করোনাকালীন অনিয়ম ও চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আকমল হোসেন : লেখার শিরোনামটি গ্রামীণ প্রবাদ বাক্যের। লেখাপড়ায় তেমন ডিগ্রিধারী নয়, তবে সমাজ সচেতন এবং দায়িত্ববোধসম্পন্ন মানুষ তাদের পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতা থেকে এ ধরনের উক্তি/প্রবাদ-প্রবচনের সৃষ্টি সেই কবে কোন নির্দিষ্ট বাস্তবতার আলোকে করেছিলো তা আজও পরিষ্কার নয়। তবে এ সকল প্রবাদ-প্রবচনের প্রাসঙ্গিতা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। দেশ দুনিয়ার কতসব পরিবর্তন হলো কিন্তু সমাজে এসব প্রবাদের প্রাসঙ্গিকতার পরিবর্তন হলো না। শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞানে আর ধর্মের চর্চার পরও সমাজের সকল সেক্টরেই সৃষ্টির সেরা জীবের মধ্যে মনুষ্যত্বের পরিবর্তে পশুত্বই যেন প্রবলভাবে বিরাজ করছে। আইন-কানুন বিচার পুলিশ সবই আছে সবাই কাজ করছে, কিন্তু কেন যেন সমাজটাকে মানুষের বাসযোগ্য করা যাচ্ছে না। ‘মানুষ মানুষের জন্য’ ভারতচন্দ্রের কথা, সকল মুসলিম ভাই ভাই ধর্মের কথা- তারপরও এক মানুষ আরেক মানুষের বিপদের কারণ হচ্ছে। পশু-পাখি তথা ইতর প্রাণীর আক্রমণ থেকে মানুষের রক্ষার নিশ্চয়তা থাকলেও মানুষের কূট-কৌশল থেকে রক্ষা পাওয়া অনেক কঠিন। মানুষের বোধ ও বুদ্ধির জায়গাটা কেন যেন স্বচ্ছ হচ্ছে না। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা, মসজিদ-মন্দির, গির্জা এবং ধর্মীয় জ্ঞান কোনোকিছুই যেন সমাজবিরোধী এই মানুষগুলির মনোজগতে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে পারছে না। মনীষীরা বলেছেন, মানুষকে ভালো হতে হলে আত্মশুদ্ধি লাগবে। সেজন্যই সক্রেটিস বলেছিলেন- ‘নিজেকে জানো’। আর হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেছিলেন- ‘যে নিজেকে চিনতে পেরেছে সে তার প্রভুকে চিনতে পেরেছে’। আর উনবিংশ শতাব্দিতে এসে অসাম্প্রদায়িক চেতনার পথিকৃত ফকির লালন শাহ বলেন- ‘আপনারে (নিজ) চিনতে পারলে অচেনারে যায় চেনা’। আত্মশুদ্ধি চর্চার বাধ্যবাধকতায় ব্যক্তির নৈতিক দায়বদ্ধতা আছে, আর আইনের ক্ষেত্রে তা মান্য করার বাধ্যবাধকতা আছে, না মানলে শাস্তির ব্যবস্থা আছে। তারপরও মানুষের বিরাট একটা অংশ যারা সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন তাদের স্বচ্ছতা-অস্বচ্ছতার কারণে সমাজের বড় ধরনের পরিবর্তন হতে পারে। এ বিষয়টা তোয়াক্কা না করেই তারা তাদের অবস্থানে রয়েছে। পৃথিবীব্যাপী মহামারি করোনার তিক্ত এই বাস্তবতায় মানুষের বাঁচা-মরা যখন অনিশ্চিত এই অবস্থায় ব্যক্তি স্বার্থে কতিপয় মানুষ মানব স্বার্থ বিরোধী কাজ করে চলেছেন। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনে প্রথম করোনা ভাইরাসের আবির্ভাব। মৃত্যুর মিছিল পর্যায়ক্রমে বেড়েই চলছে। ধনে-জনে-বলে আর পারমাণবিক শক্তিতে চ্যাম্পিয়নদের দেশে এই রোগের বিস্তার এবং লাগামহীন মৃত্যুর তালিকা যখন বাড়ছিল, তখন আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের মানুষ ও সরকার আতঙ্কের মধ্যে পতিত হয়। এ রোগ থেকে রক্ষার প্রথম ও প্রধান উপায় হলো মনোবল বৃদ্ধি, সচেতন হওয়া সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। সর্বোপরি লকডাউনের পথ অনুসরণ করা। গত ১৮ মার্চ একজনের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যুর পথ খুলে যায়। প্রথমাবস্থায় সরকার গরিব, মেহনতি ও শ্রমজীবী মানুষের সহায়তা করার উদ্যোগ নেয়। চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ঐ সকল মানুষকে দেয়ার উদ্যোগ নেয়। পরবর্তিতে ব্যক্তি সমাজ ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে এ ধরনের সাহায্য দেয়ার চেষ্টা করা হয়। গার্মেন্টস সেক্টরের শ্রমিকদের জন্য মালিকের মাধ্যমে সরকার প্রাথমিকভাবে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করে। সরকার প্রদত্ত এ সকল সুবিধা চাহিদার তুলনায় সীমিত হলেও অনেকটাই চাহিদা মিটাতো। