বন্ধ নয়, মাত্র ১২০০ কোটি টাকায় পাটকলগুলোকে লাভজনক করা সম্ভব

সুপারিশ স্কপের

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা প্রতিবেদক : রাষ্ট্রীয় পাটকল বন্ধ এবং শ্রমিক ছাঁটাইয়ের তীব্র প্রতিবাদ করেছে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। গত ৩০ জুন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত সমাবেশ থেকে সরকারের প্রতি এই আহবান জানান স্কপ নেতৃবৃন্দ। বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি শহীদুল্লাহ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জাতীয় শ্রমিক জোট বাংলাদেশের সভাপতি সাইফুজ্জামান বাদশা, জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কামরুর আহসান, জাতীয় শ্রমিক জোটের কার্যকারী সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ, ট্রেড ইউনিয়ন সঙ্ঘের সাবেক সভাপতি খলিলুর রহমান, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সাধারন সম্পাদক আহসান হাবিব বুলবুল। উপস্থিত ছিলেন সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন, বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শামীম আরা, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের দপ্তর সম্পাদক শাহীদা পারভিন শিখা, অর্থ সম্পাদক কাজী রুহুল আমীন, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের কোষাধ্যক্ষ জুলফিকার আলী, জাতীয় শ্রমিক জোট বাংলাদেশের সরদার খোরশেদ, মোহাম্মদ মোস্তাক প্রমুখ। সমাবেশ সঞ্চালনা করেন সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেকুজ্জামান লিপন। নেতৃবৃন্দ বলেন, পাটকল বন্ধ নয় বরং ১২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক করা হলে শ্রমিক ছাঁটাই করতে হয় না, উৎপাদনও তিনগুণ বাড়ানো সম্ভব। তারা বলেন, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে এ সম্পর্কিত বিস্তাারিত পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়েছিল কিন্তু দুর্নীতিবাজ আমলা, ভুল নীতি, বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যক্তিগতভাবে হস্তগত করার কায়েমি স্বার্র্থের কারণে দেশের রাষ্ট্রীয় কারখানাগুলো বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। নেতৃবৃন্দ বলেন, যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠা রাষ্ট্রীয় পাটকল লুটপাটকারীদের হাতে ছেড়ে দেয়া যায় না। স্কপ নেতারা পাটকল বন্ধ না করে যাদের ভুল নীতি ও দুর্নীতির কারনে পাটকল সমুহ লোকসান করেছে তাদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান। নেতৃবৃন্দ স্কপ প্রদত্ত সুপারিশ বাস্তবায়ন, কারখানাসমুহ আধুনিকায়ন এবং শ্রমিকদের আধুনিক মেশিন চালানোর উপযোগী প্রশিক্ষণ দেয়ার জোর দাবি জানান। বলেন, আমলাদের দুর্নীতি আর ভুল নীতির কারণে যে লোকসান তাকে আড়াল করা আর লোকসানকে অজুহাত করে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ বাস্তবায়নের এই পদক্ষেপে শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি, চাকুরির নিরাপত্তাসহ শ্রম অধিকার নিয়ে দরকষাকষির ন্যূনতম সক্ষমতাটুকুও হারাবে। এর আগে গত ২৮ জুন স্কপ শ্রমমন্ত্রীর কাছে পাটকলগুলো আধুনিকায়ন করার বিস্তারিত পরিকল্পনাসহ সুপারিশ দেন। তারা বলেন, করোনাকালে যখন কর্মহীনদের পুনর্বাসনের জন্য নতুন কর্মসংস্থান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, সেই সময় সরকার প্রণোদনার নামে রাষ্ট্রের টাকা দিয়ে বেসরকারী খাতকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ২৫ টি পাটকল বন্ধ করে স্থায়ী, অস্থায়ী, বদলীসহ প্রায় ৭০ হাজার শ্রমিক এবং তাদের উপর নির্ভরশীল লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষকে বেকারত্ব আর অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ-স্কপ এর পক্ষে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি শহীদুল্লাহ চৌধুরী, জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কামরুল আহসান, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন, ট্রেড ইউনিয়ন সঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী আশিকুল আলমের স্বাক্ষরে শ্রম প্রতিমন্ত্রী বরাবর সরকারী মালিকানাধীন বিজিএমসি কর্তৃক