কোভিড-১৯, গতানুগতিক বাজেট ও আমাদের গন্তব্য

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
দিবালোক সিংহ : ১. গত ২৭ জুন দুর্গাপুরে হয়ে গেল বাজেট ঘোষণার প্রতিবাদে সিপিবি’র মানবন্ধন। ‘৯৯ শতাংশ মানুষের জন্য বাজেট করতে হবে’ এ আমাদের দাবি। এই করোনা অতিমারির সময় ভয় থাকলেও অনেক কমরেড ও শুভানুধ্যায়ীরা এসেছিলেন। আষাঢ় মাসের বৃষ্টি মাথায় নিয়েই মানববন্ধন হয়েছে। যদিও আমাদের সভার সময় বৃষ্টি ছিল না। এখানেই আমরা ভাবছিলাম এ ধরনের একটি অতিমারিতে পার্টি হিসেবে আমরা কিভাবে আমাদের মানুষের সাথে থাকতে পারি। কিভাবে এই ভয়ংকর দুর্যোগে মেহনতি মানুষের পার্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারি। কিছুদিন আগে বোরো ধান কাটার সময় ছাত্র ও যুবকরা এ এলাকায় ধান কাটায় চাষিদের সাথে হাত লাগিয়েছিল। এখনওতো দেশের মানুষ স্বাস্থ্যবিধি পালনে তত সচেতন নয়। এখন পর্যন্ত অল্প সংখ্যক লোক এখানে সংক্রমিত, অনেকে বলছে ঢাকা, নরসিংদী থেকে লোক এসে এখানে সংক্রমণ ঘটিয়েছে। শাহজাহান বলছে, তার আয় একদম তলানিতে ঠেকেছে, সে আর তার ছেলে ইঞ্জিনচালিত রিকশা চালায়। এখন মানুষের যাতায়াত কম। তাই তার আয়ও নেই। তবে কৃষিকাজে কিছু আয় হয়েছে। গতবারের তুলনায় ধানের বাজার দর তুলনামূলক ভাল। ২. এখানে কি গ্রামে গ্রামে মানুষকে করোনা সম্বন্ধে সচেতন করার জন্য আমরা যেতে পারি? মানুষকে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি? বন্যায় যেমন ত্রাণ বিতরণ করি, মানুষের পাশে দাঁড়াই এখন কি সে রকম কিছু করা যায়? ছাত্র, যুবক, নারী, পাড়ার ক্লাব, পূজা কমিটি, মসজিদ কমিটি, ইমাম সাহেব, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, রাজনৈতিক দলের কর্মী, বেসরকারি সংস্থায় কর্মরতদের নিয়ে গ্রামে গ্রামে করোনা প্রতিরোধ কমিটির মাধ্যমে সবাইকে সচেতন করতে পারি? সরকার যেখানে হাল ছেড়ে দিয়েছে সেখানে সবাইকে সচেতন করে জনগণের সক্রিয় উদ্যোগ ও নেতৃত্বে কোভিড মোকাবিলা ও প্রতিরোধ করা এখন সময়ের দাবি। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে পনের দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে লড়াইয়ে নেমেছিল বাংলার তরুণ, ছাত্র, কিশোর, সংগ্রামী জনতা। আজ ২০২০ সালে আবার কি সে রকম উদ্যোগ নিয়ে এই অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি? এখনকার পরিস্থিতি, এ দেশের শাসকরা নিজেদের লাভ পুরো তুলে নিয়ে জনগণকে কোভিডের হাতে তুলে দিয়েছে। তাই এখন অল্প কিছু শোষকের বিরুদ্ধে অন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে করোনা পরাজিত করার সংগ্রামে নেমে পড়া দরকার। ভিয়েতনাম পেরেছে, আমরাও পারবো! ৩. কোভিড নিয়ে আমাদের উৎকণ্ঠা প্রয়োজনীয় সরকারি প্রস্তুতির অপ্রতুলতা। কী করলে ভাল হয়? এসব নিয়ে আলোচনা চলছে গত মার্চ থেকে। তার আগে ডিসেম্বরে প্রথম করোনা ধরা পড়ে চীনে, তখন সব কাজের প্রস্তুতি আছে এ কথা প্রতিদিন বলেছেন আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা কেমন সে সম্বন্ধে দেশের মানুষের ধারণা আছে, তাই হয়তো এ বিষয়টি দেশের জনসাধারণ তেমন গুরুত্ব দেয়নি। মার্চের পর থেকেই বাজেট কেমন হতে হবে তা নিয়ে প্রতিদিন টেলিভিশনে আলোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে। সাধারণভাবে একথাটিই উঠে এসেছিল যে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় জোর দিতে হবে। এ পটভূমিতে বাজেট পেশ হয়েছে। পাঁচ লক্ষ আটষট্টি হাজার কোটি টাকার বাজেট। