পাটকল বন্ধের রাজনীতি: বিকল্প ভাবনা ও প্রতিরোধের প্রশ্ন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
ডা. মনোজ দাশ : বিশ্ববাজারে পাটের চাহিদা বাড়ছে। পাট ও পাটজাত পণ্যের এমন একটি সম্ভাবনাময় সময়ে, করোনা বিপর্যয়ের মধ্যে সরকারের ভুল নীতির দায় শ্রমিকদের ওপরে চাপিয়ে, লোকসানের অজুহাতে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের এই সিদ্ধান্ত লুটেরা পুঁজিবাদের নয়া উদারবাদী এক চূড়ান্ত আক্রমণ। এটা শুধু পুঁজিবাদের দুর্যোগকালীন রাজনৈতিক অর্থনীতিই নয়, একই সাথে এটা তার নয়া উদারবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতির আসল রূপ। প্রথমত, পুঁজিবাদের আর এক রূপ এই নয়া উদারবাদ দেশি-বিদেশি লুটেরাদের স্বার্থে আমাদের অর্থনীতি-শিক্ষা-মিডিয়া-রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। দ্বিতীয়ত, এই নয়া উদারবাদ সব ধরনের কল্যাণমূলক কর্মসূচির সংকোচন ঘটাতে আগ্রহী। তৃতীয়ত, গণতন্ত্রহীন কর্তৃত্ববাদী সরকার এই নয়া উদারবাদী ভাবাদর্শে সজ্জিত হয়ে অব্যাহতভাবে বেসরকারিকরণে উৎসাহী। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ সরকার ব্যক্তির হাতে তুলে দিতে চায়। লোকসানের অজুহাতে করোনা দুর্যোগের সময় রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করে দেয়া তারই নগ্ন প্রকাশ। দেশি-বিদেশি লুটেরাদের স্বার্থে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত আমাদের সংবিধানে ঘোষিত মৌলিত নীতির লংঘনই নয়, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা ও লক্ষ্যকে সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র। তাই মহান মুক্তিযুদ্ধের সুফল রাষ্ট্রায়ত্ত পাটশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার সংগ্রাম গড়ে তোলা আমাদের একটা জাতীয় দায়িত্ব। কারণ পাটচাষ ও পাটশিল্প আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির সাথে জড়িত। বাংলার পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হচ্ছে পাট ও পাটশিল্প। দেশ ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে পাট ও পাটজাত পণ্যের বিশাল সম্ভাবনাময় এই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া যায় না। ১৯৫১ সালে নারায়ণগঞ্জে জুট মিল স্থাপনের মধ্যদিয়ে আমাদের পাটশিল্পের যাত্রা শুরু। উপযুক্ত আবহাওয়া, সহজলভ্য উন্নত মানের পাটের যোগান এবং শ্রমিকশ্রেণির অবদানের মধ্যদিয়ে পাট আমাদের প্রধান শিল্পে পরিণত হয়। ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানসহ বাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের সাথে পাটশিল্পের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন (বিজেএমসি) গঠিত হয়। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে দেড় যুগ পাট ও পাটজাত পণ্যই ছিল প্রধান রপ্তানিকারক পণ্য। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটশিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসার জন্য বাংলাদেশের শাসকশ্রেণির রাজনীতি ও অর্থনীতির ছত্রছায়ায় দেশি-বিদেশি লুটেরা চক্রই দায়ী। আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংকের ভুল প্রেসক্রিপশন, লুটেরা শাসকশ্রেণির ভ্রান্ত নীতি, ব্যবস্থাপনার দক্ষতার অভাব, ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও জবাবদিহিহীনতা, সর্বোপরি পুরাতন যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন না করে এই শিল্পকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এক সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনে ভূমিকা পালনকারী বিজেএমসিকে লোকসানী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটশিল্পের বন্ধ ঘোষণা দেশ ও জাতীয় স্বার্থ বিরোধী। এখন পাটশিল্পের বিকাশে এক অনুকূল বিশ্বপরিস্থিতি বিরাজ করছে। সবুজায়নে জোর দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ২৮টি দেশ পলিথিন বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে পাটের ব্যাগের চাহিদা বাড়বে। ইন্টারন্যাশনাল জুট স্টাডি গ্রুপের হিসাব অনুযায়ী বছরে পাঁচ হাজার কোটি পিস শপিং ব্যাগের চাহিদা রয়েছে এখন। প্রাকৃতিক আঁশ সমিতি বলেছে ২০২০ সালের পর শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই বছরে দেড় হাজার কোটি পিস পাটের শপিং ব্যাগের চাহিদা সৃষ্টি হবে। এছাড়া সৌখিন ও আসবাবপত্র তৈরির কাঁচামাল তৈরির উৎপাদনের সুযোগও দিন দিন বাড়ছে। বিশ্ববাজারে এখন শুধু পাটের ব্যাগের চাহিদা রয়েছে ৫০০ বিলিয়ন পিস। এর দশ শতাংশ ধরতে পারলে বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকা আয় হবে বাংলাদেশের। ভবিষ্যতে রপ্তানির অন্যতম খাত হবে পাট। পাটের অনুকূল বিশ্ববাজার ধরতে বাংলাদেশের প্রতিবেশি ও প্রতিযোগি দেশগুলি এরই মধ্যে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পাটশিল্পের বিকাশে অনুকুল বিশ্ব পরিস্থিতিকে জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার না করে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করে দিয়ে সরকার তাহলে কাদের স্বার্থ রক্ষা করছে? রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করে দিয়ে সরকার শুধু দেশের ব্যক্তিমালিকানাধীন পাটকল মালিকদের শ্রমিককে কম বেতন দেয়ার মাধ্যমে নির্মম শ্রম শোষণ ও মুনাফার সুযোগই করে দিচ্ছে না, একই সাথে প্রতিবেশি ও প্রতিযোগি দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবাধে ব্যবসার সুযোগ করে দিচ্ছে। পিপিপি-র মাধ্যমে সরকারি কলকারখানা চালানোর অতীত অভিজ্ঞতা খুবই খারাপ। এটা লুটপাটের রাস্তা অবারিত করে দেবে। দেখেশুনে মনে হয় সরকার এটাই চায়। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাত্র ১২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের আধুনিকায়ন করা সম্ভব। সরকার তা না করে ৫০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করে কারখানা বন্ধ করছে। ২৫টি পাটকলের জায়গা-জমি-রাস্তা-গোডাউন-নদীরঘাট এবং যন্ত্রপাতির বাজারমূল্য প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। লোকসানের অজুহাতে জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে পিপিপির নামে রাষ্ট্রের এই সম্পদ তুলে দেয়া হচ্ছে ব্যক্তির হাতে। দরকার ছিল লোকসানের জন্য দায়ী মন্ত্রণালয় ও বিজিএমসির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের অপসারণ ও বিচার করা। জুলাই-আগস্ট মাসে যখন কৃষকের হাতে পাট থাকে এবং পাটের দাম প্রতি মণ ১২০০-১৫০০ টাকা থাকে তখন মন্ত্রণালয় টাকা বরাদ্দ করে না। যখন পাট থাকে আড়তদারের কাছে, প্রতি মণ পাটের দাম ২২০০-২৫০০ টাকা হয়ে যায় তখন টাকা বরাদ্দ হয়। ৪২ কেজিতে মণ কিনে কারখানায় দেয়া হয় ৩৯ কেজি হিসেবে। এই প্রক্রিয়ায় কৃষক ন্যায্য দাম পায় না। লাভ হয় আড়তদারের। ভাগ পায় মন্ত্রণালয় ও বিজিএমসির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। লোকসান হয় কারখানার। ৪৪ বছরে লোকসান হয়েছে ১০,৬৭৪ কোটি টাকা। এ সময়ে খেলাপি ঋণ মাফ করা হয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। গত ছয় বছরে কোনো কাজ না করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্যুইক রেন্টাল কোম্পানি সরকারের কাছ থেকে ভর্তূকি নিয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। ২০১০ সালে প্রনয়ন করা হয়েছিল ম্যান্ডেটরি প্যাকেজিং এ্যাক্ট। এতে পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে পাটের ব্যবহার বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা ছিল। সরকার সেই এ্যাক্ট বাস্তবায়নে মনোযোগী হয়নি। সরকারের ভুলনীতি, দুর্নীতি ও লুটপাটের খেসারত শ্রমিকশ্রেণি ও গোটা দেশের জনগণ বহন করতে রাজি নয়। পাটশিল্পের জন্য অনুকূল বিশ্ব পরিস্থিতির এই সময়ে মানুষের যুক্তিসংগত দাবি হচ্ছে- রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ নয়, বেসরকারিকরণও