ফ্লয়েড, নিখিল ও ডা. রকিব হত্যা এবং প্রসঙ্গ ‘হেটক্রাইম’

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
হাবীব ইমন : এক. ৩০ সেকেন্ডের এক ভিডিও। গাড়ি থেকে বের করে কীভাবে অমানবিকভাবে হত্যা করা হলো একজন মানুষকে। গত ২৫ মে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা রাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহরে পুলিশি নির্যাতনে মারা যান ৪৬ বছররে জর্জ ফ্লয়েড। যিনি হিউস্টনে একটি বারে বাউন্সার হিসেবে কাজ করতেন। ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের পর, মে’র ২৬ তারিখে প্রথমে আন্দোলন শুরু হয়। যে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের অনেক দেশে। শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার ডেরেক চৌভিন কনেল্ট ৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড হাঁটু দিয়ে ফ্লয়েডের গলা চেপে ধরেছিলেন। এ সময় ফ্লয়েড বারবার বলছিলো ‘আই কান্ট ব্রিথ’ (আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না)। এ সময় চৌভিনের সাথে সহায়তা করেছেন আরও তিনজন পুলিশ অফিসার। যদিও তারা সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে এই অপরাধের সাথে জড়িত ছিলেন। ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণাঙ্গদের আন্দোলনের মুখে এরই মধ্যে ডেরেক চৌভিনকে গ্রেফতার করে তার বিরুদ্ধে সেকেন্ড ডিগ্রি হত্যার চার্জ গঠিত হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ওই পুলিশ অফিসারের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। আর অন্য তিন অফিসারের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন চার্জ আনা হয়েছে। পুলিশের হেফাজতে মৃত্যু হওয়া আফ্রো-আমেরিকান জর্জ ফ্লয়েড, যার ‘একমাত্র অপরাধ ছিল কৃষ্ণাঙ্গ হয়ে জন্ম নেয়া’। কিন্তু আমেরিকায় দীর্ঘদিন ধরে চলা বর্ণবাদী আচরণে এখন প্রতিবাদ চলছে। সেই প্রতিবাদ কর্মসূচিগুলোতে পুলিশ হামলা করছে। আন্দোলন থেমে নেই। দুই. বাংলাদেশে দৈনিক পত্রিকাগুলোতে ৪ জুন ‘গোপালগঞ্জে এএসআইয়ের পিটুনিতে যুবকের মৃত্যুর অভিযোগ’ র্শীষক একটি খবর ছাপা হয়েছে। সংবাদটিতে বলা হয়েছে, কোটালিপাড়া উপজলোর রামশীল ইউনিয়নের রামশীল গ্রামের নীলকান্ত তালুকদারের ছেলে নিখিল তালুকদার, ২ জুন অপর তিনজনের সাথে বসে তাস খেলছিলেন। পুলিশ অফিসার শামীম উদ্দিন একজনকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়। তারা গোপনে তাস খেলা ভিডিও করেন। এ সময় খেলোয়াড়রা তা টের পেয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। তিনজন পালাতে সক্ষম হলেও, নিখিল ধরা পরে পুলিশ অফিসার শামীমের হাতে। এসময় পুলিশ অফিসার নিখিলকে হাঁটু দিয়ে আঘাত করে তার মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীর পরিবার। এ বিষয়ে নিখিলের স্ত্রী ইতি তালুকদার বিভিন্ন গণমাধ্যমকে জানান, ‘এএসআই শামীমের আঘাতে আমার স্বামীর মেরুদণ্ডের তিনটি হাড় ভেঙে যায়। তাকে প্রথমে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যাই আমরা। সেখানে বুধবার তিনি মারা যান।’ চাঞ্চল্যকর এই হত্যার পর ৮ জুন এএসআই শামীম হাসানকে গ্রেফতার করেন পুলিশ। তিন. ১৪ জুন সকালে খুলনার গল্লামারীর মুহাম্মদ নগর এলাকার সন্তানসম্ভবা এক নারীকে রাইসা ক্লিনিকে ভর্তি করেন স্বজনরা। ওই নারীর কিছু জটিলতা থাকায় ওইদিন বিকেলে সিজারের মাধ্যমে বাচ্চা প্রসব করানো হয়। প্রথম দিকে বাচ্চা ও মা দুজনই ভালো ছিলেন। কিন্তু রাতে মায়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। সকালে ওই রোগীকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির জন্য সুপারিশ করা হয়। সকালে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর সেখান থেকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন সেখানকার চিকিৎসকরা। দুপুরের দিকে সেখান থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পথে ওই নারী মারা যান। এরপর রাত ৯টার দিকে ওই নারীর স্বজনরা মরদেহ নিয়ে ক্লিনিকের সামনে এসে অধ্যাপক ডা. রকীব খানকে মারধর করেন। এসময় ভারি কিছু দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়। মারধরের পর কয়েকবার বমি করেন ডা. রকীব খান। অবস্থা গুরুতর হতে থাকলে রাত ২টার দিকে তাকে গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সকালের দিকে সিটিস্ক্যান করে দেখা যায় তার মাথায় প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। সেখান থেকে দুপুরের দিকে তাকে শেখ আবু নাসের হাসপাতালের আইসিইউ-তে ভর্তি করা হয়। ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৬ জুন সন্ধ্যার দিকে তিনি মারা যান। করোনার এই দুঃসময়ে অনেকে যখন চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করেছিলো, ডা. রকিব তখন তার ক্লিনিক খোলা রেখেছিলেন, যাতে মানুষ চিকিৎসাটা পায়। তার প্রতিদান তাকে জীবন দিয়ে দিতে হলো! তিনি শুধু রাইসা ক্লিনিকের মালিক নন, বাগেরহাট মেডিক্যাল অ্যাসিসট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের (ম্যাটস) অধ্যক্ষও ছিলেন। এছাড়া সিনিয়র এ চিকিৎসক বিসিএস স্বাস্থ্য প্রশাসনে পরিচালক পদমর্যাদায় চাকরি করতেন। চার. সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া তিনটি ঘটনার কথা উল্লেখ করলাম। ঘটনাগুলোর সাথে বিদ্বেষ হামলার একটা তুলনা করা যেতে পারে। এই সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন রাষ্ট্রে ‘হেটক্রাইম’ নামে নতুন মোড়কে একটি অপরাধের উদ্ভব ঘটেছে। আমাদের দেশেও এটি প্রবল আকার ধারণ করছে। ডা. রকিবকে হত্যা ও থানায় মামলা না নেয়ার ঘটনা সেরকমই একটি বিদ্বেষমূলক ব্যাপার। সাধারণত হেটক্রাইম বলতে বুঝায় এমন কোনও অপরাধ, যা আসলে নিপীড়নের শিকার তার নিজের ধর্ম, বর্ণ, পেশা, অক্ষমতা কিংবা জেন্ডারের কারণে হয়ে থাকে। তিনি যেকোনও ধরনের শারীরিক, মানসিক কিংবা আর্থিক আক্রমণের শিকার হলেও তাকে বিদ্বেষ হামলা বা হেটক্রাইম বলা যেতে পারে। মানুষের যেসব খারাপ অভ্যাস রয়েছে, হিংসা ও বিদ্বেষ তার মধ্যে খুবই ক্ষতিকারক। ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক, সামাজিক জীবনে হিংসা-বিদ্বেষের ফলে দ্বন্দ্ব-কলহ, ঝগড়া-বিবাদ শান্তিপূর্ণ জীবনকে অশান্তি করে তোলে। মানুষের নিম্ন মন-মানসিকতা, ঈর্ষাপরায়ণতা, ধন-সম্পদের প্রতি লোভ, পদমর্যাদার প্রতি লালসা এবং নিজেকে বড় মনে করা থেকে হিংসা বিদ্বেষের উৎপত্তি বা বিকাশ ঘটে। এই হিংসা বিদ্বেষ মানুষের সৎকর্মকে তার অজান্তেই নষ্ট করে ফেলে। করোনার মহামারিতে বিশ্বে নতুন করে আবার বর্ণবাদ বা ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষ ও বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো সামনে এসেছে। কেবল কোনো একটি দেশ, মহাদেশ বা অঞ্চলেই এমন হচ্ছে তা নয়। গোটা বিশ্বেই কম-বেশি এরকম প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় দেশগুলোতে বর্ণবাদ ও বৈষম্য মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত এবং যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশেও বর্ণবাদ ও বৈষম্যের মতো সমস্যা নতুন করে সামনে আসছে। ইউরোপ-আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় বৈষম্যের শিকার কৃষ্ণাঙ্গ ও এশীয় জনগোষ্ঠী। অন্যদিকে এশিয়ার দেশগুলোতে বর্ণবৈষম্যের পাশাপাশি ধর্মীয় বিদ্বেষও রয়েছে। ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস ও ভারতের মতো দেশগুলোতে লকডাউনে নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে দেশগুলোর যৌনকর্মীরা চরম বৈষম্যের শিকার। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস আধানম ঘেব্রেয়েসুস নিজেই বর্ণবাদী আচরণের শিকার হচ্ছেন বলে মন্তব্য করেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাদা-কালোর যে জাতিবিদ্বেষ দেখা দিয়েছে তা সুপ্ত বর্ণবিদ্বেষেরই প্রকাশ। রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে মানুষের ভেতরে নানামুখী হতাশা তৈরি হয়। আর এ হতাশা থেকে বিভিন্ন বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে বিস্তার লাভ করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প করোনাভাইরাস মহামারির জন্য শুরু থেকেই চীনকে দায়ী করে আসছেন। তিনি এই ভাইরাসকে সরাসরি ‘চীনা ভাইরাস’ নামে ডাকছেন। যা দেশটিতে থাকা চীনা বংশোদ্ভূত নাগরিকদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটিতে বর্তমানে চীনা নাগরিক, চীনা বংশোদ্ভূত ও এশীয়রা ব্যাপক হারে জেনোফোবিয়া বা জাতিবিদ্বেষের শিকার হচ্ছেন। এমনকি রাস্তায় চলতে গিয়ে হামলার শিকারও হচ্ছেন। যা ইতোমধ্যে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিতও হয়েছে। আমেরিকার পুলিশ বলছে, বেশিরভাগ বিদ্বেষ অপরাধই বর্ণবাদী। এ বর্ণবাদী বিদ্বেষ কিন্তু আজ প্রথম নয়, দীর্ঘকাল থেকে সেখানে চলছে। তবে ধর্মীয় কারণেও অনেকে বিদ্বেষ হামলার শিকার হয়েছেন। আমেরিকা, কানাডা, ব্রিটেন, ভারতের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো হেটক্রাইমের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে, ধর্মান্ধদের কর্তৃক হুমকির শিকার হচ্ছে। ভারতে রাষ্ট্রীয়ভাবে এ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষটাকে সরাসরি উস্কে দিচ্ছে। আর এর মাধ্যমে আমাদের সমাজ ভীতিকরভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্নতায় ভুগছে। তারপরও সংখ্যালঘুসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ সমালোচকদের হাতে মিডিয়ায় ক্রোধের শিকার হচ্ছেন। আমরা এই অবস্থায় পৌঁছালাম কী করে? যেকোনও অনলাইন নিউজের কমেন্ট সেকশনে গেলেই দেখা যাবে লোকজন সংখ্যালঘু-বর্ণবাদের ব্যাপারে অসহিষ্ণুতা সম্পর্কিত খবর বা প্রতিবেদনের প্রতি নিজেদের মানসিক গ্লানি প্রকাশ করছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা যেন ‘বর্ণবাদী, নারীবিদ্বেষী ও অন্যান্য ধরনের ঘৃণা উদ্রেককারী ও ক্ষতিকর