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, রোগতত্ত্ববিদ সবার আলোচনা উপদেশ সবকিছুর পটভূমিতে সরকার গতানুগতিক বাজেট পেশ করেছেন। অন্যদিকে করোনা সংক্রমণ তার নিজের গতিতে ক্রমাগত উর্ধ্বমুখী, সরকার বলছে সবাইকে যার যার নিজের মত সুরক্ষা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। ৪. এমন একটা সময়ে আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক বা দেশ হিসেবে যারা অপেক্ষাকৃত সফলভাবে স্বাস্থ্য সুরক্ষা, কোভিড সংক্রমণ মোকাবিলা করতে পেরেছে, তাদের অভিজ্ঞতা, তাদের স্বাস্থ্য কাঠামো কেমন, তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ, কৌশল কী, সেসব থেকে আমরা কি শিক্ষা নিতে পারি? ৫. ঐ আলোচনায় যাবার আগে একটি কাঠামোগত আলোচনা উত্থাপন প্রয়োজন। তা হল করোনা সংক্রমণে দেখা গেল বিশ্বের বৃহত্তম ধনী দেশগুলো যারা এ-৭ গোষ্ঠীর সদস্য, প্রতাপশালী, বিজ্ঞানে অগ্রসর, ধনী দেশ হিসাবে পরিচিত তারা এই সংক্রমণ মোকাবিলায় একদম অসহায়ভাবে ধরাশায়ী হয়ে গেল। বাজারভিত্তিক অর্থনীতি সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে, এই ধারণার যারা সমর্থক তারা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, বাসস্থান এসব খাতে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা মানতে আগ্রহী নন। সাধারণভাবে তাদের দর্শন, বাজারে সব কিছুই চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ হচ্ছে, যার প্রয়োজন তিনি তা প্রয়োজনে কিনে নিতে পারবেন। এখানে স্বাস্থ্যসেবায় যারা বিনিয়োগ করছে তারা তাদের পণ্য নিয়ে অগ্রসর হবেন। তাদের লাভ, চাহিদার মাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে আরো লাফিয়ে লাফিয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকবে। তাতে কেউ যদি সেবা গ্রহণে অসমর্থ হয় তাদের কিছুই করার নেই। ৬. অন্যদিকে যারা রাষ্ট্রের মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি স্বীকৃতি দেন, তারা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, বাসস্থান এসব বিষয়ে ন্যূনতম সেবা নিশ্চিত করায় রাষ্ট্রের সক্ষমতার ওপর জোর দিয়ে থাকেন। এখন কোভিড অতিমারিতে দেখা যাচ্ছে সমাজতান্ত্রিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা নিজেদের জনসাধারণকে কোভিড অতিমারি থেকে যেভাবে সুরক্ষা দিতে পেরেছে (কিউবা, ভিয়েতনাম, উত্তর কোরিয়া এমনকি চীন) পুঁজিবাদের মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ব্রাজিল বা মেক্সিকো সেখানে চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে ও হচ্ছে। যদি আমরা ভারতের কেরালা রাজ্য বা ভিয়েতনামের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই তারা তিনটি বিষয়ের ওপর প্রথম থেকে জোরালো দৃষ্টি দিয়েছে, ক) কোভিড একটি জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত ভয়ংকর সংক্রামক রোগ, এর মোকাবিলায় একটি সক্রিয় নজরদারি (Active surveillance) ব্যবস্থা জরুরি খ) জনসম্পৃক্ততা ও অংশগ্রহণ প্রয়োজন এবং গ) জনসম্পৃকতার জন্য একটি কার্যকর বিজ্ঞানভিত্তিক যোগাযোগ (Communication) কৌশল নির্ধারণ। তাই লক্ষ্য করি, ভিয়েতনাম সরকার আহ্বান জানিয়েছে পঁয়তাল্লিশ বছর আগে তারা যেভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন মোকাবিলা করে সাম্রাজ্যবাদকে পরাস্ত করেছিল, একইভাবে কোভিডকে পরাস্ত করার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে অগ্রসর হতে হবে। ভিয়েতনাম সরকারের এই আহ্বানে জনগণ একমত হয়েছে এবং সে অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবা বিধি মেনেছে ও মানছে। যার ফলে এখন পর্যন্ত তাদের একজনও মৃত্যুবরণ করেনি, সংক্রমণের হারও স্বল্প সংখ্যায় সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে। গতানুগতিক বাজেট ১. আমাদের এ অর্থবছরের বাজেট ৫ লক্ষ ৬৮ হাজার কোটি টাকার। করোনার এ পরিস্থিতিতে আমাদের স্বাস্থ্যসেবার বেহাল অবস্থা করুণভাবে ফুটে উঠেছে। করোনা পরিস্থিতিতে সামগ্রিক মোট দেশীয় সম্পদ (জিডিপি) কমে যাবে বলেই সকল মহলের ধারণা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, বিশ্ব ব্যাংক আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ২%’র নীচে নেমে যাবে বলে ইতোমধ্যে আশংকা ব্যক্ত করেছেন। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধির হার ২.৫% ’র বেশি হবে না বলে মন্তব্য করেছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান) বলছে ১৯৯২ সালের পর নতুন করে নয় শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে অবস্থান নেবে। তাহলে সরকারি হিসেবে ২৪ শতাংশ মানুষ দারিদ্য্র সীমার নীচে ছিল, তার সাথে আরো ৯ শতাংশ যুক্ত হলে তা ৩৩ শতাংশ বা ৬ কোটির কাছাকাছি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে অবস্থান করবে। এখন অনেকেই প্রশ্ন করেন সরকার কেন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, দরিদ্র মানুষের বাসস্থান এগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে অগ্রাধিকার ও বরাদ্দ বাড়িয়ে বাজেট প্রণয়ন করেনি? এক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক-অর্থনেতিক দৃষ্টিভঙ্গী স্বাভাবিকভাবেই প্রাধান্য পেয়েছে। বড় ধরনের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষিত হয়েছে তা মূলত: বৃহৎ গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের সমর্থনে সরকারি আর্থিক প্রণোদনা হিসেবে কাজ করছে। সরকার এক্ষেত্রে সর্ম্পূণভাবে বৃহৎ ধনীগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার কাজটিকে প্রাথমিক অগ্রাধিকার দিয়েছে এবং তাদের চাহিদার কাছে সর্ম্পূণ আত্মসমর্পণ করেছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের অজ্ঞানতার সুযোগে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীসমূহ সকল ধরনের উপসনালয় খুলে দেয়ার যে দাবি জানিয়েছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও সরকার তা মেনে নিয়েছে। এইভাবে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী সরকার লুটেরা ধনিকগোষ্ঠী ও মৌলবাদীদের কাছে সাধারণ জনগণের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে সর্ম্পূণভাবে আত্মসমর্পণ করেছে বা এই সামাজিক শক্তির সরকার হিসেবে তাদের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। তাই বাজেটে অন্য কোনো প্রত্যাশার প্রতিফলনের সুযোগ ছিল কি? এখন একটু দেখা যাক বাজেট বিষয়ে মোটা দাগে আমরা কী প্রত্যাশা করেছিলাম। পাঁচলক্ষ আটষট্টি হাজার কোটি টাকার বাজেটে ২, ১৫, ০৪৩ কোটি টাকা উন্নয়ন খাতে ব্যয়ের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। আর সরকার পরিচালনা ব্যয় ৩, ৪৮, ১৮০ কোটি টাকা। এখানে পাচঁটি খাত প্রধান্য পেয়েছে। এগুলো হল যোগাযোগ খাত ২৫.৪%, বিদ্যুৎ খাত ১২.১%, ভৌত পরিকল্পনা, পানি ও কর্মচারীদের আবাসন খাত ১২.