পাটকল বন্ধে পাটচাষির সর্বনাশ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

রফিকুজ্জামান লায়েক : ২৫টি সরকারি পাটকল বন্ধ করে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কোন প্রক্রিয়ায় বন্ধ করা হবে, তাও চূড়ান্ত করেছে সরকার। ইতোমধ্যে যাতে মিলগুলিতে কোন বিদ্রোহ-সংগ্রাম না হয় তার জন্য পুলিশ মোতায়েন, দালাল নেতা নিয়োগ, ভাড়াটে গুন্ডা বাহিনীও সেট করেছে কর্তৃপক্ষ। শ্রমিক-কর্মচারীদের পাওনা টাকা পরিশোধ কীভাবে করবে তাও বলা হয়েছে। যদিও এ নিয়ে শ্রমিকসহ নানা মহলের সন্দেহ রয়েছে। কারণ আদমজীর উদাহরণ মানুষের জানা আছে। আদমজী আর চালু হয় নাই। বরং সেখানকার হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ ও সম্পত্তি লুটপাট করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন এই সিদ্ধান্ত? সরকারের তরফ থেকে লোকসানের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু মানুষ তা মানতে নারাজ। গত ৪৮ বছরে এই ২৫টি পাটকলে ১০ হাজার কোটি টাকা লোকসানের যে গল্প সরকার তৈরি করেছে, তা নিয়ে মানুষের মনে নানা যৌক্তিক প্রশ্ন আছে। কেননা দীর্ঘ এই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলি ভুল নীতিতে পরিচালনা করা হয়েছে। আর এই ভুলনীতির সুযোগ নিয়ে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা দেদারছে লুটপাট করেছে। মিলগুলিতে পাট ক্রয়ের জন্য সময়মত টাকা ছাড় দেয়া হতো না। উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করার জন্য যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণের অভাবের পাশাপাশি বাইরের বাজারে রপ্তানির জন্য সময়মত কাজ না করা এবং চূড়ান্তভাবে পাটকলগুলিকে আধুনিকায়ন না করাও ছিল ভুল নীতির অংশ। ফলে সরকার নিজের উদ্যোগহীনতা, দায়িত্বহীনতা ও অদক্ষতার দায়ভার শ্রমিক-কর্মচারীদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে পাটকলগুলি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাটকল বন্ধ করার কারণে স্থায়ী-অস্থায়ী শ্রমিকসহ মিল এলাকায় মাঝেমধ্যেই ডেইলি মজুরির ভিত্তিতে কাজ করতেন যারা, তারা সবাই হঠাৎ বেকার হয়ে পড়েছেন। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবেন পাটচাষিরা। সরকার পাট না কেনার ফলে শুধু ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি রপ্তানিকারকরা বিনা প্রতিযোগিতায় ইচ্ছেমত দাম দিয়ে পাট কিনবে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের ক্রেতা থাকা সত্ত্বেও পাটচাষিরা পাটের লাভজনক দাম দূরে থাক- উৎপাদন খরচই গত বেশ কয়েক বছর যাবৎ তুলতে পারছেন না। আর এখন তো সরকার পাটের বাজার থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে বেসরকারি মালিক ও রপ্তানিকারকদের ওয়াকওভার করে দিলো। খেলার মাঠে একপক্ষ না আসলে দর্শক খেলা উপভোগ থেকে বঞ্চিত হন। ঠিক তেমনি বাজারে একাধিক ক্রেতা না থাকলে পণ্যের উৎপাদক লাভজনক বা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। ফলে পাটচাষিরা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির সম্মুখীন হবেন তাতে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু সরকার এই কাজ করছে কেন? এভাবে তথাকথিত লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় চেতনার পরিপন্থি। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী রাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য ছিল নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে জাতীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করা। অথচ যারা মুক্তিযুদ্ধকে মনে করে একক দলীয় সাফল্য তারা কেন পাটকল বন্ধ করে বা বিক্রি করে বেসরকারি মালিকানার ছেড়ে দেয়। কারণ, তারা হলো মুক্তিযুদ্ধের ঠিকাদার- অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের নামে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে ব্যবসা করছে। যেমন সাম্প্রদায়িক শক্তি ধর্মকে ব্যবহার করে ব্যবসা করে। খোলাসা করে বললে বলতে হবে এবং যা প্রমাণিত তা হলো বর্তমান শাসক মহল মুক্তিযুদ্ধকে বিক্রি করছে। মুক্তিযুদ্ধের ফেরিওয়ালা সেজে মানুষের ঘরে সিঁধ কেটে চুরি ও লুট করছে। এবং চূড়ান্তভাবে