সোমেন চন্দের গল্পে শ্রেণিচেতনার শিল্পরূপ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
অমিত রঞ্জন দে : সোমেন চন্দ (জন্ম : ২৪ মে ১৯২০, মৃত্যু : ৮ মার্চ ১৯৪২) একাধারে ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের অগ্রসেনানী, পাশাপাশি প্রগতিশীল সাহিত্য ও সংস্কৃতিজগতেরও পুরোধা ব্যক্তিত্ব। সোমেন চন্দের জীবনকাল মাত্র ২২ বছর। এই ২২ বছর সময়কালে তিনি নিজেকে একাধারে একজন কথাসাহিত্যিক ও মার্কসবাদে বিশ্বাসী রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে পরিচিত করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। মানবিকতাবোধে বিশ্বাসী আরো অনেককেই আমরা স্মরণ করতে পারি, যাঁরা এই বাংলার মাটিতে মনুষ্যত্ববোধের তাড়নায় মানবতাবিরোধীদের হাতে মৃত্যুবরণ করেছেন। তবে রাজনৈতিক মতাদর্শ ও ন্যায়নীতিতে অবিচল সোমেন দর্শন ও সাহিত্যকে যেভাবে একই সুতায় গেঁথেছেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর। জন্মশতবর্ষে এই ক্ষণজন্মা মানুষটির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। সোমেন তাঁর গল্প-সাহিত্যে শ্রেণিচেতনাকে তুলে ধরেছেন এক নান্দনিক উপস্থাপনায়। সোমেনের ‘অমিল’ গল্পে আমরা দেখতে পাই এক দরিদ্র কন্যা ভারতীর সঙ্গে ধনী পরিবারের মেয়ে রেখার সাময়িক বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠতে। কিন্তু সে সম্পর্ক স্থায়িত্ব লাভ করে না রেখার অবিশ্বাস-সন্দেহ এবং সেটাকে ঘিরে অন্য মেয়েদের কূট মন্তব্যের কারণে। অভিনয়ের প্রয়োজনে রেখা ভারতীকে গহনা ধার দেয়, নিজের বাড়িতে নিয়ে যত্ন করে খাওয়ায়, এমনকি নিজের গাড়িতে করে তাকে বাড়িতে পৌঁছে দিতেও কার্পণ্য করেনি। কিন্তু গহনা ফেরত দেওয়ার পর রেখা যখন তার একটা গহনা খুঁজে পাচ্ছিল না তখন দেখা দিল বিপত্তি। প্রকাশ্যে এলো রেখার আভিজাত্য, উন্মুক্ত হলো তার শ্রেণি। মুহূর্তের মধ্যেই ভারতীর প্রতি রেখার মনে অবিশ্বাস দানা বাঁধে। সে কটু মন্তব্যে আহত করে ভারতীকে। বিনা প্রমাণে দরিদ্র বান্ধবীকে চোর বলে আখ্যায়িত করতে দ্বিধা করে না। ভারতী তার নিজের সামাজিক অবস্থা বুঝে যায়। সে বিস্ময়ে বিবর্ণ হয়ে পড়ে। তবু সে রেখাকে গহনাটি খুঁজে দেখার অনুরোধ জানায়। কিন্তু রেখার সন্দেহমিশ্রিত তিরস্কারে ভারতী মরমে মরে যায়। মুহূর্তের মধ্যে সে বুঝে যায় ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে কোনও মানবিক বন্ধন বা বিশ্বাসের সেতু তৈরি হতে পারে না। সোমেন-এর ‘বনস্পতি’ গল্পটি পীরপুর গ্রামের একটি পুরাতন বটগাছকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। দীর্ঘ দুই শতাব্দির সামাজিক বৈষম্য, শোষণ-বঞ্চনার ছবি প্রতিফলিত হয়েছে ‘বনস্পতি’ গল্পে। উঠে এসেছে সামন্ততান্ত্রিক সমাজের কথা, ব্রিটিশ শাসন-শোষণ-বঞ্চনার কথা। এই গল্পের শুরু ১৯৫০ সাল থেকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তখনও বাংলার বুকে তার আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। কিন্তু