মন্তব্য সরিয়ে নেয়’। পাঁচ. যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েড এবং বাংলাদেশে নিখিল তালকুদার হত্যাকাণ্ডের একটি আর্শ্চয মিল রয়েছে। দু’টি ভিন্ন রাষ্ট্রে দু’জন পুলিশ অফিসার হাঁটু দিয়ে দু’জনকে হত্যা করলেন। অফিসার শামীম কি মিনিয়াপোলিসের ডেরেক চৌভিন কনেল্টের অপর্কমে উদ্বুদ্ধ হয়ে এমন একটি অপর্কম করতে পারলেন? নিখিল একজন সাধারণ কৃষক। তার অপরাধ তাস খেলা। ফ্লয়েডের অপরাধ ছিলো তিনি একটি জাল নোট দোকানিকে দিয়েছিলেন। বিনা অপরাধ বা সামান্য অপরাধে দু’জন প্রাণ হারালো। মিনিয়াপোলিসে ফ্লয়েড হত্যার পর পুলিশ প্রধান এই হত্যাকাণ্ডের জন্যে ক্ষমা চেয়েছেন। অনেক শহরে পুলিশ হাঁটু গেড়ে আন্দোলনকারীদরে প্রতি সর্মথন ব্যক্ত করছেন। কিন্তু বাংলাদেশের পুলিশের নির্মম নির্যাতনের ফলে প্রাণ হারানোর দায় কে নেবে? চ্যানেল আই জানাচ্ছে মস্তিষ্কের ভেতর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ডা. রকিব মারা গেছেন। এই হলো আমাদের সাংবাদিকদের চিকিৎসাবিদ্যা। কিছু কিছু সাংবাদিক চিকিৎসাবিদ্যার ‘চ’টাও না বুঝে রোগীর মৃত্যুর কারণ হিসেবে ডাক্তারের অবহেলা, ভুল চিকিৎসা- এসব কারণ হিসেবে সংবাদ তৈরি করে। এভাবে সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ভেতরে ডাক্তারদের সম্পর্কে নেতিবাচক ও বৈরি পরিস্থিতি তৈরি করে। যথাযথ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ না থাকার কারণে সাংবাদিকদের মধ্যে এ ধরনের সংবাদ তৈরির জন্য মানসিকতা থাকে। এ হেটক্রাইম যতো বেশি রাষ্ট্র কিংবা সমাজে ছড়াবে, ততো বেশি নানামুখী অপরাধপ্রবণতা বাড়বে। অপরাধপ্রবণতা যে হারে বেড়েছে বাংলাদেশে বিভিন্ন ঘটনার ভেতর দিয়ে তা বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে। সমাজের বিভিন্ন স্তরে শ্রেণিবৈষম্য দিন দিন বেড়েই চলছে। দেশের অর্থনীতি আজ করোনায় বিপর্যস্ত। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাই চলছে। এসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে কেউ কেউ ঠিকমত তার কাজের মজুরি পাচ্ছেন না। কেউ কেউ পাচ্ছেন অর্ধেকটা। অদূর ভবিষ্যতে ভূমিদাসরা নিষ্ঠুরভাবে শোষিত হবেন সে আশঙ্কা রয়েছে। তাতে করে শ্রেণিবৈষম্য চরম আকারে ধারণ করবে। তীব্র দ্বন্দ্বমুখর সংগ্রাম-সংঘাত সুস্পষ্ট হবে। এতে করে সমাজের ভেতরে চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, অপহরণ, নারী নিপীড়ন-নির্যাতনসহ নানারকম সন্ত্রাসী কর্মকা- আরো বৃদ্ধি পাবে। এছাড়াও ব্যাপক আকারে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটবে। ঘৃণা বা বিদ্বেষ সমাজে স্বাভাবিক প্রবণতা হিসেবে দেখা দিবে। ‘এক টাকায় আহার’ কর্মসূচি শুরু করে বিদ্যানন্দ বেশ সাড়া ফেলেছে সমাজে। পথশিশুদের হাতে খাবার তুলে দিচ্ছেন বিদ্যানন্দের স্বেচ্ছাসেবীরা। এই বাজারে গরিবদের এক টাকায় খাবার তুলে দিচ্ছে- এটা কল্পনাই করা যায় না আমাদের দেশে। তাদের অন্যান্য কর্মসূচিও বেশ প্রশংসিত হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবী কাজের কারণে বিদ্যানন্দের পরিচিতি দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু কিছু ব্যক্তি সামাজিক গণমাধ্যমে ‘বিদ্যানন্দ’ নাম ও তার প্রধান কিশোর কুমার দাশের ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কে সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক মন্তব্য করে। ফলে কিশোর কুমার দাশ বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে যেতে চেয়েছিলেন। ‘বিদ্যানন্দ’ নামটি একজন মুসলমানের দেওয়া। সংগঠনটির ৯০ শতাংশ স্বেচ্ছাসেবী মুসলমান ও সিংহভাগ দান মুসলমানদের কাছ থেকেই আসে। সামাজিক গণমাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে মন্তব্য দেয়া, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে, উস্কানিমূলক লেখা প্রকাশিত হয়ে থাকে। দায়িত্বশীলতা ও নৈতিকতার অভাবে নাগরিকরা একে অপরের নামে মিথ্যাচার করছে। বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশ করছে। যেমন-‘ইলিশ মাছ হিন্দু মাছ। ইহা হারাম’। এ জাতীয় পোস্ট আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনে, সমাজ জীবনে একটা শ্রেণির দিকে বিদ্বেষ, ঘৃণাবোধের জন্ম দেয়। বাংলাদেশে জাতিগোষ্ঠীগত বিদ্বেষ, ঘৃণাবোধ গাঢ়ভাবে বিদ্যমান। বিশেষ বিশেষ চেহারা বা আচরণকে নির্দিষ্ট করে ফেলা। শব্দ ব্যবহারেও ঝামেলা আছে, ধরুন ‘দেখতে চোরের মতো’, ‘চাঁড়ালের মতো’ এমন কতগুলো বর্গ আদর্শিকভাবে ঘৃণাত্মকভাবে ব্যবহৃত হয়। এর বাইরে সামাজিক সম্পর্কের মধ্যেও আছে। কোনো একটা অঞ্চলকে শনাক্ত করে, যেমন ধরুন ‘ওমুক এলাকার লোক ডাকাত’ বলা হচ্ছে। ‘নোয়াখালীর লোক খারাপ, বরিশালের মানুষ ভালো’, ‘কুমিল্লার লোক ইতর’ ইত্যাদি বাক্যের ভেতরে আঞ্চলিক বিদ্বেষ ফুটে উঠছে। ছোটবেলা থেকে হিন্দুদের ড্যাডা, মালাউন ডাকার মধ্য দিয়েই আমরা মাথার মধ্যে এক ঘৃণার চাষ করি, সাম্প্রদায়িকতার ছুরি ঘোরাই। মূল কথা হলো একটা জনগোষ্ঠীকে সরলীকরণ করে কাঠামোগত বিদ্বেষ বহন করা। একই সঙ্গে শিক্ষক, পুলিশ, ডাক্তারসহ বিশেষ বিশেষ পেশার প্রতি তীব্র ঘৃণা বা বিদ্বেষ আমরা এ সমাজের মধ্যে ভয়ঙ্করভাবে দেখতে পাচ্ছি। বিদ্বেষ হামলা বা হেটক্রাইম বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে প্রত্যেক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পেছনে সুগভীরভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থসহ ধর্মীয় ও গোষ্ঠীগত অসহিষ্ণুতার প্রভাব থাকে। ব্যক্তি ও সমষ্টির নিজস্ব ঘৃণা ও ঘৃণ্য কৌশলকে সমষ্টির আবেগে মুড়িয়ে সন্ত্রাসী উন্মাদনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার বহু উদাহরণ রয়েছে। এমন উদাহরণ যেটা এখন বাংলাদেশে ঘটছে। সমাজে ব্যাপকহারে গণপ্রহার, গণপিটুনি, আত্মহত্যা, পারিবারিক সহিংসতা ক্রমশ বাড়ছে। সরকারের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠান নির্বাসনে গেলেই এ রকম অবস্থা হয়। রাষ্ট্রের নৃশংসতা সমাজের মধ্যে পুনরুৎপাদিত হয়। অ্যামনেস্টির রিপোর্টে বলা হয়েছে, অন্যান্য অপরাধ থেকে হেটক্রাইমকে আলাদা করে ভাবা দরকার। প্রচলিত আইনে সাধারণত হেটক্রাইমকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয় না। গণপ্রহার, গণহিংসাকে কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। কখনো কখনো ভুয়া খবরও অসহিষ্ণুতার জন্ম দেয়। মানুষকে হিংসায় উন্মত্ত করে তোলে। তাই সরকারকে সকল বিদ্বেষমূলক হামলার মতো অপরাধ দমনের দায়িত্ব নিতে হবে। লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, ঢাকা মহানগর

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..