বর্ণবাদবিরোধী লড়াই পুঁজিবাদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
রাগিব আহসান মুন্না : এক সময় ‘সাদা শ্রেষ্ঠ’ অথবা ‘আমেরিকা প্রথম’- এ সকল স্লোগান তুলে জনতুষ্টিবাদীরা জাতীয়তাবাদের যে ধ্বজা উড়িয়ে রাজনীতিতে কিস্তিমাত করার সুযোগ নিত সেই কৌশল বর্তমান পৃথিবীতে অচল হয়ে পড়েছে। কারণ নয়া উদারবাদের নীতি শোষণের তীব্রতাকে যে মাত্রায় নিয়েছে, যেভাবে মুনাফার একচেটিয়াকরণ হয়েছে তাতে সম্পদের মালিকানায় কর্পোরেট একচ্ছত্র অধিপত্য সামাজিক রাজনৈতিক সমীকরণে ক্রমান্বয়ে অস্থিরতা আর অসহিষ্ণুতাকে অসম্ভব করে তুলেছে। নয়া উদারবাদ এমন এক ব্যবস্থা যার মৌলিক ভিত্তিগুলো একই সঙ্গে নতুন এবং ধ্রুপদী উদারনৈতিক চিন্তা প্রসূত। ওয়াশিংটন কনসেনসাস এর ভিত্তি। ওয়াশিংটন কনসেনসাস মূলত যুক্তরাষ্ট্র প্রণীত বাজার তাড়িত কতকগুলো মৌলিক নীতি যা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থা, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ দ্বারা কার্যকর। সমাজের তলানিতে থাকা মানুষ আর পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে ‘টেনে তুলতেই’ নাকি এই নীতি। আদতে যুক্তরাষ্ট্রের গুটিকতক এলিট-বিজনেস টাইকুনের স্বার্থে পরিচালিত এক বাজার লালসা। নয়া উদারবাদ ক্রমাগত সামাজিক সুরক্ষা খাতকে সংকুচিত করে ঘটায় পণ্যায়ন। আবার একই সঙ্গে উন্নয়নের গালভরা বুলিতে নিশ্চিত করে পুঁজি ও পণ্যের অবারিত প্রবাহ। জাতিসঙ্ঘ-বিশ্বব্যাংক-আইমএফ- এডিবি-আইএনজিও এমন নানাবিধ প্রতিষ্ঠান মিলে ঠিক করে এর ব্যবস্থাপত্র। এ এক নতুন ধরনের শাসন প্রণালী। সম্পদের বৈষম্য আর জীবন জীবিকার ব্যবস্থাপনায় যে সীমাহীন ফারাক তা থেকেই শ্রেণি-চেতনা আরো প্রকটভাবে প্রকাশিত আর বিকশিত হয়েছে। পুঁজিবাদী চলমান ব্যবস্থাই আসলে শ্রেণি-ঘৃণা সৃষ্টির কারণ। চলমান সংগ্রাম আর বিক্ষোভগুলির মধ্যে দিয়ে সেটাই আমরা দেখতে পাচ্ছি, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে চরম অনাস্থার প্রকাশ ঘটেছে। সময় যত যাচ্ছে প্রতিবাদের মাত্রা ততই তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে। জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ পরিণত হয়েছে দাঙ্গায়, যা মিনিয়াপোলিস শহর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি শহরে ছাড়িয়ে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্ণবাদ ও শ্বেতাঙ্গ পুলিশ সদস্যের ক্ষমতার অপব্যবহারের বাইরে আরও গভীর কিছু কি রয়েছে? এমন প্রশ্নে জবাবে মার্কিন বুদ্ধিজীবী চমস্কি বলেছেন, গভীরে যা আছে তা হলো ৪০০ বছরের নির্মম অত্যাচার। মানব ইতিহাসে দাসত্ব সবচেয়ে জঘন্যতম ব্যবস্থা, যা কিনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের মূল ভিত্তি। কালো মানুষদের অপরাধী হিসেবে তুলে ধরতে তারা যা করেছিল তা হলো, ‘ভিন্ন নামে দাসপ্রথা’ প্রতিষ্ঠা করা। প্রকৃতপক্ষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পর্যন্ত কার্যকর ছিল এটা, যখন দরকার ছিল শ্রমের। তারপর আপেক্ষিক স্বাধীনতার যুগ আসে। বর্ণবাদী আইনের