সেই সময়েও সামন্ত প্রভুদের বর্বর শোষণ ও নির্যাতন ছিল। সোমেনের ‘বনস্পতি’ গল্পে তেমনই এক সামন্ত প্রভু পীরপুরের বৃদ্ধ জমিদার ‘নবকিশোর চৌধুরী’। সোমেন এ গল্পে অতি চমৎকারভাবে জমিদার নবকিশোরের লাম্পট্য, নারীর প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি, চম্পকের যৌনবাসনার যন্ত্রণার ছবি এবং শংকরের অকথিত বাসনা সুকুমারীর জীবনে যে হাহাকার নেমে এসেছে তা অসাধারণ মুন্সিয়ানার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন। গল্পের একপর্যায়ে আমরা দেখতে পাই নবকিশোর চৌধুরীর তৃতীয় পুত্রের গোপন সম্পর্কের কথা। যেটা জানার পর জমিদার দুজনকেই হত্যা করে। কিছুদিন পর জমিদার নবকিশোর নদীর ধারে দুটি ‘অশ্বত্থের চারা’ একসাথে পুতে রাখেন। সেই চারা ধীরে ধীরে বৃহদাকায় বনস্পতিতে পরিণত হয়। অশ্বত্থের চারা বেড়ে ওঠার সাথে এগিয়ে চলে গল্প। যেখানে ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধ, ১৭৭০ সালের মহাবিদ্রোহ, ১৯০৫ সালের স্বদেশি আন্দোলন, এমনকি ১৯৩০-এ গান্ধীর আইন অমান্য করার ঘটনা- এ সবই চিত্রিত হয়েছে এক ঐতিহাসিক যুগ পরম্পরার ক্যানভাসে। সোমেনের অগ্রজ বা সমসাময়িক লেখক এবং তাঁর অনুজ কল্যান চন্দের লেখা থেকে জানা যায়, গ্রাম্যজীবনের অভিজ্ঞতা তেমন ছিলো না সোমেন-এর। গ্রামের অভিজ্ঞতা বলতে শৈশবে মায়ের সাথে মামাবাড়ি যাওয়ার অভিজ্ঞতেই প্রধান। মূলত: তাঁর বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরে। যেখানে একটু একটু করে গড়ে উঠছে শিল্প-কলকারখানা। এসব কলকারখানায় কাজের খোঁজে মানুষ ভিড় করছে শহরে। যাদের অধিকাংশেরই পূর্ব-পুরুষ কৃষক। এই শ্রমিকদের কেউ কাজ করে মিউনিসিপ্যালিটির কর্মী হিসেবে, কেউ প্রেসে, কাপড় কল-সূতা কলে, সাবান বা বিস্কুট ফ্যাক্টরিতে, রেলওয়ের ওয়ার্কসপে। এদের জীবনের উত্থান-পতন, ঘাত-প্রতিঘাত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পান সোমেন। আর সে পর্যবেক্ষণ কাজে লাগিয়ে তিনি রচনা করেন ‘সংকেত’ গল্পটি। যে কারণে ‘সংকেত’ গল্পে সাহিত্যবোধের পাশাপাশি বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। সেখানে শ্রেণিচেতনা তথা পুঁজিবাদ বিরোধী শ্রেণিসংগ্রামেরও এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। এ গল্পে গ্রাম্য নিম্নবিত্ত, মধ্যস্বত্বভোগী এবং শোষক বা মালিক শ্রেণির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। গল্পের কয়েকটি চরিত্র যেমন- দশরথ, রামচন্দ্র, বলরাম, ইয়াসিন, আকবর আলী, রহমান এরা সবাই গ্রামের নিম্নবিত্ত শ্রেণির অংশ। এদের কেউ হিন্দু, কেউ মুসলমান। কেউ তাঁতি, কেউ খেতমজুর। দারিদ্র্য এদের আষ্টেপৃষ্ঠ ঘিরে রেখেছে এবং সেটাই তাদের পরিচয়ের মাপকাঠি হয়ে পড়েছে। তারা প্রত্যেকেই শহরে যে কাপড়ের কল স্থাপিত হয়েছে, সেখানে কাজের আশায় বুক বাঁধে। গল্পের মধ্যে এক কাপড়কলের ম্যানেজার ও তার দালাল বাচ্চা মৌলভির মতো মধ্যস্বত্বভোগীদের সরব উপস্থিতি পাওয়া যায়। যারা সব