সাংবাদিক ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা কামাল লোহানী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
এ এন রাশেদা: কামাল লোহানী। পুরো নাম আবু নঈম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী। ১৯৩৪ সালের ২৬ জুন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থানার খান সনাতলা গ্রামে জন্ম হয় তাঁর। বাবার নাম আবু ইউসুফ মোহাম্মদ মুসা খান লোহানী। মা রোকেয়া খান লোহানী। মাত্র ৬ বছর বয়সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই মা পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। তারপর কলকাতায় স্কুল শিক্ষিকা ফুফুর কাছে কিছুদিন। লেখাপড়া শুরু হয় পার্ক সার্কাস এলাকায় ‘শিশু বিদ্যাপীঠ’-এ। পরবর্তীতে পাবনা জেলা স্কুল। ১৯৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকায় ছাত্রদের মিছিলে গুলির প্রতিবাদে, পাবনায় ২২শে ফেব্রুয়ারির ছাত্র মিছিলে যোগ দিলেন কামাল লোহানী। সামনে ছিল মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা। তাই পড়াশুনায় নিমগ্ন ছিলেন। কিন্তু ২১শে-র ঘটনা তাকে বিচলিত করে। এবং এই আন্দোলন থেকেই গোপন রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন: ‘মেট্রিক পরীক্ষার্থী হয়েও মিছিলে শরিক হলাম, আর এর মধ্য দিয়েই মাতৃভাষার প্রতি অনুরাগ ও স্বদেশপ্রেম আমার মধ্যে জাগরিত হলো। অবশ্য ঢাকায় যা হচ্ছিল তার ঢেউ সারা বাংলাদেশেই ছড়িয়ে পড়ছিল। যদিও তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল ছিল না, তথাপি তা হয়েছিল।’ মেট্রিক পাশের পর তিনি ভর্তি হলেন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে। কলেজে প্রগতিমনাদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘পাইওনিয়ার ফ্রন্ট’। কলেজ ছাত্র-সংসদ নির্বাচন হবে কিন্তু প্রগতিশীলদের কোনও সংগঠন ছিল না। তবে ছাত্রলীগ ছিল, তাই তারা ‘পাইওনিয়ার ফ্রন্ট’ এর নামেই ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলেন। একজন ছাত্রলীগ ছাড়া পুরো প্যানেলেই তারা জয়লাভ করলেন। পরে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত হলে পাবনায়ও ছাত্র ইউনিয়নের কমিটি গঠিত হয় এবং পাইওনিয়ার ফ্রন্টের সবাই ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য হন। পূর্বোক্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন: ‘১৯৫৩ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি নুরুল আমিন পাবনায় আসবে বলে আমরা জানলাম। ছাত্র হত্যার নির্দেশ দানকারী নুরুল আমিনকে প্রতিহত করতে হবে। আমাদের সঙ্গে বহু শ্রমিক যেমন হোসিয়ারি, বিড়ি শ্রমিক ও অন্যান্যরাও যুক্ত ছিলেন- প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক। ছাত্র-শ্রমিকের বিশাল মিছিল নিয়ে আমরা যখন যাচ্ছিলাম, পথে আমাদের উপর হামলা করা হলো। আমাদের মিছিলে ঘোড়া দাবড়ানো হলো ছত্রভঙ্গ করার জন্য। সেদিন একটা টেবিলের উপর দাঁড়িয়ে সবাই বক্তৃতা করছিলেন এবং আমিও করলাম। সেটাই আমার জীবনের প্রথম বক্তৃতা। রাজনীতির কারণেই আমাকে বক্তৃতা করতে হয়েছিল। ১৯৫৩ সালে ছাত্র ইউনিয়নের সম্মেলনে আমরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করেছিলাম। এসবের মধ্য দিয়ে আমার মধ্যে এক সাংস্কৃতিক জাগরণের সৃষ্টি হয়েছিল যে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হলাম। সেই রাজনীতি আমাকে সামনের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। রাজনীতির প্রয়োজনে নাটকও করেছি।’ ১৯৫৪ সালের ২৯শে মে পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নরের শাসন অর্থাৎ ৯২-ক ধারা জারি করা হলো। সরকারের বিরুদ্ধে বললে গ্রেফতার করার আইন। ওইদিনই অর্থাৎ সেবার ঈদের আগের দিন তাদের বাড়ি ঘেরাও করে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে যাওয়ার আগে তাঁর কাছে থাকা গোপন কাগজপত্র তিনি গ্রামের একজন কৃষককে ডেকে দিতে পেরেছিলেন। কলেজ থেকে তিনি যখন গ্রামে আসতেন, তখন গ্রামের মানুষদের মাঝে রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করতেন। এই নিয়ম এবং নির্দেশই তখন ছিল¬- সে কাজটি তারা সবাই করতেন বলে জানালেন। ১৯৫৫ সালে রাজশাহী জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি পাবনায় চাচার বাড়িতে যান এবং চাচার কাছ থেকে ১৫ টাকা নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। সেবার বন্যা হয়েছিল, তাই অনেক পথ ঘুরে গোয়ালন্দ দিয়ে ঢাকায়। প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে, তবে দুই তিনদিন পরে অন্যত্র। চাচাতো ভাই ফজলে লোহানী তাকে ‘দৈনিক মিল্লাত’ এ নিয়ে গিয়েছিলেন। সম্পাদক ছিলেন সেকান্দার আবু জাফর। সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা না থাকলেও জেলের ভেতর শ্রমিক কয়েদিদের পত্রিকা পড়ে শোনানো অর্থাৎ ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করে শোনানোর অভিজ্ঞতা আছে বলে জানালেন। আবার মাস শেষে সারা মাসের খবরগুলো একত্রিত করে ক্লাস নেয়ার অভিজ্ঞতা ছিল। অগ্রজ পার্টি কমরেডদের কাছে এই দীক্ষা তিনি নিয়েছিলেন। এভাবে মিল্লাত থেকে সাংবাদিকতা শুরু হল কামাল লোহানীর। এরপর ‘দৈনিক আজাদ’, ‘সংবাদ’, ‘বঙ্গবার্তা’, ‘পূর্বদেশ’, ‘বাংলার বাণী’, দৈনিক ‘বার্তা’য় গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। ১৯৫৭ সালে কামাল লোহানী কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করেন। যা আগে থেকে প্রস্তুতিপর্বে ছিল। ১৯৫৮ সালে মার্শাল-ল জারি হলে তিনি আজিমপুরে সানজিদা খাতুন ও ওয়াহিদুল হকের বাসায় আশ্রয় নেন। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপনের ব্যাপারে সরকারি নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে কামাল লোহানীর দৃঢ় ভূমিকা ছিল। শতবর্ষ পালনের আয়োজনে ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্যে ব্রজসেনের ভূমিকায় অংশ নিয়ে প্রশংসিত হয়েছিলেন তিনি। ১৯৬২ সালে অল্পদিন কারাবাসের পর কামাল লোহানী ‘ছায়ানটে’র সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। সাড়ে চার বছর এই দায়িত্ব পালন করেন। ওই সাক্ষাৎকারে কামাল লোহানী বলেছেন, ‘ছায়ানট যেহেতু কমিউনিস্ট পার্টির অনুপ্রেরণায় হয়েছিল, তাই আমি এই দায়িত্ব নিয়েছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে পরিচালকরা যখন শুধু একাডেমিক দিকে ঝুঁকে পড়লেন- আমি ভাবলাম এখন আমার থাকা ঠিক হবে না। তখন ১৯৬৭ সালের কৃষক শ্রমিকদের আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য ‘ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী’ গড়ে তুলি। ‘ক্রান্তি’ মানে বিপ্লব। আমাদের সঙ্গে ছিলেন আলতাফ মাহমুদ, শেখ লুৎফর রহমান, আব্দুল আলিমসহ আরো অনেকে।’ ‘আমাদের উদ্দেশ্য ছিল ঘরের মধ্যে অনুষ্ঠান নয়, ঘরের বাইরে করা। আমরা ঈদগাহের মাঠ, ধানক্ষেতের মাঝে বড় ময়দানে অনুষ্ঠান করতাম। ‘জ্বলছে আগুন ক্ষেতে খামার’ আমরা ৪০ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে করেছিলাম। পত্রিকায় বড় শিরোনামে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। ‘ও আলোর পথযাত্রী’ মানুষের প্রশংসা পেয়েছিল।’ ‘রাজনীতি আমাকে দিয়ে অনেক কিছু করিয়েছিল। একবার জি এ মান্নানের বড় ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম। তখন তিনি কবি জসীমউদ্দিনের নকশী কাঁথার মাঠ করছিলেন। তিনি আমাকে নাচে নিলেন। নকশী কাঁথার মাঠ যেহেতু পূর্ববাংলার কাহিনী তাই বিদগ্ধজনদের দাবি ‘নকশি কাঁথা’ই করতে হবে- আবার পশ্চিম পাকিস্তানে এই নৃত্যদল যাবে। আমি তখন নাচ জানতাম না। কিন্তু আমাকে নাচ শেখানো হলো। পরবর্তীতে নৃত্যশিল্পী হিসেবে বিদেশেও গেছি। একবার করাচিতে যখন নামলাম তখন অপ্রীতিকর ঘটনা তারা ঘটিয়েছিল। ঢাকা এয়ারপোর্টে আসার পর আমাদের দলীয় নেতা যখন আমার পাসপোর্ট চাইলেন তখন দিলাম। পরে বুঝলাম আমার পাসপোর্ট সিজ করা হলো।’ ১৯৭১ সালে তিনি স্বাধীন বাংলা বেতারের সংবাদ বিভাগের প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫ শে ডিসেম্বর তিনি ঢাকা বেতারের পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি বেতারকে পুনর্গঠনে মনোযোগী হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের দিকে মনোনিবেশ করেন। ১৯৮১ সালে ‘দৈনিক বার্তা’র সম্পাদকের চাকরিতে সমাপ্তি টানেন। তখন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। আর এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘বিএনপির শাসনামলে শিল্পকলা একাডেমীর মহা পরিচালকের দায়িত্বে থাকাকালীন তৎকালীন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী জাহান আরা বেগমের সাথে আমার এক প্রকার ঝগড়াই হয়ে গেলে আমি ইস্তফা দেই এবং যে কাজগুলো তখন করতে পারেনি সে কাজগুলো পরবর্তী সময় করেছি।’ তিনি সব সময় দৃঢ়চেতা ছিলেন। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতির দায়িত্ব তিনি দু'দফায় পালন করেছেন নিষ্ঠা ও তেজোদীপ্ততার সঙ্গে। উদীচী সদস্যদের কাছে তিনি প্রিয় লোহানী ভাই। তার সময়কালে উদীচী স্বাধীনতা পুরস্কার প্রাপ্ত হয়। ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটে’র উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। সাংবাদিকতার জন্য ২০১৫ সালে ‘একুশে পদক’ এ ভূষিত হয়েছিলেন কামাল লোহানী। তাঁর বইয়ের মধ্যে রয়েছে- ‘আমরা হারাবো না’, ‘সত্যি কথা বলতে কি?’, ‘যেন ভুলে না যাই’, ‘মুক্তিসংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার’, ‘রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলা বেতার’, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার’, ‘এ দেশ আমার গর্ব’, ‘আমাদের সংস্কৃতি ও সংগ্রাম’, ‘লড়াইয়ের গান’ ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নৃত্যশিল্পের বিস্তার’ ‘প্রেমে কবিতার মত’ এবং কবিতার বই ‘শব্দের বিদ্রোহ’। ‘বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনই ছিল কামাল লোহানীর সর্বশেষ ও জীবনের সর্বোচ্চ দাবি। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ও ধর্মনিরপেক্ষতার দাবি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর জিয়াউর রহমান, এরশাদ এবং বেগম খালেদা জিয়া- সেই চার মূলনীতি সংবিধান থেকে বিদায় করে দিয়েছিলেন এবং কেউ কেউ বিদায় দানকে বহাল রেখেছেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় এলেও সংবিধানের অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র পুনরুদ্ধারে তারা ব্যর্থ হয়েছে। আর এখন কামাল লোহানী এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের জন্য যারা এতদিন আন্দোলন করে আসছিলেন তারা সমবেত হয়েছিলেন। কামাল লোহানী ‘বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা জাতীয় কমিটি’র আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছিলেন। যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. মোশতাক আহমদ ও সদস্য সচিব অধ্যাপক বদিউর রহমান। সেই আন্দোলনে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বাসদ, জাসদসহ অনেকেই ছিলেন। কিন্তু সংসদে সেই একাত্তরের নিরাবরণ সংবিধান পাশের দিনে শহীদ মিনার থেকে নির্ধারিত কালো পতাকার মিছিল ছিল, সেই মিছিলে এই