কর্তৃত্ববাদী শাসন হঠাতে হবে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
অনিরুদ্ধ দাশ অঞ্জন : কর্তৃত্ববাদ কথাটা ইংরেজি ‘Authoritarianism’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ। স্বৈরাচারের ভিন্ন রূপ হচ্ছে কর্তৃত্ববাদ। ‘স্বৈরাচার’ কথাটা সেকেলে হলে, কর্তৃত্ববাদ তার নবতর সংস্করণ। একদলীয় বা এক ব্যক্তির শাসন, যেখানে নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বা মতামতের কোনো মূল্য নেই, সেই শাসনকে কর্তৃত্ববাদী শাসন বলা হয়ে থাকে। এক দল কিংবা এক ব্যক্তি বা কতিপয় ব্যক্তির নির্দেশই এখানে শিরোধার্যত। ব্যক্তি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের সমার্থক। কর্তৃত্ববাদী শাসকরা স্বৈরতন্ত্রকে বৈধ করতে মুখে গণতন্ত্রের কথা বলেন, গণতন্ত্রকে ব্যাখ্যা করেন নিজেদের সুবিধামতো। গণতন্ত্রের আগে বা পরে সুবিধামতো শব্দও জুড়ে দেন। পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান ‘মৌলিক গণতন্ত্রে’র কথা বলেছিলেন। বর্তমান সরকার বলছে ‘উন্নয়নের গণতন্ত্র’। ‘আগে উন্নয়ন, পরে গণতন্ত্র’ এমন একটি প্রচারণা সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। রাজনৈতিক স্বার্থে গণতন্ত্রকে উন্নয়নের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কর্তৃত্ববাদী শাসনে গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা হারিয়ে যায়। সর্বক্ষেত্রে কর্তৃত্ববাদী শাসকের সার্বভৌমত্ব কায়েম হয়। সরকারের ঘোষিত ও অঘোষিত নিয়ন্ত্রণের ফলে নাগরিকদের স্বাধীনতা ও অধিকার বিপন্ন হয়। ভীতি সঞ্চার ও বল প্রয়োগ করে বিরোধী মতকে স্তব্ধ করে দিয়ে এবং গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রের অন্তর্গত সব বিষয়ের ওপর শাসকের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রশাসন ও পুলিশের ওপর সরকারের অতিমাত্রায় নির্ভরতা এবং বিচারহীনতা দেখা দেয়। রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকার করে তোলা হয়। শাসককে পরিণত করা হয় প্রভুতে। জনগণ পরিণত হয় শাসকের নিয়ন্ত্রণাধীন ভৃত্যে। নানা পন্থায় কর্তৃত্ববাদী শাসক সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। হয়ে ওঠেন সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক, সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। প্রসঙ্গত বলা যায়, ফরাসি সম্রাট ষোড়শ লুই সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমিই রাষ্ট্র’। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টেফান ওয়াল্ট কর্তৃত্ববাদী শাসনের দশটি লক্ষণের কথা বলেছেন। সাধারণভাবে লক্ষণগুলো হচ্ছে : ভীতি অথবা উৎকোচের মাধ্যমে তথ্যব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ; তাঁবেদার তথ্যব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা; প্রশাসন ও নিরাপত্তাব্যবস্থার দলীয়করণ; নিজ স্বার্থে নির্বাচনী ব্যবস্থায় জালিয়াতি; বিরোধী রাজনীতিকদের ওপর নজরদারির জন্য গোয়েন্দা সংস্থার ব্যবহার; অনুগত ব্যবসায়ীদের পুরস্কার, অবাধ্য ব্যবসায়ীদের শাস্তি; বিচারব্যবস্থা হাতের মুঠোয় নিয়ে আসা; শুধু এক পক্ষের ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ; ভীতি ও আতঙ্ক ছড়ানো; বিরোধী রাজনীতিকদের সম্পর্কে মিথ্যা প্রচার। স্টেফান ওয়াল্ট কর্তৃত্ববাদী শাসনের যে রূপরেখা তুলে ধরেছেন, তার সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান শাসন মিলে যাচ্ছে। বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের বৈশিষ্ট্যগুলো ইতিমধ্যেই যথেষ্ট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অনেক আগেই বাংলাদেশ কার্যত একদলীয় শাসনব্যবস্থা তথা কর্তৃত্ববাদে প্রবেশ করেছে। ব্রিটেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিট’ (ইআইইউ) গত বছরের ৯ জানুয়ারি এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে 'গণতান্ত্রিক' কিংবা 'ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক' দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই। জার্মান প্রতিষ্ঠান 'বেরটেলসম্যান স্টিফটুং' বিশ্বের ১২৯ টি দেশের ওপর সমীক্ষা চালায়। ২০১৮ সালের ২৩ মার্চ প্রকাশিত রিপোর্টে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশকে স্বৈরতান্ত্রিক