বিজেএমসি কার্যালয়ের সামনে অবস্থান-বিক্ষোভ

রাষ্ট্রীয় পাটকল বন্ধ নয় আধুনিকায়ন কর

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা প্রতিবেদক : রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিল, পাটকল বন্ধ না করে আধুনিকায়ন, মাথাভারী প্রশাসন নয়-দক্ষ কার্যকর প্রশাসন চাই, সরকারের দুর্নীতি-লুটপাট বন্ধ, ভুলনীতি পরিহারের দাবিতে মতিঝিলের আদমজী কোর্টস্থ বিজেএমসি কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি করেছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। গত ২৮ জুন সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ শেষে জোটভুক্ত দলগুলোর নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে মতিঝিলের আদমজী কোর্টস্থ বিজেএমসি কার্যালয়ের সামনে যান। সেখানেই দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি পালিত হয়। বাম গণতান্ত্রিক জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে সেখানকার অবস্থান সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুল্লাহ কাফি রতন, বাসদ (মার্কসবাদী)’র নেতা মানস নন্দী, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য আকবর খান, গণসংহতি আন্দোলনের বাচ্চু ভূইয়া, কমিউনিস্ট লীগের নজরুল ইসলাম, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির নেতা আমেনা বেগম। সমাবেশ পরিচালনা করেন বাসদ নেতা খালেকুজ্জামান লিপন। সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, করোনা সংক্রমণের এই দুর্যোগকালে যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বিপুল সংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছে। বিদেশ থেকেও অনেক শ্রমিক কাজ হারিয়ে দেশে ফিরছে, সেই সংকটকালে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন ‘কথিত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী পদক্ষেপ নিয়ে ২৫টি রাষ্ট্রীয় পাটকল বন্ধ করার গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যার ফলে স্থায়ী-অস্থায়ী মিলে প্রায় ৫৫/৬০ হাজার শ্রমিক কাজ হারাবে। তাদের পরিবার এবং ৪০ লাখ পাটচাষী, তাদের পরিবার, পাট ব্যবসায়ী মিলে মোট প্রায় সাড়ে ৩ কোটি মানুষ চরম বিপাকে পড়বে। নেতৃবৃন্দ বলেন, পাট ও পাট শিল্পের সাথে বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য গভীরভাবে যুক্ত। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও পাটকল শ্রমিকদের ভূমিকা ছিল সামনের কাতারের। দেশ স্বাধীনের পর ৭৭টি রাষ্ট্রীয় পাটকল ছিল। ১৯৮২ সাল থেকে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ এর কাঠামোগত সমন্বয়ের পরামর্শ পলিসি অনুসারে একের পর এক সেসব পাটকলগুলো বন্ধ করতে থাকে শাসকশ্রেণি। পানির দামে এসব কলকারখানা ব্যক্তি মালিকদের হাতে তুলে দেয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০০২ সালে তৎকালীন ৪ দলীয় জোট সরকার এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল আদমজী বন্ধ করে দেয়। ওই সময় বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে ২৫ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা দেয় পাটখাত সমন্বয় করার জন্য অর্থাৎ বন্ধ করার জন্য আর ভারতকে ২৫ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা দেয় পাটখাত উন্নয়নের জন্য। ‘তখন রাজাকার শিল্পমন্ত্রী নিজামী বলেছিলেন আদমজী অজগর সাপের মতো দেশের অর্থনীতি গিলে খাচ্ছে। তিনি আদমজী বন্ধ করে দোয়া করেছিলেন আর এখন মুক্তিযোদ্ধা পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর বলছেন রাষ্ট্রীয় পাটকলের লোকসানের বোঝা জনগণ বইতে পারবে না তাই কথিত পিপিপি’র নামে ব্যক্তি খাতে দেয়া হবে। আর সরকারতো ব্যবসা করবেনা, সরকারের দায়িত্ব ব্যবসায়ীদের সহায়তা