পরিচালিত পাটকলসমূহ আধুনিকায়ন করে কার্যকর, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তোলার জন্য সুপারিশ পত্র দাখিল করার প্রাক্কালে নেতৃবৃন্দ বলেন, ১৯৫৪ সালের ২১ দফা থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস ও বাংলাদেশের ঐতিহ্যের সাথে রাষ্ট্রীয় পাট শিল্প যুক্ত। স্বাধীনতার স্বপক্ষের দাবিদার শক্তি রাষ্ট্র ক্ষমতাই থেকে এইরুপ শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী সিদ্ধান্ত নেয়া দু:খজনক। এই ধরনের সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রীয় সম্পদে ব্যাক্তিখাতকে সমৃদ্ধ করার নীতিতে রাজাকার আর মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রীর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। নেতৃবৃন্দ প্রশ্ন রাখেন, সচিবালয়সহ রাষ্ট্র যন্ত্রের কর্মকর্তাদের বেতন পরিশোধ বাবদ ব্যায়কে কি ভর্তুকি হিসাবে বিবেচনা করা হয়? তাহলে রাষ্ট্রীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধের ব্যায়কে ভর্তুকি বলে উল্লেখ করা হয় কেন। আর পাট মন্ত্রণালয়ের আমলা ও বিজেএমসি‘র কর্মকর্তাদের দূর্নীতির দায়ে শ্রমিকরা কেন বলি হবে? নেতৃবৃন্দ করোনাকালে রাষ্ট্রীয় পাটকলকে বন্ধ করে শ্রমিকদের বেকারত্বে ঠেলে দেওয়ার গনবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল করার আহবান জানান। স্কপের সুপারিশে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের অভ্যুদয়, সংগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পাট চাষ, পাটশিল্প এবং পাটজাত দ্রব্য ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। পাট চাষি, পাট শ্রমিক, পাট ব্যবসায়ীসহ প্রায় ৩ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাটশিল্পের সাথে যুক্ত। অতীতের কিছু সময় কৃত্রিম তন্তু ব্যবহারের কারণে পাটের চাহিদা খানিকটা হ্রাস পেরেও বর্তমানে বিশ্বব্যাপী এর চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে।’ সুপারিশে বলা হয়, করোনাভাইরাসের কারণে আমাদের দেশের আমদানী-রপ্তানী, প্রবাসী আয় মারাত্মক ঝুঁকির মুখে। বিশ্ব এবং বাংলাদেশের জনগণের ক্রয়ক্ষমতা এবং চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পসহ গার্মেন্টস, চামড়া, নির্মাণ খাত, সিরামিক, মেলামাইন, প্লাষ্টিক, পরিবহন শিল্পে উৎপাদন সংকুচিত হবে। যার ফলে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কর্মহীন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ‘এরকম পরিস্থিতিতে হঠাৎ আমরা জানতে পারলাম যে সরকারি ২৫টি পাটকল বন্ধ ও শ্রমিক ছাঁটাই করা হবে যাতে শ্রমিক কর্মচারীদের পাওনা পরিশোধে ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। করোনা দুর্যোগের এই সময়ে শ্রমিক ছাঁটায়ের ঘোষণা বেসরকারি মালিকদের কেবল উৎসাহিতই করবে না, তাদেরকে বেপরোয়া করে তুলবে এবং বেসরকারি মালিকরা নানা অজুহাতে স্থায়ী শ্রমিকদের ছাঁটাই করে পরবর্তীতে কম মজুরিতে অস্থায়ী শ্রমিক নিয়োগের কৌশল নেবে যা সমগ্র শিল্পখাতকে একটি অস্থির অবস্থার দিকে ধাবিত করবে; শিল্পের পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে। সুপারিশে স্কপ নেতারা বলেন, ‘আমরা হিসাব করে দেখিয়েছি ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে শ্রমিক ছাঁটাই অথবা ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে বিএমআরই-র মাধ্যমে সংস্কারের বিজেএমসির পরিকল্পনা রাষ্ট্রীয় পাটশিল্পের সংকটের সমাধান করবে না। বরং শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ - স্কপ এর পেশকৃত আধুনীকিকরণ প্রস্তাব যাতে উন্নত ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির তাত, ভিম, ওয়ার্প ওয়েভিং ক্রয়ে মাত্র ১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ এর মাধ্যমে উৎপাদন ক্ষমতা তিনগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। এর মাধ্যমে শ্রমিক কর্মচারীদের মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন করা ও পাটশিল্পকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীল, লাভজনক এবং ক্রেতাদের পছন্দ ও চাহিদা পুরণের সক্ষমতা অর্জন করা যায়।‘

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..