দেশ বলে তুলে ধরে। বাংলাদেশ এখন স্বৈরশাসনের অধীন এবং এখন গণতন্ত্রের ন্যূনতম মানদণ্ড মানা হচ্ছে না বলে মন্তব্য করে প্রতিষ্ঠানটি। নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ (এইচআরডব্লিউ) অনেক আগেই বিবৃতি দিয়ে বলেছে, বাংলাদেশ সরকার আরও কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের এক শুনানিতে এইচআরডব্লিউ-এর বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশ অধিকতর স্বৈরশাসনের পথে এগোচ্ছে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কিংবা আন্তর্জাতিক মিডিয়ার পর্যনবেক্ষণ-মতামতের চেয়ে দেশের মানুষের অভিজ্ঞতাটাই গুরুত্বপূর্ণ। কর্তৃত্ববাদী শাসন কী, তা এই করোনা-মহামারিতে মানুষ অনেক স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছে। করোনার আঘাতে মানুষের জীবন ও জীবিকা যখন হুমকিতে, অর্থনীতি বিপর্যিস্ত, ঠিক তখনই সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ২৬টি পাটকল বন্ধের ঘোষণা দিল। এর মধ্যদিয়ে দেশের পাটশিল্প ধ্বংসে সর্বশেষ পেরেকটি মারা হলো। এই নির্মম সিদ্ধান্ত কেবল ২৫ হাজার শ্রমিকের জন্যই নয়, পাটিশিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে যুক্ত লাখ লাখ মানুষের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। পাটকে কেন্দ্র করে বর্তমানে দেশে-বিদেশে সম্ভাবনার নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। বিগত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে পাট ও পাটপণ্য রপ্তানিতে আয় বেড়েছে ২১ শতাংশ। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হচ্ছে পাটের নতুন বাজার। পাটের জীবন-রহস্য উন্মোচন করেছেন বাঙালি গবেষকরা। ফলে পাটকে কেন্দ্র করে নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। পাটের পাতা দিয়ে এখন চা তৈরি হচ্ছে। পাট দিয়ে পলিথিনের মতো ব্যাগ তৈরির প্রক্রিয়া আবিষ্কৃত হয়েছে। করোনা-পরবর্তী বিশ্বে পরিবেশ সচেতনতার কারণে পাটের চাহিদা বিশ্বব্যাপীই ব্যাপকভাবে বৃদ্ধির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এমন দারুণ সম্ভাবনাকে অগ্রাহ্য করে কর্তৃত্ববাদী সরকার এই আত্মঘাতী ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। বেছে নেয়া হলো করোনা-মহামারির সময়টাকে। ২৬টি পাটকল বন্ধের কারণ হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে যথারীতি লোকসানের অজুহাত দেয়া হয়েছে। শ্রমিকদের ওপর লোকসানের দায় চাপিয়ে দিয়ে, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি আর খামখেয়ালিপনাকে আড়াল করা হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের ব্যয় বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত তিন বছরে শ্রমিকের মজুরি কমেছে, কিন্তু বেড়েছে বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন (বিজিএমসি)-এর কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন। বিজিএমসি-এর হিসাব বলছে, ২০১৭-১৮ সালের লোকসানের ৩৯ ভাগের পেছনে কারণ ছিল পুরনো যন্ত্রপাতি। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ শতাংশে। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ ১০ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। গত ১০ বছরে লোকসান হয়েছে ৭ হাজার কোটি টাকা। শ্রমিকদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর (গোল্ডেন হ্যান্ডশেক) জন্য সরকার ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। অথচ ১৩০০ কোটি টাকা খরচ করে পাটকলে আধুনিক যন্ত্রপাতি বসালে, উৎপাদন তিনগুণ বাড়ানো সম্ভব। বেসরকারি খাতের পাটকলগুলো লাভ করতে পারলে, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল কেন লোকসান করে? রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে লোকসান আসলে ইচ্ছাকৃত। বিশ্বব্যাংক ও সাম্রাজ্যবাদী দাতা গোষ্ঠীর পরামর্শ ও চাপে ১৯৮২ সালের পর পাটশিল্পে বিরাষ্ট্রীয়করণের ধাক্কা লাগে। পুরনো আমলের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে উৎপাদন কমিয়ে এবং দুর্নীতি করে ধীরে ধীরে ডাউন-সাইজ করা হয় পাটকলগুলোকে। ২০০২ সালে বন্ধ করা হয় সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজী। সেই ইতিহাস মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়নি। আদমজী