দ্বারা এরও পথ রুদ্ধ করা হয়। এটা এতটাই চরমপন্থী আইন ছিল যে নাৎসিরা পর্যন্ত একে খারিজ করে। ফ্লয়েড হত্যার প্রতিবাদ প্রতিদিন যেন নতুন মাত্রা অতিক্রম করেছে। দুনিয়াব্যাপী যে আন্দোলন তা প্রতিদিন অপ্রতিরোধ্য রূপ নিচ্ছে। এ আন্দোলন ইঙ্গিত দেয়, যারা এই শ্রেণি বৈষম্যের সমাজকে শরীরের সবটুকু নির্যাস দিয়ে প্রাচুর্যময় করে তুলছে, তারাই আজ সমাজের সবচাইতে অবহেলিত—সবক্ষেত্রে বঞ্চিত। নীরবে নিভৃতে বহুদিন তারা শোষিত, নিষ্পেষিত। বেসামাল করোনাভাইরাসের ছোবলে পুঁজিবাদের সূর্যটা যখন ডুবতে বসেছে তখন তাকে রক্ষা করতে আবার তারা পুরানো কৌশলের আশ্রয় নিয়ে বর্ণবাদকে উস্কে দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে, এতে তারা দুটি সংকট পাড়ি দিতে পারবে: প্রথমত, কোভিড-১৯ প্যান্ডামিক যুদ্ধে তার যে সীমাহীন ব্যর্থতা সেটা জনগণের মন থেকে মুছে দিতে পারবে। দ্বিতীয়ত, নভেম্বরের নির্বাচনে তার সমর্থকদের সাদা শ্রেষ্ঠত্বের উন্মাদনায় ঐক্যবদ্ধ করে সে পুনঃনির্বাচিত হবে। পুঁজিবাদ শুধু শোষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, চরম ঔদ্ধত্ব- নিকৃষ্ট নিষ্ঠুরতা আর বেপরোয়া সংস্কৃতিরও জন্ম দিয়ে থাকে। কিন্তু মানুষ জাগলে ইতিহাসের চাকা উল্টোদিকে ঘোরানো যায় না। জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে হোয়াইট সুপ্রিমেসির যে কুৎসিত চেহারা তা উলঙ্গভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ড আমেরিকানদের অতীতের সকল অত্যাচার আর বৈষম্যের ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে করোনাকালীন সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা- মিথ্যাচার- শঠতা এবং বেকারত্ব ও অর্থকষ্ট। এছাড়াও লক্ষণীয় করোনা রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে কালোরা নিদারুণ বৈষম্যের শিকার ও মৃত্যু অনুপাতে কালোর সংখ্যা অনেক বেশি। এ সকল ঘটনা মিলিত হয়ে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে আমেরিকার রাজপথে। আজ আমেরিকাসহ সারা পৃথিবীতে প্রতিবাদের মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে নয়া উদারবাদের মৃত্যুঘণ্টার আগাম ধ্বনি। এব্যবস্থা মানুষ আর মানবিকতার চরম শত্রু, মানবিক সমাজের জন্য বিপজ্জনক। এর বিনাশ হল, ব্যক্তি মালিকানার সমাজের উচ্ছেদ ঘটিয়ে বৈষম্যহীন সমাজ, যেখানে থাকবে সম্পদের সামাজিক মালিকানা। এই সমাজেই আছে মানুষ এবং মানবিকতার মুক্তি। ইতিহাস সেই মাহেন্দ্রক্ষণে উপনীত। ইতিহাস আজ উত্তরণের সেই বিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে। একসময় লেলিনের ভাস্কর্য সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তাতে অনেকে তালি দিয়ে দাম্ভিকতার সাথে বলেছিল- দুনিয়াতে পুঁজিবাদের বিকল্প নাই। আজ তাদেরি দেশে কলম্বাসসহ পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের প্রতিভূদের ভাস্কর্য যখন চুর্ণ হয় জনরোসের শিকার হয়, তখন বুঝতে হবে জনগণ পুঁজিবাদকে প্রত্যাখান করছে, তার স্থান এখন ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..