৬%, শিক্ষা খাত ১২.১ % এবং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও তথ্য খাত ৮.৭%। এ খাতগুলো সব মিলিয়ে পেয়েছে বাজেটের ৭০%। মোট প্রকল্প ৮৪২ টি। স্বাস্থ্যখাতে বাজেট ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৬.৪%। যেখানে পরিচালনা ব্যয় ১৬, ৭৪৭ কোটি টাকা। বিগত বছরের তুলনায় পরিচালনা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৪.৩% থেকে ৪.৭% । স্বাস্থ্য বাজেট জিডিপির ০.৯%, যা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা সুপারিশ অনুযায়ী হতে হবে জিডিপি’র ৪%। এখন জিডিপির পরিমাণ ৩১, ৭১, ৮০০ কোটি টাকা, সে হিসাবে ৪% হার হলে এর পরিমাণ দাড়ায় ১, ২৬, ৮৭২ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য খাতে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, জনসংখ্যা এবং পরিবার কল্যাণ বাজেটে কোনও পরিবর্তন হয়নি (সিপিডি)। বাংলাদেশ সরকার যদি স্বাস্থ্যখাতে এক টাকা ব্যয় করে তাহলে জনসাধারণের ব্যয় করতে হয়ে ৪.৪২ টাকা। এর মানে এ অর্থবছরে কোভিড ঝুঁকির সময় স্বাস্থ্য খাতে খরচের প্রয়োজনীয়তায় আরো অনেকে দারিদ্র্যসীমার নীচে নেমে যাবে। বিগত ১২ বছর স্বাস্থ্য খাতে বাজেট সবসময় জিডিপির এক শতাংশ’র নীচে রয়েছে। ২০১৭ সালে তিরিশটি অনুন্নত দরিদ্র দেশগুলো এ থেকে বেশি ব্যয় করেছে। দক্ষিণ এশিয়াতেও জিডিপির অনুপাতে স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সবেচেয়ে কম। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বাজেট ৯৪, ৫৭৪ কোটি টাকা বা বিগত বছরে ছিল ৮১, ৮৬৫ কোটি টাকা। এখানে ২৩ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে সরকারি কর্মচারীদের পেনশন ভাতা ও এ সংক্রান্ত সুদজনিত খরচ মেটানোর জন্য। এখানেও আনুপাতিক হারে বাজেট বরাদ্দ ১৮%’র জায়গায় হয়েছে ১৭%। একজন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদের মতে করোনাকালীন সময়ে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বাজেট হওয়া উচিত জিডিপির ৩.৭% অর্থাৎ ১, ১৭, ৩৫৬ কোটি টাকা। ভৌত পরিকল্পনা, পানি সরবরাহ ও গৃহায়ণ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু স্বচ্ছতার সাথে এই বরাদ্দ আলাদা করতে হবে, তাহলে বোঝা যাবে কোথায় যাচ্ছে বরাদ্দ, আর দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছানোর পরিকল্পনাই বা কতটুকু? শিক্ষাখাতে বাজেট ৬৬, ৪০১ কোটি টাকা, জিডিপির ২.০৭%। যেখানে ইউনেস্কোর সুপারিশ হল ব্যয় করতে হবে জিডিপির ৬ শতাংশ। এখাতে বাজেট কমেছে, এর ফলে শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ এবং গর্ভধারণের মত সামাজিক কুফলের ঝুঁকি বাড়বে (CAMPE)। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে, এ খাতে বাজেট ২৬, ৭৫০ কোটি টাকা। এখাতে ভর্তুকির পরিমাণ চারশত কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে আটশ কোটি টাকা। মিডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী কোন বিদ্যুৎ উৎপাদান না করে ভাড়া করা বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো গত দশ বছরে হাতিয়ে নিয়েছে ৫২ হাজার কোটি টাকা। ২. অন্যদিকে ধনবৈষম্য বৃদ্ধির হার বেড়েই চলেছে। এ সংক্রান্ত সূচক গিনি সহগ ও পালমার অনুপাত সর্বকালের রেকর্ড অতিক্রম করেছে। বৈষম্য যত বাড়বে কোভিড ১৯’র মৃত্যুঝুঁকি তত বাড়বে। এর মানে হবে নিম্নমজুরির শ্রমিকদের সংখ্যাধিক্য। যথাযথ সুরক্ষার ব্যবস্থা