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এ সকল সুবিধা বিতরণকারীদের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কারণে এ গুলির সঠিক ব্যবহার অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে নেয়া তালিকায় যেমন গড়মিল তেমনি বরাদ্দকৃত মালামাল আত্মসাতের ঘটনাও ঘটতে থাকে। এ সকল ঘটনায় ইতোমধ্যে শতাধিক জনপ্রতিনিধিকে সাময়িক বরখাস্ত অথবা পুলিশ কাস্টডিতে দেয়া হয়েছে। চল্লিশ জন ব্যক্তির নামের সাথে একই মোবাইল নম্বর, গরিবের হক আত্মসাতের নয়া ফন্দি ফিকির। অন্যদিকে দাম বেড়ে যায় ওষুধ ও করোনা প্রতিরোধে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপাদানের। মৃত্যুতে ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎক নার্স টেকনেশিয়ানরা দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। এরইমাঝে কিছু চিকিৎসক করোনাকালীন দায়িত্ব পালনকালে হোটেলের নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন, বাংলাদেশে করোনা টেস্টের হার খুবই কম, যার হার মাত্র ২৯ শতাংশ এবং পৃথিবীতে যার অবস্থান ১৪৯তম। পরীক্ষার সুযোগ এখন পর্যন্ত ঢাকাকেন্দ্রিক। ৪৩টি জেলায় এখন পর্যন্ত পরীক্ষা কেন্দ্র করা যায়নি। করোনার কারণে সাধারণ রোগীর চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালে প্রাথমিক পর্যায়ে করোনা রোগী ভর্তি করতে চায়নি। সরকারের বিশেষ চাপের কারণে ভর্তি করতে রাজি হলেও আন্তরিকভাবে এখনো কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে না। ক্ষেত্র বিশেষে চিকিৎসা করলে আর্থিকভাবে মানুষকে সর্বসান্ত করে ছাড়ছে। মুনাফাই যেন তাদের সকল ধ্যান ও জ্ঞান। অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ব্যয়ের তুলনায় ৩/৪ গুণ বেশি অর্থ দাবি করছে সরকারের নিকট। ছোটখাট বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলি করোনা টেস্টেরে সনদ ছাড়া ভর্তিই করছে না সাধারণ কোনও রোগী। সরকার থেকে নিম্নমানের পিপিই সরবরাহের অভিযোগ এসেছে। এগুলি ব্যবহারকারী চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়ে অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠছে। ক্ষেত্র বিশেষে সরকার এ সকল অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। এসকল অনিয়মকারীদের কি কোনও নৈতিক দায়বদ্ধতা নেই? জনগণের প্রদেয় টাকা থেকে তাদের বেতন দেয়া হয় না? এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিভাগের অনেক কর্মী সুরক্ষা সামগ্রী পাননি। এই সময়ের জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেনের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সংকট কাটছে না। ডিসপেনসারগুলি ওষুধসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সামগ্রীর সরবরাহ সংকটের কথা বলে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করছে ওষুধসহ করোনাসামগ্রী। পুঁজিবাদী অর্থনীতির নেচারের আলোকে এবং চাহিদা ও যোগানের কথা বলে দামবৃদ্ধির অজুহাত খাড়া করছ। করোনার এই সংকটের সময়েও লাশবাহী গাড়িতে ইয়াবার চালান পাচার হচ্ছে। চলছে চাঁদাবাজী, ছিনতাই; নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যাও বন্ধ নেই। করোনার মত ভয়াবহ এই মহামারিতে কে কখন আক্রান্ত হয় বা কে কখন লাশের মিছিলে যুক্ত হয় তার কোনও ভয়-ডর নেই এসকল সমাজ বিরোধীদের। কথায় বলে- ‘স্বভাব যায় না মলে (মরলে) আর ইল্লত যায় না ধুলে’ অথবা ‘কয়লা ধুলে ময়লা যায় না’। করোনার মত মহামারির সময়েও যাদের দ্বারা এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংগঠিত হচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে ‘চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী’ এই প্রবাদের সত্যতা যেন শতভাগ সত্য। সাপ এঁকেবেঁকে চললেও গর্তে যাওয়ার সময় ঠিকই সোজা হয়। কিন্তু সমাজবিরোধী মানুষরূপী এই দানবদের কবে বোধদয় হবে কে জানে? লেখক: অধ্যক্ষ, সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (বাকবিশিস) কেন্দ্রীয় কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..