শিক্ষা বাজেটে শিক্ষকদের নতুন কিছু অধরাই থেকে গেল

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
জাহাঙ্গীর হোসেন : করোনা মহামারীকালে বাজেটের রঙ্গ খানিকটা হলেও ভিন্ন মাত্রায় মোড় দিলেও বেসরকারি এমপিও ও ননএমপিওভুক্ত কিংবা খণ্ডকালীন শিক্ষকদের জন্য কোনো রকমের নির্দেশনা নেই। দেশে ২৫ হাজার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে ১ লক্ষ খণ্ডকালীন ও ২ লক্ষাধিক ননএমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছে। করোনাকালে খণ্ডকালীন ও ননএপিওভুক্ত শিক্ষকগণ চরমভাবে আর্থিক দীনতায় জীবনযাপন করছে। এদের পাশাপাশি এমপিওভুক্ত শিক্ষকগণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ধার্যকৃত বেতনটুকু পাচ্ছে না বিদ্যালয় বন্ধ থাকার কারণে। কারণ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গত ৩ মাস যাবৎ কোনো আয় নেই এবং শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনিরও কোনো ব্যবস্থা নেই। বিদ্যালয়ে আয় না থাকার কারণে বিদ্যালয়ের ফান্ড থেকে শিক্ষকদের বেতন দিতে পারছে না। এতে করে শিক্ষকগণ চরম অর্থ সংকটে দিনাতিপাত করছে। গোটা বিশ্বকে করোনা শিখিয়ে দিলো প্রকৃতির উপর অপশাসনের ফল। এ দিকে বলতে হয়, বাংলাদেশের বাজেটে স্বাস্থ্যখাত বিবেচনায় প্রধান হলেও শিক্ষাখাত অপ্রধান হবে না মোটেও। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, এ দুটো খাত বাজেটে সেভাবে প্রধান করে আনা হয়নি। বরাবরের মতো এবারও বাজেটে কিছু খাতকে এক ধরনের ঘুষ দেয়া হচ্ছে যেমন- জনপ্রশাসন, প্রতিরক্ষা ও জনশৃঙ্খলার মতো এসব খাত। গত বারের চেয়ে এবার শিক্ষাখাতে বাজেট কম। ২০১৯-২০ অর্থবছরের শিক্ষা ও প্রযুক্তিখাতে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা। গতবার নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিও এবং শিক্ষার অবকাঠামোগত পরিবেশ উন্নয়নে তূলনামূলক বরাদ্দ বেশি ছিল। এবার ২০২০-২১ অর্থ বছরে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ৬৬,৪০১ কোটি টাকা অর্থ্যাৎ বাজেটের ১১.৬৭%। মূলত: জনগণ আশা করে থাকে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ হবে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকগণ অন্তত দুই যুগ ধরে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবি জানিয়ে আসছে। গত এক দশকে দাবিটি আরও জোরালো হয়েছে। কিন্তু এবার এ দাবিটির উপর বাজেটের মধ্য দিয়ে সরকারের নাখোশ মনোভাব দীপ্ত হয়েছে। যা হতভাগা শিক্ষক-কর্মচারীরা মোটেও আশা করছে না। শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের সহজপথ দেখাতে শিক্ষক নেতারা যারপরনাই চেষ্টা করেছিল। শিক্ষক নেতারা যুক্তি দেখিয়েছিল- এটি জাতীয়করণ করতে সামান্য অর্থই লাগবে। শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন সাধারণ জনগণ। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক ও অভ্যন্তরীণ খরচ নির্বাহ করতে বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃক ন্যূনতম ১০০ টাকা বেতন শিক্ষার্থীদের উপর ধার্য করা আছে। ১০০-৫০০/৭০০/১০০০ টাকার অধিক বেতন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আদায় করছে। এতে করে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক নাখোশ হয় শিক্ষকের উপর। এ নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির বদনাম অধরাই থেকে যায়। সাধারণ মানুষের ধারণা শিক্ষার্থীর নিকট থেকে উত্তোলিত অর্থ শিক্ষকদের পেটেই যায়। এখানে ম্যানেজিং কমিটির অবাধ দুর্নীতি-অনিয়ম সম্পর্কে মানুষের অগোচরেই থেকে যাচ্ছে। যার ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মাঝে দূরত্ব মরণ পর্যন্ত থাকে। শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের ফলে শিক্ষক যেমন বেতন-ভাতাদি বেশি পাবেন, তেমনি শিক্ষার্থীরাও নামমাত্র বেতন সরকারকে দিবেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মাঝে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব অনেক কমে যাবে, ফলে শিক্ষার মান বেড়ে যাবে। শিক্ষকদের বেতন বেড়ে গেলে তখন সরকার প্রাইভেট-টিউশনি বন্ধের প্রতি জোর দিলে এবং এর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে মোটেও অন্যায় হবে না। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করতে এটাই প্রধান অবলম্বন হতে পারে। শিক্ষক যখন প্রাইভেট-টিউশনি করেন তখন অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে কম-বেশি বিরূপ প্রভাব পড়ে থাকে। শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করার পর ধীরে ধীরে শিক্ষক নিয়োগ ও ক্লাশরুমের সংকট নিরসন করতে পারলেই- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার্থীরা ৮০% শিক্ষার্জন করতে সক্ষম হবে বলে মনে করি। বিদ্যালয়গুলো নামমাত্র পাশের জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতায় থাকতে হবে না। শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করতে প্রয়োজনে থোক বরাদ্দ দিয়ে হলেও জাতির আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো উচিত। এতে করে সরকারের ইমেজও বেড়ে যাবে। এ দিকে সভ্যতার এ যুগে একযোগে না করে পর্যায়ক্রমে জাতীয়করণের কোনো যুক্তি আমাদের কাছে মনে হয় না। জাতীয়করণে সরকারের সদিচ্ছাই যথেষ্ট। মাত্র ৪/৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করলেই জাতীয়করণ সম্ভব। তাও লাগবে না, প্রতিষ্ঠানের ছাত্র বেতন ও সম্পদের সঠিক ব্যবহার করলে। শিক্ষার ভিতরকার পরিবেশ সৃষ্টির দিকে না তাকিয়ে সরকারের উপরভাসা ভাব। যেমন অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সেটি অবশ্যই প্রয়োজন। তবে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার প্রতি প্রণোদনা, বিনা বেতন ও আধুনিক উপকরণ ব্যবস্থাপনার পদক্ষেপ আরও বাড়ানো উচিত। অর্থাভাবে বেসরকারি শিক্ষকদের চলন-বলন এখনও গরীবী মাপের। স্বল্পবেতনে দৈনন্দিন খরচ নির্বাহ করা কঠিন। বি.এড ব্যতিত একজন শিক্ষক বেতন পান সর্বসাকুল্যে ১৩/১৪ হাজার টাকা। বি.এডসহ একজন শিক্ষক বেতনপান ১৭/১৮ হাজার টাকা। টাইমস্কেল প্রাপ্ত একজন শিক্ষক বর্তমান সর্বসাকুল্যে পান ২৪/২৫ হাজার টাকা। এসব শিক্ষকের পরিবারের সন্তানদের পড়ালেখার খরচসহ যাবতীয় খরচতো আছেই। তাছাড়া মা-বাবার খরচ নির্বাহ এবং নিজেদের চিকিৎসা ব্যয়ভার এবং সামাজিক অনুষ্ঠানাদি ব্যয়সহ বিভিন্ন খরচ বাড়তেই থাকছে। তাই এ অবস্থায় জাতীয়করণ না করলেও অন্তত বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসাভাতাদি আপদকালিন বাড়ানো উচিত। প্রায় ৬ লক্ষাধিক বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীর পরিবারের সদস্য অন্তত ২৫-৩০ লক্ষ মানুষের এদের জীবনমান সচল করতে এতটুকুন অধিকার পাওয়ার দাবি করা মোটেও অন্যায় নয়। মনে রাখাই উচিত শিক্ষার ৯৮% নিয়ন্ত্রণ হয় বেসরকারি পর্যায়ে। উপরন্তু ৫% দিয়ে ৪% কেটে নেয়া হচ্ছে অবসর-কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য, অর্থ দাড়ায় প্রতি ১০ মাস পর ১ মাসের বেতন কেটে নেয়া। প্রতিবেশি রাষ্ট্রের তুলনায় শিক্ষায় বরাদ্দের হারে অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, নেপালে জিডিপির ৫.