ছাড়াই সংক্রমণের ঝুঁকির ভেতর শ্রমিকদের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। বস্তিতে বেশি বেশি মানুষ গাদাগাদি করে বসবাস করবে (JEFRY SACKS)। আমরা খুবই বৈষম্যপূর্ণ একটি সমাজে বসবাস করছি। জাতীয়ভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ অতিমারি মোকাবিলায় কোনো কৌশল নিতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। সব বিষয়ে শাসক ধনী গোষ্ঠীর দলবাজি প্রাধান্য পেয়েছে। আমরা বামপন্থিদের পক্ষ থেকে জনস্বার্থে একটি ঐকবদ্ধ দেশপ্রেমিক করোনা প্রতিরোধ কৌশল তৈরির আহ্বান জানিয়েছিলাম। শাসকগোষ্ঠী তার নিজের গোষ্ঠীস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে এ বিষয়ে কোনও কর্ণপাত করেনি। এইতো হলো বাজেট সংক্রান্ত প্রত্যাশার বিপরীতে জনসাধারণের পাওনা। কোভিড বিবেচনায় করণীয় কী? ১. এরিখ মারিয়া রেমার্ক’র বিখ্যাত মর্মস্পর্শী উপন্যাস æAll Quiet in the Western Front” ও এর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত চলচ্চিত্র আমরা দেখেছি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মারা গিয়েছিল চার কোটির বেশি মানুষ। আর Spanish Flu (H1N1 Virus) অতিমারিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৫০ কোটি মানুষ, আর মারা গিয়েছিলেন পাঁচ কোটি। জানুয়ারি ১৯১৮’তে শুরু হয়ে এই অতিমারি শেষ হয়েছিল ১৯২০ এর ডিসেম্বরে। এখন প্রশ্ন ১০০ বছর পর কি একই কাহিনীর পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে? ২. কাহিনীর যে পুনরাবৃত্তি হতে পারে না তা হাতে কলমে করে দেখিয়েছে কেরালার বামপন্থিদের সরকার। জনগণের প্রতি মমতা ও দায়িত্ববোধ এবং দেশপ্রেম থেকে তারা প্রতিটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কোভিড মোকাবিলায়। সাফল্যের একটি প্রধান কৌশল হল পরীক্ষা, চিহ্নিত করা, বিছিন্ন করা, চিকিৎসা ও সাহায্য করা। তারা (রোগতত্ত্ববিদ্যা অনুযায়ী) প্রাক্কলন করেছে, কত লোক সংক্রমিত হবে, এই ভাইরাসের সংক্রমন শক্তি (Infectivity) কত, জনগণের সংক্রমিত হবার সম্ভাবনা (Susceptibility), ভাইরাস সংক্রামনের তীব্রতা (Virulence) ইত্যাদি। এছাড়া গ্রাম থেকে কেন্দ্র পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততা গড়ে তুলতে প্রথম থেকেই উদ্যোগী হয়েছেন কেরালার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী। গণসংগঠনের কর্মীরা ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাম থেকে গ্রামে। সরকারি ও ব্যক্তিখাতের স্বাস্থ্য কর্মী, চিকিৎসক, টেকনিশিয়ান সকলে মিলে ঐকবদ্ধভাবে লড়াই করছেন, তৈরি করেছেন সক্রিয় নজরদারি পরিকল্পনা (Active Surveillance Plan) জনগণকে সম্পৃক্ত করার বিজ্ঞানভিত্তিক যোগাযোগ কৌশল (Communication Strategy) এমনকি তাদের ওখানে যারা অন্য প্রদেশের শ্রমিক ছিল তাদের তিনমাসের খাদ্য সরবরাহ করেছেন লকডাউনের সময়। পরে তাদের বিশেষ ট্রেনে পাঠানো হয়েছে তাদের বাড়িতে। এই করোনাকালিন সময়ে স্কুলের বাচ্চারা বঞ্চিত হয়নি। তাদের জন্য পুষ্টিকর দুধ সরবরাহ করা হয়েছে বাড়িতে বাড়িতে। সর্বোপরি সকল স্তরের ছাত্র-ছাত্রীরা পরীক্ষা শেষ করতে পেরেছে। কেরালার বামপন্থী সরকার এভাবেই করোনা মোকাবিলা করে এগিয়ে চলেছে এরকম একটি ঘণবসতিপূর্ণ ভারতীয় রাজ্যে। আমাদের গন্তব্য ১. আমাদের এখানে প্রথমতঃ এ ধরনের একটি সক্রিয় নজরদারি পরিকল্পনা এখনো তৈরি হয়নি। আমাদের জানতে হবে আনুমানিক কতো লোক আক্রান্ত হতে