দেশকে-দেশের মৌলিক চেতনাকে পিছনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। পাটকল বন্ধ করা এরই অংশ মাত্র। পাটচাষি, পাটকল ও পাটশিল্প- এসব আমাদের দেশে হঠাৎ গজিয়ে উঠা বা আকাশ থেকে পড়া কোনো বিষয় নয়। পাট চাষের রয়েছে শত শত বছরের ইতিহাস, আর পাটশিল্পেরও ইতিহাস আমাদের দেশে নতুন নয়। এক সময় আমাদের ভূখণ্ডের মানুষ শুধু গেরস্থালির কাজের জন্য পাট চাষ করতেন। কিন্তু দুইশত বছরেরও পূর্ব থেকে মানুষ বাণিজ্যিকভাবে পাট চাষ করছেন। কেউ হয়তো ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন- কিন্তু সত্যটা হলো বাঙালি মধ্যবিত্ত বিশেষ করে মুসলিম মধ্যবিত্তের বিকাশ পাট বিক্রির টাকা দিয়ে। বর্তমানের যে পাটকল-পাটশিল্প শুধু এটাই নয়, পাটকল স্থাপনের অনেক আগে থেকেই আমাদের দেশের পাটশিল্পের যাত্রা বা পাটশিল্প বিকশিত হয়েছিল। যদিও সে বিষয়টি ব্যাখ্যার জন্য এ লেখা নয়। পাটচাষি, পাটকল ও পাটশিল্প আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু সম্ভাবনাময় এ খাতকে আমাদের দেশের শাসকশ্রেণি নানা অপকর্মের মাধ্যমে তাকে ধ্বংস করছে। আমাদের দেশের পাটচাষিরা রোদ-বৃষ্টি-গরম উপেক্ষা করে পাট উৎপাদন করে আসছেন। একসময় আমাদের প্রধান রপ্তানির দ্রব্য ছিল কাঁচা পাট ও পাটজাত দ্রব্য। এখনও রপ্তানির প্রায় ৪ ভাগ আয় আসে পাটখাত থেকে। আমাদের পাটের চাহিদা নতুন করে বাড়ছে দুনিয়াব্যাপী। তাকে সরকারে দায়িত্বে ধরার চেষ্টা না করে এখন পুরো পাটখাতকে ব্যক্তি মালিকের হাতে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। পাটের বাজারে প্রতিযোগিতা না থাকায় পাট চাষিরা প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হবেন। লাভবান হবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও মালিকরা। পাটের সাম্প্রতিক সাফল্য অভাবনীয়। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য শতকরা ১৫ ভাগ বেশি রপ্তানি হয়েছে। যদিও গত অর্থবছরের শেষের চার মাসে করোনা দুর্যোগের কারণে বহির্বাণিজ্যে নানা সমস্যা ছিল। ২০/৩০ বছর আগে ১৩/১৪ লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করে যে পরিমাণ উৎপাদ হতো এখন ৮/৯ লাখ হেক্টর জমিতে চাষ করে তার চেয়ে বেশি পাট উৎপাদন হচ্ছে। এটা পাটচাষির সাফল্য। আমাদের দেশে লাখ-লাখ হেক্টর জমি আছে, যেখানে বৃষ্টির মৌসুমে পাট ছাড়া অন্য ফসল ভাল হয় না। ফলে পাটচাষি জীবনের প্রয়োজনে লাভজনক দাম না পেলেও পাটচাষে বাধ্য হন। কিন্তু সরকারি পাটকলগুলি বন্ধ হওয়ার কারণে পাটচাষিরা মহাবিপাকে পড়ে যাবেন। শুধু পাটচাষিই নন, আমাদের দেশের জনসংখ্যার ১৫-২০ ভাগ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাট চাষের ও পাটশিল্পের সাথে জড়িত। শাসক মহল তার শ্রেণির মানুষের স্বার্থ রক্ষার জন্য পাটকলগুলি একের পর এক বন্ধ করছে। লাখ লাখ পাটচাষির বিবেচনা তাদের নাই। পাটকল বেসরকারিকরণের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে পাটচাষির। লোকসানের যে অজুহাত সরকার দিচ্ছে তার দায় কোনোভাবেই পাটচাষির নয়। ৫০ হাজারের বেশি শ্রমিক কর্মচারী বেকার হবে ঠিকই। কিন্তু তার থেকেও বড় সর্বনাশ হবে কয়েক লাখ পাটচাষি ও এই শিল্পের সাথে জড়িত কোটি মানুষের। কৃষিবান্ধব সরকার এই ধরনের গালভরা বুলি যতই আওড়ানো হোক না কেন তাদের চরিত্র পাটচাষি কৃষকরা বুঝতে পারছেন। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন গঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে ১৯৭২ সালে ৬৭টি পাটকল জাতীয়করণ করা হয়। পরে পরিত্যক্ত ও বন্ধ থাকা আরও ৮টি পাটকল সরকার অধিগ্রহণ করে। বন্ধ করতে সর্বশেষ ২৫টি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেবার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে দেশের শাসকশ্রেণি জাতীয় শিল্প ও কৃষকবান্ধব নয়। পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার পাটচাষি ও পাটশিল্পের সাথে জড়িত মানুষকে চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিল। সরকারের এই মানুষবিরোধী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাজপথে যে সংগ্রাম চলছে তাকে বেগবান করা এখন সময়ের দাবি। লেখক : সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..