করা, ’ বলেন বাম নেতারা। নেতৃবৃন্দ বলেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট ও ব্যক্তি মুনাফার জন্য তুলে দিতে স্বাধীন দেশে কথিত মুক্তিযোদ্ধা - রাজাকার আজ এক কাতারে দাঁড়িয়েছে। করোনা দুর্যোগে বেসরকারি পোশাক কারখানাসহ কারখানা মালিক ব্যবসায়ীরা পাচ্ছে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা, আর রাষ্ট্রীয় কারখানায় প্রণোদনা না দিয়ে বন্ধ করা হচ্ছে। এর নাম নাকি দেশপ্রেম! নেতৃবৃন্দ বলেন, সারা বিশ্ব আজ সবুজায়নের দিকে যাচ্ছে। ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে কৃত্রিম তন্তু পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ হচ্ছে। পাটজাত দ্রব্যের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে তখন দেশের রাষ্ট্রীয় পাটকল বন্ধ করা অযৌক্তিক-অন্যায়। সারা পৃথিবীতে বছরে ৫০০ বিলিয়ন পিস শপিং ব্যাগ ব্যবহার হয়। যদি এর ২-৩% এর বাজারও বাংলাদেশ ধরতে পারে তাহলে দেশের পাটকল বন্ধ নয় নতুন পাটকল নির্মাণ ও শ্রমিক নিয়োগ করতে হবে। সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশে এখন সরকারি-বেসরকারি মিলে প্রায় ৩০৫টি পাটকল আছে এর মধ্যে ২৮১টি বেসরকারি। ৫৬টির মতো বন্ধ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় পাটকলে ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিক আরও ২৫ হাজার বদলী শ্রমিক মিলে ৫০/৫৫ হাজার শ্রমিক, অথচ এই অল্প সংখ্যক পাটকল ও শ্রমিক পরিচালনার জন্য রয়েছে সাড়ে তিন হাজার কর্মকর্তার এক মাথাভারী প্রশাসন। নেতৃবৃন্দ বলেন, বলা হচ্ছে পাটকল লোকসান দিচ্ছে। দেশবাসীর প্রশ্ন লোকসানের জন্য দায়ী কে? সরাকরের দুর্নীতি, লুটপাট, ভুলনীতি ও মাথাভারী-অদক্ষ প্রশাসন। শ্রমিকরা নয়। তারা সরকারের ভুলনীতির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, জুলাই-আগস্ট মাসে পাটের দাম যখন ১০০০/১২০০ টাকা থাকে তখন পাট না কিনে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে যখন পাটের দাম ২০০০/২২০০ টাকা হয় তখন পাট কেনা হয়; চাহিদার চেয়ে কম পাট কেনা হয়। এদিকে বিদেশে নতুন বাজার খোঁজা, পণ্যের বহুমুখীকরণ এসবই মন্ত্রণালয় ও বিজেএমসিসহ প্রশাসনের কাজ, অথচ তারা এসব কাজে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যর্থ। তাদের ব্যর্থতার কারণে হওয়া লোকসানের দায় কোনোভাবেই পাটকল শ্রমিকেরা নেবে না। নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশের রাষ্ট্রীয় পাটকলগুলো পাকিস্তান আমলে ১৯৫১-৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ফলে দীর্ঘদিনের পুরনো যন্ত্রপাতির কারণে উৎপাদন ১৮ টন থেকে অর্ধেকে নেমে এসে ৯ টনে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান বিশ্বে আধুনিক মেশিন দিয়ে ৩৬ টন পর্যন্ত উৎপাদন করা যায়। পুরনো যন্ত্রপাতি বদলে পাটকলের আধুনিকায়ন না করাও লোকসানের অন্যতম কারণ। নেতৃবৃন্দ বলেন, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ গত বছর ডিসেম্বরে সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে মাত্র ১২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে রাষ্ট্রীয় পাটকলের আধুনিকায়ন করলে, শ্রমিকদের ২৫০০০ টাকা বেতন দিয়েও কারখানা লাভজনক থাকবে। কোন শ্রমিক ছাঁটাই করতে হবে না বরং নতুন শ্রমিক নিয়োগ দেয়া যাবে। অথচ সরকার এই ১২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ না করে ৬ হাজার কোটি টাকা দিয়ে শ্রমিক ছাঁটাই ও পাওনা পরিশোধ করে কারখানা বন্ধ করতে চাইছে যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, অন্যায় ও গণবিরোধী। নেতৃবৃন্দ পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিল, পাটকলের আধুনিকায়ন করা, দুর্নীতি, লুটপাট বন্ধ, মাথাভারী প্রশাসন ছোট করা ও ভুলনীতি পরিহারের দাবি জানান।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..