যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আজ থেকে দেড় যুগ আগে বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রবল প্রতিবাদ সত্ত্বেও বন্দুকের নলের মুখে এশিয়ার সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজী বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বিএনপি সরকার বিশ্ব ব্যাংকের পরামর্শে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী এই গুরুত্বপূর্ণ শ্রমঘন কারখানাটি বন্ধ করেছিল। স্বাধীনতা-উত্তরকালে যে শ্রমিক দিনের পর দিন শ্রম দিয়ে জীবনকে মেশিনের সঙ্গে পিষে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তিকে অব্যাহত রেখেছিল- হাজার হাজার শ্রমিকের সেই চাকরি এক দিনের নোটিশে খেয়ে ফেলে তাদেরকে পথে বসিয়ে দিয়েছিল সরকার। কর্মমুখর আদমজীকে শ্মশানে পরিণত করা হয়েছিল। চাকরি হারানোর ক্ষোভে শ্রমিক যেন প্রতিবাদ করতে না পারে, কর্মহীন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে দাঁড়িয়ে কোনো শ্রমিক যেন কাঁদতে না পারে সেই ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল। দুর্বৃত্তপনা, পেশিশক্তি আর বন্দুকের নলের মুখে শ্রমিকদের সেই কান্নাকে গিলে ফেলতে হয়েছিল। তখন সরকার ও বিশ্ব ব্যাংকের তাবেদার এদেশের গণমাধ্যমগুলো আনন্দে উলঙ্গ হয়ে প্রচার করা শুরু করেছিল, এ বড়ই লোকসানের খাত। একে বন্ধ করে দিলে অন্য পাটকলগুলো ভালভাবে চালানো যাবে। এরপর শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা আর রূপসা নদী দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গিয়েছে। কতোটা ভালভাবে চলেছে সেটা এখন বোঝা যাচ্ছে। ১৮ বছর পরে এসে আওয়ামী লীগ সরকার-পরিচালিত গোটা পাটকলগুলোই কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে। এরই মধ্যে জানানো হয়েছে, পাটকলগুলোতে যে স্থায়ী প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক আছে তাদের সবার চাকরিই ‘গোল্ডেন হ্যান্ডশ্যাকের’ নামে খেয়ে ফেলবে এই আওয়ামী লীগ সরকার। বিশ্ব ব্যাংকের তাবেদারি করার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে লজ্জাহীন তীব্র প্রতিযোগিতা আছে। কে কার চেয়ে বেশি তাবেদার এটা প্রমাণ করার জন্য প্রতিনিয়ত এই দুটো দল মরিয়া থাকে। বিশ্ব ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষায় দেশের স্বার্থও এদের কাছে নস্যি ব্যাপার। এটা প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিদিনের জন্যই সত্য ও বাস্তব। সেটা গোটা পাটখাতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে ১৮ বছর পরে আরো একবার প্রমাণ করলো মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের দল বলে দাবিদার আওয়ামী লীগ। প্রতিদিন বা সবসময়ের সত্যটা দেড় যুগ পরে এসে আওয়ামী লীগ আবারো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, আওয়ামী লীগ আর বিএনপির মধ্যে দেশের স্বার্থ বিসর্জনে, গরিব মানুষের পেটে লাথি মারতে বিন্দুমাত্র কোনো পার্থক্য নাই। যাহা আওয়ামী লীগ, তাহাই বিএনপি। যাহা বিএনপি, তাহাই আওয়ামী লীগ। পাটকলের শ্রমিকদের কেন বিদায় দেওয়া হচ্ছে? তিন টাকার কাজ তেত্রিশ টাকা দিয়ে করানোর এই লুটপাটের