পারে। ঐ অনুযায়ী তৈরি করতে হবে পরিকল্পনা ক,খ,অথবা গ। তাত্ত্বিকভাবে যদি ধরি হুবেই প্রদেশের উহান শহরে (চীন) যে তীব্রতা ও গতিতে করোনা সংক্রমণ হয়েছিল সেই গতিতে আমাদের দেশে সংক্রমণ ছড়িয়ে যায় তাহলে আক্রান্তের সংখা আনুমানিক আট লক্ষ ছাড়িয়ে যাবে। মৃত্যুর মুখে পতিত হবে ষাট হাজারের মতো মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমান অনুযায়ী করোনায় আক্রান্ত আশি শতাংশ রোগী মৃদু সংক্রমণের ভেতর দিয়ে সুস্থ হয়ে উঠবে। পনেরো শতাংশ রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। আর পাঁচ শতাংশ রোগীর আইসিইউ (ICU) সেবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে। উপরোক্ত বিষয়সমূহ আমাদের পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। ২. আমাদের দেশে শুধু চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় ৯২ হাজার, তার ভেতর ২৭ হাজার কর্মরত সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বাকিরা বেসরকারি। এই দুর্যোগ মোকাবিলায় এদের সবাইকে সাথে নিতে হবে আমাদের জনগণের স্বার্থে। দেশের সরকারের ‘একলা চল’ এবং ‘আমলা ও ব্যবসায়ী নির্ভর চরম স্বার্থপর’ নীতি জনবিরোধী, তা পরিত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধের মত সকলকে একসাথে নিয়ে করোনা মোকাবিলায় ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। ৩. এদেশের মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। এখানকার মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি, আচার-ব্যবহার, শিক্ষাগত যোগ্যতা সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে তৈরি করতে হবে যোগাযোগ কৌশল। এখানে প্রচলিত ধারণা “ঈশ্বর আমাদের সহায়”। সে বিশ্বাস থাকতেই পারে, কিন্তু একই সাথে ঈশ্বরে বিশ্বাস রেখে নিজেদের করণীয় যে সম্পাদন করতে হবে তা তাদেরকে বোঝাতে হবে। ৪. এখন পর্যন্ত করোনা পরীক্ষা দৈনিক ১৮ হাজারে সীমাবদ্ধ আছে। আমরা এখনো হিসাব করছি যারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বা চিকিৎসকের পরামর্শে টেস্ট করাচ্ছেন তাদের সংখ্যা, কিন্তু যদি আমরা এই রোগের ছড়িয়ে পড়ার ডিগ্রি বিবেচনায় নেই তাহলে যারা সংক্রমিত তাদের সংস্পর্শে যারা এসেছেন তাদেরকেও টেস্ট করতে হবে, বিছিন্ন করতে হবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে একটা বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে। সে ধরনের সক্ষমতা আমাদের দ্রুত অর্জন করতে হবে। শুধু RT-PCR টেস্টে তা সম্ভব হচ্ছে না, আমাদের ছয় কোটি মানুষ শ্রম বাজারে আছে। তাদের মধ্যে কারা সুস্থ তা নির্ধারণ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টেস্টের প্রয়োজন। আর সেটা সম্ভব Rapid Test Kit ব্যবহার করে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কিট কাজ করলে তা ব্যবহারে আপত্তি কোথায়? না হলে কিট আমদানি করতে হবে। এ ধরনের কিট চীন, কোরিয়া, পশ্চিমা বিশ্বে ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলো কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে ব্যবহৃত হবে। এভাবে প্রাথমিক ছাকুনি দিয়ে রোগী সনাক্ত করা যাবে। তার পরবর্তী ধাপে প্রয়োজন অনুযায়ী RT-PCR টেস্ট, জেলায় এবং প্রতিটি উপজেলায় নমুন সংগ্রহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এখনকার চিত্র অনুযায়ী ঢাকা শহর ও আশেপাশের জেলায় করোনা আক্রান্ত প্রায় ৮০ শতাংশ, তাদের