সময় সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। এমনকি গ্রামের কৃষক-শ্রমিক হতদরিদ্র মানুষের জীবনে ঝড় তুলে দিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করতেও কার্পণ্য করে না। সোমেন চন্দ সে রকম ঘটনারই অবতারণা করেছেন ‘সংকেত’ গল্পে। আরেকটি বিষয় এখানে না বললেই নয় তাহলো সোমেন তাঁর ‘সংকেত’ গল্পে অতি চমৎকাররূপে কৃষিজীবনের মধ্যে যন্ত্রজীবনের ক্রমপ্রবেশের এক সুনিপুণ চিত্র তুলে ধরেছেন। কারখানায় কাজ করার জন্য গ্রামের মানুষ চলে আসছে, তাদের পুরোনো জীবন ভাঙছে। নতুন জীবন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে কারখানার মালিক দ্বারা। সোমেন যখন দক্ষিণ মৈশুরিতে বাস করতেন তখন মাঝে মধ্যেই তাকে প্রত্যক্ষ করতে হত হিন্দু-মুসলিম, মুসলিম- খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে পরস্পরবিরোধী আক্রমণ, লুট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা। কিন্তু ১৯৪১ সালে ঢাকা শহরে হিন্দু-মুসলমানের মাঝে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংগঠিত হয় তা সোমেনের মনের মধ্যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। সেই কলঙ্কিত ইতিহাস নিয়েই সোমেন চন্দ লিখেন ‘দাঙ্গা’ গল্পটি। সে সময় ব্রিটিশ সাম্র্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সমগ্র ভারতবাসী সংগ্রামে রত। সোমেন ধারণা করতে থাকেন এই ধরনের ঘটনায় যারা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে রত সেই সমস্ত সংগ্রামী জনতার মধ্যে কেউ কেউ সাম্প্রদায়িকতায় আচ্ছাদিত হতে পারেন। এরকম এক উৎকণ্ঠা থেকেই তিনি রচনা করেন ‘দাঙ্গা’ গল্পটি। সোমেন তাঁর ‘দাঙ্গা’ গল্পে মানুষের অসার উত্তেজনার বিস্তার দেখে মর্মপীড়িত, স্পর্শকাতর শুভবুদ্ধিসম্পন্ন এক তরুণের মনে দাঙ্গার ঘটনাগুলো কী প্রতিবেদন সৃষ্টি করেছে তার স্বরূপ উদ্ঘাটনে ব্রতী হয়েছেন। এখানে রাজনৈতিক মতাদর্শ আর মানুষের মনঃপ্রতিক্রিয়ার সংমিশ্রণের কারণে তা একটি সার্থক রাজনৈতিক গল্পে পরিণত হয়েছে। সোমেন দেশকে এবং দেশের জনগণকে কতখানি দরদ দিয়ে ভালোবেসেছিলেন তাঁর প্রমাণ মেলে এই গল্পের নায়ক অশোকের একটা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। ‘আগামী নতুন সভ্যতার যারা বীজ, তাদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে আমি যোগ দিয়েছি, তাদের সুখ-দুঃখ আমারও সুখ-দুঃখ। আমি যেমন বর্তমানের সৈনিক, আগামী দিনেরও সৈনিক বটে। সেজন্য আমার গর্বের আর সীমা নেই। আমি জানি আজকের চক্রান্ত সেদিন ব্যর্থ হবে, প্রতিক্রিয়ার ধোঁয়া শূন্যে মিলাবে। আমি আজকের থেকে দ্বিগুণ কর্তব্যপরায়ণ হলাম, আমার কোনো ভয় নেই।’ সোমেন চন্দের ‘ইঁদুর’ গল্পে দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবনের যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি যেমন উঠে এসেছে, ঠিক তেমনি অনুপম মাধুরীতে চিত্রিত করেছেন মধ্যবিত্ত মানসিকতা। তিনি অত্যন্ত নির্মোহভাবে প্রতিফলন ঘটিয়েছেন শোষকের শোষণ ক্রিয়া। পাশাপাশি উঠে এসেছে মুক্তিকামী মানুষের মুক্তির বারতা। সোমেন সুকুমার চরিত্রের মধ্য দিয়ে অতি চমৎকারভাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভিতু ও দোদুল্যমান মানসিকতাকে চিত্রায়িত করেছেন। ‘ইঁদুর’ গল্পে সুকুমার ছাড়াও মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে বাবা, মা, রক্ষিত মশায়, প্রেস কর্মচারী মদনকে উপস্থাপন করেছেন। এরা প্রত্যেকেই মধ্যবিত্ত মানসিকতার ভাবাবেগতাড়িত। দারিদ্র্যের বর্তমান বাস্তবতা তারা স্বীকার করতে চায় না। একধরনের উদাসীনতা দিয়ে দারিদ্র্যকে ঢাকতে চায়। সোমেন ইঁদুর গল্পে ‘মা’ চরিত্রের মধ্য দিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীর মানসিকতার দারুণ এক প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন। সংসারের কারোর কাছে তাঁর কোনো প্রত্যাশা নেই, নেই কোনো অভিযোগ। সে সংসারের সব ভয়ের কাছে কুঁকড়ে থাকে। তার কোনো মান-অভিমান নেই। সংসারের সবার সুখ-দুঃখের খেয়াল রাখাই তার একমাত্র দায়িত্ব। সে কখনো তার প্রতি সংগঠিত অন্যায়, নির্যাতন, নিষ্পেষণ ও বঞ্চনার বেড়াজাল ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায় না। তাই তো তার স্বামী তাকে কিছু দিতে চাইলেও রান্নার জন্য মাত্র একটা লাল শাড়ির বাইরে অন্য কিছু চাওয়ার থাকে না। এ গল্পে তিনি যন্ত্রযুগের আবির্ভাব, প্রকৃতি ও মানুষের মনোজগতের ছবি এঁকেছেন অতি নিখুঁত নিপুণতায়। পরিবর্তনের পদধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়। সোমেন তাঁর গল্পের মধ্যে কিছু পরে পরেই ইঁদুরের উৎপাতের কথা বলেছেন। সোমেন এখানে অতি তাৎপর্যপূর্ণভাবে ইঁদুরকে উপস্থাপন করেছেন বুর্জোয়া, পুঁজিপতি, শোষক শ্রেণির রূপক হিসেবে। তিনি দেখিয়েছেন সুচতুর ইঁদুর কীভাবে মধ্যবিত্তের কষ্টার্জিত খাদ্য খেয়ে ফেলে, কীভাবে বস্ত্র কেড়ে নিয়ে তাকে অশালীন করে দেয়, তার গোপনীয়তা নষ্ট করে। তার রাতের ঘুম কেড়ে নেয়, তাকে আতঙ্কিত করে তোলে। শোষকরূপী ইঁদুর মধ্যবিত্তের স্বপ্ন দাঁত দিয়ে কীভাবে কুরকুর করে কেটে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। সোমেন তাঁর গল্পে এই ইঁদুরকে বিনাশ করার স্বপ্নও দেখিয়েছেন। তাই তো তিনি ইঁদুরমারা কলের কথা বলেছেন এবং তিনি কেবল স্বপ্ন দেখিয়েই ক্ষান্ত হননি। সুকুমারের বাবার আনা ‘ইঁদুর’ মারা কলের সাহায্যে কয়েকটা ইঁদুর ধরা পড়া এবং তাদের বিনাশও দেখিয়েছেন। ইঁদুর বিনাশে বড়ো বড়ো ইট, লাঠির ব্যবহার দেখিয়েছেন, টেনে এনেছেন সাহসী ছেলের দলের মাধ্যমে বিপ্লবের আভাস। এভাবেই সামাজ দেহের ইঁদুরের প্রতি তাঁর তীক্ষ্ণ কটাক্ষ, নির্মম শ্লেষ আর মেহনতি মানুষের সংগ্রামী জীবনের প্রত্যয়ে গল্পটি অনবদ্য হয়ে উঠেছে। সোমেন ইঁদুর ধরার সময়টাকে উল্লেখ করেছেন ‘প্রত্যুষ’ হিসেবে, যা অত্যাচারে জর্জরিত মানুষের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ যেন অন্ধকারে নিমজ্জিত মানুষের জন্য আলোর হাতছানি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..