সব দলের সংসদ সদস্যরা আর থাকলেন না এবং আওয়ামী লীগ অসন্তুষ্ট হবে বিবেচনায় অনেকে এলেন না। সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য জনগণের চিন্তা-চেতনা বিকাশের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের কোনো কর্মসূচি নেই। বিভিন্ন দল থেকে প্রলোভন দেখিয়ে এবং জামাত শিবির থেকে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সদস্যপদ দেয়া এবং কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে সংসদ সদস্য বানানোই আওয়ামী লীগ তাদের কর্তব্য বলে মনে করছে। বঙ্গবন্ধুর প্রতিজ্ঞা বাস্তবায়নের লক্ষ্য তাদের নেই। তাই বাহাত্তরের সংবিধানের মূল লক্ষ্যের দিকে জনগণকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষুদ্র শক্তি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঋদ্ধ কামাল লোহানী এবং সেই ধারার রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ব্যক্তিদেরই এগিয়ে আসতে হয়েছে। কামাল লোহানী বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা জাতীয় কমিটির শেষ সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন ৪ নভেম্বর ২০১৯। কিছুটা ভগ্নহৃদয় এবং ভগ্ন শরীরে তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন সেই সাংবাদিক সম্মেলনে। পূর্বাপর অবস্থা বর্ণনা করে শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত এদেশের মানুষকে বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠার উদাত্ত আহ্বান জানাই।’ “মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্দীপ্ত দেশের ছাত্র, যুব, নারী, শ্রমিক, কৃষক, মজুর, শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, পেশাজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, লেখক, বুদ্ধিজীবীসহ সর্বস্তরের প্রতিনিধি সমন্বয়ে একটি অভিন্ন মঞ্চে দেশব্যাপী গণজাগরণ সৃষ্টির প্রত্যয় নিয়ে ‘বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা জাতীয় কমিটি’ গঠন করে ২০১১ সাল থেকে নানাভাবে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তারই ধারাবাহিকতায় আজ এই ‘সংবিধান দিবসে’ আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীকে বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।” তারপর তিনি বলেন, ‘আমাদের অঙ্গীকার যেকোনো মূল্যে বাহাত্তরের সংবিধান তথা রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির যথাযথ পুনঃপ্রতিষ্ঠা। তাই আমাদের দাবি- ১) রাষ্ট্রীয়ভাবে ৪ নভেম্বর ‘সংবিধান দিবস’ ঘোষণা এবং যথাযথ মর্যাদায় দিবসটি পালন। ২) সামগ্রিকভাবে বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ৩) রাষ্ট্র পরিচালনায় রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। ৪) সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী ধর্মভিত্তিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা এবং ৫) বাংলাদেশের বসবাসরত বিপুল সংখ্যক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও মর্যাদা নিশ্চিত করা।’ সাত মাসের মাথায় ২০ শে জুন সকাল দশটায় তিনি চিরবিদায় নিলেন। হলো না কামাল লোহানীর বাহাত্তরের সংবিধান ফিরে পাওয়া। বাবার লাশের পাশে দাঁড়িয়ে তার প্রথম সন্তান সাগর লোহানীকে আক্ষেপ করে বলতে শোনা গেল, ‘বাবা তার সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ দেখে যেতে পারলেন না’। সাংবাদিক ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা কামাল লোহানীকে জানাই প্রণতি। তথ্যসূত্র: মাছরাঙ্গা চ্যানেল ও দেশ টিভি চ্যানেলে প্রচারিত সাক্ষাৎকার, দৈনিক সংবাদ লেখক: সম্পাদক, একতা সহ-সভাপতি, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..