দেশের অন্যত্র, যেখানে সংক্রমণের হার কম তাদের থেকে পৃথক করতে হবে। এভাবে সর্ম্পূণভাবে আগামী ডিসেম্বরের ভেতর করোনা দমন করার পরিকল্পনা করতে হবে। প্রতিটি এলাকার মানুষ যখন কাজে বাইরে যাবে সে যাতে সঠিকভাবে মাস্ক পরিধান করে ও নিয়মিত ব্যবহার করে তা নিশ্চিত করার জন্য মাস্ক সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি এলাকায় সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। জনস্বাস্থ্য’কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থেকে এ খরচ হবে। বিনামূল্যে দেশের ৩৫% মানুষ, যারা দরিদ্র তাদের এই সেবার আওতায় আনতে হবে। ৫. বাংলাদেশ একটি দরিদ্র দেশ। এখানে হাসপাতালে সব রোগীর চিকিৎসা করা সম্ভব হবে না, তাই জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও তার প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরালো ও শক্তিশালী করতে হবে। আমাদের স্বাস্থ্য খাতে ১৩ হাজারেরও বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। যেগুলো ওয়ার্ড পর্যায়ে ৬,০০০ জনসংখ্যাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে থাকে। তাদেরকে করোনা প্রতিরোধে অবিলম্বে যুক্ত করতে হবে। এসব ক্লিনিকে কোভিড সেবা দেয়ার ব্যবস্থা থাকবে। কোভিড টেস্ট করার ব্যবস্থা থাকবে, নমুনা সংগ্রহ করার ব্যবস্থা থাকতে হবে, কোভিড সচেতনতা এবং রোগী চিহ্নিত ও বিছিন্ন করার কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। আমাদের সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা প্রটোকল বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যবহারের জন্য নিশ্চিত করতে হবে ও ব্যবহারে নামতে হবে। সকল পর্যায়ের চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, সাধারণ পরিচ্ছন্নতা কর্মী সবাইকে কোভিড বিষয়ে প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। খাবার স্যালাইন জনপ্রিয় করার জন্য আমরা উদ্যোগী হয়েছিলাম, তার থেকেও শক্তিশালী প্রচারাভিযান পরিচালনা করতে হবে। ৬. কোভিড মোকাবিলায় জনস্বাস্থ্য ও রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য নিয়ে বহু দশক কাজ করেছেন তাদেরকে এই অতিমারির বিরুদ্ধে যুদ্ধের সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালনে যুক্ত করতে হবে। ৭. সর্বোপরি কোভিডের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি বঞ্চিত মানুষদের সম্মিলিত করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের মত আবার আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে। পঞ্চাশ বছরে এই দেশটিকে যারা একটি বৈষম্যের পাহাড় আর লুণ্ঠনের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে সেই অল্প কিছু মানুষের বিরুদ্ধে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। পঞ্চাশ বছর আগে এরকম একটা সন্ধিক্ষণে আমরা একটি মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে মাতৃভূমির স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলাম। পঞ্চাশ বছর পর এই করোনা দুর্যোগ আমাদের আবার একটি সুযোগ এনে দিয়েছে, বঞ্চনা আর বৈষম্যের এই ইতিহাস ছুড়ে ফেলে একটি সাম্যের বাংলাদেশ জাতিকে উপহার দেয়ার। আমরা কি প্রস্তুত এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে? ভিয়েতনাম যদি সফল হতে পারে আমরা কেন পারবো না? এই যুদ্ধে নামার এখনই সময়। লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..