স্বর্ণযুগেও সরকার ও তার তস্যদের মুখে সেই পুরনো কিচ্চা- লোকসান হচ্ছে। কেন লোকসান হচ্ছে? দুটো কারণকে খুব সযতনে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে- এক. পাট কেনায় দুর্নীতি; দুই. অব্যবস্থাপনা। প্রশ্ন হচ্ছে- পাট কিনে কে? শ্রমিক কি পাট কেনে? না, শ্রমিক পাট কেনে না। পাট কেনে সরকারি বড় কর্মকর্তা আর পাট দেয় সরকারের পোষ্য দালালরা। তাহলে দুর্নীতিবাজ সেই সরকারি কর্মকর্তার কী চাকরি যাবে? না, তার চাকরি যাবে না। তিনি পা চেটে চেটে আরো উপরে উঠবেন আর চাকরি যাবে শুধু শ্রমিকের। প্রশ্ন হচ্ছে- পাটকলের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কি শ্রমিকের হাতে। না, সেটা করে সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আর মন্ত্রণালয়ের সরকারি নেতারা। তাহলে অব্যবস্থাপনার দায় কেন শ্রমিক নেবে? অব্যবস্থাপনার জন্য চাকরি গেলে তো সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আর সরকারি নেতাদের যাওয়ার কথা! কিন্তু না, তাদের চাকরি যাবে না, চাকরি যাবে শ্রমিকের। কারণ, শ্রমিক হচ্ছে গরিব, তাঁকে লাথি মারাটা সহজ। আর প্রতিবাদ করলে নিজস্ব পোষ্য বাহিনী, সরকারি বাহিনী তো আছেই। বাক স্বাধীনতা নিয়ে দিনরাত এক করে ফেলা তথাকথিত সুশীল সমাজ বা গণমাধ্যমও কিছু বলবে না- কারণ, এতে যদি তাঁবেদারির খাতা থেকে নাম কাটা যায়! একজন সরকারি কর্মকর্তা তো রাখঢাক না রেখেই বলে ফেললেন, আসলে বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের চেয়ে সরকারি খাতের শ্রমিকদের বেতন বেশি এটাও স্বেচ্ছা অবসরের একটা কারণ। তার মানে, শ্রমিকের বেতন সরকারি স্কেল অনুযায়ী একটু বেশি হলে, সে ভালভাবে খেয়েপরে বাঁচতে পারলে যেন সরকারের বুক ফেটে যায়! ধনিক শ্রেণির পক্ষে তো এটা সহ্য করা আসলেই কঠিন যে, গরিব শ্রমিক ভাল বেতন পাচ্ছে, সেই টাকায় ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা শেখাচ্ছে! শ্রমিককে না খাইয়ে মারার নীতিটা তাই এই সরকারের বিকৃত রুচির পরিচয় ছাড়া আর কিছুই না। আর এখন সারাবিশ্ব জুড়েই করোনার মহামারী চলছে। সময়টা গরিব-মধ্যবিত্ত-খেটে খাওয়া মানুষের জন্য কোনো অবস্থাতেই অনুকূলে নয়। সরকারের কেতাদূরস্ত মন্ত্রী, নেতা, পাতিনেতা সবাই রঙিন টেলিভিশনে নিজের চেহারা জাহির করে বিনয়খচিত সুললিত মৃদু মৃদু স্বরে আবৃত্তির ঢঙে বলেন, ‘এই করোনার সময়ে দয়া করে মালিকপক্ষ কাউকে ছাঁটাই করবেন না। দুর্যোগ কেটে গিয়ে পূর্ব দিগন্তে উদিত সূর্যের করোনা রসে আবার পৃথিবী শান্ত হবে। সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বাঁচুন, প্রতিবেশীর দিকে নজর রাখুন- এটাই সরকারের আহ্বান, সরকার সেটার জন্যই চেষ্টা করছে।’ সেই চেষ্টার ফল হিসেবে সরকার নিজেই একসঙ্গে ২৫ হাজার পাটকল শ্রমিকের চাকরি খেয়ে পথে বসিয়ে দেওয়ার সব আয়োজন করে ফেলেছে। এমন দ্বি-চারিতার, এমন শ্রমিক-বিদ্বেষী, গরিব-মারা, আত্মঘাতী সরকাকে ধিক! ধিক এই তাঁবেদার সরকারের এমন রাষ্ট্রবিরোধীকে নীতিকে। এর জবাব অবশ্যই একদিন আওয়ামী লীগ, বিএনপি নামধারী সরকারগুলোকে দিতে হবে। এজন্য শ্রেণি-সংগ্রামের কোনো বিকল্প কিছু নাই। সেই সংগ্রামকেই এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..