপ আলাপ-আলোচনা ব্যতিরেকে নারী আন্দোলন ও বিভিন্ন অংশীজনের সাথে আলোচনা না করে সর্বোপরি রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে এ বিষয়ক কোনোরকম দাবি না ওঠা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার চিন্তা কেন করেছে, যা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য উদ্বেগজনক পদক্ষেপ। এটা ভাববার বিষয়। যদিও কমিশনের নতুন অধ্যাদেশটিতে বলা হয়েছে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বিষয়ে একটি পৃথক আইন হতে যাচ্ছে যেখানে দলের কমিটিসমূহে ৩৩% নালী রাখতে হবে বলা হলেও তার কোনো সময়সীমা বা বাধ্যবাধকতা নাই। কিংবা ৩৩% নারী প্রতিনিধিত্ব না রাখলে রাজনৈতিক দলের কোন জবাবদিহিতা বা শাস্তির বিধান রাখা হয়নি। এক্ষেত্রে নতুন এই আইনে রাজনৈতিক দলের জবাবদিহিতা এবং সময় নির্দিষ্ট করে না দিয়ে নতুন আইন করা হলে তা হবে নারীর ক্ষমতায়নের কোনও একটি পশ্চাদমুখী পদক্ষেপ। সরকারের যে সকল ইতিবাচক পদক্ষেপের ফলে আন্তর্জাতিক ইনডেক্সে বাংলাদেশের জেন্ডার বৈষম্য কমে এসেছিল তাতে করে তা আবার বৃদ্ধি পাবে। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে যে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে তাকে আরো অগ্রসর কার্যকর এবং টেকসই করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলের সকল পর্যায়ের নীতি নির্ধারণী ক্ষেত্রে ৩৩% নারীর অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি আরও জোরদার করতে হবে। নির্বাচন কমিশন প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সাথে এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আগামীতে সময়সীমা নির্দিষ্ট করতে হবে এখনই। রাজনৈতিক দলসমূহ, নারী সংগঠনসহ সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন, নাগরিক সমাজ, সর্বস্তরের জনগণ একত্রিত হয়ে এ বিষয়ক গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ পরিবর্তন করে এবং শর্ত শিথিল করে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বিষয়ক আইনের ধারায় যে প্রস্তাব রাখা হয়েছে তা পরিবর্তনের জোর দাবি জানানো হোক। তা না হলে শুধু নারীসমাজই নয় সমগ্র দেশবাসী যতটুকু এগিয়ে ছিল তার দ্বিগুণ পিছিয়ে পড়বে। উন্নয়নের মহাসড়কে দাঁড়িয়ে শুধু ঊর্ধ্বমুখে তাকালেই হবে না, মহাসড়কে জমে থাকা ধূলা/ময়লাও পরিষ্কার করতে হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..