ন্যাটো জোটে ঘোর সংকট

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিদেশ ডেস্ক : উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটোর ঘরে এখন গভীর সংকট। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর সাথে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর ভীষণ দ্বন্দ্ব এবং জোটের দুই প্রধান শক্তি ফ্রান্স জার্মানির সাথে তুরস্কের দ্বন্দ্ব ন্যাটোর মৃত্যুর সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে। যদিও ন্যাটো জোটের সংকটের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল আরো দুই বছর আগেই। ২০১৮ সালে ব্রাসেলসে ন্যাটো জোটের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়ে ন্যাটোর পৃষ্ঠপোষক দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্টের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। ব্রাসেলসেই ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সরাসরি দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠে। ফ্রান্স ও জার্মানিসহ পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো বিভিন্ন বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করলেও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো ন্যাটোর প্রতি এখনো আস্থাশীল। গত বছরের জুলাইয়ে ব্রাসেলসে ন্যাটোর এক সম্মেলনে ন্যাটোর মাতবর দেশ যুক্তরাষ্টের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেন জোট দেশগুলো পর্যাপ্ত সামরিক ব্যয় করছে না। এপর থেকেই জোট সদস্য দেশগুলোর মধ্যে শুরু হয় তুমুল বাকবিতণ্ডা এবং একে অপরের প্রতি অভিযোগ। ন্যাটোর ব্যয়ভার বহন নিয়েও ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মতদ্বৈততার সৃষ্টি হয়। জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল ন্যাটোতে নিরাপত্তা ব্যয় জিডিপির কমপক্ষে ২ শতাংশ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, ইউরোপ নিজেই তার নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করতে পারবে। যদিও জার্মানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল। ফ্রান্স আবার জার্মানির ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবে ভেটো দেয়। জোটে প্রতিরক্ষা খাতে জার্মানির ব্যয় নিয়ে কড়া সমালোচনা করে ব্রিটেন। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জার্মানীর প্রতি রাশিয়ার অতি মিত্রতার অভিযোগ তুলে। বিপরীতে ইউরোপীয় কাউন্সিলের তোপের মুখে পড়তে হয়েছিল ট্রাম্পকে। অভিযোগ উঠেছিল ট্রাম্পের ক্ষমতাগ্রহণের পরই ন্যাটো জোটে ইউরোপীয় দেশগুলোর একে অপরের সাথে বৈরীতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ট্রাম্প ন্যাটো জোটে ইউরোপের স্বার্থের চেয়ে আমেরিকার স্বার্থের বিষয়ে বেশি আগ্রহী ছিলেন। একই অভিযোগ তুলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো। তিনি একবার ‘দ্য ইকোনমিস্ট’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ন্যাটোর ‘ব্রেইন ডেথ’ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্পষ্ট মতদ্বৈততা রয়েছে ন্যাটোর কর্তৃত্বের প্রশ্নে। আর তুরস্ক, ফ্রান্স, গ্রীসের মত ন্যাটোভুক্ত দেশসমূহ জড়িয়ে পড়েছে ভূমধ্যসাগর অঞ্চলের তেলের উপর নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিবাদে। ন্যাটো জোটের ভাঙ্গন এখন শুধু ঘোষণারই অপেক্ষা করছে। ন্যাটো জোটে এখন সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব ফ্রান্স এবং তুরস্কের মাঝে। উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভূমধ্যসাগরে দুই দেশের রণতরী মুখোমুখি অবস্থান করেছিল। লিবিয়া ইস্যু নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্যারিস ও আঙ্কারা বাক-যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। লিবিয়ার সহায়তায় ভূমধ্যসাগর থেকে তেল উত্তোলন করতে চায় তুরস্ক। যেখানে গ্রীসের রয়েছে প্রবল আপত্তি। এমতাবস্থায় ফ্রান্স গ্রীসের পক্ষ নিয়ে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের তেলে নিজের নিয়ন্ত্রণ বলবৎ রাখতে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে। যার রেশ এসে পড়ে ন্যাটো জোটে। সম্প্রতি তুরস্ক লিবিয়ার বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা মানছে না অভিযোগ তুলে ন্যাটোর সমুদ্র অভিযান থেকে নিজেদের সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে ফ্রান্স। ফলে অপারেশন সি গার্ডিয়ান নামে সাগরে ন্যাটোর নিরাপত্তা অভিযানে থাকছে না তারা। এছাড়া লিবিয়ার সঙ্কট, উত্তর সিরিয়ায় তুরস্কের ভূমিকা নিয়ে ফ্রান্সের সাথে আগে থেকেই তুরস্কের সম্পর্ক ক্রমশই তিক্ত হয়ে উঠেছে। তুরস্কের বিষয়ে উদ্বিগ্ন ন্যাটোর অন্য দেশ সমূহও। ক্রেমলিনের সাথে মিত্রতায় আঙ্কারা ন্যাটোর কোন দেশের মতামতের পরোয়া করেনি বলে ক্ষুদ্ধ সবাই। আর তুরস্কের রাশিয়ান এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ক্রয়কে ন্যাটো জোটের প্রতি হুমকি বলেই মনে করেছে ন্যাটোর দেশগুলো। ফ্রান্স এবং লিবিয়ার দ্বন্দ্ব দুইবার অবসানের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। বরং লিবিয়া ইস্যুতে উত্তোরত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে ন্যাটোর থেকে তুরস্কের বেরিয়ে যাওয়ার সময়ের ব্যাপার মাত্র। উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটো ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্নায়ুযুদ্ধকালীন সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপরীতে এই সামরিক জোট প্রতিষ্ঠা হয়। প্রতিষ্ঠার সময় এই সংস্থায় ১২টি দেশ যোগ দেয়। প্রতিষ্ঠাকালীন দেশগুলো হলো- বেলজিয়াম, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, আইসল্যান্ড, ইতালি, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, পর্তুগাল, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে এই জোটে ২৯ টি দেশ চুক্তিবদ্ধ। ইউরোপের বাহিরে আমেরিকা এবং কানাডা ন্যাটো’র সদস্য দেশ। ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোর পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতা প্রদানে অঙ্গীকারবদ্ধ।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..