পাটকল বন্ধের জন্য বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে অর্থ দিয়েছিল। অন্যদিকে একই সময়ে বিশ্বব্যাংক ভারতকে অর্থ দিয়েছিল নতুন পাটকল গড়ে তোলার জন্য। যে সরকার পাটকল চালাতে পারে না, সেই সরকারের হাতে দেশ কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। করোনার কারণে লাখ লাখ মানুষ কাজ হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। এমন এক দুঃসময়ে সরকার শ্রমিক ছাঁটাই করে বেসরকারি মালিকদের শ্রমিক-কর্মচারী ছাঁটাইয়ের সুযোগ তৈরি করে দিল। করোনার মধ্যে গার্মেন্টস্-এ শ্রমিক ছাঁটাই অব্যাহত রয়েছে। বকেয়া বেতনের জন্য শ্রমিকদের আন্দোলন এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অঘোষিত ছাঁটাইয়ের মধ্যেই বিজিএমইএ-র সভাপতি ব্যাপক হারে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের হুমকি দিয়ে রেখেছেন। গার্মেন্টমালিকরা প্রণোদনা আদায় করে নিল, আবার শ্রমিকদের বেতন-বোনাস কেটে রাখল। গার্মেন্ট শ্রমিকদের ‘কাজে যোগদান না করলে চাকরি চলে যাবে’ এই ভয় দেখিয়ে শত শত মাইল হাঁটিয়ে ঢাকায় এনে আবার তাঁদের বাড়িতে ফেরত পাঠানো হলো। করোনা-মহামারির মধ্যেই শ্রমজীবী মানুষের ওপর এভাবে হামলা চলছে। বৈষম্য বাড়ছে, আরও বাড়বে। অবাক হওয়ার কিছু নেই। চলমান শাসনে এমনই ঘটার কথা। কর্তৃত্ববাদী শাসনের অন্যতম অনুষঙ্গ লুটপাট। লুটেরাদের রক্ষা করছে সরকার। করোনার মধ্যে দুর্নীতির যেসব ঘটনা আমাদের সামনে আসছে, তাতে আতঙ্কিত হতে হয়। মানবপাচার আর মুদ্রাপাচারের অভিযোগে সম্প্রতি কুয়েতে বাংলাদেশের একজন এমপি গ্রেপ্তার হয়েছেন। সরকারি ব্যবস্থাপনায় কয়েকজন লুটেরা বিদেশে পালিয়েও গেছেন। ক্যাসিনা, সম্রাট থেকে পাপিয়া, ট্রাংক আর সিন্ধুকে থরে থরে সাজানো টাকা, এসব বিষয় মানুষ ভোলেনি। একের পর এক স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির কাহিনি উঠে আসছে। করোনা-মহামারি মোকাবিলায় সুরক্ষা সামগ্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটায় অনিয়ম-দুর্নীতি উদ্বেগজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এন-৯৫ মাস্কের মোড়কে নকল মাস্ক সরবরাহের মতো মারাত্মক অপরাধের সঙ্গে যুক্তদের কী শাস্তি হলো তা কেউ জানেন না। ‘করোনাভাইরাস মোকাবিলায় জরুরি সহায়তা’ প্রকল্পের জন্য বিশ্বব্যাংক ও এডিবির কাছ থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে। এই প্রকল্পে চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে খরচ ধরেছে, তা বর্তমান বাজারমূল্যের চেয়ে চার-পাঁচ গুণ বেশি। চিকিৎসা সরঞ্জামে যত টাকা খরচ করা হচ্ছে, তার চেয়ে তুলনামূলক বেশি টাকা খরচ হচ্ছে সফটওয়্যার, ওয়েবসাইট, অডিও-ভিডিও ফিল্ম তৈরি, সেমিনার, কনফারেন্স ও পরামর্শক খাতে। ভ্রমণ, গাড়িভাড়া, অনাবাসিক ভবন নির্মাণ বাবদ অস্বাভাবিক খরচ ধরা হয়েছে। খরচের এমন হিসাব পরিকল্পনা কমিশনকেও বিস্মিত করেছে। করোনাকালে ওএসএমর চাল চুরির হিড়িকের পর, ২৫০০ টাকা বিতরণে বিস্তর অভিযোগের নানা কাহিনি মানুষ জেনেছে। বিদ্যুতের ভৌতিক বিলে মানুষ দিশেহারা। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি’ (জিএফআই)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে গড়ে পাচার হয়ে যাচ্ছে প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা। প্রকৃত পরিমাণ আরও বেশি হবে। ব্যাংক মালিকদের ঋণ পৌনে ২ লাখ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। ২০০৮ সালের তুলনায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫ গুণের বেশি। নির্যােতন-নিপীড়ন করে, ব্যক্তি ও মিডিয়ার স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করেই কর্তৃত্ববাদী শাসনকে টিকে থাকতে হয়। গত বছর ৩০-৩১ জুলাই জেনেভায় জাতিসংঘের ‘নির্যাতনবিরোধী কমিটি’ বা Committee Against Torture (CAT)-র ৬৭তম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বলা হয়েছিল, ‘প্রথম পর্যালোচনা অধিবেশনে যেসব অভিযোগ এসেছে, তা একটি হিমশৈলের ডগা মাত্র!’ গুম, বন্দুকযুদ্ধ, রিমান্ড, হেফাজত ও কারাগারে মৃত্যু, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়মুক্তি ও বিচারহীনতা, বিচারবিভাগের স্বাধীনতা, শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা, ভোটারদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা, নির্বাচনী সহিংসতা, ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের জন্য সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে হয়রানি ও দেশত্যাগে বাধ্য করা, তথ্যপ্রযুক্তি আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো আরও অনেক বিষয়ে তীব্র প্রশ্নবাণের মুখে পড়তে হয়েছিল বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সদস্যদের। এমন জবাবদিহিতার মুখে উত্তর দিতে গিয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা রীতিমতো খেই হারিয়ে ফেলেছিলেন। ওই অধিবেশনের বাংলাদেশ অংশটি পর্যায়লোচনা করলে বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের চেহারাটাও ফুটে ওঠে। করোনা-মহামারিতে মানুষের বিপন্নতার সুযোগে কর্তৃত্ববাদী সরকার আরও শক্ত করে জনসাধারণের ওপর জেঁকে বসার চেষ্টা করছে। প্রধান প্রধান জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে করা ‘আইন ও শালিস কেন্দ্রে’র ছয় মাসের (জানুয়ারি-জুন) প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, এ সময়কালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ও তথাকথিত ‘ক্রসফায়ারে’ ১৫৮ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে কেবল গোপালগঞ্জে পুলিশের মারধরে নিখিল তালুকদারের (৩২) মৃত্যুর বিষয়টিই আলোচনায় এসেছে। এ সময়কালে কারা হেফাজতে মারা গেছেন ৩৭ জন। ১৫৬ জন সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিভিন্নভাবে নির্যাতন, হয়রানি, হুমকি ও বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। করোনাকালীন সময়ে সাংবাদিকদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সাংবাদিক কাজলের ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিষয়টি তুলে ধরেছে। সম্প্রতি একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে করা দুর্নীতির অভিযোগের সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশের পর অন্তত ১০ জন সাংবাদিককে পুলিশের তদন্ত কমিটি তলব করে। এটা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আক্রমণ। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে স্তব্ধ করতে নিপীড়নমূলক কুখ্যাত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ প্রয়োগ করা হচ্ছে। সরকারের সমালোচনা করায়, করোনা-মহামারিতেই বেশ কয়েকজন শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক, অ্যাকটিভিস্টকে বাড়ি থেকে তুলে এনে এই আইনে মামলা ঠুকে দেয়া হয়েছে। তাঁদের জামিন দেয়া হচ্ছে না। এমনকি মো. ইমন নামের ১৪ বছর বয়সের এক কিশোরকেও গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়েছে। গত ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) এ আইনের আওতায় কমপক্ষে ৬২টি মামলা হয়েছে এবং মামলাগুলোতে প্রায় ১৪০ জনকে আসামি করা হয়েছে। সাংবাদিক, লেখকরা ‘সেল্ফ-সেন্সরশিপে’ বাধ্য হচ্ছেন। ফলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকছে না। কয়েকদিন আগে রংপুরে প্রগতিশীল ছাত্রজোটের মানববন্ধনে পুলিশ হামলা চালিয়ে কয়েকজনকে আটক করে। তাহলে মানববন্ধনও করা যাবে না? কর্তৃত্ববাদী শাসনে জনগণের প্রতি সরকারের কোনো দায় থাকে না। করোনা সেটা অনেক স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছে। করোনাকালের বাজেটে স্বাস্থ্যখাত উপেক্ষিতই থেকেছে। মহামারির মধ্যে অর্থমন্ত্রী মোস্তফা কামাল, আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বিদেশে পাড়ি দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, জনগণের প্রতি তাঁদের ন্যূনতম দায় নেই। করোনা-মহামারি মোকাবিলায় সরকার জনগণকে যুক্ত করার কোনো চেষ্টাই করেনি। জনগণের সঙ্গে সরকারের বিচ্ছিন্নতা বাড়ছেই। বাগড়ম্বর করে সরকার পার পেতে চাইছে। সরকারের দায়িত্বহীনতার মানুষের জীবন আর জীবিকা দুটোই এখন হুমকিতে, হুমকিতে গোটা দেশ। কর্তৃত্ববাদী শাসন বহাল থাকলে জনগণের অধিকার, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। দেশ বাঁচাতে, মানুষ বাঁচাতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। যথাযথভাবে পালন করতে হবে রাজনৈতিক কর্তব্য। কর্তৃত্ববাদী শাসন হঠাতে হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..