১৫% ও মালদ্বীপে ৪.২৫%। বাজেটকে মানবিক করতে হলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বাঁচাতে শিক্ষা জাতীয়করণের নিমিত্তে বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন। সম্প্রতি সরকার একটি উচ্চতর স্কেল ঘোষণা দিয়েছে যা অনেক বছর আটকে ছিল। আর একটি উচ্চতর স্কেল মামলা জটিলতায়। এ প্রাপ্যতা থেকেও শিক্ষকরা বঞ্চিত হচ্ছে। এর ক্ষতিপূরণ শিক্ষকদের মিটিয়ে দেয়া বিবেকবান যে কারোরই দায়িত্ব। আর এদিকে আনুপাতিক মারপ্যাঁচে পড়ে কলেজ শিক্ষকগণ জটিলতায় ভুগছেন। এতে করে অধ্যাপক পদোন্নতি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রণালয়ের বর্তমান নেতৃত্বের অগোচরেই থেকে যাচ্ছে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য। মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কৃষি, কম্পিউটার, শরীরচর্চা ও ধর্মীয় বিষয়ের শিক্ষকগণ বি.এড ব্যতিত বর্তমানে ১৬,০০০ টাকা স্কেলে বেতন পাচ্ছেন। এদিকে গণিত, ইংরেজি, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষার বিষয়ের শিক্ষকগণ বি.এড ব্যতিত পাচ্ছেন ১২,৪০০ টাকা। এ পার্থক্যের কোনো যথাযথ কারণ নাই। ফলে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক মর্যাদা ও বেতন নিয়ে হরহামেশা খটকা ও বাদানুবাদ লেগেই আছে। এ বৈষম্য অন্তত দেড় যুগ ধরে চলে আসছে। তাই এর অবসান চাচ্ছে সাধারণ শিক্ষকগণ। মাধ্যমিক পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষক থেকে অধ্যক্ষ পর্যন্ত বেতন বৈষম্য বড় ধরণের। এ দিকটার প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি কামনা করছি। পাশাপাশি দৃষ্টি দিতে হবে শিক্ষক বদলীর দিকে। একই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন চাকরি করায় মানসিকতা একপেশে হয়ে যায়। এতে করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এলাকার অভিভাবকদের সাথে মনোমালিন্য বিভিন্ন কারণেই হয়ে থাকে। চাকরিস্থল থেকে বাসস্থানের দূরত্ব হওয়ার কারণে বাড়িভাড়া কিংবা যাতায়াত ভাড়ায় বেতনের বড় অংশ চলে যায়। শিক্ষকতা পেশাকে আরও উৎসাহিত করতে সহকারি শিক্ষক থেকেই প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিসার হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত। এতে করে এ পেশায় মেধাবীরা প্রবেশ করবেন, ফলশ্রুতিতে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে। পরিশেষে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে শিক্ষকের সংখ্যাই অধিক। বাংলাপিডিয়ার প্রাপ্ততথ্য অনুযায়ী, মোট শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা ১১১১ জন। তন্মধ্যে শিক্ষকই ৯৯১ জন। অতএব দেশ ও জাতির ক্রান্তিকালে শিক্ষক সমাজের ভূমিকা থাকতেই হয়। অন্যথায় জাতি অনগ্রসর হয়েই থাকবে। লেখক: সাধারণ সম্পাদক, মাধ্যমিক সহকারি শিক্ষক সমিতি, চাঁদপুর

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..