নয়; আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ও ভারতকেন্দ্রিক সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের চাপ মোকাবিলা করে, ভ্রান্তনীতি ও ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতার অভাব কাটিয়ে, প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্নীতিমুক্ত করে এবং পুরাতন যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন করে রুগ্ন দশা থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটশিল্পকে বের করে এনে পাটশিল্পের যথাযথ সম্প্রসারণ ঘটানো। প্রথমত, দরকার ৭৭টি পাটকল পরিচালনা করতে গঠিত বিজেএমসি-র বর্তমান কাঠামোকে পরিবর্তন করে ২৫টি পাটকলকে পরিচালনার মতো দক্ষ ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন দুর্নীতি টিকিয়ে রাখার জন্য যে অশুভ চক্র ক্রিয়াশীল থেকে বছরের পর বছর লোকসানের পরিস্থিতি তৈরি করেছে তাকে সমূলে নির্মূল করা। সবক্ষেত্র জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার পথ বেছে নেয়া। তৃতীয়ত, এবং সর্বোপরি বিজেএমসিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে কারখানাগুলির পুরাতন যন্ত্রপাতি পরিবর্তন করে আধুনিক যন্ত্র স্থাপনের মাধ্যমে উৎপাদন হার বৃদ্ধি করে মাথাপিছু ব্যয় কমানোর কৌশল গ্রহণ করা দরকার। শ্রমিকদের কাজের সুযোগ অব্যাহত রেখে বিদ্যমান শত বছরের পুরোনো স্কটল্যান্ড টেকনোলজি পর্যায়ক্রমে ধাপে ধাপে আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে আধুনিকায়ন বাস্তবায়নের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করাই হবে যুক্তিসংগত। এই আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ায় বর্তমানে কর্মরত শ্রমিক উদ্বৃত্ত হবে না। উৎপাদন ক্ষমতা তিনগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছু নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। উৎপাদিত পণ্যের গুণগতমান, বহুমুখিনতা ও বৈচিত্র বৃদ্ধি পাবে। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ প্রাধান্য বিস্তার করতে সক্ষম হবে। এভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করার ফলে সামগ্রিকভাবে বিজিএমসি আত্মনির্ভরশীল, কার্যকর এবং সরকারি কোনো আনুকুল্য সাবসিডি ছাড়াই লাভজনক ও ব্যবসায়িকভাবে পরিচালিত হতে পারতো। ২৫ হাজার টাকা করে বেতন দিয়েও লাভ করা সম্ভব। কিন্তু সরকার সে পথে হাঁটেনি। ক্ষমতায় থাকার জন্য আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশন ও ভারতকেন্দ্রিক সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ ঘোষণা করেছে। শুধু তাই নয় ফ্যাসিবাদী কায়দায় ভয়-ভীতি-গ্রেফতার-জেল-জুলুমের মাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও আন্দোলন সংগ্রামকে দমন করার ঘৃণ্য পথ বেছে নিয়েছে। পাটশিল্প রক্ষার প্রশ্ন শুধু পাট শ্রমিকদের বেঁচে থাকার প্রশ্ন নয়, এটা জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা ও লক্ষ্যের সাথে এটা যুক্ত। তাই মহান মুক্তিযুদ্ধের সুফল রাষ্ট্রায়ত্ত পাট শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার সংগ্রাম গড়ে তোলা আমাদের একটা জাতীয় এজেন্ডা ও দায়িত্ব। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ও সাম্রাজ্যবাদের চাপ প্রত্যাখান করে যথার্থ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটশিল্পকে রক্ষা ও বিকশিত করা সম্ভব। কিন্তু বর্তমান শাসকশ্রেণি সহজে এটা করবে না। এজন্য গড়ে তুলতে হবে জনগণের অন্দোলন। বিপ্লবী গণতান্ত্রিক ধারার শ্রমিক আন্দোলনের পাশাপাশি পাট শিল্প রক্ষা ও বিকাশের জন্য গড়ে তুলতে হবে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনায় জাতীয় জাগরণ ও প্রতিরোধ। বাম ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, শক্তি ও বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ এই জাতীয় দায়িত্ব পালনে রাখতে পারেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..